
বাচ্চাদের নিয়ে মা নেংটি ইঁদুর। সংগৃহীত।
ছোটবেলায় যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা ‘মজার দেশ’ ছড়া সবাই পড়েছি। ছড়াটির শেষ অনুচ্ছেদ নিশ্চয়ই সবার মনে আছে।
“সেই দেশেতে বেড়াল পালায়,
নেংটি ইঁদুর দেখে;
ছেলেরা খায় ক্যাস্টর অয়েল
রসগোল্লা রেখে!”
নেংটি ইঁদুর দেখে;
ছেলেরা খায় ক্যাস্টর অয়েল
রসগোল্লা রেখে!”
এই অংশটি পড়ার সময় বাড়ির মধ্যে ঘোরাফেরা করা হুলো বেড়ালটার ছবি মনের মধ্যে ভেসে উঠত। ছড়ার সবগুলো লাইনের বক্তব্য আজব হলেও এই অনুচ্ছেদের প্রথম দুটি লাইন মনে হত সত্যি কারণ আমাদের বাড়ির মধ্যে নেংটি ইঁদুরের প্রচুর উৎপাত ছিল, অথচ হুলো ব্যাটাকে কোনওদিন একটাও ইঁদুর শিকার করতে দেখিনি। তার নজর ছিল কেবল ভাত, দুধ আর মাছের দিকে। বাবা বলত, ও মনে হয় নেংটি ইঁদুরকে ভয় পায়! সে যাই হোক, নেংটি ইঁদুর চেনে না এমন বাঙালি পাওয়া দুষ্কর, বিশেষ করে গ্রামের বাঙালি। সবার কাছেই এমন অনিষ্টকারী ক্ষুদে স্তন্যপায়ী প্রাণী মনে হয় আর কেউ নেই!
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৮১ : আকাশ এখনও মেঘলা

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
শুধু সুন্দরবন অঞ্চল নয় সারা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে এদের বিস্তার। নেংটি ইঁদুরের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Mus musculus’, ইংরেজিতে ‘House mouse’। ইউরোপ ও এশিয়া জুড়ে মোট পাঁচটি উপপ্রজাতির নেংটি ইঁদুর দেখা যায়। এদের মধ্যে সুন্দরবন তথা ভারতে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় যে উপপ্রজাতি দেখা যায় সেটি হল ‘Mus musculus castaneus’। বিবর্তনবিদদের মতে, নেংটি ইঁদুরের উৎপত্তি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায়। আর ৭০ লক্ষ বছর আগে সুন্দরবনের তথা ভারতে প্রাপ্ত এই উপপ্রজাতিটির উৎপত্তি ভারত উপমহাদেশেই। কিন্তু প্রধানত বণিকদের হাত ধরেই এরা ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় গোটা পৃথিবীতে। সমুদ্রপথে যখন বণিকরা নানা পণ্যদ্রব্য নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছে তাদের সঙ্গী হয়েছে এই সব নেংটি ইঁদুর। আর তারপর তারা স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছে নতুন দেশে।

ফলের বীজ ভক্ষণরত নেংটি ইঁদুর। সংগৃহীত।
নেংটি ইঁদুর এমন এক প্রাণী যারা মানুষের সঙ্গ ছাড়া থাকে না। তাই সুন্দরবন অঞ্চলে গৃহস্থের বাড়িতে ছাড়া এদের জঙ্গল এলাকায় বা খোলা প্রান্তরে কিংবা নদী তীর ও সমুদ্র উপকূলে পাওয়া যায় না। গৃহস্থের বাড়িতে যেহেতু নানা খাবারদাবার, শস্য ইত্যাদি থাকে তাই গৃহস্থের বাড়িতেই এদের দেখা যায়। দেখা যায় হাটে, বাজারে নানা দোকানেও। এদের বাসা সাধারণত ঘরের অন্ধকার জায়গায় যেখানে মানুষের খুব একটা আনাগোনা নেই। মাটির ঘর হলে তো কথাই নেই। আমাদের পুরনো মাটির বাড়ির খড়ের চালের মধ্যে বহুবার ওদের বাচ্চাসহ বাসা দেখেছি। এছাড়া ধানের বস্তার ভেতরে, জ্বালানি কাঠ, পুরোনো কাঠের আলমারি, খেসারি কলাইয়ের ভুষির স্তুপের মধ্যেও ওদের আস্তানা দেখেছি। ক’দিন আগে ফেলে রাখা রঙের বালতির মধ্যে বাচ্চাসহ মা ইঁদুরের বাসা দেখলাম। এরা কিন্তু মাটির মধ্যে গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায় না।
আরও পড়ুন:

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৭০: রাবণ কে? রামায়ণের রাবণ কী আজও নেই?
নেংটি ইঁদুর এতই ছোট যে এদের ওজন খুব কম, মাত্র ১২ থেকে ২৫ গ্রাম। লম্বা হয় মাত্র ৬৫ থেকে ৯৫ মিলিমিটার। এটা অবশ্য লেজ ছাড়া। লেজটার দৈর্ঘ্য শরীরের সমান বা তার থেকেও একটু বেশি, প্রায় ৬০ থেকে ১০৫ মিলিমিটার। লেজ আঁশযুক্ত আর তার মাঝে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কিছু রোম দেখা যায়। কান দুটো কিন্তু তুলনায় বড়, ১১ থেকে ১৪ মিলিমিটার। কান দুটো প্রায় গোলাকার আর ছোট ছোট লোমে ঢাকা। এদের গায়ের লোম বেশ নরম আর ঘন। পিঠের দিকে লোমের রঙ গাঢ় ধূসর। পেটের দিকের লোম অনেকটা হালকা রঙের। এদের মাথাটা তুলনামূলকভাবে একটু লম্বা। তেমনই তুন্ড অর্থাৎ মুখের সামনের সূচালো অংশ একটু বেশি লম্বা। আর তার আগায় রয়েছে সংবেদনশীল রোম বা হুইস্কার। এই রোমের সাহায্যে এরা রাতের অন্ধকারে খাবার-দাবারের খোঁজ করে। যদিও এরা গর্তের মধ্যে থাকে না তাও এদের চার পায়ে রয়েছে তীক্ষ্ণ নখর যা এদের উপরে বেয়ে উঠতে খুব সাহায্য করে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৮ : পথে এবার নাম সাথী

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
আমিষ নিরামিষ কোনোটাতেই আপত্তি নেই নেংটি ইঁদুরের। ধান, চাল, গম, বিস্কুট, রুটি, খাবারের অবশিষ্টাংশ কোনও কিছুই বাদ যায় না। এমনকি মানুষের খাদ্য নয় এমন জিনিসও ওরা কখনও কখনও খায়। ঘরের বাইরের খাবারের কথা বললে বলতে হয় বিভিন্ন ফলের বীজ, রসালো মূল, রসালো পাতা ইত্যাদি উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পোকামাকড়, গুবরে জাতীয় পোকার লার্ভা, শুয়োপোকা, ছোটখাটো সন্ধিপদ প্রাণী, কাঁকড়া, মাছ, এমনকি মৃত পশুর মাংসও খায়। এদের সাধারণত কোনও জল খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। খাবার দাবারের মধ্যে যেটুকু জলীয় অংশ থাকে তাতেই এদের জলের চাহিদা মিটে যায়।

খাবারের সন্ধানে নেংটি ইঁদুর। সংগৃহীত।
বর্ষার পরে এবং শীতের সময় এদের প্রজননের হার সবথেকে বেড়ে যায়। কারণ এই সময় খাবারের জোগান থাকে সবচেয়ে বেশি, আর সেই সব খাবারের পুষ্টিগত মানও হয় ভালো। পুরুষ নেংটি ইঁদুর হয় বহুগামী, অর্থাৎ একাধিক স্ত্রী নেংটি ইঁদুরের সঙ্গে মিলিত হয়। বাচ্চার জন্ম দেওয়ার জন্য কাগজ বা খড়ের স্তুপ, দেওয়ালের মধ্যে থাকা কোনও ফাটল বা ফোকর, ড্রয়ার, বাক্স, অব্যবহৃত বালতি, কৌটো, হাঁড়ি, কলসি, খড়ের চাল, খড়ের গাদা ইত্যাদি ওদের পছন্দ। যৌন মিলনের আগে পুরুষ নেংটি ইঁদুর গান গেয়ে স্ত্রী নেংটিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। অবশ্য সেই গান আমাদের কানে পৌঁছয় না কারণ সেই গানের শব্দ তরঙ্গ আমাদের শ্রুতিগোচর নয়। পুরুষ নেংটি ইঁদুর তার এলাকাকে চিহ্নিত করে নেয় যাতে অন্য কোনও পুরুষ তার এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে। সে তার প্রস্রাবের সঙ্গে এক ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক মিশিয়ে দেয় যা অন্য পুরুষ নেংটি ইঁদুরদের তার উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়। অনুকূল পরিবেশে একটা স্ত্রী নেংটি ইঁদুর বছরে ৫ থেকে ১০ বার বাচ্চাদের জন্ম দেয়। এটা সম্ভব হয় কারণ এদের গর্ভাবস্থা মাত্র ১৯ থেকে ২১ দিন স্থায়ী।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৭: চাটুকারদের স্তুতিবাক্যই রাজ্যের পতন ডেকে আনে! পেঁচাদের ট্র্যাজেডি আর ‘কথা বলা গুহার’ এক কালজয়ী রাজনৈতিক পাঠ
প্রত্যেকবারে একটা গর্ভবতী স্ত্রী নেংটি ইঁদুর ৩ থেকে ১২টি বাচ্চার জন্ম দেয়। জন্মের সময় বাচ্চারা হয় লোমহীন এবং তাদের চোখ ফোটে না। ৫ থেকে ৭ সপ্তাহ বয়স হলে বাচ্চারা প্রজননে সক্ষম হয়ে ওঠে। আর এদের গড় আয়ু মাত্র এক থেকে দেড় বছর। আয়ু কম হলে কী হবে, এদের এত দ্রুত বংশবিস্তার হয় যে তাতেই মানুষের ব্যাপক সমস্যা তৈরি করে। সুন্দরবন অঞ্চলে যেহেতু বন্যার প্রকোপ অনেক বেশি তাই নেংটি ইঁদুরদের এই সময় সাঁতার দিয়ে নিরাপদ আস্তানায় যেতে দেখেছি বহুবার। এইসব কারণেই নেংটি ইঁদুর নানা ধরনের প্রতিকূলতা সহজে জয় করতে পারে। তাছাড়া এরা এদের লেজের মাধ্যমে অন্তত ১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড দেহের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলতে পারে ফলে পরিবেশের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এদের তেমন কোনও সমস্যা হয় না।

নেংটি ইঁদুর। সংগৃহীত।
শুধু গৃহস্থ বা দোকানদারদের খাবারদাবার খেয়ে ক্ষয়ক্ষতি নয়, জামাকাপড়, লেপ, কাঁথা, তোষক, বালিশ, কম্বল, বই-খাতা, দড়ি, বস্তা ইত্যাদি কেটে প্রভূত ক্ষতি করে আমাদের। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের রোগ বিস্তারেও এদের ভূমিকা রয়েছে, যেমন প্লেগ, রিকেটশিয়ালপক্স, লেপ্টোস্পাইরোসিস, লাইমি রোগ ইত্যাদি। আর তাই অনিষ্টকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে প্রথম সারিতেই রয়েছে নেংটি ইঁদুর। কিন্তু তা বলে কি এদের অন্য কোনও গুরুত্ব নেই? জীববিজ্ঞানের গবেষণায় মানুষের মডেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় যে প্রাণী সেটি কিন্তু এই নেংটি ইঁদুর। জিনগতভাবে মানুষের সাথে অনেকটা সাদৃশ্য থাকায় সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে গবেষণার কাজে প্রাণীটির বহুল ব্যবহার হয়ে আসছে। তাছাড়া সুন্দরবন এলাকায় এদের বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্বের কথা তো অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং বেঁচে থাক নেংটি ইঁদুর। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















