কলকাতায় বৃষ্টি

ফসলের দানা খাচ্ছে ধেড়ে ইঁদুর। সংগৃহীত।

ছোট থেকেই দেখতাম আমাদের বাড়ির পশ্চিমদিকে যে বড় পুকুরটা ছিল তার পাড়ে বিশেষ করে পশ্চিম পাড়ে খুব বড় বড় গর্ত। বলাবাহুল্য পুরো পশ্চিমপাড় জুড়েই ছিল বাঁশঝাড়। ওই গর্তগুলো থেকেই দেখতাম প্রায় ছোটখাটো বিড়ালের আকারের ইঁদুর বেরিয়ে আসত, আবার ঢুকে যেত। সবাই বলত ধেড়ে ইঁদুর। তাই ছোট থেকেই ওদের ধেড়ে ইঁদুর বলে চিনি। পুকুরের পূর্ব পাড়ে অর্থাৎ যেদিকে আমাদের পুরনো বাড়ি ছিল সেদিকের পাড়েও বেশ কিছু বড় বড় গর্ত ছিল। এই দিকে ছিল অনেক নারকেল গাছ। তার মাঝে সজনে, কুল আর আম গাছও ছিল। ওইসব গাছের গোড়ায় ওই ধেড়ে ইঁদুরদের কখনও কখনও ঘুরতে দেখতাম।
আমাদের বাড়িতে ছোট থেকেই কুকুর পোষা হতে দেখেছি। কালু নামে একটা কুকুর ছিল যে ওই ধেড়ে ইঁদুর দেখতে পেলেই প্রচন্ড গতিবেগে তাড়া করত। আর তখন ওই ইঁদুর পূর্বপাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে পুকুরে পড়ে দিব্যি সাঁতার কেটে পশ্চিম পাড়ে গিয়ে গর্তে ঢুকে যেত। বেচারা কালু পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে বোকার মতো সেই দৃশ্য দেখত। পরবর্তীকালে চিম্পু নামের কুকুরটাও ওইভাবে ধেড়ে ইঁদুরদের তাড়া করত। এখন গ্রাম ছেড়ে আধা শহরের বাসিন্দা হলেও আমার বর্তমান বাড়ির আশেপাশেও ওই ধেড়ে ইঁদুরদের এখনও যথেষ্ট পরিমাণে দেখতে পাই। প্রায়শই দেখি বাড়ির পাঁচিলের পাশে কচু গাছের জঙ্গলের মধ্যে ছোটাছুটি করছে। একদিন তো একটা বেজিকে ধেড়ে ইঁদুর শিকার করতে দেখলাম। কখনো দেখি পাঁচিলের ওপর দিয়ে ছুটে একদিক থেকে আর একদিকে যাচ্ছে। সুন্দরবন অঞ্চলের বসতি এলাকা তো বটেই সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকাতেও এই ইঁদুররা বেশ সহজলভ্য। ইংরেজিতে এদের বলে ‘Greater Bandicoot Rat’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Bandicota indica’।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭২ : শুধু হাসি-খেলা?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৬: কাঠবিড়ালি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক

ধেড়ে ইঁদুররা সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ত পরিবেশে চমৎকারভাবে অভিযোজিত প্রাণী। যেহেতু সুন্দরবন অঞ্চলে জোয়ারের সময় কিংবা জলোচ্ছ্বাসে ওদের গর্তগুলো প্রায়শই জলমগ্ন হয়ে যায়, তাতে কিন্তু এদের খুব বেশি যে অসুবিধা হয় তা কিন্তু নয়। আবার এদের খাদক প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেক সময় এরা এমন গর্ত করে যার এক বা একাধিক মুখ থাকে জলসংলগ্ন বা জলের উপরিতলের সামান্য নিচে। এদের শত্রু প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে এরা যে গর্ত করে তা অনেক শাখা-প্রশাখাযুক্ত হয় এবং মাটির প্রায় এক মিটার নিচে হয়। নদী, খাল, পুকুর ইত্যাদির পাড়ের ঢালে এদের গর্তের মুখ দেখা যায়। যেহেতু এরা অসাধারণ সাঁতারু তাই জলে ডোবা গর্ত এদের কাছে মোটেই সমস্যাজনক নয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

ধেড়ে ইঁদুরের গর্ত। সংগৃহীত।

সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকায় খাদ্যের সন্ধানে ছোট নদী, খাঁড়ি এরা খুব সহজেই সাঁতার দিয়ে এপার ওপার করতে পারে। আবার জলোচ্ছ্বাসের সময় কিংবা ভরা জোয়ারের সময় গর্ত নোনা জলে ভরে গেলে ওরা সাঁতরে উঁচুতে চলে যায়, আবার জল নেমে গেলে ফিরে আসে গর্তে। আমাদের বাড়ির সামনে নিয়মিত জোয়ার-ভাঁটা খেলা যে খাল ছিল সেখানেও ওদের সাঁতরে পার হতে অনেকবার দেখেছি। এরা নোনা জল দিব্যি খেতে পারে। আবার উচ্চ লবণসমৃদ্ধ যেসব উদ্ভিদ সুন্দরবনে জন্মায় যেমন গিরা শাক, যদু পালং ইত্যাদি এরা স্বাভাবিকভাবেই খেতে পারে। এইসব বৈশিষ্ট্য দেখে বুঝতে একটু অসুবিধা হয় না যে ধেড়ে ইঁদুররা সুন্দরবনের জন্য চমৎকারভাবে অভিযোজিত হয়েছে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৪০: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২১

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৪: ভাবি প্রশাসক রামের প্রশিক্ষণের সূচনা—রাক্ষস খরের সঙ্গে সংঘাত

আগেই বলেছি ধেড়ে ইঁদুর প্রায় একটা ছোটখাটো বিড়ালের আকারের হয়। লেজ বাদে এদের দৈর্ঘ্য ২৭ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার, আর লেজের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮ সেন্টিমিটার অর্থাৎ দেহ আর লেজ প্রায় সমান সমান। এদের ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হয়। মাথা, ঘাড়, পিঠ গাঢ় বাদামি বা কালচে রঙের লোমে ঢাকা থাকে। এর মাঝে থেকে থেকে কালো রঙের লম্বা ও কর্কশ লোম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পেটের দিকের রঙ অনেকটা ফ্যাকাশে। এদের মুখের সামনের দিকটা অন্যান্য ইঁদুরের জাতের তুলনায় কিছুটা ভোঁতা। দেখলে মনে হয় শূকরের মতো। লেজটা যে অনেক লম্বা তা আগেই বলেছি। একটু মোটাসোটা লেজের রঙ কালো আর লেজের ওপরে দেখলে মনে হয় যেন আঁশ রয়েছে। আর সেই আঁশের মধ্যে থেকে পাতলা পাতলা লোম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। মাথার তুলনায় এদের দুটো চোখ মনে হয় যেন ছোট কিন্তু কান দুটো প্রমাণ সাইজ এবং গোলাকার। অন্যান্য ইঁদুরের মতো এদেরও উপরের চোয়ালের দুটো কৃন্তক দাঁত বেশ বড় এবং এই দাঁত কমলা রঙের হয়। চারটে পায়ের পাতা চওড়া আর পায়ের রঙ কালো। প্রতি পায়ের আঙুলে রয়েছে তীক্ষ্ণ নখ। মাটিতে গর্ত খুঁড়তে এমন নখ সাহায্য করে। এমনিতে এরা ভীতু কিন্তু বিপদে পালানোর পথ না পেলে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং লোম খাড়া করে জোরে ঘোৎঘোৎ শব্দ করে।
কলকাতায় বৃষ্টি

ধেড়ে ইঁদুর। সংগৃহীত।

ধেড়ে ইঁদুরদের বাসস্থানের কথা আগেই বলেছি। তবে সুন্দরবনের বসতি অঞ্চলে জমির আলে এদের গর্ত দেখা যায় এবং এরা জমি থেকে শস্য-ফসল নিয়ে গর্তের মধ্যে জমা করে। কখনো কখনো খামার, গোলাঘর এবং মাটির ঘরের মেঝের নিচেও এদের গর্ত খুঁড়ে আস্তানা বানাতে দেখা যায়। আমাদের গ্রামের বাড়ির খামারে এই ইঁদুরকে মারার জন্য একটা গর্তের মুখে জল ঢাললে অনেক দূরের কোনও একটা গর্তের মুখ দিয়ে এদের পালাতে দেখতাম। বোঝা যেত মাটির নিচে এদের গর্তের জাল কতটা সুদূরপ্রসারী। আধা শহরবাসী হওয়ার পর এদের জঞ্জালের স্তুপের ওপর ঘোরাঘুরি করতেও দেখেছি। তার মানে এরা জঞ্জাল ও আবর্জনার মধ্যে থেকে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার-দাবার সংগ্রহ করে। অসময়ের জন্য খাবার সংগ্রহ করে রাখতে এরা পটু। ধানের গোলা বা শস্য-ফসলের মাঠ থেকে এরা বিপুল পরিমাণ শস্য-ফসল সংগ্রহ করে। এর ফলে চাষীদের কাছে ধেড়ে ইঁদুর ফসলের অন্যতম শত্রু। তাছাড়া পুকুরপাড়ে গর্ত করে বলে বর্ষার সময় ঘোগ হয়ে যায় আর সেখান দিয়ে মাছ পালায়। আবার নদীর পাড়ে প্রচুর গর্ত করে বলে নদীবাঁধ পলকা হয়ে যায় যা জলের চাপ সামলাতে না পেরে সহজেই ভেঙে যায়।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

সুন্দরবন অঞ্চলের জনবসতি এলাকায় এবং অরণ্য এলাকায় ধেড়ে ইঁদুরদের খাবারদাবারের মধ্যে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। অরণ্য এলাকায় এরা বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের কন্দাল মূল, বীজ ইত্যাদি খায়। ঘাসের বীজ এবং জলজ উদ্ভিদ খেতেও এদের দেখা যায়। বসতি এলাকায় আবার ধান এদের অন্যতম খাদ্য। এছাড়া ক্ষেতের লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে, পটল, আলু ইত্যাদিও এরা খায়। প্রাণীজ খাদ্যের মধ্যে শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি, বিভিন্ন পোকামাকড়, মাকড়সা, মাছ ইত্যাদি রয়েছে এদের খাদ্য তালিকায়। কখনো কখনো মৃত জীবজন্তুর মাংস খেতেও দেখা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬০ : কাকজাতক — ভেবে দেখ মন

সুন্দরবনের ধেড়ে ইঁদুরদের প্রজননকাল সারা বছর। তবে বর্ষার সময় ও ধান কাটার পর এদের প্রজনন হার সবচেয়ে বেড়ে যায়। যেহেতু এদের গড় আয়ু কম, মাত্র ৮ থেকে ১২ মাস। তাই এই অল্প জীবদ্দশায় একটা স্ত্রী ধেড়ে ইঁদুর ৮ থেকে ১০ বার বাচ্চা প্রসব করে। আর প্রত্যেকবারই ৮ থেকে ১৪ টি বাচ্চার জন্ম হয়। স্বাভাবিকভাবেই এদের গর্ভাবস্থা অল্প দিন স্থায়ী হয় – মাত্র ২১ থেকে ২৩ দিন। জন্মের পর বাচ্চাদের গায়ে লোম থাকে না, চোখও ফোটে না। জন্মের ৫০-৬০ দিনের মধ্যে বাচ্চারা প্রজননে সক্ষম হয়। বাচ্চার জন্ম দেওয়ার সময় এরা গর্তের মধ্যে শুকনো ঘাস ও শিকড় দিয়ে একটা নরম বাসা বানায়। এই বাসাতেই স্ত্রী ইঁদুর বাচ্চাদের প্রসব করে।
কলকাতায় বৃষ্টি

জলাশয়ে ভাসমান আগাছার উপর ধেড়ে ইঁদুর। সংগৃহীত।

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে এই ধেড়ে ইঁদুরদের গুরুত্ব কিন্তু কম নয়। সাপ, প্যাঁচা, বেজি, গোসাপ, বাঘরোল, বুনো বিড়াল এমনকি কুমিরের খাদ্য হল এই ধেড়ে ইঁদুর। এইভাবে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলে শীর্ষ খাদকদের অস্তিত্ব রক্ষায় এরা সাহায্য করে। আবার ফসলের ক্ষতিকর কিছু পোকামাকড়, শামুক ইত্যাদি খেয়েও উপকার করে। তবে চাষীর যতটা উপকার করে শস্য-ফসল খেয়ে ক্ষতি করে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাছাড়া আগেই বলেছি প্রচুর সংখ্যক গর্ত খুঁড়ে নদীবাঁধ, পুকুরপাড় ইত্যাদির ক্ষতি করে। আবার বাগানে অনেক গাছের গোড়ায় গর্ত করার জন্য গাছ মারাও যায়। অনেক সময় পাকা বাড়ির নিচে বেশি গর্ত করলে বাড়ির ভিত কমজোরি হয়ে যায়। মাটির বাড়িতে এদের জন্যই সাপের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়।

সুন্দরবনের এরা বিপন্ন তো নয়ই বরং এদের জন্য সাধারণ মানুষ বিপন্ন। তবুও যে কোনও জীব বাস্তুতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সুন্দরবনের ধেড়ে ইঁদুরদের গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content