কলকাতায় বৃষ্টি

জলসাঘর ছবির একটি দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত।

জলসাঘর ছবির একটি অংশ আজ। অংশটিতে সংলাপ সামান্য, কেবল দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাওয়া। ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্য-সর্বস্ব জমিদারির জমিদার বিশ্বম্ভর রায় তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিজীবনের ক্ষত নিয়ে একান্তে নিভৃতবাসী। মুষ্টিমেয় একান্ত অনুগত ভৃত্য-কর্মচারী তাঁর আজ্ঞাবহ। এই অংশটিতে জমিদারমশাইকে জমিদারবাড়ির বিরাট নির্জন ছাদের একপাশে দেখা যায়। তিনি নিচে নামতে চান। ছাদ থেকে বাড়ির ওপরতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচের তলা, তারপর আরও নিচে ধাপে ধাপে নেমে আসা বিস্তৃত প্রান্তরে। পাশে থেকে যাবে অর্থ ও আভিজাত্যের নানা প্রাচীন স্মারকগুলি, থাকবে বিরাট প্রাসাদোপম জমিদারবাড়ি। দেশে নবজীবনের ঢেউ উঠেছে। পুরাতন আভিজাত্যের অহঙ্কারের সামনে প্রতিস্পর্দ্ধিত ভুঁইফোঁড় নতুন তার আস্ফালন দেখাচ্ছে। নতুন বিত্তশালী শ্রেণি আর ছায়ান্ধকার প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো অভিজাত পুরাতনের দ্বন্দ্বের একটা ক্ষেত্র জাগতে থাকে ক্রমে ক্রমে।
জমিদারমশাই তাঁর একান্তযাপনের নিভৃত স্থানটি ছেড়ে নিচে নামতে চান, প্রিয় পোষ্য তুফান ও মতিকে দেখার জন্য। প্রাচীন আভিজাত্য ও গৌরবের উচ্চমার্গে যাঁর অবস্থান, তাঁর এই নিচে নামা কিছু তাত্পর্য রেখে যাবে ছবিতে। এরপরের ঘটনাক্রম তাঁকে নিয়ে যাবে পতন, বিনষ্টি কিংবা ক্ষয়ের পথে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৮ : মহাপুরুষ—কাল আজ পরশু

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৫: রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের ভূমিকা, যে কোনও কাজে সাফল্যের অনুপ্রেরণা হতে পারে কী?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক

স্বজনবিয়োগের ক্ষত বয়ে চলা বিমর্ষ প্রভুর এই উদ্যোগে অনুগত ‘পুরাতন ভৃত্য’ উদ্বেল হয়। একতলার চওড়া দালানের পথে ছুটে যায় সে, যাওয়ার পথে দালানে শুয়ে থাকা অবাঞ্ছিত কুকুরটাকে ক্যাঁক করে খানিক লাথি কষিয়ে দেয়, প্রভুর যাতায়াতের পথ পরিষ্কার রাখার তাগিদেই মনে হয়। উচ্চমার্গীয় মানুষদের পথে এমন কিছু অবাঞ্ছিত বটে। কিন্তু সেই পুরনো ঠাটবাট আর আড়ম্বরের পথ তেমন নিষ্কণ্টক আছে কি? বামদিকে একটি প্রস্তরমূর্তি নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে এসবের সাক্ষী হয়ে। ডানদিকে বিপুলাকার স্তম্ভ চারজোড়া স্তম্ভ গগনচুম্বী পুরাতনের স্থানু প্রতিনিধি হয়ে দণ্ডায়মান, আরও দূরে একটি প্রাচীন শূন্য সোফাজাতীয় বসার আসন।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২২

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৩ : পিঞ্জরে অচিন পাখি

প্রাচীনকালের রাজাদের ক্ষমতা ও শক্তির পরাকাষ্ঠা ছিল তাঁদের চতুরঙ্গ সেনাবল। চারটি অঙ্গের মধ্যে যেমন থাকে রথ ও পদাতিক, তেমন-ই থাকে হাতি ও ঘোড়া। যার যতো বেশি হাতি তার ততো মর্যাদা, শক্তি। উপনিবেশোত্তর যুগে হাতি-ঘোড়া সেই আধিপত্য তলিয়ে গেছে, তাদের বিপুল প্রতিষ্ঠা অন্যের দখলে গেছে যন্ত্রের দুনিয়ায়।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৩ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /২

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

জমিদারমশাই তাঁর প্রাসাদ ছেড়ে নেমে এসেছেন খোলা মাঠে, মুক্ত আকাশের নীচে, দূরে নদী। তুফান ও মতিকে দেখা যায়। ধীরে ধীরে লাঠিতে ভর করে এগিয়ে শ্বেতশুভ্র ঘোড়াটির কাছে আসেন। তারপর বাড়ির বিস্তৃত কম্পাউন্ড পার হয়ে ঢালু জমি বেয়ে নেমে আসেন মাঠে। একটু দূরে একটি হেলে পড়া ইঁটের প্রাচীর যেন দন্ত-বিকশিত করে উপহাস করে। অনেক দূরে দিকচক্রবালের কাছেই বোধহয়, হাতিটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, সকল আভিজাত্য, ক্ষমতা, প্রতাপ ও অহঙ্কারের লোলচর্ম গায়ে জড়িয়ে। পাশের মেঠো কাঁচা ভাঙাচোরা রাস্তাজুড়ে একটা লরি হেলে দুলে তার যন্ত্রশরীর নিয়ে ক্রমশঃ দিগন্তের দিকে পাড়ি দেয়। গায়ে লেখা তার পরিচয়, গাঙ্গুলি এ্যাণ্ড কোং। নিয়ে যায় একরাশ সাদা ধুলোধোঁয়ার স্তুপ, নবোদ্গত নাগরিক অভিমান। দেশ এগিয়ে চলেছে তার যাবতীয় পুরনো কাসুন্দির ভাঙা দেয়াল আর ঘটি না ডোবা তালপুকুরকে পিছনে ফেলে। বাণিজ্যজীবী নতুন বিত্তবান সম্প্রদায় জেগে উঠছে, মহিম গাঙ্গুলি যাদের প্রতিনিধি। যাদের প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে সবল শিকড়ের টান নেই, আছে উল্কাসম আধুনিক যান্ত্রিক ছুটে চলার গোড়ায় চোখ ঢেকে দেওয়া ধুলোধোঁয়ার পুরু আস্তরণটুকু। লরিটি আরও আরও দূরে চলে যায়। নিজের অভ্যন্তর থেকেই উদ্গীর্ণ ধোঁয়ার জালে সে নিজেই ঢাকা পড়ে, মুছে যায় দূরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা হাতিটির চিত্রবত্ অস্তিত্বটুকুও।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৭: ধেড়ে ইঁদুর

আয়না আর ঝাড়বাতি-মোড়া জলসাঘরের ভাঙা হাট ফুরিয়ে যাওয়া বেলায় খেলা ভাঙার খেলার স্বপ্ন দেখে। সে-ও ফুরোয় অচিরেই, রাতশেষের সুখস্বপ্নের মতোই।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content