
ছবি : প্রতীকী।
এই জগতে সকল কিছুই ঘটা সম্ভব? অভিজ্ঞতা বলবে, যার সম্ভাবনা কোটিতে গুটি, কিংবা তার চেয়েও ঢের কম, তা একপ্রকার অসম্ভব বটে। যেসব কারণের জন্য কেউ হয় ডুমুরের ফুল, কিছু কল্পনা হয় আকাশকুসুম, সেই সম্ভাবনাগুলি তখনই সত্য হয়, যদি সূর্য পশ্চিমে উদিত হন। অসম্ভব কোনও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, নাকি অসম্ভবের সম্ভাব্য হয়ে ওঠার দুরাকাঙ্ক্ষাটিই একান্ত মনোজাগতিক সেই তর্ক এ কাহিনির তত্ত্ব নয়। তবে, অনেক গল্পে দেখা যায়, যা একান্তই অসম্ভব বলে মনে করা হয়, তা ঘটে যায়। কারণ, অপারে কাব্যসংসারে কবি প্রজাপতির তুল্য অবিসংবাদী। কখনও তাকে কাকতালীয় বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কখনও আবার দৈবক্রমে ঘটছে এমনও বলা হয়। এর নেপথ্যে যে যুক্তি তর্কের অবকাশ থেকে যায়, তাও আজকের গল্পটির প্রতিপাদ্য নয়। প্রতিপাদ্য এটিই যে, জগতে এমন কিছুর সম্ভাবনাও থেকে যায়, যা অসম্ভব, কখনও ঘটবে না। তবে যে বলা হয়, অসম্ভব বলে কিছু হয় না! মনে পড়ে যায় শেক্সপিয়রের সেই প্রসিদ্ধ উক্তি, “There are more things in Heaven and Earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy.” পরিস্থিতি রাজাকে ফকির করে, বিপরীতটিও ঘটে, বিচ্ছেদের পরেও মিলন আসে। তবে এই কাহিনি বলবে সেই কথা, যা ঘটে না, ঘটবে না কখনও। কেন ঘটে না? জানাবে জাতকমালার এই কাহিনি।
বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে বারাণসীর এক শ্রেষ্ঠিপুত্র। তাঁর নাম মহাধনকুমার। বারাণসীর রাজা ব্রহ্মদত্তের পুত্র ব্রহ্মদত্তকুমারের বয়স্য তিনি, খেলার সাথী। ক্রমে তাঁদের মৈত্রী প্রগাঢ় হল। তাঁরা একই আচার্যের কাছে বিদ্যাভ্যাস করে সতীর্থ হলেন। রাজার মৃত্যুর পরে কুমার রাজপদে অভিষিক্ত হলেন। কিন্তু তাঁদের অচ্ছেদ্য মৈত্রী যথাপূর্ব রইল। রাজা তাঁর বয়স্যকে কাছে কাছে রাখতেন।
সেই নগরের পরমাসুন্দরী নগরনটী বারবণিতার নাম ছিল নগরশোভনা। মহাধনকুমার তাঁর ভবনে নিয়মিত যেতেন, প্রতিদিন একসহস্র মুদ্রার বিনিময়ে তাঁর সান্নিধ্যলাভ করতেন। পিতার মৃত্যুর পরে যখন তিনি নগরশ্রেষ্ঠী হলেন, তখনও তাঁর সেখানে যাতায়াত অক্ষুণ্ণ থাকল।
বোধিসত্ত্ব দিনে তিনবার রাজসন্দর্শনে যেতেন। একদিন সায়ংকালে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে করতেই সূর্যদেব অস্তাচলে গেলেন। নেমে এল অন্ধকার। বোধিসত্ত্ব মনে মনে ভাবলেন যে, এখন আর গৃহে গিয়ে প্রস্তুত হয়ে ফিরে আ আসার সময় নেই। তার চেয়ে এখান থেকেই নগরশোভনার প্রমোদগৃহে চলে যাওয়া যাক।
অনুচরদের ফিরিয়ে দিয়ে একাকী তিনি এলেন সেই গণিকার গৃহে। নগরশোভনা তাঁকে দেখে জানতে চাইলেন, “আর্যপুত্র, সহস্রমুদ্রা আছে তো সঙ্গে?”
“ভদ্রে! আজ বড় বিলম্ব হয়েছে। রাজার বাড়ি থেকে সোজা এই এখানে চলে এলাম। কাল তোমাকে দুই সহস্র মুদ্রা একেবারে দিয়ে দেব।”
“তা হবে না। আমি সহস্রমুদ্রা না পেলে মনোরঞ্জন করি না। আগে অর্থ আনুন। ফেলো কড়ি মাখো তেল।”
“ বলছি তো, কাল-ই দ্বিগুণ অর্থ দেব, চিন্তা কীসের!”
নগরশোভনা ভৃত্য দাসীদের ডেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে
তাঁকে দূর করে দিলেন।
“এই লোকটাকে এখনই এখান থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দাও, দেখবে আমার দিকে যেন তাকাতেও না পারে।”
নগরনটী মনে মনে ভেবেছিলেন, একদিন সুযোগ দিলে প্রতিদিন-ই বোধহয় শ্রেষ্ঠী নানা অজুহাত দেখাবেন। তাতে বিপুল ক্ষতি, ধনক্ষয়। সুতরাং, অবকাশ দেওয়া যাবে না।
সেই নগরের পরমাসুন্দরী নগরনটী বারবণিতার নাম ছিল নগরশোভনা। মহাধনকুমার তাঁর ভবনে নিয়মিত যেতেন, প্রতিদিন একসহস্র মুদ্রার বিনিময়ে তাঁর সান্নিধ্যলাভ করতেন। পিতার মৃত্যুর পরে যখন তিনি নগরশ্রেষ্ঠী হলেন, তখনও তাঁর সেখানে যাতায়াত অক্ষুণ্ণ থাকল।
বোধিসত্ত্ব দিনে তিনবার রাজসন্দর্শনে যেতেন। একদিন সায়ংকালে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে করতেই সূর্যদেব অস্তাচলে গেলেন। নেমে এল অন্ধকার। বোধিসত্ত্ব মনে মনে ভাবলেন যে, এখন আর গৃহে গিয়ে প্রস্তুত হয়ে ফিরে আ আসার সময় নেই। তার চেয়ে এখান থেকেই নগরশোভনার প্রমোদগৃহে চলে যাওয়া যাক।
অনুচরদের ফিরিয়ে দিয়ে একাকী তিনি এলেন সেই গণিকার গৃহে। নগরশোভনা তাঁকে দেখে জানতে চাইলেন, “আর্যপুত্র, সহস্রমুদ্রা আছে তো সঙ্গে?”
“ভদ্রে! আজ বড় বিলম্ব হয়েছে। রাজার বাড়ি থেকে সোজা এই এখানে চলে এলাম। কাল তোমাকে দুই সহস্র মুদ্রা একেবারে দিয়ে দেব।”
“তা হবে না। আমি সহস্রমুদ্রা না পেলে মনোরঞ্জন করি না। আগে অর্থ আনুন। ফেলো কড়ি মাখো তেল।”
“ বলছি তো, কাল-ই দ্বিগুণ অর্থ দেব, চিন্তা কীসের!”
নগরশোভনা ভৃত্য দাসীদের ডেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে
তাঁকে দূর করে দিলেন।
“এই লোকটাকে এখনই এখান থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দাও, দেখবে আমার দিকে যেন তাকাতেও না পারে।”
নগরনটী মনে মনে ভেবেছিলেন, একদিন সুযোগ দিলে প্রতিদিন-ই বোধহয় শ্রেষ্ঠী নানা অজুহাত দেখাবেন। তাতে বিপুল ক্ষতি, ধনক্ষয়। সুতরাং, অবকাশ দেওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৬: যে রাজা চাটুকারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত, তার পতন স্বয়ং বিধাতাও আটকাতে পারেন না

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে
এভাবে অপমানিত হয়ে শ্রেষ্ঠীর ভ্রম ঘুচে গেল। এর জন্য-ই আমি আশিকোটি ধন ব্যয় করেছি! একদিন আমাকে রিক্তহস্ত দেখে এই পাপিষ্ঠা এভাবে অপমান করল!
এমন মিত্রদ্রোহিনী বারাঙ্গনার নীচ আচরণে বোধিসত্ত্ব আকুল হলেন। কী বিপুল শূন্য এই তথাকথিত সৌহার্দ্যবন্ধন! মানুষ এমন অকৃতজ্ঞ-ও হয় এই সত্য তাঁর মনোলোকে উন্মোচিত হতেই তাঁর জাগতিক আকর্ষণ বিগত হল। জন্ম নিল সেই পরম শুদ্ধ বৈরাগ্য। তিনি আর গৃহে ফিরলেন না। গার্হস্থ্যধর্মের প্রতি নিরাকাঙ্ক্ষ হলেন। রাজার সঙ্গেও সাক্ষাৎ না করে তিনি প্রব্রজ্যা অবলম্বন করে নগরের বাইরে গঙ্গাতীরে কুটির নির্মাণ করে তপশ্চর্যা করতে লাগলেন।
ক্রমশ রাজার মনে ব্যাকুলতা জন্ম নিল। কই! মিত্র তো আর আসছেন না! এদিকে নগরশোভনা যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা-ও লোকমুখে রটে গেল। রাজা জানলেন, “শ্রেষ্ঠী বোধহয় লজ্জায় ঘর ছেড়েছেন।” রাজা নটীকে ডাকিয়ে আনালেন রাজসভায়, যাচাই করলেন সত্যাসত্য। নটীও সব স্বীকার করতে দ্বিধা করল না। ক্রোধে রাজা অগ্নিতুল্য হয়ে বললেন, “শোন পাপাত্মা অবিমৃষ্যকারিণী! যদি বাঁচতে চাস, এখনই আমার মিত্রকে যেখান থেকে পারিস নিয়ে আয়। নইলে তোর প্রাণ আর থাকবে না।”
এমন মিত্রদ্রোহিনী বারাঙ্গনার নীচ আচরণে বোধিসত্ত্ব আকুল হলেন। কী বিপুল শূন্য এই তথাকথিত সৌহার্দ্যবন্ধন! মানুষ এমন অকৃতজ্ঞ-ও হয় এই সত্য তাঁর মনোলোকে উন্মোচিত হতেই তাঁর জাগতিক আকর্ষণ বিগত হল। জন্ম নিল সেই পরম শুদ্ধ বৈরাগ্য। তিনি আর গৃহে ফিরলেন না। গার্হস্থ্যধর্মের প্রতি নিরাকাঙ্ক্ষ হলেন। রাজার সঙ্গেও সাক্ষাৎ না করে তিনি প্রব্রজ্যা অবলম্বন করে নগরের বাইরে গঙ্গাতীরে কুটির নির্মাণ করে তপশ্চর্যা করতে লাগলেন।
ক্রমশ রাজার মনে ব্যাকুলতা জন্ম নিল। কই! মিত্র তো আর আসছেন না! এদিকে নগরশোভনা যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা-ও লোকমুখে রটে গেল। রাজা জানলেন, “শ্রেষ্ঠী বোধহয় লজ্জায় ঘর ছেড়েছেন।” রাজা নটীকে ডাকিয়ে আনালেন রাজসভায়, যাচাই করলেন সত্যাসত্য। নটীও সব স্বীকার করতে দ্বিধা করল না। ক্রোধে রাজা অগ্নিতুল্য হয়ে বললেন, “শোন পাপাত্মা অবিমৃষ্যকারিণী! যদি বাঁচতে চাস, এখনই আমার মিত্রকে যেখান থেকে পারিস নিয়ে আয়। নইলে তোর প্রাণ আর থাকবে না।”
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৬: রাক্ষস খরের নিধনের নিরিখে রামচন্দ্রের মূল্যায়ন
নটী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রথ সাজিয়ে লোকলস্কর নিয়ে তাঁর সন্ধানে চললেন, বহু অনুসন্ধানে তাঁকে পেলেন সেই কুটিরে। প্রণিপাত জানিয়ে মিনতি করলেন—
“আমি যে দোষ করেছি, তা নিতান্তই অজ্ঞতার বশে ঘটে গিয়েছে। আমাকে ক্ষমা করুন, আর এমনটা হবে না কখনও।”
“ক্ষমা করলাম। আর আমার কোনও ক্রোধ নেই।”
“তবে ফিরে চলুন। আমার সুরম্য রথে চড়ে নগরে চলুন। সেখানে গিয়ে আমার যা ধন আছে সব আপনাকে দিয়ে দেব।”
“সে আর হয় না। এখন তোমার সঙ্গে আমার যাওয়া হবে না। তবে পৃথিবীতে যদি অভূতপূর্ব কিছু ঘটে কখনও, তবে গেলেও যেতে পারি।”
গণিকা উত্তরোত্তর প্রার্থনা জানায়, চলুন। আসুন আমার সঙ্গে।
বোধিসত্ত্ব বলেন না যে, যাব না। তুমি এসো তো বাপু। বরং বলেন, “যাব, সময় হলে।”
“কবে?”
সেই একবার বুদ্ধদেবের পায়ে কেঁদে পড়লেন এক বৃদ্ধা। মৃতকে প্রাণ দান করো। বুদ্ধদেব তাঁকে পাঠিয়েছিলেন নগরের ঘরে ঘরে, একমুঠো সর্ষের দানা আনো মাগো, সেখান থেকে, যেখানে মৃত্যু আজও প্রবেশ করেনি। তবেই মৃতের শরীর জেগে উঠবে প্রাণপ্রাচুর্যে! কিন্তু সে হয় না। কারণ, সে তো হওয়ার নয়।
“আমি যে দোষ করেছি, তা নিতান্তই অজ্ঞতার বশে ঘটে গিয়েছে। আমাকে ক্ষমা করুন, আর এমনটা হবে না কখনও।”
“ক্ষমা করলাম। আর আমার কোনও ক্রোধ নেই।”
“তবে ফিরে চলুন। আমার সুরম্য রথে চড়ে নগরে চলুন। সেখানে গিয়ে আমার যা ধন আছে সব আপনাকে দিয়ে দেব।”
“সে আর হয় না। এখন তোমার সঙ্গে আমার যাওয়া হবে না। তবে পৃথিবীতে যদি অভূতপূর্ব কিছু ঘটে কখনও, তবে গেলেও যেতে পারি।”
গণিকা উত্তরোত্তর প্রার্থনা জানায়, চলুন। আসুন আমার সঙ্গে।
বোধিসত্ত্ব বলেন না যে, যাব না। তুমি এসো তো বাপু। বরং বলেন, “যাব, সময় হলে।”
“কবে?”
সেই একবার বুদ্ধদেবের পায়ে কেঁদে পড়লেন এক বৃদ্ধা। মৃতকে প্রাণ দান করো। বুদ্ধদেব তাঁকে পাঠিয়েছিলেন নগরের ঘরে ঘরে, একমুঠো সর্ষের দানা আনো মাগো, সেখান থেকে, যেখানে মৃত্যু আজও প্রবেশ করেনি। তবেই মৃতের শরীর জেগে উঠবে প্রাণপ্রাচুর্যে! কিন্তু সে হয় না। কারণ, সে তো হওয়ার নয়।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৩ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /২

দশভুজা, সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৪২: যোগমায়া দেবী—এক প্রতিবাদী নারী
তবে বোধিসত্ত্ব ফিরবেন কবে? কোন সেই মহাক্ষণ? তিনি জানান—
“যদি কখনও স্রোতোহীন গঙ্গাজলে কুমুদ ভাসে, যদি কখনও শ্বেতশুভ্র কোকিল গেয়ে ওঠে, যদি কখনও জামগাছে তাল ফলে, যদি কখনও কচ্ছপের লোমে বোনা রেশমী, পশমী ও তুলার বস্ত্র লোকের শীতনিবারণ করে, যদি কখনও মশার দাঁতে তৈরি হয় দৃঢ়বদ্ধ বিশাল অট্টালিকা, যদি কখনও শশকের শৃঙ্গে গড়ে ওঠে স্বর্গারোহণের অদ্ভুত সিঁড়ি, আর মুষিকের দল সেই সোপান বেয়ে চন্দ্রলোকে গিয়ে চাঁদকে চিবিয়ে খায় আর ভূতলে আছড়ে ছুড়ে ফেলে রাহুকে, যদি কখনও ভ্রমরের দল নিঃশেষে ঘটের সুধা পান করে অগ্নিতে শয্যা পাতে, যদি কখনও গাধাও তার বিম্বৌষ্ঠরঞ্জিত সুমুখ নিয়ে নৃত্যগীতে পারদর্শী হয়, যদি কখনও কাক আর পেঁচা পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে নিভৃতে প্রেমালাপ করে, যদি কখনও কচি কোমল কিশলয়ের ছাতা মাথায় বর্ষার অবিরাম ধারাপাত দিব্য পার হয়ে যায়, যদি কখনও চটক পাখি ঠোঁটে করে গন্ধমাদন বহন করে, যদি কখনও সুকুমার বালক পাল তুলে রশি টেনে একটা গোটা জাহাজ চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে চলে যায় কখনও, তবেই আমাদের পুনর্মিলন হতে পারে।”
একেই বলে এটিকেট! তবুও বললেন না, এসো বাপু, মানে মানে বিদেয় হও।
দার্শনিক কিংবা বৈয়াকরণ এই অসম্ভবের তত্ত্বকে বহুবিস্তৃত করেন। এ কাহিনি কিন্তু এখানেই সাঙ্গ হয়েছে। গণিকা ফিরে আসেন। রাজার কাছে চেয়ে নেন প্রাণভিক্ষা।
“যদি কখনও স্রোতোহীন গঙ্গাজলে কুমুদ ভাসে, যদি কখনও শ্বেতশুভ্র কোকিল গেয়ে ওঠে, যদি কখনও জামগাছে তাল ফলে, যদি কখনও কচ্ছপের লোমে বোনা রেশমী, পশমী ও তুলার বস্ত্র লোকের শীতনিবারণ করে, যদি কখনও মশার দাঁতে তৈরি হয় দৃঢ়বদ্ধ বিশাল অট্টালিকা, যদি কখনও শশকের শৃঙ্গে গড়ে ওঠে স্বর্গারোহণের অদ্ভুত সিঁড়ি, আর মুষিকের দল সেই সোপান বেয়ে চন্দ্রলোকে গিয়ে চাঁদকে চিবিয়ে খায় আর ভূতলে আছড়ে ছুড়ে ফেলে রাহুকে, যদি কখনও ভ্রমরের দল নিঃশেষে ঘটের সুধা পান করে অগ্নিতে শয্যা পাতে, যদি কখনও গাধাও তার বিম্বৌষ্ঠরঞ্জিত সুমুখ নিয়ে নৃত্যগীতে পারদর্শী হয়, যদি কখনও কাক আর পেঁচা পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে নিভৃতে প্রেমালাপ করে, যদি কখনও কচি কোমল কিশলয়ের ছাতা মাথায় বর্ষার অবিরাম ধারাপাত দিব্য পার হয়ে যায়, যদি কখনও চটক পাখি ঠোঁটে করে গন্ধমাদন বহন করে, যদি কখনও সুকুমার বালক পাল তুলে রশি টেনে একটা গোটা জাহাজ চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে চলে যায় কখনও, তবেই আমাদের পুনর্মিলন হতে পারে।”
একেই বলে এটিকেট! তবুও বললেন না, এসো বাপু, মানে মানে বিদেয় হও।
দার্শনিক কিংবা বৈয়াকরণ এই অসম্ভবের তত্ত্বকে বহুবিস্তৃত করেন। এ কাহিনি কিন্তু এখানেই সাঙ্গ হয়েছে। গণিকা ফিরে আসেন। রাজার কাছে চেয়ে নেন প্রাণভিক্ষা।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা
দার্শনিক হয়তো মনে করাবেন সেই রজ্জুতে সর্পভ্রমের কথা, যেখানে আকস্মিক ভ্রম ঘটে, তা-ই সত্য বলে প্রতিভাত হয়, তারপর যথার্থ সত্যস্বরূপ আত্মপ্রকাশ করে। যা ভ্রান্ত, তা আর থাকে না। কিন্তু শশবিষাণ কিংবা গজদন্তমিনার ভ্রান্তি নয়, অসম্ভব।
ভ্রান্তিকে সরিয়ে সরিয়ে যথার্থের উপলব্ধি মানুষের জাগতিক পথচলার অভীষ্ট। সেখানে রজ্জুতে সর্পভ্রম ঘটছে নিত্যক্ষণ। সেই ভ্রমকে উপলব্ধি করে, তাকে বর্জন করে, অতিক্রম করে মানুষ ঋদ্ধ হয়। যার অস্তিত্ব আছে, তার সাপেক্ষেই ভ্রম ঘটে। কিন্তু যা অসম্ভব, তার ক্ষেত্রে ভ্রম অপ্রাসঙ্গিক। এই কাহিনিতে বোধিসত্ত্বের যে ভ্রম ঘটেছে, তাকে তিনি সংশোধন করেছেন তৎক্ষণাৎ, যা সংশোধিত, সংস্কৃত ও অভ্রান্ত, তার আর পুনর্মূল্যায়ন ঘটে না। তাই পুনর্মিলনের সম্ভাবনাটি অসম্ভবের আঙ্গিকে এমন বহুবিস্তৃত করে তোলা হয়েছে।
তবে এই অস্থান বা অসম্ভবের ভিড়ে বিস্মৃত হওয়া চলবে না প্রকৃত কথাটি। রাজার সঙ্গে বোধিসত্ত্বের মৈত্রী ছিল। মৈত্রী ছিল গণিকার সঙ্গেও। একটি স্বার্থবন্ধনহীন, অন্যটি স্বার্থে ঘেরা আবিল। এই স্বার্থের অভিঘাতেই কাকে পেঁচায় মৈত্রী হয় না। এই স্বার্থের দুর্বিপাকেই জগৎ আচ্ছন্ন, আপ্লুত। যখন ভ্রম, মোহ ঘুচে যায়, তখন সম্ভব আর অসম্ভব তাদের পারস্পরিক অলীক নৈকট্য ত্যাগ করে। স্পষ্ট হয় অসম্ভব আর সম্ভবের অলঙ্ঘ্য ভেদটুকু। সেই যথার্থ আকাশকুসুম অলীককে চিনতে পারার শিক্ষা দেয় এই গল্প। —চলবে।
ভ্রান্তিকে সরিয়ে সরিয়ে যথার্থের উপলব্ধি মানুষের জাগতিক পথচলার অভীষ্ট। সেখানে রজ্জুতে সর্পভ্রম ঘটছে নিত্যক্ষণ। সেই ভ্রমকে উপলব্ধি করে, তাকে বর্জন করে, অতিক্রম করে মানুষ ঋদ্ধ হয়। যার অস্তিত্ব আছে, তার সাপেক্ষেই ভ্রম ঘটে। কিন্তু যা অসম্ভব, তার ক্ষেত্রে ভ্রম অপ্রাসঙ্গিক। এই কাহিনিতে বোধিসত্ত্বের যে ভ্রম ঘটেছে, তাকে তিনি সংশোধন করেছেন তৎক্ষণাৎ, যা সংশোধিত, সংস্কৃত ও অভ্রান্ত, তার আর পুনর্মূল্যায়ন ঘটে না। তাই পুনর্মিলনের সম্ভাবনাটি অসম্ভবের আঙ্গিকে এমন বহুবিস্তৃত করে তোলা হয়েছে।
তবে এই অস্থান বা অসম্ভবের ভিড়ে বিস্মৃত হওয়া চলবে না প্রকৃত কথাটি। রাজার সঙ্গে বোধিসত্ত্বের মৈত্রী ছিল। মৈত্রী ছিল গণিকার সঙ্গেও। একটি স্বার্থবন্ধনহীন, অন্যটি স্বার্থে ঘেরা আবিল। এই স্বার্থের অভিঘাতেই কাকে পেঁচায় মৈত্রী হয় না। এই স্বার্থের দুর্বিপাকেই জগৎ আচ্ছন্ন, আপ্লুত। যখন ভ্রম, মোহ ঘুচে যায়, তখন সম্ভব আর অসম্ভব তাদের পারস্পরিক অলীক নৈকট্য ত্যাগ করে। স্পষ্ট হয় অসম্ভব আর সম্ভবের অলঙ্ঘ্য ভেদটুকু। সেই যথার্থ আকাশকুসুম অলীককে চিনতে পারার শিক্ষা দেয় এই গল্প। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















