কলকাতায় বৃষ্টি
আবার পরশপাথর ছবির প্রসঙ্গে আসা যাক। দেখা গেছে, পরেশ দত্ত পরশপাথরের স্পর্শে সামাজিক জীবনে প্রভূত বিত্ত ও যশ লাভ করেছেন। ডালহৌসির অফিসপাড়ার ছকে বাঁধা জীবন থেকে ভাবী দেশনেতা, খুব মসৃণ তাঁর উত্তরণের পথ। তাঁর পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা পরশপাথরের জাদুস্পর্শে লোহার তৈরি এটা-সেটা মহার্ঘ্য সোনা হয়ে ওঠে। অবশ্য যুগে যুগে পরশপাথর সেই কাজটাই করে নাকি! যা নয়, যা হতে পারে না তাকেই সত্য করে তোলে। দর্শন এই শক্তিকে অজ্ঞান, মায়া ইত্যাদি নানা শব্দে তত্ত্বে প্রতিপাদন করেছে। কোন্ এক মায়াবলে দড়িকে সাপ মনে হয়। দর্শন তার প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ডে সেই রজ্জু, সেই সর্পের অস্তিত্বের নেপথ্যের সত্যাসত্যকে কষ্টিপাথরে ঘষে ঘষে যাচাই করে নিকষিত হেমটিকে রসজ্ঞের কাছে পরিবেশন করেন, দেখান আপেক্ষিক সত্যটিকে যার সত্তায় জড়িয়ে থাকে অজ্ঞানের আচ্ছন্নতা।
পরেশবাবুর পেশ করা সোনার জিনিসপত্র যা নাকি তাঁর বাবার বাবার বাবার বাবার অর্থাৎ কীনা দাদাজির দাদাজির, কষ্টিপাথরে ঘষে ঘষে দেখে শেঠজি বুঝে নিয়েছিলেন যে এ একেবারে খাঁটি নিখাদ। সে তো চলার পথে অনেক কিছুকেই মনে হয়। শেষে বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া, ভাবিয়া করিও কাজের পরামর্শ। সে ক্ষ্যাপা লোকটাও সাগরতীরে জাদুপাথরের খোঁজে পাগল হয়ে ফিরেছিল, ফিরে দেখেনি কী সে করছে, পাথর পেয়েছে, ফেলেও দিয়েছে, কখন যেন কোন এক এমন ফেলে দেওয়া পাথর তার জাদুকরী ক্ষমতার ঐশ্বর্যটুকু রেখে গিয়েছিল তার কোমরের লোহার শেকলে… শৃঙ্খল হিরণ্যময় হয়েছিল। সে তো, কবে কোন এক দিনে রাজাধিরাজ নেমে এসে মহাভিক্ষুর মতো তার দক্ষিণহস্তটি বাড়িয়ে দিয়ে ভিক্ষা চেয়েছিলেন পথে পথে ফেরা এক ভিক্ষুকের কাছে। মহাকার্পণ্যে সে প্রভূত অনিচ্ছায় তুলে দিয়েছিল ভিক্ষালব্ধ অন্নকণা, দিনের শেষে তা-ই ফিরে এসেছিল স্বর্ণকণিকা হয়ে, ভাঙনের পথ ধরে ধরে। তবে এসব কাহিনি তো সুবিদিত, শেষে কার স্পর্শে কে যে সোনা হয়ে ওঠে, কী যে সোনা হয়ে ওঠে তার হিসেব কোন্ পরশপাথর রাখে?
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২০ : চারুলতা-মহানগর — বীক্ষণযন্ত্র

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৪ : যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫১: সাইকেল মাহাতো অ্যান্ড কোং

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

এই পরশপাথরের আকাঙ্ক্ষা আর মহার্ঘ্য সুবর্ণের আপেক্ষিক শূন্যগর্ভ অস্তিত্ব যে আপাত ও যথার্থের আশে-পাশে ও মাঝে থাকা অনেক হিসেব মেলাতে আর ভেঙে দিতে পারে তা পরেশবাবু বুঝেছিলেন। কী এ ঝোঁকের মত্ততার বশে এক শেঠজির নিমন্ত্রণে অহংকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সমাজের মাথাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন তাঁর সৌন্দর্যের গোপন রহস্যের মতো, বের করে দেখিয়েছিলেন পরশপাথর, পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন তার আওয়াজ ফাঁকা নয়, হুঁ হুঁ বাবা! ভাবী নেতার ধনবান শেঠজির আনুকূল্য লাগবে এতে সন্দেহ নাস্তি। কিন্তু তা বলে নিজের তাসটি দেখিয়ে দিলে ম্যাজিক ওখানেই শেষ। প্রাণভোমরা তরবারির খোঁচায় ঘ্যাচাং ফু!

তারপর অতিথিপরায়ণ শেঠজি সোজা পরেশের বাড়ি ধাওয়া করে পরশপাথরটির ক্ষমতা স্বহস্তে যাচাই করার আর্তি জানালেন। তারপর চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হল। এ যে খাঁটি সোনা তিনি তা যাচাই করে দেখে নিয়েছেন আগেই। সুতরাং এবার ফর্মুলাটা না দিলেই নয়। কী করে বানাতে হয় এই জাদুপাথর তা তো বলতেই হবে, নাহলে বেআইনের পথে মোক্ষলাভের শর্টকাট রাস্তা যে অবিলম্বে আইনের পথে গিয়ে মিশবে তা বলা বাহুল্য। টেনিদার ভাষায়, চালাকি ন চলিষ্যতি। তার চেয়ে এসো দুজনেই সোনা বানাই।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

নাচার হয়ে পরেশবাবু পরশপাথরের ফর্মুলা দেন, ধূর্ত শেঠজি নোট করে নেন একনিষ্ঠ ছাত্রের মতো। দেবনাগরী লিপি তিনি জানেন, বাংলা ভাষাও কিছু কিছু জানেন বৈকী। প্রথমে মন্তরটা বাংলা বাংলা শোনালেও পরেশবাবু অভয় দিয়েছিলেন— এ আদি সংস্কৃত শ্লোক। সেটা পড়ে কোনও পণ্ডিত হা হা হা হা করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে পারেন। কিংবা দুরূহ দুর্ভেদ্য মহার্ঘ্য, গবেটের অবোধ্য ভাষার অসংস্কৃত রূপ দেখে নিজের অধীত বিদ্যা ও ভাষাটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবাঙ্মনস্-গোচরত্বের আস্বাদন করে আত্মশ্লাঘা বোধ করতেই পারেন, কিন্তু পণ্ডিতের কাজ পণ্ড করাই তো। তিনি আর এই শ্লোকের মর্ম কী করে বুঝবেন!

পরেশবাবুর সেই জাদুমন্তরের আপাত অসঙ্গত সৌকুমার্যে পরিচালক বিদ্রূপ ছুড়ে দিয়েছেন সকলের দিকে। যেখানে লাগবে সেটিই বুঝি তাঁর লক্ষ্যস্থল। হলদে সবুজ ওরাংওটাং আর ইটপাটকেল চিত্পটাং এই দুয়ের দুরূহ সংযোগ-বিয়োগের থেকেও পদের শেষপ্রান্তে বিপদের মতো লগ্ন হয়ে থাকা অনুস্বারের জাদুস্পর্শে সংস্কৃত হয়ে ওঠার অসংলগ্নতাটি চোখে পড়ার মতো। এভাবেই তথাকথিত ‘ইত্যাদির’ দল থেকে, অসংস্কৃতের দল থেকে ‘সংস্কৃত’ হয়ে ওঠার মাদকতাটুকু এই অংশের নির্যাস।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১১৮: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৭

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

ওই মত্ততা পরেশকে সোনার স্বপ্নে মজিয়েছে, স্বপ্ন ছুটে গেলে যে নিষ্ঠুর সত্য জেগে ওঠে, পরশপাথরের মায়া কেটে গেলেও তা–ই হয়। সোনা মুছে বেবাক কালো লোহা ব’নে যায়। তাই হলদে সবুজ ওরাংওটাংয়ের অসারতার পাশেই অনুস্বারের দাপাদাপিতে সংস্কৃত হয়ে ওঠার বাসনা কিংবা পরশপাথরের স্পর্শ, একই মুদ্রার ওপিঠ-ওপিঠ। পরেশবাবু তাঁর অভিনব শ্লোকের সঙ্গে ভাষ্যটিও রাখেন– চিত্পটাং করার প্রশ্নে ইট কম, পাটকেলটা বেশি। যা তিনি খেয়েছেন বিলক্ষণ। সমাজের সামনে নিজেকে জাহির করতে গিয়ে যে কাছাকোঁচায় টান পড়ার উপক্রম।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮১ : খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

তাঁর এই মুশকিল আসান করার জন্য, শুকিয়ে আসা সাজানো বাগানে অসম্ভবের ফুল ফোটানোর জন্য মালিটি তাঁর সেক্রেটারি প্রিয়তোষ হয়ে সায়ানাইডের অভাবে পরশপাথর গেলার জন্য গোকুলে বর্দ্ধমান; তবে সে কথা বলা যাবে পরে কখনও। ধর্মতলায় পৌঁছে স্থানসঙ্কট, সংস্কৃতের মাহাত্ম্য আর সেখানে কর্মখালি তথা বিপুল কর্মসম্ভাবনার যুগলালিত দর্শনটিকে দেখতে ও বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পরেশের পরশপাথর সেই সমাজবীক্ষায় উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতের সংশয়ঘেরা সমাজজীবনের পরিসরে অনায়াসে জাগিয়ে তোলে ঔপনিষদীয় প্রজ্ঞা, সেখানেই সৃষ্টিছাড়া নিয়মহারা দুনিয়ার শাশ্বত স্বপনদোলা পাশেই হিসাবহীন ভাঙনের নিত্যসঙ্কট, আজ-ও। এক লহমায় ধর্ম-ভাষা-সম্পদ-বিপদ-জীবন-যন্ত্রণা জুড়ে যেতে থাকে কোন্ পরশপাথরের জাদুস্পর্শে। মিথ্যের প্রবল মায়াশক্তির অজ্ঞান সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘুরতে থাকে মহামানবের সাগরতীরে, ডালহৌসির কেজো অফিস পাড়া থেকে ধর্মতলার মহাকেন্দ্রে, কখন যেন সে পরশপাথরের ক্ষণিক অজানা স্পর্শে সত্য হয়ে ওঠে! তারপর পরশপাথর মিলিয়ে আসে, সোনাও পরম মিথ্যা হয়, তার রংটাও ফুরিয়ে যায় ক্রমে। মানুষ তখন জীবনসমুদ্রের মহাতরঙ্গের বিপুল কলরবের পাশে ধ্যানস্থ হয়, ঘষে মেজে সোনা করে তোলা পিতলের জন্য নয়, একান্তই নিজের জন্য। আত্মানং বিদ্ধি।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content