কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) বকখালি কার্গিল সৈকতে সোনালি বাটান। (ডানদিকে) অপ্রজনন ঋতুতে সোনালি বাটান। ছবি: সংগৃহীত।

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বকখালির কারগিল সৈকতে গিয়ে যখন জৌরালি দেখে ফিরব ফিরব করছি ঠিক সেই সময় এক ঝাঁক পাখিকে অদ্ভুতভাবে উড়তে দেখলাম। পাখিগুলো উড়তে উড়তে ঢেউয়ের কাছাকাছি এসে আবার উপরে উঠে যাচ্ছে। সমস্ত পাখির গতিবেগ ও অভিমুখ একই। পুরো ঝাঁকটাই একবার ডান দিকে বাঁক নিচ্ছে তো পরমুহূর্তেই বাঁদিকে। এভাবে ৪০-৫০ সেকেন্ড ধরে উড়তে উড়তে এসে সবাই একসাথেই অনতিদূরে বালুকাবেলায় এসে বসল। চোখে বাইনোকুলার লাগাতেই হল। দেখি পাখিগুলোর পিঠ জুড়ে সোনালি ও হলুদ রঙের ছোপ। আর ভ্রুর উপর থেকে একটা সাদা পটি মাথার চাঁদি, ঘাড় ও গলা হয়ে পেটের দিকে নেমে এসেছে অনেকটা হাট্টিমা পাখিদের মতো। পাখিগুলো বালুকাবেলায় বসে কয়েক সেকেন্ড স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কী বুঝল কী জানি! আবার সদলবলে ফুরুৎ। চলে গেল দূরে দৃষ্টির বাইরে।

এই পাখিগুলো সম্বন্ধে অজয় হোম মহাশয়ের লেখা পড়েছি বলে মনে হল। কিন্তু নাম তো একেবারেই মনে নেই! তাছাড়া বইটা তো বাড়িতে। সুতরাং বাড়ি ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা। বাড়ি ফিরে সহজেই পাখিটিকে শনাক্ত করে ফেললাম ‘চেনা অচেনা পাখি’ বই থেকে। ইংরেজিতে এদের নাম হল ‘Eastern golden plover’ বা ‘Pacific golden plover’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Pluvialis fulva’। যেহেতু এরা পরিযায়ী পাখি তাই এদের কোনও স্থানীয় নাম নেই। অজয়বাবু এদের নাম দিয়েছেন সোনালি বাটান। এদের দেহের রঙের সাথে এই নাম যথার্থই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুন্দরবন অঞ্চলে সোনালি বাটানরা হল শীতকালীন পরিযায়ী পাখি। অন্যান্য পরিযায়ী পাখিদের মতো এরা অপ্রজজন ঋতুতে সুদূর আলাস্কা ও সাইবেরিয়া থেকে প্রায় ১২ হাজার-১৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সুন্দরবনে আসে। সুন্দরবন অঞ্চলের উপকূলে এবং জলাভূমি গুলিতে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি বা সেপ্টেম্বর মাস থেকে এদের দেখা মেলে। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে এরা ফিরে যেতে শুরু করে প্রজননভূমিতে। এরা যখন সুন্দরবন অঞ্চলে পৌঁছয় তখন এদের চেহারা অনেকটা বিবর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার আগেই এদের চেহারার ভোল বদলে যায়। তৈরি হয়ে যায় প্রজনন পালক। তখন এদের পিঠ ও মাথার চাঁদির রং হয় কালোর ওপর সোনালি হলুদ ছোপযুক্ত। পেটের নিচের দিকের রং হয় কালো। গাল গলা ঘাড়ের রঙও হয় কালো, তবে তার ওপরও হালকা হলুদ বা সোনালি রঙের ছোট ছোট কম সংখ্যক ছিট দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?

আগেই বলেছি, এই সময় ভ্রু থেকে মাথা ঘাড় গলা ও বুক পর্যন্ত দুদিকে সাদা রঙের চওড়া পটি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চঞ্চু, আঙুল ও পায়ের রঙ হয় ধূসর। চোখ আর লেজের নিচের দিকের রং হয় গাঢ় বাদামি। অপ্রজনন ঋতুতে অর্থাৎ আমাদের এখানের শীতকালে যখন এরা পৌঁছয় তখন এদের পিঠ, মাথা, লেজ, গলা ইত্যাদি অংশে উজ্জ্বল সোনালি রঙের ছিটের পরিবর্তে হালকা হলুদ ও সাদা ছিট দেখা যায় এবং গাঢ় কালো রং অনেকটা হালকা হয়ে যায়। আর তাই ওদের চেহারার জেল্লা কমে যায়। তবে ভ্রুর উপর থেকে ঘাড়ের দুপাশে সাদা রঙের পটির অবশেষ কিছুটা বোঝা যায়। প্রজনন ঋতুতে এদের স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। জানুয়ারি মাসে যখন কারগিল সৈকতে ওদের দেখতে পাই তখন ওদের প্রজনন পালক অনেকটাই তৈরি হয়ে গিয়েছিল বলেই আমার মনে হয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রী পুরুষের পার্থক্য তখনই হয়তো বোঝা যেত। কিন্তু খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারিনি বলে আমার চোখে তা ধরা পড়েনি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

যাইহোক, পার্থক্যটি হল পুরুষের উদরের নিচে কালো রঙ স্ত্রী সোনালি বাটানের তুলনায় অনেক গাঢ় এবং তার উপর সাদা ছিটের মাত্রা অনেক বেশি। আর ওদের শরীর যখন অপ্রজনন পালকে ঢাকা থাকে তখন কিন্তু পুরুষ ও স্ত্রী পার্থক্য করা সম্ভব নয়। সোনালি বাটানরা মাঝারি আকারের পাখি। মাথাটা তুলনামূলকভাবে বড় কিন্তু ঘাড়টা বেশ সরু। লম্বা হয় প্রায় ২৪ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার আর দুই ডানা বিস্তার করলে ৬৫ থেকে ৬৭ সেন্টিমিটার। ডানার প্রান্তভাগ সুচালো ধরনের। আর পা দু’খানি হাট্টিমা পাখিদের মতো টিঙটিঙে লম্বা। এদের দাঁড়ানোর ভঙ্গী কিন্তু হাট্টিমাদের মতো রীতিমতো ঋজু। অপ্রজনন ঋতুতে এদের ওজন হয় প্রায় ১৩৫ গ্রাম।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) সোনালি বাটানের ডিম। (ডানদিকে) উড়ন্ত সোনালি বাটানের দল। ছবি: সংগৃহীত।

সোনালি বাটানদের প্রধান খাবার হল পোকামাকড়। এরা ফড়িং, বোলতা, গুবরে জাতীয় পোকা, পিঁপড়ে, মাছি, মশা, মাকড়সা ইত্যাদি খেতে খুব ভালোবাসে। তাছাড়া সামুদ্রিক নানা শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, চিংড়ি ইত্যাদিও খায়। পরিযানের ঠিক আগে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার উপযোগী হয়ে উঠতে এরা বিভিন্ন পোকামাকড় ছাড়াও কাউবেরি ও ব্লুবেরি ফল ও বীজ খেয়ে নেয় যাতে শরীরে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন এদের ওজন হয় প্রায় ২০০ গ্রাম। এদের খাবার সংগ্রহ করার পদ্ধতিটা ভারি দৃষ্টিনন্দন। কিছুটা দৌড়ে যায়, তারপর থেমে গিয়ে খপ করে শিকার চঞ্চুতে তুলে নেয়। আর তারপর জায়গায় দাঁড়িয়েই দ্রুত সেটিকে উদরে চালান করে। তারপর আবার দৌড়োয় পরের শিকার খুঁজতে। আবার মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে গিয়ে মাথাটাকে উপর-নিচে দোলায়, যেন মনে হয় কাউকে জিজ্ঞাসা করছে—“খবর কী?” দলবদ্ধভাবে একটি এলাকায় থাকলেও সুন্দরবনের উপকূল ও জলাভূমি অঞ্চলে বেলাভূমি, নদীর চড়া বা অগভীর জলাশয় এবং ছোট ছোট ঘাস ভরা জমিতে এদের এককভাবে খাবার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। অবশ্য পাশে অন্য পরিযায়ী পাখিরা থাকতে পারে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

শীতকালে এরা পরিযায়ী হয়ে আসে কুমেরুর তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এরা পৌঁছায় দক্ষিণে সুন্দরবন-সহ সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। তাছাড়া এরা আফ্রিকা, ওশেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেও পরিযান করে। ভারতে উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়াও দেশের মধ্যে বিভিন্ন জলাভূমি অঞ্চলে সোনালি বাটানদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন আলাস্কা থেকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে মাত্র ৩-৪ দিনের মধ্যে একটানা ৪৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সোনালি বাটানরা সক্ষম। এরা দল বেঁধে আসার সময় ৩০০০ ফুট থেকে ১৬০০০ ফুট উচ্চতা দিয়েও উড়ে আসতে পারে। সুন্দরবন বা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল থেকে শীতের শেষে কিন্তু সব সোনালি বাটান তাদের প্রজননভূমিতে ফিরে নাও যেতে পারে। আর তখন তাদের প্রজনন পালকে সুসজ্জিত অবস্থায় এখানেই দেখা যেতে পারে। জানুয়ারি মাসে মনে হয় আমি যাদের দেখেছিলাম তাদের তখন প্রজনন পালক কিছুটা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অজয়বাবু এমনি একটি সোনালি বাটানকে সুন্দরবনে মে মাসে দেখেছিলেন বলে তাঁর বইতে লিখেছেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

মে থেকে আগস্ট মাস হল সোনালি বাটানদের প্রজননকাল। কুমেরিয় তুন্দ্রা অঞ্চলে মাটিতে ছোট খোঁদল করে তার ওপরে লাইকেন, মস, ঘাস, পাতা ইত্যাদি বিছিয়ে বাসা তৈরি করে। দেখা গেছে পুরুষরা স্ত্রীদের থেকে আগে এসে এলাকা দখল করে বাসা তৈরি করে, আর একই জায়গায় সে বার বার ফেরে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অপ্রজননভূমি থেকে তারা জোড় বেঁধেই প্রজননভূমিতে ফেরে। স্ত্রী যখন ডিমে তা দেয় পুরুষ তখন পাহারার দায়িত্ব নেয়। স্ত্রী সোনালি বাটান সাধারণত চারটে ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ সাদা হলেও তার ওপর প্রচুর পরিমাণে গাঢ বাদামি ও কালো ছিট দেখা যায়। সাধারণতঃ দিনের বেলায় পুরুষ ও রাত্রে স্ত্রী পাখি ডিমে তা দেয়। ২৬-২৭ দিন তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। দারুণ বিস্ময়ের ব্যাপার হল ডিম ফুটে বেরোনোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাচ্চারা বাসা ছেড়ে মা-বাবার পিছু নিতে পারে। আর একদিনের মধ্যেই এরা স্বাবলম্বী হয়ে যায় অর্থাৎ নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করে নেয়। তবে তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাসায় ফেরে শরীরের উষ্ণতা পেতে আর সুরক্ষার তাগিদে। পাখিদের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য অন্য কোনও পাখির রয়েছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) প্রজননক্ষম পুরুষ সোনালি বাটান। (ডানদিকে) সোনালি বাটান। ছবি: সংগৃহীত।

আইইউসিএন সোনালি বাটানদের বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত না করলেও সুস্বাদু মাংসের জন্য নাকি অনেকেই এদের শিকার করে। তা যদি সত্যি হয় তবে সোনালি বাটানদের সুন্দরবনে ভবিষ্যৎ খুব বেশি সুরক্ষিত নয়। অজয়বাবু জানিয়েছেন যে এরা যখন খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে তখন দু’একটি পাখি পাহারাদারের কাজ করে। তারা নাকি বিপদ বুঝলে অন্যদের সতর্ক করে দেয়। এতে বন্দুকবাজদের শিকারে বেশ সমস্যা হয়। কিন্তু কেউ যদি এদের উল্টো দিক থেকে দূরত্ব বজায় রেখে তাড়া করে তখন এরা বন্দুকধারীর নাগালে চলে আসে। অজয়বাবু লিখেছেন এভাবেই এরা “নির্বুদ্ধিতার মাশুল দেয়”। তবে ভবিষ্যতই বলবে এরা কতখানি নির্বুদ্ধিতার মাশুল দিয়েছে।—চলবে।

* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content