
ডিম পাড়ার জন্য বালিকাঠার চাই এমন বালুকাময় বিস্তৃত বেলাভূমি। ছবি : সংগৃহীত।
করোনাকালের শেষের দিক। সময়টা ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস। মানুষের মনে করোনার আতঙ্ক তখনও যথেষ্ট রয়ে গেছে। তাই সংবাদপত্রেও প্রথম পাতা থেকে করোনা সংক্রান্ত খবর ভেতরের পাতায় যায়নি। কিন্তু পরিবেশবিদদের জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ খবর অবশ্য ২১ জানুয়ারি সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় ছোট করে জায়গা পেয়েছে। পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে চোখটা আটকে গেল সেই খবরে। সজনেখালিতে আবদ্ধ কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্র থেকে ১০টি বালিকাঠা নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে প্রত্যেকটির পিঠে জিপিএস ট্রান্সমিটার সংযুক্ত করে। খবরটা পড়েই মুহূর্তে আমার মন পাড়ি দিল ৫০/৫২ বছর আগে।
বালিকাঠা নামটা আমাদের পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় খুব বেশি প্রচলিত নয়, কিন্তু ‘কাঠা’ শব্দটি সেই সময় এবং তার কিছুদিন পরেও প্রবলভাবে জনপ্রিয় শব্দ ছিল। আমার বাড়ি থেকে সামান্য দক্ষিণে কাকদ্বীপ ও নামখানার ঠিক মাঝামাঝি রাজনগর, বিশালাক্ষীপুর ও বুধাখালি গ্রামের সংযোগস্থলে এবং অধুনা বিলুপ্ত ঘিয়াবতী নদীর তীরে অবস্থিত উকিলের হাট ছিল কাঠার মাংসের জন্য সুবিখ্যাত। কাঠা হল সুন্দরবনের নদী, খাঁড়ি ও উপকূলের নোনাজলের কচ্ছপ। প্রতি রবিবার ও বুধবার বিকেলে বসত হাট। দূর দূরান্তের গ্রামের মানুষ সাপ্তাহিক বাজার করতে মাঠ, খাল-বিল পেরিয়ে হাটে আসত। শাকসবজি, তরিতরকারি, মুরগির ডিম, নদীর মাছ, হাঁড়ি কলসি ইত্যাদির সাথে বিক্রি হত কাঠার মাংস।
বালিকাঠা নামটা আমাদের পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় খুব বেশি প্রচলিত নয়, কিন্তু ‘কাঠা’ শব্দটি সেই সময় এবং তার কিছুদিন পরেও প্রবলভাবে জনপ্রিয় শব্দ ছিল। আমার বাড়ি থেকে সামান্য দক্ষিণে কাকদ্বীপ ও নামখানার ঠিক মাঝামাঝি রাজনগর, বিশালাক্ষীপুর ও বুধাখালি গ্রামের সংযোগস্থলে এবং অধুনা বিলুপ্ত ঘিয়াবতী নদীর তীরে অবস্থিত উকিলের হাট ছিল কাঠার মাংসের জন্য সুবিখ্যাত। কাঠা হল সুন্দরবনের নদী, খাঁড়ি ও উপকূলের নোনাজলের কচ্ছপ। প্রতি রবিবার ও বুধবার বিকেলে বসত হাট। দূর দূরান্তের গ্রামের মানুষ সাপ্তাহিক বাজার করতে মাঠ, খাল-বিল পেরিয়ে হাটে আসত। শাকসবজি, তরিতরকারি, মুরগির ডিম, নদীর মাছ, হাঁড়ি কলসি ইত্যাদির সাথে বিক্রি হত কাঠার মাংস।
শীতের সময় হাট হয়ে উঠত আরও বেশি জমজমাট কারণ এই সময় প্রচুর সবজির সাথে সস্তায় দেদার বিক্রি হত কাঠার মাংস। সেই সময় দারিদ্র্য অধ্যুষিত গ্রামীণ সুন্দরবনের মানুষের কাছে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য হিসেবে কাঠার মাংস ছিল অনেক বেশি গ্রহণীয়। শীতকালে সুদূর মহাসাগরের সামুদ্রিক অলিভ রিডলে কচ্ছপরা দলবেঁধে সুন্দরবনের জনবিহীন দ্বীপগুলির বালুকাবেলায় ডিম পাড়তে আসত। আর সেগুলোকেই ধরে আনত কাঠাশিকারীরা। তবে এদের লভ্যতা ছিল কেবল শীতকালে। বাকি সময় কাঠার মাংস বলতে সুন্দরবনের বালিকাঠার মাংসই বোঝাত। অলিভ রিডলে কচ্ছপের থেকে আকারে বেশ খানিকটা ছোট সুন্দরবনের তৎকালীন এই স্থায়ী বাসিন্দারা ছিল সুন্দরবনের মানুষের কাছে মাংসের অন্যতম উৎস। এদের ডিমের চাহিদাও ছিল প্রচুর। কেবল স্থানীয় মানুষের কাছে নয়, মাংস ও ডিমের চাহিদা ছিল সুন্দরবনের বাইরেও। ফলে সারা বছর ধরে বালিকাঠা শিকার ও বিক্রি রমরমিয়ে চলত। আর এভাবেই সুন্দরবনের এই অনন্য জলসম্পদটি গত শতকের নব্বইয়ের দশকের আগেই প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬১ : গোবিন্দ সোরেন দ্য গ্রেট

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৭ : দুই সহোদরার সখি সংবাদ (২)

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৮৮ : নেকলেস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৪: শূর্পনখার কাহিনিতে, ষড়রিপুর প্রভাব, এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত নয় কী?
মনে পড়ে গেল ছোটোবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথের লেখা “আবদুল মাঝির গল্প”। ছুঁচলো দাড়ি, কামানো গোঁফ ও নেড়া মাথা আবদুল মাঝি লেখকের দাদার জন্য পদ্মা নদী থেকে ইলিশ মাছ ও কচ্ছপের ডিম এনে দিত। সেই ডিম হয়তো এই বালিকাঠার ডিমই হবে। পরমুহূর্তেই স্মৃতিপটে ভেসে উঠল আমার শৈশবে নিয়মিত দেখা ঘটনার দৃশ্য—মাঠের মাঝে মাড়া পথ দিয়ে গ্রামের প্রান্তিক মানুষরা হাট থেকে মাথায় বাঁশের বা বেতের ঝুড়িতে করে বাজার নিয়ে ফিরছে আর তাদের অনেকের হাতেই রয়েছে এক টুকরো কাপড় বা রুমালে বাঁধা শালপাতায় জড়ানো কাঠার মাংস। সেই মাংস থেকে বেরোনো রক্ত ও রস শালপাতা চুইয়ে ভিজিয়ে দিত রুমাল বা কাপড়ের টুকরো। তা দেখেই বুঝতাম ওতে কাঠার মাংসই আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বালিকাঠার মাংস।

পুর্ণবয়স্ক পুরুষ বালিকাঠা। ছবি : সংগৃহীত।
বালিকাঠা হল সুন্দরবন অঞ্চলের একমাত্র স্থায়ী কচ্ছপ অর্থাৎ টার্টল (Turtle)। এরা অলিভ রিডলে কচ্ছপের মতো পরিযায়ী নয়। এরা সমুদ্রে থাকে না। বেশিরভাগ সময় থাকতে পছন্দ করে সুন্দরবনের নদীনালায় যেখানে লবণাক্ততা অনেক কম অর্থাৎ মিষ্টি জলের প্রবাহ বেশি। কেবল ডিম পাড়ার সময় এরা খাঁড়ি বা উপকূলের দিকে এগিয়ে যায় এবং বালিযুক্ত তটভূমিতে ডিম পাড়ে। এরা হল এশিয়ায় মিষ্টি বা আধানোনা জলের কচ্ছপদের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম কচ্ছপ। এবং একই সঙ্গে পৃথিবীতে সবচেয়ে সঙ্কটে থাকা কচ্ছপদের মধ্যে অন্যতম। এদের পিঠের খোলস অর্থাৎ ক্যারাপেস লম্বায় হয় প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার। আর ওজন হয় সর্বাধিক ১৮ কেজি। পিঠের খোলস বা ক্যারাপেস হয় সামান্য নিচু এবং রং হয় সবুজাভ-বাদামি। তবে বাচ্চা বালিকাঠার খোলসে একটা উঁচু শিরার মতো অংশ থাকে যা বড় হলে ক্রমশ মিলিয়ে যায়। পেটের দিকের খোলস অর্থাৎ প্ল্যাস্ট্রনের রং হয় হলুদাভ। এদের মাথা তুলনায় ছোট তবে তুন্ড বেশ সূচালো এবং উপর দিকে উঁচিয়ে থাকে। বলতে পারা যায়, বালিকাঠারা হল বেশ নাক উঁচু কচ্ছপ! তুন্ডের আগায় এক জোড়া নাসারন্ধ্র খুব স্পষ্ট দেখা যায়। এদের পায়ে আঁশগুলো এমন ভাবে বিন্যস্ত থাকে যে দেখে মনে হয় ডোরা দাগ আছে। এদের স্ত্রীদের আকার পুরুষের থেকে কিছুটা বড় হয়। স্ত্রীদের মাথার রঙ হয় ধূসর। প্রজনন ঋতুতে পুরুষদের রং হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন। তখন এদের মাথার রঙ হয় কুচকুচে কালো কিন্তু ঘাড়ের রঙ হয় সিঁদুরের মতো বা কমলা। সামনের দুটো পায়ের রঙও হয় উজ্জ্বল লাল বা কমলা রঙের, আর চোখের কনীনিকার রঙ পাল্টে হয়ে যায় হলুদাভ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৯ : শুধু মনুভ্যালি নয়, কৈলাসহরের চা বাগান কালীশাসনও বিপ্লবী তৎপরতার সাক্ষী

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২৮: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৯
বালিকাঠার বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ‘Batagur baska’, ইংরেজিতে ‘Northern River Terrapin’। অনেকেই এই কচ্ছপকে বাটাগুর কচ্ছপ বলেন। এদের মূল বাসস্থান হল ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন। তবে মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডেও এদের এক সময় পাওয়া যেত। এখন আর পাওয়া যায় না। আর ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে প্রায় বিলুপ্ত কিংবা ইতিমধ্যে প্রাকৃতিকভাবে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। যদি কিছু বেঁচে থাকে তবে তা ভারতীয় সুন্দরবনের সজনেখালি লাগোয়া দ্বীপে এবং বাংলাদেশের কারামজাল ম্যানগ্রোভ সেন্টারে বেঁচে আছে। এই জায়গাগুলোতে ভারত এবং বাংলাদেশে বালিকাঠা বা বাটাগুর কচ্ছপের আবদ্ধ প্রজনন বা ক্যাপটিভ ব্রিডিং (captive breeding) করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, একসময় গঙ্গাসাগর ও বকখালির বেলাভূমি ছিল বালিকাঠাদের উপযুক্ত প্রজননভূমি। কিন্তু পর্যটন শিল্পের বাড়বাড়ন্তের ফলে ওই এলাকায় মানুষের আনাগোনা ও রাস্তার কুকুরের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। আর তাই বহুদিন হল ওই দুটি এলাকাকে বালিকাঠারা পরিত্যাগ করেছে। মেছুয়া ও কেন্দু দ্বীপও ছিল একদা নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কারণে জলতল বৃদ্ধি পাওয়ায় জোয়ারের সময় ওই দ্বীপগুলোর প্রায় পুরোটাই ডুবে যায়। তাছাড়া দ্বীপদুটোতে জোয়ারের সীমার উপরে শুকনো বালির অভাব রয়েছে। পক্ষান্তরে বাগমারা, গরানহাটি ও ছাইমারি দ্বীপ আজও ওদের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে উপযুক্ত রয়েছে। আর তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা ওই তিনটি দ্বীপে এখনও জীবিত বালিকাঠার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫২: কূটবণিক্-জাতক — ভাণ্ডার তোর পণ্ড যে হয়

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
বালিকাঠা বা বাটাগুর কচ্ছপরা সর্বভুক। নদীতে মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে এরা নদীর পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখে বলে এদের ‘জলের শকুন’ বা ওয়াটার ভালচার (water vulture) বলা হয়। এদের খুব পছন্দের খাবার হল ম্যানগ্রোভের ফল। জোয়ারের সময় যখন নদীর দুই পাড়ের ম্যানগ্রোভ গাছগুলোর শাখা জলের তলায় আংশিক ডুবে যায় তখন এই কচ্ছপরা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ফল খায়। বিভিন্ন খাবারের মধ্যে ওদের সবচেয়ে পছন্দ হল ম্যানগ্রোভের ফল। বীজসহ ফল খাওয়ায় এদের মলের সাথে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের আস্ত বীজ বেরিয়ে আসে। তাই ওরা যখন অন্যত্র মলত্যাগ করে তখন সেই জায়গায় মলের সাথে বেরোনো বীজ থেকে ম্যানগ্রোভের চারা জন্মায়। এইভাবে সুন্দরবন অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বিস্তারে বালিকাঠা দারুণভাবে সাহায্য করে। এছাড়াও বালিকাঠা ছোট ছোট জলজ প্রাণী যেমন শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি খেতে পছন্দ করে। সুন্দরবনের বাস্তুতান্ত্রিক সাম্যাবস্থা রক্ষায় বালিকাঠাদের গুরুত্ব অপরিসীম।

(বাঁদিকে) পুরুষ (ওপরে) ও স্ত্রী (নিচে) বালিকাঠা। (ডানদিকে) জিপিএস ট্রান্সমিটার পিঠ্বে নিয়ে বালিকাঠা এগোচ্ছে নদীর দিকে। ছবি : সংগৃহীত।
কিন্তু এই বালিকাঠা কি আর আদৌ টিকে আছে সুন্দরবনে? আইউসিএন (IUCN) এদের চরমতম বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রেখেছে। ভারতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এরা শিডিউল-১ তালিকাভুক্ত। ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবনের কচ্ছপ গবেষকদের মতে প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনও বালিকাঠা আদৌ বেঁচে আছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। কারও কারও মতে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে সর্বাধিক ১০০ টি বালিকাঠা বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে। দ্য ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII)-এর গবেষকরা পরিবেশগত ডিএনএ পদ্ধতি (environmental DNA বা eDNA protocol) প্রয়োগ করে ভারতীয় সুন্দরবনে প্রাকৃতিকভাবে কোনও বাটাগুর কচ্ছপ বেঁচে আছে কিনা তার হদিস পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পদ্ধতি অনেকটা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতো। বাটাগুর কচ্ছপের মল, আঁশ বা দেহ থেকে নিঃসৃত শ্লেষ্মায় যদি কোনও ডিএনএ থেকে থাকে তাহলে তা শনাক্ত করা হয় এই পদ্ধতিতে। আর এই গবেষণায় সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর জলের নমুনায় বিজ্ঞানীরা বাটাগুরের ডিএনএ-র উপস্থিতি টের পেয়েছেন। ফলে প্রাকৃতিকভাবে ভারতীয় সুন্দরবনে বাটাগুর কচ্ছপ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি বলেই মনে হয়। তবে বাস্তবে বর্তমানে কোনও বাটাগুর কচ্ছপের চাক্ষুষ প্রমাণ মেলেনি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৪: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— অলিভ রিডলে কচ্ছপ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
পশ্চিমবঙ্গের বনবিভাগ ১৯৮৮ সালে বালিকাঠার আবদ্ধ প্রজনন কর্মসূচি গ্রহণ করে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে কচ্ছপ বিশেষজ্ঞরা বালিকাঠার ২১টি বাসা চিহ্নিত করেন এবং তা থেকে ৬৪৫টি ডিম সংগ্রহ করে সজনেখালি কেন্দ্রে নিয়ে আসেন কৃত্রিম পদ্ধতিতে সেই ডিম থেকে বাচ্চার জন্ম দেওয়ার জন্য। ১৯৯৭ সালে সালিম আলি সেন্টার ফর অর্নিথোলজি অ্যান্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রি থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে সংগৃহীত ডিমের ৫০%-এর কম ডিম থেকে বাচ্চা জন্মেছিল। কিন্তু প্রশাসনিক কোনও সমস্যায় ৯০-এর দশকের শেষের দিকে বালিকাঠার আবদ্ধ প্রজনন প্রকল্পটি রদ হয়ে যায়। তবে ২০০৮ সালে প্রকল্পটি পুনরায় চালু করা হয়। এবার রাজ্য বনদপ্তরের সঙ্গে ‘Turtle Survival Alliance’ (TSA) যৌথভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হয়েছে। এই প্রকল্পের কর্মসূচি হিসেবে সজনেখালি ব্যাঘ্রপ্রকল্প অঞ্চলে ২০১২ সালে ১২ টি পূর্ণবয়স্ক বালিকাঠা নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে আবদ্ধ প্রজনন শুরু করা হয়। ২০২২ সালে ওই প্রজনন কেন্দ্রে বালিকাঠার সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে ৩৯৭ টিতে। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের অন্তর্গত সাতটি কেন্দ্রে বালিকাঠাগুলি প্রতিপালিত হচ্ছে। সাতটি কেন্দ্র হল সজনেখালি, দোবাঁকি, ঝিঙেখালি, হরিখালি, নেতিধোপানি, চামটা এবং বাগনা বা ঝিলা। এদের মধ্যে প্রথম ছয়টি সজনেখালি রেঞ্জের মধ্যে এবং শেষেরটি বসিরহাট রেঞ্জের মধ্যে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ১০টি আধা-পরিণত বালিকাঠা (৩টি পুরুষ ও ৭টি স্ত্রী)-র খোলসের উপর জিপিএস ট্রান্সমিটার যুক্ত করে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় আবেগকে মর্যাদা দিয়ে বনবিবির মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর সজনেখালি ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে সেগুলিকে নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। উপগ্রহের মাধ্যমে এদের গতিবিধি নজর করা হচ্ছে। দেখা গিয়েছে ১০টির মধ্যে ৯টি বালিকাঠা বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে চলে গিয়েছে। একটি বালিকাঠা রয়েছে ভারতীয় সুন্দরবন অংশে যেখানে জলের লবণাক্ততা নেই বললেই চলে। অতিরিক্ত লবণাক্ততা বালিকাঠার বসবাস এবং প্রজননের জন্য যে উপযুক্ত নয় তা বিজ্ঞানীরা আগেই জানিয়েছিলেন। যেহেতু ভারতীয় সুন্দরবন অংশের লবণাক্ততা বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশের তুলনায় বেশি তাই ৯টি বালিকাঠার বাংলাদেশের দিকে পাড়ি দেওয়া এবং অন্যটির মিষ্টিজলের নদীতে চলে যাওয়া বিজ্ঞানীদের ধারণাকেই নিশ্চিত করেছে।

জিপিএস ট্রান্সমিটার যুক্ত করে ১০টি বালিকাঠা নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত।
বালিকাঠার আবদ্ধ প্রজনন প্রকল্পের মধ্যে দিয়ে জন্মানো কচ্ছপদের প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখতে চাইছেন আবদ্ধ প্রজননে জন্মানো বালিকাঠা প্রাকৃতিক পরিবেশে কতটা মানিয়ে নিতে পারে বা আদৌ মানিয়ে নিতে পারে কিনা এবং তারপর তারা আদৌ স্বাভাবিকভাবে বংশবিস্তার করতে পারে কিনা। তাছাড়া এই কর্মসূচি কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সাফল্যলাভ সম্ভব নয় কারণ এই কচ্ছপরা তো আন্তর্জাতিক সীমানা মেনে অবস্থান করবে না। তাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ না করলে এই প্রকল্পের সাফল্যলাভ সম্ভব নয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ১০টি বালিকাঠা নদীতে ছেড়ে দেওয়া ছিল একেবারেই প্রাথমিক পদক্ষেপ। ফলে এই কর্মসূচি কতটা সফল হবে বা আদৌ সফল হবে কিনা তার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। আর যদি সফল হয় তবে আবারও হয়তো একদিন সুন্দরবনের নদীতে ও খাঁড়িতে অবাধে বিচরণ করবে সুন্দরবনের অনন্য জলসম্পদ বালিকাঠা।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















