রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

বাচ্চাদের নিয়ে মা বুনো শুয়োর। ছবি সংগৃহীত।

সুন্দরবনের স্থলবাসী বন্যপ্রাণী ত্রয়ীর মধ্যে অন্যতম হল বুনো শুয়োর। সুন্দরবনের জঙ্গলে যতদূর জানি বর্তমানে যথেষ্ট সংখ্যায় বুনো শুয়োর আছে। তবে এখনও পর্যন্ত স্বচক্ষে দেখার সুযোগ না হওয়ায় আফসোস রয়েছে। ছোটবেলায় মাঝে মাঝেই শুনতাম জঙ্গল থেকে শিকার করা বুনো শুয়োরের মাংস গ্রামে বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই চড়া দামে সেই মাংস কিনে খেত। সে সুযোগ আমার হয়নি। তবে হলে কিন্তু এখন অপরাধবোধে ভুগতাম। যাইহোক, বর্তমানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে বুনো শুয়োর হত্যা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া নজরদারি ও শাস্তি চোরাশিকারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। তাই ইদানিংকালে বুনো শুয়োর সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে কেউ চোরাগোপ্তা শিকার করেছে বলে শুনিনি। আর সুন্দরবনের বুনো শুয়োর শিকার করা চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ এই শুয়োররা যেমন শক্তিশালী তেমনই প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক। তাই শিকার করা রীতিমতো কষ্টকর ও বিপজ্জনক।
সুন্দরবনের বুনো শুয়োরের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Sus scrofa’। উপপ্রজাতি ‘cristatus’। শুধু সুন্দরবন নয়, ভারত উপমহাদেশ, বিশেষ করে ভারত, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও পশ্চিম তাইল্যান্ডে এই উপপ্রজাতির বুনো শুয়োরদের আবাসস্থল। মনে হয় সেই কারণে ভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনিতে এদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্রে বুনো শুয়োরের মাথার মূর্তি পাওয়া গেছে। সংস্কৃতে শুয়োরকে বলা হয় বরাহ। আর বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার হল বরাহ। ৫০০০-১২০০০ বছর আগেকার পুরনো প্রস্তর যুগের গুহাচিত্রে বুনো শুয়োরের উপস্থিতি রয়েছে। ভারতবর্ষের প্রাচীনতম গুহাচিত্র ভীমবেটকাতে রয়েছে এর প্রমাণ। সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন স্থানে খনন করে বুনো শুয়োরের হাড়গোড় এবং পাত্রের মধ্যে শুয়োরের চর্বির অবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দীতে চালুক্য বংশের রাজত্বকালে রাজপ্রতীক ছিল এই শুয়োর। বুনো শুয়োরের ছবি খোদাই করা মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। সুতরাং এসব থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভারতীয় সভ্যতায় বহু প্রাচীনকাল থেকে বুনো শুয়োর এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রেখেছে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : এই ভাষাতেই করি গান

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫৭: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

মধ্য ইউরোপের শুয়োরদের থেকে সুন্দরবনের শুয়োর তথা ভারতীয় বুনো শুয়োরদের চেহারায় পার্থক্য খালি চোখে দেখে খুব সহজে নিরূপণ করা যায়। ভারতীয় পুরুষ বুনো শুয়োরদের মাথার পিছন থেকে ঘাড় হয়ে পিঠে এবং গলার কাছে নিচের দিকে রয়েছে সিংহের কেশরের মতো বড় বড় লোম। মধ্য ইউরোপের বুনো শুয়োরদের ক্ষেত্রে কিন্তু তা নেই। তাছাড়া ভারতীয় বুনো শুয়োরদের লেজেও লোমের পরিমাণ বেশি। আর দুটো কান অপেক্ষাকৃত ছোট এবং খাড়া।

আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২২: সঞ্চারিত অনুরাগের রেশ

সুন্দরবনের বুনো শুয়োরদের রং গাঢ় বাদামি থেকে কালচে ধূসর হতে পারে। এরা লম্বায় হয় প্রায় পাঁচ ফুট, আর উচ্চতা ৮০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার। পুরুষদের আকার স্ত্রীদের থেকে কিছুটা বড়। এদের ওজন হয় ৫০কেজি থেকে ১৫০ কেজির মধ্যে। এদের মাথাটা বড়, লম্বা কিন্তু ঘাড় খুব ছোট। মাটি খুঁড়ে খাবার সংগ্রহ করার জন্য এদের তুন্ড বেশ লম্বা এবং সঞ্চালনে সক্ষম। পুরুষ বুনো শুয়োরদের তো আবার হাতির দাঁতের মতো দুটো বড় দাঁত চোয়ালের দু’পাশ থেকে বেরিয়ে আসে। দাঁতাল পুরুষ বুনো শুয়োরদের দেখতে কিন্তু ভয়ঙ্কর হয়। এই দাঁত মাটি খুঁড়ে খাবার সংগ্রহ করার সাথে সাথে আত্মরক্ষা করতেও সাহায্য করে। আক্রমণ বা আত্মরক্ষার সময় এই দাঁত দুটি হয়ে ওঠে অস্ত্র। এদের চামড়া খুব মোটা। চামড়ার উপর দুই স্তর বিশিষ্ট লোম দেখা যায়। বাদামি রঙের নরম ছোট ছোট লোমের উপর থাকে গাঢ় বাদামি বা কালো রঙের খোঁচা খোঁচা শক্ত ও লম্বা লোম।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী

সুন্দরবনের বুনো শুয়োরদের খাদ্যতালিকা অন্যান্য অঞ্চলের একই উপপ্রজাতির বুনো শুয়োরদের থেকে বেশি লম্বা। খুব বৈচিত্রপূর্ণ এদের খাদ্যতালিকা। প্রধানত উদ্ভিজ্জ খাদ্যই এরা বেশি পছন্দ করে। পাতা, ফল, বীজ, গাছের বাকল, কাদা বা মাটির মধ্যে প্রোথিত মূল, কন্দ ইত্যাদি এদের পরিচিত খাদ্য। দেখা গিয়েছে এদের গৃহীত খাদ্যের ৯০ শতাংশই উদ্ভিজ্জ খাদ্য। লম্বা ও সঞ্চরণশীল তুন্ডের সাহায্যে এরা মাটি খুঁড়ে মূল ও কন্দ বার করে খায়। তবে সুযোগ পেলে নানা ধরনের প্রাণীজ খাবার-দাবার এরা খেতে ছাড়ে না। মাটির মধ্যে থাকা কেঁচো, পোকামাকড়, কাঁকড়া ইত্যাদির পাশাপাশি মাটির ওপরে থাকা গিরগিটি, সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি প্রাণীও শিকার করে। কখনও কখনও এদের মৃতদেহের মাংস, হাড় ইত্যাদি খেতেও দেখা যায়। আমার পরিচিত দু’একজন সুন্দরবন পর্যটক নদীর তীরে বুনো শুয়োরকে কাদার মধ্যে থেকে লাল কাঁকড়া বার করে খেতে দেখেছেন। এরা মাটি খুঁড়ে খাবার সংগ্রহ করার ফলে বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বীজ থেকে গাছ জন্মাতে যেমন সুবিধা হয় তেমনই মাটির উপরের জৈব বস্তু মাটির নিচে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং মাটির মধ্যে বায়ু চলাচল ভালো হয়। অর্থাৎ ম্যানগ্রোভ বনভূমির উর্বরতা রক্ষায় এবং ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের অস্তিত্ব বজায় রাখতে বুনো শুয়োররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

সুন্দরবনের বুনো শুয়োরদের একটি চমৎকার অভিযোজন হল এরা সাঁতারে দারুন দক্ষ। নদী, খাঁড়ি ইত্যাদি সাঁতরে এরা প্রায়শই একটি দ্বীপ থেকে আরেকটি দ্বীপে যাতায়াত করে। সুন্দরবনের বুনো শুয়োররা সাধারণভাবে নিশাচর হলেও দিনের বেলাতেও কখনও কখনও খাবার-দাবার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। স্ত্রী বুনো শুয়োররা সাধারণত দলবদ্ধ অবস্থায় থাকলেও প্রজননকাল ছাড়া অন্য সময় পুরুষ বুনো শুয়োর একা একাই ঘুরে বেড়ায়। স্ত্রী বুনো শুয়োরের গর্ভাবস্থা প্রায় চার মাস স্থায়ী হয়।

একটি মা বুনো শুয়োর একসঙ্গে ৪-৬টি বাচ্চার জন্ম দেয়। তবে সর্বোচ্চ ১২ এবং সর্বনিম্ন ৩টি বাচ্চার জন্ম দিতেও দেখা গিয়েছে। সাধারণতঃ গাছের ছোট ডালপালা, ঘাস, পাতা ইত্যাদি দিয়ে মা শুয়োর বাচ্চার জন্মের আগে একটা অস্থায়ী বাসা বানায়। সেই বাসাতেই মা বাচ্চাদের জন্ম দেয়। বাচ্চাদের গায়ে রং ডোরাকাটা হয় বলে সহজেই বাচ্চারা শত্রুর দৃষ্টি এড়াতে পারে। বাচ্চার বয়স ১০ দিন হলে তারা মায়ের সাথে খাবার সংগ্রহে বেরোয়। তিন মাস বয়স হলে বাচ্চারা মাতৃদুগ্ধ ছেড়ে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হয়ে যায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

মাটি খুঁড়ে খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত বুনো শুয়োর। ছবি সংগৃহীত।

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে বুনো শুয়োরদের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে কারণ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের খাদ্যতালিকায় দ্বিতীয় পছন্দ হল এই বুনো শুয়োররা। এরা চেহারায় এবং শক্তিতে মোটেই কম যায় না। ফলে একটা বুনো শুয়োরকে কাবু করতে বাঘকে যথেষ্ট বেগ পোয়াতে হয়। যখন বাচ্চা হয় তখন মা শুয়োররা ভীষণ হিংস্র হয়ে ওঠে। বাচ্চার বিপদ হতে পারে মনে করলে আক্রমণ করে। তাছাড়া দেখা গেছে এদের বুদ্ধিশুদ্ধিও যথেষ্ট ভালো। বিশেষ করে যখন স্ত্রী বুনো শুয়োররা দলবদ্ধ থাকে তখন তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি ওদের মেধার পরিচয় দেয়। সুন্দরবনে খাদ্য-খাদক সম্পর্কের নিরিখে এদের সংখ্যা যথেষ্ট ভালোই। তাই যদিও এরা বিপন্ন নয় তবুও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে এদের গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে (১৯৭২) এদের তিন নম্বর শিডিউলে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এরা বাসস্থান না হারালে কিংবা মানুষের হাতে নির্বিচারে শিকার না হলে সুন্দরবনে অন্তত এদের কোনও আশু বিপদ নেই।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content