
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
শিয়ালদা স্টেশনের থিকথিকে ভিড়ের মধ্য থেকে এক অবিনশ্বর উদ্বাস্তুকে আবিষ্কার করেছিল শংকর। তার ফেলে আসা রূপকথা দেশের উজান আলো তিনি। গোপালগঞ্জ হাইস্কুলের সেকেন্ড মাস্টারমশাই মণীন্দ্র বারুজ্জে। মুজঃফরপুর লোকালে চেপে তাঁকে নিয়েই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিল শংকর। ঠিকানা চম্পারণ।
সারারাত ট্রেন জার্নি করে চম্পারণে পৌঁছতে সকাল দশটা বাজলো। বেতুয়া ক্যাম্প এখনও ক্রোশ খানেক দূরে। নিজের ব্যাগ আর স্যারের থলি দু’ কাঁধে ঝুলিয়ে স্টেশন লাগোয়া দোকানপাট ছাড়িয়ে পুবমুখে এগোতে থাকলো দু’জনে। চারপাশে ঘনিয়ে এসেছে নির্জনতা। দূরে দূরে ফসলের ক্ষেত। তিল তিসি সরষের সম্ভার। কিছু ঘরবাড়ি দোকানপাট পচাখাল। খাল পার বেয়ে জলা জমিতে নেমে পায়ে হাটা সরু পথ। পা টিপে টিপে হেঁটে যেতে হবে ওদের। পথ তো সোজা নয়। আঁকাবাঁকা। মানচিত্রের মতো এমন জটিল পথজাল ছাড়িয়ে যেতে পারলে তবেই পৌঁছোনো যাবে বেতুয়ার উদ্বাস্তু মানুষের ভিড়ে। কোনও সাদা সরল রাস্তা খোলা নেই ওদের সামনে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। যদিও শরৎকাল আকাশের অঙ্গে নীল, কিন্তু সেই নীল আগুন পুড়িয়ে দিচ্ছে মাটিকে। হাঘরেদের হরিবোল ধ্বনিতে আশ্বিনের চিতা চারপাশে আগুন জ্বালাচ্ছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২২: সঞ্চারিত অনুরাগের রেশ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৮ : শত্রুরা যখন নিজেদের মধ্যে লড়ে, আখেরে লাভ হয় তৃতীয় ব্যক্তিরই

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫০: বালোদক-জাতক—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৯: মহাভারতের কথা অমৃতসমান কেন?
রাস্তার মেটে ধুলো উড়িয়ে ওরা দু’জন হাঁটছে। ব্রজেন স্যারের কষ্ট হচ্ছে। হবেই তো। এতদিনের উপবাস, অনিদ্রা, অসম্মান, কেমন জীর্ণ হয়ে গিয়েছেন স্যার! ভিতরে ভিতরে যেন বেঁচে নেই মানুষটা! এমন একটা মরা মানুষের পক্ষে উদ্বাস্তুর যন্ত্রণায় মলম লাগানো কি সম্ভব? ক্ষতের মুখ চিঁড়ে বার করে আনতে পারবেন পুঁজ রক্ত স্রাব! অপারেশন উদ্বাস্তুর অগ্নিগর্ভ লড়াইতে ধুঁকতে ধুঁকতে যেন সামিল হচ্ছে একটি অর্ধদগ্ধ শব!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৫ : অতর্কিতে হামলা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৪: ত্রিপুরায় রিয়াং বিদ্রোহ
চলতে চলতে অনেক কথা বলছে শংকর। বকে চলেছে একাই। বৃদ্ধ সঙ্গীটি নীরব। শংকর কিন্তু শুধু বলার জন্য বলছে না। স্যারকে বোঝানোর জন্য শেখানোর জন্য বলছে দেশের বর্তমান হাল হকিকত। এখন আর কতটুকুই বা জানেন স্যার! পূর্ববঙ্গে যখন ছিলেন তখনকার সেকেন্ড মাস্টার আর এই শিয়ালদা স্টেশনের জনগণের হাতে মার খাওয়া ছিন্নমূল ব্রজেন বাড়ুজ্জে আসলে আর এক সত্তা নয়। শংকর জোয়াল টানার মত স্বেচ্ছায় টানছে এই অর্ধ-মৃত বৃদ্ধ কে। বাঁচাতে চাইছে। জীবনের আলো দেখানোর দায়িত্ব নিয়েছে সে। অপ্রকট অহংকারে নিজের পিঠ যেন নিজেই চাপরাচ্ছে। মুখে বলছে,
—সার, শোনেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এদেশের উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের সঠিক ব্যবস্থা করে নাই। উপরন্ত জানাইয়া দিছে এখানে আগত উদ্বাস্তুগনের আর জায়গা হইব না। যারা আইসে তাগো-ই পুনর্বাসন দিতে পারছোস না, কি কন সার ঠিক কইছি কিনা কন?
স্যারের দিকে সোজা চোখে তাকিয়ে আছে শংকর।
—সার, শোনেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এদেশের উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের সঠিক ব্যবস্থা করে নাই। উপরন্ত জানাইয়া দিছে এখানে আগত উদ্বাস্তুগনের আর জায়গা হইব না। যারা আইসে তাগো-ই পুনর্বাসন দিতে পারছোস না, কি কন সার ঠিক কইছি কিনা কন?
স্যারের দিকে সোজা চোখে তাকিয়ে আছে শংকর।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪০: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বুনো শুয়োর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
পিঠের মধ্যিখান থেকে উঁচু হয়ে উঠেছে মেরুদণ্ডের উর্ধ্ব ভাগ কুঁজ। কাঁধ দু’খানা অনেকখানি ঝুঁকে এসেছে সামনের দিকে। আর শীর্ণ হাত জোড়া ছন্নছাড়া ঝুলছে হাড় সর্বস্ব শরীরের দু’পাশে। স্থবির মানুষটা আদৌ ভার হয়ে দাঁড়াবে কিনা কে জানে! বিরক্তি জমছে অল্প অল্প। স্যারের নীরবতায় শঙ্করের ভুরু কুঁচকোলেও তবু জানান দিতে চায় তাঁর সত্য জগতের হদিশ।
—কত ক্ষুধার্ত মানুষ চাইরপাশে। তারই মইধ্যে সরকার উচ্ছেদ কইরতে চায় আমাগো। সার, আসল কথাখান হইল ডর। পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুর রাজনীতি যদি একবার শুরু হয় সেই আন্দোলনের ঝড় সেই তান্ডব থামাইতে পারব সরকার খেতাবধারী ওই রাসকেল গুলা!
কিতে মাথা ঘুরিয়ে স্যার তাকালেন শঙ্করের দিকে। লজ্জা পেয়ে গেল শংকর। স্যারের সামনে এতখানি দর্প দেখানো ঠিক নয়। কিন্তু স্যারকেও তো বোঝাতে হবে দেশের বর্তমান অবস্থা।
—কত ক্ষুধার্ত মানুষ চাইরপাশে। তারই মইধ্যে সরকার উচ্ছেদ কইরতে চায় আমাগো। সার, আসল কথাখান হইল ডর। পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুর রাজনীতি যদি একবার শুরু হয় সেই আন্দোলনের ঝড় সেই তান্ডব থামাইতে পারব সরকার খেতাবধারী ওই রাসকেল গুলা!
কিতে মাথা ঘুরিয়ে স্যার তাকালেন শঙ্করের দিকে। লজ্জা পেয়ে গেল শংকর। স্যারের সামনে এতখানি দর্প দেখানো ঠিক নয়। কিন্তু স্যারকেও তো বোঝাতে হবে দেশের বর্তমান অবস্থা।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
এবার আরও নরম গলা শংকরের। বলল—
—উদ্বাস্তু রাজনীতি বুঝছেন স্যার! সমস্ত উদ্বাস্তু নয় অবশ্য। জবরদখল কলোনির উদ্বাস্ত। এরা নূতন মোচড় মারতাছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে।
এতক্ষণ পরে কথা বললেন ব্রজেন বাবু। বললেন—তুমি অংশগ্রহণের চান্স পাইছো রাজনীতিতে?
স্যারের এই সামান্য প্রশ্নেই ধক করে উঠেছে হৃদপিণ্ড! এখনই কি বলা ঠিক হবে? সে তো শুধু স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী নয়, সে হইল আমন্ত্রিত নেতা। কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নিজে তাকে আহ্বান জানাইছেন, না থাউক এখনই নয়। বলবে স্যারকে সবই বলবে তবে কিছুদিন পর।—চলবে।
—উদ্বাস্তু রাজনীতি বুঝছেন স্যার! সমস্ত উদ্বাস্তু নয় অবশ্য। জবরদখল কলোনির উদ্বাস্ত। এরা নূতন মোচড় মারতাছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে।
এতক্ষণ পরে কথা বললেন ব্রজেন বাবু। বললেন—তুমি অংশগ্রহণের চান্স পাইছো রাজনীতিতে?
স্যারের এই সামান্য প্রশ্নেই ধক করে উঠেছে হৃদপিণ্ড! এখনই কি বলা ঠিক হবে? সে তো শুধু স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী নয়, সে হইল আমন্ত্রিত নেতা। কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নিজে তাকে আহ্বান জানাইছেন, না থাউক এখনই নয়। বলবে স্যারকে সবই বলবে তবে কিছুদিন পর।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















