শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

একঝলকে

ছবি : অগ্নি সংস্কার
পরিচালনা : অগ্রদূত
উত্তম কুমার অভিনীত চরিত্রের নাম : রজত
ছবির নায়িকা: সুপ্রিয়া চৌধুরী
মুক্তির তারিখ : ১৪.০৪.১৯৬১
প্রেক্ষাগৃহ : উত্তরা, পূরবী ও উজ্জ্বলা

উত্তম-সুপ্রিয়া যুগ চালু হওয়ার মুখে। উত্তম-সুচিত্রা-সূর্য, আর কিছু দিনের মধ্যেই সপ্তপদী হয়ে বিপাশা-য় অস্তমিত হবে। পরবর্তীকালে মেঘের আড়াল থেকে কখনো কখনও মুখ বাড়িয়ে দেখবেন ‘আলো আমার আলো’, ‘গৃহদাহ’ প্রভৃতিতে। সুযোগ পেলে সঙ্গত করবেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। এরকম এক প্রেক্ষিতে বছরে একচেটিয়া তিন-চারটি নিদেনপক্ষে পাঁচটির বেশি ছবি আর তৈরি হবে না। কিছু দিনের মধ্যেই ছবি বিশ্বাস অকাল প্রয়াত হবেন। তুলসী চক্রবর্তীও একা থাকার সাহস পাবেন না। জন্মদাতা পিতা ধরাধাম ছেড়ে চলে যাবেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি হবে। এতগুলো আগে-পিছে ঘটনার প্রেক্ষিত নিয়ে আমাদের আলোচ্য ১৯৬১ সাল এবং ‘অগ্নি সংস্কার’ ছবির সূত্রপাত ঘটবে।

আসলে চিরদিনই কারও সমানও নাহি যায় এ বেদবাক্য মাথায় রেখে উত্তম কুমার নামক ক্ষণজন্মা এক প্রতিভার কেরিয়ার-গ্রাফও মাঝে মাঝে উর্ধ্ব নিম্নমুখী হচ্ছিল। আমরা আগেই আলোচনা করেছি বছরে একটানা বারোটা থেকে ১৪ টা ছবি রিলিজ প্রায় হাতের বাইরে। ভারত চীন যুদ্ধের নগদ প্রাপ্তিতে বাংলা ছবিতেও কিছুটা মন্দা এসেছে। সেই সুবাদে উত্তম কুমারের মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যাতেও ভাটা পড়েছে। তা বলে এই নয় যে উত্তমবাবু ফুরিয়ে গিয়েছেন।
১৯৫৪-৫৫ সাল থেকে টানা বছরে বারোটা করে ছবি আর পেরে ওঠা যাচ্ছে না বা সম্ভব হচ্ছে না। সারা জীবনে আবার সেই ১৯৭৫-৭৬ সাল নাগাদ এক বছরের নটা দশটা ছবি মুক্তি পাওয়ার গল্প ঘটেছে। বাকি গড়পড়তা ছটা করে ছবি বছরে মুক্তি পেতে শুরু করল ক্যারিয়ারের তুঙ্গে উঠে।
বিনয় চট্টোপাধ্যায়ের লেখনীতে এ চলচ্চিত্রের পূর্ণতা। রাঘবপুর কারখানার চিফ ইঞ্জিনিয়ার রজত চৌধুরীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, যিনি সৎ, বুদ্ধিমান এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সচেতন। রজত চৌধুরী তাঁর কাজের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং কারখানার শ্রমিকদের চাহিদা বোঝেন। কিন্তু কোম্পানির স্বার্থের সাথে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয়।

শুরুতে আদর্শবাদী হিসেবে দেখানো হলেও, পরবর্তীতে রজতের ব্যক্তিত্বে এক ধরণের কুরুচিকর বা নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এটি মূলত সম্পর্কের টানাপড়েন এবং ব্যক্তিগত সততার সঙ্গে পেশাগত জীবনের দ্বন্দ্বের একটি কাহিনি, যেখানে সুপ্রিয়া চৌধুরী ও অনিল চট্টোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবিটির মূল্যায়ন প্রসঙ্গে, প্রধান যে দিকটা আলোকপাত করা যায় সেটা হল কাহিনির বুনন। সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত কাহিনীর প্রতিটি পরত ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৫ : সাথীহারা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৭ : ঘুঘুর ফাঁদ

দোলি হ্যায়!

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

এ প্রতিবেদনের শুরুতে যে প্রেক্ষিত আলোচনা করা হয়েছে সে সময়, উত্তম কুমার নামক ক্ষণজন্মা একজন প্রতিভাধর শিল্পীর মানসিক গঠন কি রকম ছিল তার প্রতিটি পদক্ষেপ আমরা ছবিটির বিভিন্ন ফ্রেমে লক্ষ্য করতে পারব। একটা আল্ট্রা মডার্ন নাগরিকত্বের ভূত যেন তাঁর মধ্যে চেপে বসেছিল। সে সময়ে যাঁরা চলচ্চিত্রমোদী, তাঁদের মধ্যে যাতে কোন একঘেয়েমি না আসে সেই গড়পড়তা বড় লোকের মেয়ে গরিবের ছেলে,তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে বেরিয়ে এসে নাগরিক সমাজের মানসিক উত্থান পতন যেটা শহুরে ভদ্রসভ্য মানুষের মধ্যে সংস্কারের পটভূমিতে গড়ে ওঠে সেটাই এ ছবির মূল উপজীব্য ছিল।

অগ্রদূত সংস্থা, প্রকৃতিগতভাবে সেসব কাহিনীকেই মনোনয়ন করতেন যেখানে সময়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়। আমরা যদি অগ্রদূতের ফিল্মি হিস্ট্রি যদি ভালো করে মূল্যায়ন করি সেখানে দেখব সেই ‘স্বপ্ন ও সাধনা’ থেকে শুরু করে ‘বাবলা’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘পথে হল দেরি’ প্রভৃতি ছবির প্রেক্ষিত কিন্তু গতানুগতিক নয়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫০: দণ্ডকারণ্যে শূর্পনখা—একটি নাটকীয় চমক ও দ্বৈতসত্তায় অনন্য রাম

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৫: ত্রিপুরায় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব

মনোজাগতিক নিছক বিনোদন তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। যে কোনও সময়ের সাথে দাঁড়িয়ে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সারস্বত আবেদন তাঁরা রাখতেন। না হলে পরবর্তীকালে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাকে দিয়ে ‘বাদশা’ ছবি করাতে পারতেন না।

আমরা যারা হাতেগোনা কয়েকজন উচ্চকোটি সমর্থিত পরিচালকদের সৃষ্টি নিয়ে বেশি মাতামাতি করি তারা অগ্রদূত, অগ্রগামী যাত্রিক অজয় কর এ ধরনের পরিচালকদের ছবির বৈচিত্র্য নিয়ে মাতামাতি করি না। তাঁদের বাণিজ্যিক ছবির তকমাতেই আমরা ভাবতে অভ্যস্ত থাকি।

অত্যন্ত কম মানের প্রযুক্তিগত সমর্থন নিয়ে অগ্রদূতের কর্ণধাররা সে সময়ে দাঁড়িয়ে যে মানের ছবি নির্মাণ করার সাহস দেখিয়েছেন সেটা কিন্তু ভীষণ ভাবে সারস্বত সমাজের একটা সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলা চলচ্চিত্রের দুর্ভাগ্য, এ ধরনের পরিচালকদের বা পরিচালক গোষ্ঠীর সেরকম কোনও মূল্যায়ন হলো না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি টাও চিরকাল কেমন যেন এক পেশে হয়েই রয়ে গেল। নাহলে যেখানে উত্তম সুচিত্রার ব্লকবাস্টার ছবি পরের পর হিট দিচ্ছে সেখানে প্রায় আনকোরা সুপ্রিয়া চৌধুরীকে দিয়ে একটি শহুরে সুশীল সমাজের চরিত্রের রূপায়ণ করানো বেশ হিম্মতের দরকার হতো। বিশেষত যেখানে সুচিত্রার পোশাক থাকতো সম্পূর্ণভাবে সেই ব্রাহ্মসমাজের অনুকরণে ও শরৎচন্দ্রের সামাজিক আব্রু রক্ষা কারী এলিট ক্লাসের নারী চরিত্র। একমাত্র সুপ্রিয়া চৌধুরী এসেই নিজেকে মেরিলেন মনেরো ও সোফিয়া লোরেনোচিত হলিউডি ঘরানাকে সবার আগে পোশাক দিয়ে সূচনা করতে চেয়েছিলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন।

অগ্রদূতের কর্ণধারদের সুপ্রিয়ার এই অংশটা ভীষণ পছন্দের ছিল তাই পোশাকের ব্যাপারে কোনও রাকঢাক গুড় গুড় না রেখে যেকোনও ভালো দৃশ্যায়নে অত্যন্ত সাহসী চিন্তা ভাবনা করার মত একটা উত্তরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। এই জুটিকে সঙ্গে নিয়ে এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে আর কিছুদিনের মধ্যে ‘উত্তরায়ণ’-এর মতো একটা মনোজ্ঞ ছবি মুক্তি পেতে চলবে। যার পটভূমি ‘অগ্নিসংস্কার’ ছবিতে তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬০: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

এরপরে অবধারিতভাবে আসবে ছবিটির প্লেয়ার কাস্টিং বিষয়ক কথাবার্তায়। অগ্রদূত কখনোই চরিত্রের বিপক্ষে গিয়ে কোন কুশীলবকে মনোনয়ন করেননি। কারণ তাঁদের সবচেয়ে বড় মূলধন ছিল, সিচুয়েশনকে নির্মাণ করার মতো দক্ষ শিল্পীর উপস্থিতি। এই অবস্থানগত স্থিতিকে মাথায় রেখে আমরা ছবিটির আঞ্চলিকতা তথা রূপায়ণের এক একটি স্তরকে আলোচনা করব।
ছবির গান লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার একটু করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই পুরনো জুটি অবধারিতভাবে তাদের বাঁধা কিছু স্টাফ আর্টিস্টকে দিয়েই গানগুলো গাওয়ানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। এবং শ্রোতাদের কানেও তুলেছিল ছবির গানগুলি।

নির্মাণকারী সংস্থাকে ছবির মান উন্নয়নে সবচেয়ে আগে মনে রাখতে হয় দর্শক সমাজের কথা তথা প্রযোজকের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা। দর্শক সমাজে তথা মানুষের মনোজগতে যে ছবি একবার ঠাঁই পায় খুব কম পরিস্থিতিতেই পরবর্তী আরেকটি স্মরণীয় ছবি যদি তারা না দেখে তাহলে সেই মানসিক স্থিতি বদলায় না। আবারও কিছু ছবি থাকে যে ছবিগুলোর পরে হাজারটা ছবি দেখলেও সে ছবির রেশ যায় না যেমন ‘শোলে’ ছবির আবেদন ।

পাঠকরা ভাবতে পারেন অগ্রদূতের ফিল্মি কেরিয়ারে এর চেয়েও ভালো ছবি আছে। ধারণা সত্য ; কারণ কোন একটা ছবি করবো বলে তো কোন গোষ্ঠী অনেকদিন থাকে না। কিন্তু বর্তমান প্রতিবেদকের বলার উদ্দেশ্য, একটা গোষ্ঠী বিবর্তনের হাত ধরে কীভাবে ছবির মনোনয়ন করেন সেই অংশটার মূল্যায়ন খুব জরুরি। সেদিক দিয়ে টোটাল ফিল্ম ইউনিট সে বিভূতি লাহা হোক বা উত্তম কুমার হোক দুজনেই সার্থক শিল্পীসত্তার পরিচয় দিয়েছেন।
কলকাতায় বৃষ্টি
উত্তমবাবুর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছবির কাহিনি অনুযায়ী প্রতিটি চরিত্রের ডাইমেনশন বদলে নেওয়া। উত্তমবাবুর সমস্ত ছবি দেখলে একটা কথাই এককথায় বলা যায় কোনও ছবির সঙ্গে কোনও ছবির চরিত্র রূপায়ণে মিল নেই। অর্থাৎ ওঁর রিপিট বিষয়টা খুব বেশি দেখা যায়নি। কারণ প্রতিটা ছবির আলাদা পরিচালক আলাদা আবেদন আলাদা কাহিনি।

আলাদা কাহিনিতে যদি আলাদা অভিনয়সত্তা মেশানো না যায় তাহলে সেই ছবি কালজয়ী হতে পারে না। উত্তমবাবুর মতো শিল্পী এই মর্মবাণীটা খুব হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে একই বছর মুক্তি পেয়েছিল ‘অগ্নীশ্বর’, ‘বাঘবন্দী খেলা’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’। তিনটি ছবির যদি ডাইমেনশন আমরা আলোচনা করি তাহলে দেখব প্রতিটা চরিত্রের দাবি আলাদা। প্রতিটা চরিত্রের রূপায়ণ আলাদা। প্রতিটা চরিত্রের রূপায়ণকারী পরিচালক আলাদা। তাহলে একই শিল্পী কীভাবে নিজেকে ফিট প্রমাণ করেছেন? তার উত্তরে বলা যায়, প্রত্যেকটা চরিত্রকে নিয়ে বিস্তর গবেষণা বা রিসার্চ ওয়ার্ক না থাকলে ক্যামেরার সামনে এ হেন ডেলিভারি সম্ভব নয়।

যে উত্তম কুমার আগের বছর ‘অমানুষ’ হয়েছেন সেই একই মানুষ কোনও দক্ষতা থাকলে তার পরের বছর ‘অগ্নীশ্বর’-এর ডাক্তারের চরিত্র করতে পারেন সেই ভাবনার সেতুটাই আজকের ছবির সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা যেতে পারে।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content