বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

প্রসঙ্গ হল খাণ্ডববনদহনের সময়ে যে কটি প্রাণী অগ্নির করাল গ্রাস হতে রক্ষা পেয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম মন্দপাল ঋষির ঔরসজাত চারটি শার্ঙ্গকপক্ষিশাবক। খাণ্ডববনদহনের সময়ে, মহর্ষি মন্দপাল নিজের বিপন্ন সন্তানদের রক্ষার্থে, স্তুতিযোগে অগ্নিদেবকে তুষ্ট করলেন। আনন্দিত অগ্নিদেব, মহর্ষির অভীপ্সিত প্রার্থনা পূরণ করলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন, তিনি মহর্ষির পুত্রদের নিষ্কৃতি দেবেন।

প্রজ্জ্বলিত অগ্নির দহনজ্বালায় জ্বলছে খাণ্ডবারণ্য। শার্ঙ্গক অর্থাৎ খঞ্জনশাবক চারটি ব্যথিত হল। তারা কষ্ট ও উদ্বেগ বোধ করল কিন্তু এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণলাভের জন্যে উপায় বা রক্ষক কোনওটাই পেল না। পুত্রদের রক্ষার উপায়ান্তর না দেখে তাদের মাতা, দুঃখদীর্ণা জরিতা, পুত্রদের দুরবস্থাবিষয়ে চিন্তা করে দুঃখে,শোকে বিলাপ করতে লাগলেন। জরিতা কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন, দুঃখবৃদ্ধিকারী, ভয়াবহ অগ্নিদেব, শুষ্ক বন দগ্ধ করতে করতে, পৃথিবী আলোকিত করে,এগিয়ে আসছেন। এই শাবকগুলির অপরিণত বুদ্ধি, এখনও এরা চরণ এবং পুচ্ছহীন,তবে এরাই বংশের পূর্বপুরুষদের পরমাশ্রয়, তাই তিনি এদের প্রতি স্নেহের আকর্ষণ অস্বীকার করতে পারেন না। লেলিহান শিখায়, মহীরুহগুলির ত্রাস সৃষ্টি করে, ক্রমশ এগিয়ে আসছেন অগ্নি। জরিতার পুত্রগুলির যে পাখাই হয়নি, তারা যে গমনে অক্ষম। পুত্রদের সঙ্গে নিয়ে যাবেন যে, উদ্ধারের সেই উপায়ও নেই। আবার তাদের পরিত্যাগ করে যেতেও পারবেন না। এই সব চিন্তা করে উপায়হীনতাবশত জরিতার হৃদয় বিদীর্ণ হল। আদায় চ ন শক্নোমি পুত্রাংস্তরিতুমাত্মনা। ন চ ত্যক্তুমহং শক্তা হৃদয়ং দূয়তীব মে।। কোন পুত্রকে ত্যাগ করবেন? কে যাবে মায়ের সঙ্গে? তাঁর নিজের ইতিকর্তব্যতাই বা কী? এই বিষয়ে পুত্রদের কী অভিমত? জরিতা, অনেক চিন্তা করে, মুক্তির উপায় খুঁজে পেলেন না। স্থির করলেন শাবকদের আবৃত করে তাদের সঙ্গেই মৃত্যু বরণ করবেন। *ছাদয়িষ্যামি বো গাত্রৈঃ করিষ্যে মরণং সহ।
জরিতার চারটি শাবক, তাঁদের নাম যথাক্রমে জরিতারি, সারিসৃক্ক, স্তম্বমিত্র এবং দ্রোণ। জরিতা বললেন, জ্যেষ্ঠ জরিতারির ওপরে বংশের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে, দ্বিতীয় সারিসৃক্কর কাজ বংশবিস্তার। তৃতীয় স্তম্বমিত্র তপশ্চর্যায় আত্মনিয়োগ করবে। আর কনিষ্ঠ দ্রোণ হবেন শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ। এমন নির্দেশ দিয়ে নির্মম পিতা পূর্বেই প্রস্থান করেছেন। এখন কোনও উপায় অবলম্বন করে এই ঘোর দুর্বিপাক থেকে নিস্তার পাবেন? কীভাবে কৃতকার্য হবেন তিনি? এই সব ভেবে চিন্তাকুল হলেন জরিতা। কিন্তু নিজের বুদ্ধিবলে, সেই আশ্রয় থেকে পুত্রদের মুক্তিলাভের কোনও উপায় খুঁজে পেলেন না। মায়ের বিলাপোক্তির প্রত্যুত্তরে শাবকরা বলল, মা, তুমি স্নেহ ত্যাগ করে,যেখানে অগ্নি নেই সেখানেই যাও। স্নেহমুৎসৃজ্য মাতস্ত্বং পত যত্র ন হব্যবাট্। কারণ পুত্ররা মৃত হলে মায়ের আবার পুত্র হবে, কিন্তু জননীর মৃত্যু হলে বংশে সন্তানসম্ভাবনা থাকবে না। এই দুই সম্ভাবনার বিষয়ে গভীরভাবে আলোচনা করে, যাতে বংশরক্ষা হয় তার জন্য এটাই মায়ের যথার্থ সুযোগ। পুত্রদের অনুরোধ, পুত্রদের প্রতি সর্বনাশা স্নেহের প্রকাশ, আর নয়। স্বর্গলাভেচ্ছু পিতার পুত্রসন্তানের পিতৃত্ব লাভের মধ্য দিয়ে স্বর্গলোকপ্রপ্তির এই উদ্যোগ যেন ব্যর্থ না হয়। মা ত্বং সর্ব্ববিনাশায় স্নেহং কার্ষীঃ সুতে পুনঃ। ন হীদং কর্ম্ম মোঘং স্যাল্লোককামস্য নঃ পিতুঃ।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৭: গুল্মিকজাতক—লোভে পাপ পাপে মৃত্যু

জরিতা পুত্রদের অগ্নির থেকে মুক্তির একটি উপায় বললেন, নিকটস্থ গাছটির কাছে মাটিতে যে ইঁদুরের গর্ত আছে, সেখানে দ্রুত প্রবেশ করলে, সেখানে তাদের কোনও ভয় নেই। তার পরে জরিতা নিজে মাটি দিয়ে গর্তের ছিদ্রমুখ আবৃত করবেন। জরিতা মনে করেন,জ্বলন্ত অগ্নিদেবের প্রতীকারের এটিই উপায়। জননী পুত্রদের অভয় দিলেন, অগ্নির প্রকোপ কমে গেলে তিনি মাটি সরিয়ে দিয়ে পুত্রদের অগ্নি হতে মুক্ত করতে আবার আসবেন। আশঙ্কিত খঞ্জনশাবকরা বলল, পাখাহীন আমরা এখন মাংসপিণ্ডমাত্র, মাংসভোজী ইঁদুর নির্ঘাত আমাদের শেষ করে দেবে। এই ভয়ে, আশঙ্কিত শাবকরা এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। প্রবল ক্ষোভ তাঁদের কণ্ঠে, কেন অগ্নি তাদের ধ্বংস করবেন না? কেনই বা ইঁদুর তাদের বিনাশ সাধন করবে না? কেন পিতা (সন্তানোৎপাদনে) ব্যর্থ হবেন? তাঁদের জননীই বা কীভাবে বাঁচবেন? ব্যথিত শাবকরা জানাল,এখানে থাকলে ইঁদুরের কিংবা গগনবিহারী অগ্নির কবলে বিনাশ নিশ্চিত। এই দুই সম্ভাবনার কথা গভীরভাবে চিন্তা করে খঞ্জনশাবকদের সিদ্ধান্ত হল, ইঁদুরের খাদ্যরূপে নয় বরং দগ্ধ হয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। ইঁদুরের ভক্ষণে মৃত্যু যে ঘৃণ্য, বরং শাস্ত্রজ্ঞনির্দিষ্ট অগ্নিদহনে দেহত্যাগই শ্রেয়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৭: আপাতত পরিত্রাণ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

মা জরিতা, পুত্রদের নিশ্চিন্ত করলেন, এই গর্ত থেকে নির্গত ইঁদুরটির ছোট্ট পা-দুখানি ধরে, একটি শ্যেনপাখি তাকে হরণ করেছে।তাই এখানে পক্ষিশাবকদের কোন ভয় নেই। শার্ঙ্গকশাবকরা জানাল, তাঁরা খবর রাখেন, শ্যেনপাখি সেই ইঁদুরটিকে হরণ করেনি। এখানে আরও অন্য ইঁদুর থাকতে পারে,তাদের থেকেও ভয় আছে। অগ্নি এসে পৌঁছবে কি না,সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।দেখা যাচ্ছে,বায়ুও দিক পরিবর্তন করেছে। এই অবস্থায় গর্তে প্রবেশ করলে গর্তবাসীদের হাতে মৃত্যু নিশ্চিত।নিশ্চিত মৃত্যু হতে, সন্দিগ্ধ মৃত্যু বরং শ্রেয়। পুত্রদের অনুরোধ, মা, আপনি ইচ্ছে মতো আকাশে উড়ে যান, ভবিষ্যতে আপনি সুন্দর পুত্র লাভ করবেন। চর খে ত্বং যথান্যায়ং পুত্রানাপ্স্যসি শোভনান্। জরিতা আশ্বস্ত করলেন, পক্ষিশ্রষ্ঠ শ্যেন দ্রুতবেগে গর্ত হতে ইঁদুরকে নিয়ে যাচ্ছে— এই দৃশ্য তিনি নিজে চাক্ষুষ করেছেন। দ্রুতগতিতে ইঁদুরটিকে নিয়ে যখন সে যাচ্ছিল তখন আশীর্বাদ করতে করতে জরিতা তাকে অনুসরণ করেছিলেন। জরিতা শ্যেনকে আশীর্বাদ করেছিলেন, শ্যেনরাজ, তাদের শত্রুকে নিয়ে চলেছেন, তিনি যেন স্বর্ণময়দেহে, শত্রুহীন হয়ে, স্বর্গে অবস্থান করেন। শ্যেনপাখি ইঁদুরটিকে খেয়ে ফেললেন। তারপরে তার অনুমতি নিয়ে জরিতা স্বগৃহে ফিরে এলেন।জরিতা পুত্রদের অভয় দিলেন, হে পুত্রগণ, তোমরা গর্তে প্রবেশ কর। বিশ্বাস কর,তোমাদের কোন ভয় নেই। আমি নিজে ইঁদুর হরণরত মহান শ্যেনপাখিকে দেখেছি। প্রবিশধ্বং বিলং পুত্রাঃ! বিশ্রব্ধা নাস্তি বো ভয়ম্। শ্যেনেন মম পশ্যন্ত্যা হৃত আখুর্মহাত্মনা।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮০: রাজনীতিতে সবাই চায় সবলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে, দুর্বলরা সব সময়ই একা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু

শার্ঙ্গকশাবকদের তবু বিশ্বাস হয় না।শাবকরা সন্দিগ্ধমনে বলল, তারা কখনও শ্যেনপাখিকে ইঁদুর হরণ করতে দেখেনি। না জেনে, এই মাটির গর্তে তারা প্রবেশ করতে পারবে না। জরিতা গভীর বিশ্বাসে বলল, সে জানে, শ্যেন ইঁদুরটিকে হরণ করেছে। পুত্রদের কোন ভয় নেই। তাঁর কথা অনুসারে তারা কাজ করুক। তবু শার্ঙ্গকশাবকরা মাকে বিশ্বাস করতে পারল না। মা মিথ্যা স্তোকবাক্য বলে তাদের ভয় থেকে মুক্ত করতে চাইছেন। এই সন্দিগ্ধ বিষয়ে, এই বুদ্ধি অনুযায়ী কাজ করা উচিত হবে না। তাঁদের মত হল—আমরা আপনার কোন উপকার করিনি,আমাদের আপনি জানেন না। অথচ কষ্ট করে আমাদের প্রতিপালন করেছেন। আপনি কে? আমরা আপনার কে? ন চোপকৃতমস্মাভির্ন চাস্মান্ বেত্থ যে বয়ম্। পীড্যমানা বিভর্য্যস্মান্ কা সতী কে বয়ং তব।।

জননী তরুণী এবং প্রিয়দর্শিনী, স্বামীর খোঁজ নেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর আছে। তিনি বরং স্বামীর খোঁজে যান। অচিরেই আবার তিনি, সুন্দর পুত্র লাভ করবেন। শার্ঙ্গকশিশুরা বরং অগ্নিতে প্রবেশ করে শোভন লোক লাভ করবে। অগ্নি যদি তাদের দগ্ধ না করে, মা আবার তাদের কাছে ফিরে আসবেন। এমন উক্তিপ্রত্যুক্তির পরে, শার্ঙ্গী জরিতা, পুত্রদের খাণ্ডববনে পরিত্যাগ করে, অগ্নির উপদ্রবহীন সুরক্ষিত স্থানে চলে গেল। তার পরে, তীক্ষ্ণ শিখা বিস্তার করে, হব্যবাহন অগ্নি, ত্বরিতগতিতে মন্দপালের পুত্রদের কাছে হাজির হল।সেই প্রজ্বলিত অগ্নিকে দেখে, শার্ঙ্গকশাবকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। তখন জ্যেষ্ঠ জরিতারি অগ্নিকে তার বক্তব্য শোনাতে লাগল।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬১: বাংলা গদ্য-পদ্যের ইতিহাসে ত্রিপুরা

খঞ্জনপক্ষিনী মা জরিতা ও তার পক্ষিশাবকদের বিধ্বংসী অগ্নির গ্রাস হতে পরিত্রাণলাভের আপ্রাণ হৃদয়বিদারক প্রচেষ্টা, একটি জীবন সত্য মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে মায়ের স্নেহের তুল্য জীবনদায়ী আর কিছু হতে পারে না। সহায়সম্বলহীন, আত্মরক্ষায় অপারগ, অপরিণতদেহ পুত্রদের রক্ষার্থে এবং পিতার স্বার্থরক্ষায় মায়ের আপ্রাণ আত্মক্ষয়ী প্রচেষ্টা মাতৃত্বের এক চরম নিদর্শন বলা যেতে পারে।

অন্যনারীর সঙ্গসুখ উপভোগের কারণে, নির্মম পিতা, বংশগতি এবং সেই সঙ্গে বংশমর্যাদারক্ষার গুরুদায়িত্বভার পুত্রদের ওপরে ন্যস্ত করে চলে গেছেন। পুত্রদের প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের যেন কোন দায়িত্ব তাঁর নেই। এই চরম সঙ্কটের মুহূর্তে, বিপন্ন পুত্রদের জন্যে মায়ের মন হাহাকার করে উঠেছে। অগ্নির ত্রাস,তাঁর আগ্রাসী লেলিহান শিখা যেন বিপন্ন সভ্যতাকে গ্রাস করতে উদ্যত প্রাকৃতিক কোন ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ। চারিদিকে বিপন্ন মানবতা, তার মূল জনয়িত্রী পৃথিবীকে বাঁচাতে উদ্যত হয়েছে। শিকড় বাঁচলে তবেই যে মহীরুহ আবার ফুলে ফলে ভরে উঠবে। জীবন নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচবে। অপরদিকে নিজেকে ধ্বংস করেও সন্তানদের বাঁচাতে মায়ের আমরণ সংগ্রাম।

পৃথিবীর স্নেহের ছায়ায় যে নিশ্চিন্ত হয় জীবন। তবু দৈব দুর্বিপাক প্রতিহত করবার শক্তি মানুষের নেই। অনেকক্ষেত্রেই মানবসভ্যতার স্রষ্টারা শত শত প্রযুক্তিকৌশল প্রয়োগ করেও সেই অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিকশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত বা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হন। তবু সভ্যতার জয়যাত্রাকে অব্যাহত রাখতে তাঁদের দুর্দম প্রচেষ্টার অন্ত নেই। প্রতিকূলতার কথা ভুলে গিয়ে সৃজনানন্দে বিভোর সভ্য মানুষ, নব নব সৃষ্টিশীলতায় মেতে ওঠেন।মন্দপাল ঋষি সন্তানদের পৃথিবীতে এনেছেন, দায়িত্ব পালন করেননি। মা জরিতা, সন্তানদের, পৃথিবীমায়ের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছেন। তাঁর নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হোক, কিন্তু সন্তানরা বেঁচে থাক,বংশের অগ্রগতির ধারাটি অক্ষুণ্ণ থাক।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

যখন দুটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে কোনটির গুরুত্ব বেশি? মানুষ এই বিষয়ে দোলাচলচিত্ততা অনুভব করে, বস্তুত ধর্মসঙ্গট হয় তখনই। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে কর্তব্য নির্ধারণ করা দুষ্কর। উপরে অগ্নির লেলিহান শিখা, গর্তের আশ্রয়ে ওৎ পেতে বসে আছে ঘাতক, এই অবস্থায় সংশয়াতুর যে কেউ পরামর্শদাতার প্রস্তাব সম্বন্ধেও ঘোর সন্দিহান হয়ে ওঠেন। তখন বিশ্বস্ত নিকটজনের পরামর্শেরও গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আত্মিক সম্পর্কের জননীও অবিশ্বাসের পাত্রী হয়ে ওঠেন।পরোক্ষে প্রশ্ন ওঠে, কোনও স্বার্থবুদ্ধি কাজ করছে না তো? নিঃস্বার্থ কোন কাজ হয় না। সমাজ, সংসার, আত্মীয়তার বন্ধন,রক্তের সম্পর্কের মিলমিশ যেন সব মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়। স্নেহাতুরা মায়ের বিশ্বস্ততা, সন্তানপালনের দায়বদ্ধতা নিয়ে যখন সন্তান প্রশ্ন তোলে, তখন মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের মধ্যে স্বার্থবুদ্ধির আঁশটে গন্ধ ক্লেদাক্ত করে তোলে সম্পর্কের বুনিয়াদ। এ সব কিছুই এক চরম অবস্থায় বিপন্ন, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানবাত্মার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে আত্মিক অবক্ষয়ের প্রকাশ। বাস্তব যাপনচিত্রে হয়তো এমনটা স্বাভাবিক নয়। শার্ঙ্গকপাখির ছানাদের মুখে মানুষের চিন্তা ও সংলাপ যেন মহাভারতীয় এক নতুন দিগদর্শন। প্রশ্ন ভাবিয়ে তোলে,নিশ্চিত মৃত্যু শ্রেয় না যেখানে মৃত্যুবিষয়ে সংশয় রয়েছে অর্থাৎ মৃত্যু হবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে,সেই বিষয়ে আস্থা রাখা ভালো? নিঃসংশয়াৎ সংশয়িতো মৃত্যুর্মাতর্বিশিষ্যতে। কোন মৃত্যু ভালো? পশুর গ্রাসরূপে মৃত্যুবরণ? না অগ্নি দহনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে মৃত্যু? গর্হিতং মরণং নঃ স্যাদাখুনা ভক্ষিতে কিল।শিষ্টাদিষ্টঃ পরিত্যাগঃ শরীরস্য হুতাশনাৎ।।

শেষ পর্যন্ত যে অগ্নির আশ্রয় নিতে হয় তাই অগ্নিদহনে মৃত্যুই শ্রেয়। হায় রে মন, মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েও মৃত্যুবরণের ঠিকবেঠিকের মূল্যায়নের হিসাবনিকাশ। এ সব কিছুই আসন্নমৃত্যুর সম্মুখীন শার্ঙ্গশাবকদের অনুভূতির প্রকাশমাত্র, কিন্তু বক্তব্যের আবেদনে লুকিয়ে আছে সার্বিক জীবনদর্শন। কে অকালে, হঠাৎ প্রস্তুতিহীন কোনও দুর্যোগে এই সুন্দর মায়াময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায়? মহাভারত ভাবনা জাগিয়ে তোলে, জীবনের নশ্বরতা তুলে ধরে, চিন্তায় ঝড় তোলে, মনে আনে ঔদাসীন্য, এই সব মহাকাব্যিক বিস্তারের বিচিত্রতা নয় কী? —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content