শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

মা সারদা।

১৩৩৯ সালের দোলপূর্ণিমায় আবির খেলার সময় কোনও ছেলের অসাবধানতার জন্য সুরমাদেবীর কানের ঠিক পিছনে রঙের ঘটির আঘাত লাগে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাঁর কান দিয়ে দু’একদিন জল পড়ার পর পুঁজরক্ত পড়তে আরম্ভ করল। আর এর ঘা মস্তিষ্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় রাতের মধ্যেই একটা কিছু হয়ে যাবে, ডাক্তার এরূপ নিশ্চিত অভিমত দিয়ে চলে গেলেন। সেই রাতে সুরমাদেবী ক্রমাগত ভুল বকতে লাগলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন যে, তাঁর ঘাড়ের উপর কে বসল? ‘আমি কি এত ভার সইতে পারি? আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্চে, শিগ্গির আলো জ্বাল, দেখি’। তারপরই প্রকৃতিস্থ হয়ে বললেন, ‘মা এসেছিলেন, তাঁর পরণে লাল নরুনপেড়ে কাপড়’। এই বলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরদিন ডাক্তার এসে অবাক হয়ে দেখলেন যে, রোগ সেরে গিয়েছে। কানের ভিতর আঁচড়ের দাগের মতো দেখা যাচ্ছে। এছাড়া আর কিছুই নেই। তিন-চার দিন পর সেই দাগও আর দেখতে পাওয়া গেল না। প্রমীলা বসু লিখেছেন যে, তাঁর ভাই প্রবোধ সিংহের বয়স তখন কুড়ি, একুশ হবে। তখনকার বোম্বাইয়ের ধারোয়ার নামক স্থানে সে থাকত। সেখানে রোজ বিকেলে নদীর তীরে বসে গীতাপাঠ করত। একদিন হঠাৎ একটা গরু নদীর ওপার থেকে এসে তার কাছে শুয়ে পড়ে। তবে প্রবোধ নিজের ভাবেই গীতাপাঠ করছিল। আর গরুটা থেকে থেকে তার মুখটা তার কোলের ওপর তুলে দিচ্ছিল। প্রবোধ তার কোল থেকে গরুটার মুখ বারবার নামিয়ে দিলেও গরুটা মুখ না সরালে সে একটু বেশি জোরে গরুর মুখটা সরিয়ে দিলে সে কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়। হিন্দুর ছেলে হয়ে গোহত্যা করলাম ভেবে সে কাঁদতে লাগল।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে এসেও কারও সঙ্গে সে দেখা করল না। একটি নির্জন ঘরে ঢুকে ঠাকুর ও শ্রীমাকে স্মরণ করতে লাগল আর গোহত্যাজনিত পাপ থেকে মুক্ত করার জন্য ব্যাকুলভাবে প্রার্থনা করতে লাগল। ভোররাতে শ্রীমা তাকে দেখা দিয়ে বললেন, ‘বাবা, তুমি গোহত্যা করনি, গরুটার তিনদিন থেকে অসুখ ছিল, তোমার মুখে গীতা শুনে সে গোজন্ম থেকে মুক্ত হল। বলা হয়ে থাকে যে, চুরাশিলক্ষ প্রজাতি জন্মের শুভকর্মের ফলে গোজন্ম লাভ করে, যে জন্মে ধরিত্রীমা ও মায়ের মতো গরু নিজ রক্তকে দুধে পরিণত করে প্রকৃতির মতো নির্বিচারে সকলের সেবা করে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৭: মহাভারতের বিচিত্র সব গল্পকথায় রয়েছে মানবজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ ও দ্বন্দ্বময়

তাই শাস্ত্রবাণী হল যে, গোজম্মের পুরো জীবন এই নিঃশেষে দান করার পুণ্য কর্মের ফলেই পরবর্তী জীবনে দুর্লভ মনুষ্যজন্ম লাভ করে। মানুষ জন্ম লাভ অতি কঠিন ও দুর্লভ আর একমাত্র মানুষজন্মেই সে নিজের উত্তোরণ ঘটিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর জ্ঞান না থাকায় তারা তা পারে না। পরদিন প্রবোধ যখন নদীর তীরে গীতাপাঠ করতে বসেছে, একটি রাখাল ওপার থেকে এসে বলল, ‘আমাদের একটা গরু কাল বিকেলে মারা গেছে, সে তিনদিন কিছুই খায়নি। মরে যাবে বলে মালিক তার গলার দড়ি খুলে রেখেছিল। ধারোয়ারে যখন এই ঘটনা ঘটে শ্রীমা তখন জয়রামবাটিতে ছিলেন।
আরও পড়ুন:

বিধানে বেদ-আয়ুর্বেদ, ফেসিয়াল প্যারালাইসিস বা বেলস পলসি রোগের প্রতিকারে আয়ুর্বেদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল

প্রমীলাদেবী জানান যে, পরে তিনি কলকাতায় এলে তাঁকে সকল কথা জানিয়ে বলেন, ‘মা, ভক্ত কাতর হয়ে ডাকলে আপনি কোথায় না যান! শ্রীমা হাসতে লাগলেন। শ্রীমা বলেছিলেন, ‘ঠাকুর শতবছর সূক্ষ্মশরীরে ভক্তের হৃদয়ে বাস করবেন, বলেচেন আর তার অনেক শ্বেতাঙ্গ ভক্ত আসবে। কেশবানন্দ মহারাজ, ‘শ্রীশ্রীমার অস্ফুট স্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন যে, শ্রীমার মুখে ঠাকুরের কথা শুনতে শুনতে তিনি বলেন, ‘মা, ঠাকুর শরীর ধারণ করে জগতে এলেন, কিন্তু এমনি দুর্ভাগ্য যে তাঁকে প্রত্যক্ষ দেখতে পেলুম না’।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত

তখন শ্রীমা নিজের শরীর দেখিয়ে বললেন, ‘এর ভিতর তিনি সূক্ষ্মদেহে আছেন। তিনি নিজের মুখেই বলেছিলেন, আমি তোমার ভিতর সূক্ষ্মদেহে থাকব’। ‘বেলুড়মঠের নিয়মাবলী’ পুস্তিকায় স্বামীজী লিখেছেন, ‘শ্রীভগবান এখনও রামকৃষ্ণ শরীর ত্যাগ করেননি। কেউ কেউ তাঁকে এখনও সেই শরীরে দেখে থাকেন ও উপদেশ পেয়ে থাকেন। সকলেই ইচ্ছা করলে দেখতে পেতে পারেন। যতদিন তিনি আবার স্থূলশরীরে না আগমন করছেন ততদিন তাঁর এই শরীর থাকবে’। শ্রীমাও ঠাকুর হতে অভিন্না। ঠাকুরের থেকে মা সারদার আলাদা অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। শ্রীমাও আজ সূক্ষ্মদেহে ভক্তের হৃদয়পুরে বাস করেন। জীবনের বিশেষ সংকট মুহূর্তে ও মনের অতিব্যাকুলতায় ভক্তসন্তানেরা তাঁর দর্শন লাভ করে যেভাবে কৃতার্থ হয়েছেন, ওপরের ঘটনাগুলিই তার নিদর্শন।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content