মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

পরশ পাথর ছবির একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত।

দ্য ফিলোজফার’স স্টোন… পরশপাথর, ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে যা। মূল কাহিনি পরশুরাম রাজশেখর বসুর। এর চলচ্চিত্রায়িত কিছু অংশ দেখা যাক।

অফিস ফেরত করণিক পরেশনাথ দত্ত আচমকাই কুড়িয়ে পেয়েছেন পরশপাথর। এটা ম্যাজিক স্টোন হতেই পারতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক রিলিজে পরিচালক নাম দিয়েছেন দ্য ফিলোজফার’স স্টোন, এই পাথর মানুষের ভাবজগতে বিপ্লব আনবে, দর্শন ছাড়া কোন আন্দোলন দানা বাঁধে? আবার পৃথিবীর আজকের দর্শন আগামিকালের একটা দারুণ অভিঘাতে কিংবা সময়ের স্রোতে ভেসে বদলাবে, অনুমান অসঙ্গত নয়। তাই পরেশবাবু পরশপাথর পেয়ে দমে গেলেন, ভয় পেলেন, কাঁদলেন, তারপর লোহাকে সোনা করে বেচে দিলেন। টাকার বাণ্ডিল নিয়ে অল্পবিত্তের স্বপ্নের গাড়ি ট্যাক্সিতে চড়ে বসলেন। ট্যাক্সি এখানে একটা বিলাসবহুল সূচনা, পিছনে ফুরফুরে পর্দা। কোথায় যাবেন? জানালেন, দিনটা ভালো, হাওয়া খেতে চান।
কোথায় গেলেন শেষ পর্যন্ত? শেষদৃশ্যে ঘোড়াটানা সুলভ গাড়িতে চড়ে বসেছেন। দেশনেতা থেকে একেবারে জালি কেসে ফেঁসে গিয়েছেন, অর্জিত অথবা পয়সায় কেনা প্রেস্টিজ গঙ্গায় ভেসেছে। সোনার চোরাকারবারি তকমা পেয়ে গারদের ওপারে যেতে যেতে বেঁচেছেন। কারণ, পরশপাথর উবে গেছে। সব সোনা আবার লোহা হয়ে গেছে। একটা দুঃস্বপ্ন বা দুষ্টগ্রহের পাকেচক্রে সত্যি হয়ে ওঠা মিথ্যের দল সরে গিয়ে সারসত্যটুকুকে জানিয়ে যাচ্ছে, সূর্য এসে যেমন জাগিয়ে তোলে। ছ্যাকরাগাড়ি ছুটে চলে যায়, হয়তো একটা নতুন স্বপ্ন কিংবা, দুঃস্বপ্ন মুছে যায়। হয়তো নতুন স্বপ্ন জাল বোনে। প্রেস্টিজ যায়, সম্মান থাকে। গড়ের মাঠের দিকে চলে যান তাঁরা।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা

ট্যাক্সিতে হাত ঢুকিয়ে একটা হাত কাতর কণ্ঠে ভিক্ষা চায়। তাকে পাশ কাটিয়ে ট্যাক্সি ছেড়ে দেয়। ময়দানের আশেপাশে এসে বুক ঢিপঢিপ করে। এখানেই কোথাও মিলেছিল ওই আশ্চর্য রতন। রাজভবন পেরোতে পেরোতে স্বপ্নে ডুবে যান। দেশনেতা হয়ে গার্ড অফ অনার নিচ্ছেন। ফুল আঁকা ট্যাক্সির সিটে গা এলিয়ে ফুলেল স্বপ্ন দেখে আত্মপ্রসাদ জাগে। ময়দানে বিদেশি শাসকের মূর্তি দেখে মনে মনে নিজের মর্মর মূর্তি দেখতে পান, পরেশচন্দ্র দত্তের স্মৃতিতে স্থাপিত মূর্তির পাদদেশে সমবেত হয়ে কারা যেন মধুর ন্যাকা ন্যাকা গদগদ কণ্ঠে প্রশস্তি বলে যায়। চোগা চাপকান মাল্যে শোভিত মূর্তির শীর্ষে সানন্দে মাথা দোলাতে থাকেন পরেশ। বেশ। পুরো যাত্রাপথের সময়টায় নেপথ্যে বাজতে থাকে একটা রিনরিনে অস্বস্তিকর বুক ধুকপুক করা সুর। সুখ এসেও যেন স্বস্তি আসে না। যা হয় না, হতে পারে না, তাকে প্রতিষ্ঠিত করার দুনম্বরির পথে যাত্রা শুরু করলেন পরেশ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?

এরপর গাড়ি থামালেন লোহাপট্টির কাছেই বোধহয়, দূরে হাওড়া ব্রিজ দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ আধিপত্যের মহিমা আর অহং নিয়ে দাঁড়িয়ে। চোখে পড়ে লোহার বল, মনে ভয়। অবাঙালি বিক্রেতা জানান, বল নয়, মিউটিনির গোলা। দুটি গোলা পেয়ে যান বিনা ব্যয়ে।

পরেশের পরশপাথরের জোরে এই ‘উন্নতি’র সঙ্গে কেমন করে যেন রাজনীতি মিশে যাচ্ছে না? এ কি শুধুই অলীক অলৌকিক এক পাথরের ছোঁয়ায় মহার্ঘ্য হয়ে ওঠার কল্পকথা? কল্পকথার আবডালে এক চরম সত্য, যে সোনার সংসারের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে আছে তামাম দুনিয়া তা “ঝুট হ্যায়”। পরশপাথর মিথ্যে, তার মায়ায় জমে ওঠা সোনার সম্ভাবনা মিথ্যে। রবীন্দ্রকবিতায় ক্ষ্যাপা পরশপাথরটি পেয়েও হারিয়েছে, তার স্পর্শে কোমরের লোহার শিকল সোনার হয়ে গেছে কখন তা সে জানতেও পারেনি, অভ্যাসবশে অজস্র নুড়ির মাঝেই তাকে নুড়ি ভেবে ফেলে দিয়েছে। তারপর আবার খুঁজতে শুরু করেছে তা। সত্যজিতের চলচ্চিত্রে সেই মোহবন্ধন থেকে মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে। অদ্বৈতবাদী যে মায়ার কথা বলবেন, যার প্রভাবে জগত্টা আছে, আবার নেই, নেই, আবার আছেও, সেই মায়ার মতোই তাল তাল সোনার অস্তিত্ব অনস্তিত্বের আপেক্ষিকতায় মোড়া রাজনৈতিক আখ্যান পরশপাথর।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল

পরেশ নিজেকে দেশনেতা হিসেবে দেখতে চান, রাজভবন, ব্রিটিশ শাসকের মূর্তি কিংবা মিউটিনির লোহার গোলা আর সর্বোপরি অনৈতিকতার ইঙ্গিত, পরবর্তীতে সোনার অবমূল্যায়নে অর্থনীতির ভাঙনের আশঙ্কা—এই সবকিছু নিয়ে দেশ কাল রাষ্ট্রের অন্তরে লালিত সুদিনের স্বপ্নকে শুধু বিদ্রুপ করে ক্ষ্যাপার সাগরতীরে পরশপাথর খুঁজে ফেরার রূপকল্পটিকে জাগিয়ে তুলতে চায়, কোন অলৌকিক ক্ষণে পরশপাথরের আশ্লেষে লোহা হয়ে ওঠে সোনা, ক্ষ্যাপা তা জানতেও পারে না, অতশত না দেখে অভ্যাসের বশে নুড়ি ভেবে ছুড়ে ফেলে দেওয়া পরশপাথরকে খুঁজে পেতেই তার সকল জীবনীশক্তি ব্যয় হতে থাকে। সে কি কখনও ভাবে “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না?”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত

মনে পড়তে পারে গুপ্তধন গল্পের মৃত্যুঞ্জয়কে, সে আর্তনাদ করে বলেছিল, ওগো সন্ন্যাসী আমি এই সোনা চাই না। এই সুড়ঙ্গ থেকে, অন্ধকার থেকে, গোলকধাঁধা থেকে, সোনার গারদ থেকে বার হতে চাই, আলোক চাই, আকাশ চাই, মুক্তি চাই।

পরেশবাবু শেষে পরশপাথর থেকে মুক্তি পেলেন। কিন্তু সত্যজিতের চলচ্চিত্র-দর্শনে ন্যায় ও অনৈতিকতার প্রশ্নটি জেগে থেকেছে শেষ পর্যন্ত। পরশপাথরে যে সোনাকে কেন্দ্র করে এতকিছু, সোনার কেল্লাতেও কি সেই সোনার হাতছানি নেই? চার প্রজন্মের মূল্যবোধের কাহিনী যে “শাখাপ্রশাখা”, সেখানে প্রায় শেষদিকের দৃশ্যে সে কি কি জানে জানাতে গিয়ে শিশু নাতিটি ন্যায়নিষ্ঠ অসুস্থ হৃদাঘাতে শয্যালীন পিতামহকে জানায়, তার বাবা জ্যেঠুর দুনম্বরি আছে, তোমার কি আছে দাদু তিন নম্বরি, চারনম্বরি?
কলকাতায় বৃষ্টি

সত্যজিৎ রায়।

১৯৫৮ থেকে ১৯৯০ সালের যাত্রাপথ। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া পরশপাথরে যে জীবন, দেশ দুনিয়ার কথা, মোহমুক্ত হয়ে জীবনকে জয় করার কথা বলা হচ্ছে ১৯৯০ সালের ছবিতে আসন্ন মুক্ত অর্থনীতির দেশের স্বপ্নে আকাঙ্ক্ষায় আর একটা সহস্রাব্দের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে এতদিনের বয়ে চলা, লালিত পালিত বোধ-বুদ্ধি, আদর্শ ও বিশ্বাসের পরিসরে সেই জীবনের জয়গান কি শোনা যাচ্ছে?—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content