রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) বাদামি মাথা গাঙচিল প্রজনন ঋতুতে। (ডান দিকে) বকখালিতে বাদামি মাথা গাঙচিল। ছবি: সংগৃহীত।

“লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস!
ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস
নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে-ফিরে
বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে!”
(জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থের ‘বেদিয়া’ কবিতাংশ)


কাকদ্বীপের হারউড পয়েন্ট জেটিঘাট থেকে ভেসেল এ চেপে কচুবেড়িয়া জেটিঘাটে যাওয়ার সময় কিংবা কচুবেড়িয়া জেটিঘাট থেকে হারউড পয়েন্ট জেটিঘাটে আসার সময় মুড়িগঙ্গা নদীর উপর সাদা রঙের ঝাঁক ঝাঁক পাখিকে উড়তে বা নদীর জলে ভাসতে দেখেনি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। যাঁরা নিত্যযাত্রী তাঁদের খুব পরিচিত সঙ্গী হল এই পাখিরা। কবি জীবনানন্দ ‘তটিনীর কূলে’ ‘বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী’-র কথাই বলেছেন। ভেসেলের সঙ্গে সঙ্গে ওরাও ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলে। জাহাজ, লঞ্চ, ভেসেল ইত্যাদির পিছু নেওয়া এদের স্বভাব। সাধারণত সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাস থেকে মার্চ এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।
আবার বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জে গেলে সেখানেও যথেষ্ট পরিমাণে এই পাখিগুলিকে সমুদ্র তীরে দেখা যায়। ফ্রেজারগঞ্জ হারবার এবং কাকদ্বীপ হারবারে যখন মাছ নিয়ে ট্রলার হাজির হয় তখন তাদের আনাগোনা সেখানে বেড়ে যায়। ট্রলার থেকে পচা বা বাতিল মাছগুলি নদীতে ফেলে দিলে ওরা উড়তে উড়তে ছোঁ মেরে জল থেকে সেই মাছ তুলে নিয়ে চলে যায়। শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্যই অনেক পর্যটক দীর্ঘ সময় হারবারগুলিতে সময় অতিবাহিত করেন। পর্যটকরা এই নয়নাভিরাম দৃশ্য নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ক্যামেরাবন্দি করেন। সাদা বা হালকা ধূসর রঙের প্রায় দাঁড়কাকের মতো সাইজের অসাধারণ সুন্দর এই পাখিগুলি হল মূলতঃ সুন্দরবনের পরিযায়ী পাখি। সাধারণ মানুষ এদের বলে গাঙচিল। ইংরেজিতে বলা হয় ‘Brown Headed Gull’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Chroicocephalus brunnicephalus’।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৪: ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ সাহিত্য সংস্কৃতির অকৃপণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন

শীতকালে সুন্দরবন অঞ্চলে সমুদ্রের তীরে বা মোহনার কাছে যখন এদের দেখা যায় তখন এদের মাথার রং থাকে ধূসরাভ সাদা আর কানের পিছনে দু’দিকে হালকা কালো রঙের দাগ থাকে। আমাদের এখানে যখন গরম তখন এরা শীতপ্রধান এলাকায় ফিরে যায়। ভারতের উত্তর প্রান্তে লাদাখ, তাজিকিস্তান থেকে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার উচ্চ মালভূমি অঞ্চল হল বাদামি মাথা গাল বা গাঙচিলদের প্রজননভূমি। এই অঞ্চলে অবস্থিত অন্তর্দেশীয় হ্রদগুলিতে ভাসমান ঝোপ বা আশপাশের ঝোপে কিংবা হ্রদের মধ্যে অবস্থিত দ্বীপে বাসা তৈরি করে ওরা ডিম পাড়ে। মে-জুন মাস হল ওদের প্রজননের সময়। বালির মধ্যে সামান্য গর্ত করে বা শুকনো শ্যাওলা দিয়ে ওরা বাসা বানায়।

এদের ডিমের রং বালির মতো বাদামি আর তার ওপরে থাকে কালচে ছিট। ফলে বালির রঙের সাথে সহজে ডিমের রঙ মিশে যায়। স্ত্রী গাঙচিল এক থেকে তিনটি ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ গাঙচিল সেই ডিমে ১৭ থেকে ২২ দিন ধরে পর্যায়ক্রমে তা দেয়। তারপরই বেরিয়ে আসে গাঙচিলের ছানারা। বাবা ও মা উভয়ে মিলে ছানাদের লালন পালন করে। গাঙচিল প্রজননক্ষম হতে প্রায় দু’বছর সময় নেয়। এক বছর বয়সী গাঙচিলের লেজের প্রান্তে ও ডানার পালকে কালো দাগ থাকে। গাঙচিলরা গড়ে ১১ বছর বাঁচে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

গাঙচিলদের প্রিয় খাদ্য হল মাছ, চিংড়ি ও মাছের পরিত্যক্ত অংশ। অবশ্য এগুলো হল ওদের শীতকালের খাবার। প্রজনন ঋতুতে ওরা এসব খাবার ছাড়াও পোকামাকড়, শুয়োপোকা, ইঁদুর, শামুক, ঝিনুক, কেঁচো ইত্যাদি খায়। সমুদ্রের বেলাভূমি ও নদীর মোহনা ছাড়াও এদের কৃষিজমিতেও দেখা যায় জানা গেছে। চাষের সময় মাঠে উঠে আসা নানা পোকামাকড় বা কৃষিজমিতে জমা জলে মাছ, চিংড়ি ইত্যাদিও খায়। অবশ্য কৃষিজমিতে গাঙচিলদের আমি কখনও দেখিনি।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২০: রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের একমাত্র তাঁকেই প্রণাম করতেন

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

সুন্দরবনের বাদামি মাথা গাঙচিলদের স্ত্রী ও পুরুষ একই রকম দেখতে। গ্রীষ্মকালে পরিণত গাঙচিলদের মাথা ও পিঠের পালকের রং হয় হালকা বাদামি। এই সময় এদের চঞ্চু এবং পায়ের রং হয়ে ওঠে লাল। ডানার পালকের প্রান্তে চওড়া কালো ব্যান্ড দেখা যায় আর ডানার নিচের রং হয় ধূসর। ডানার ওড়ার পালকগুলো কালচে হয়ে যায়। শীতকালে অবশ্য রঙ পাল্টে প্রায় পুরোপুরি সাদাই হয়ে যায় গাঙচিলেরা, কেবল একটা গাঢ় উলম্ব দাগ থেকে যায়। এই সময় ওদের চঞ্চুর বেশিরভাগ অংশের রং থাকে হলুদ, আর চঞ্চুর আগার রং হয় কালচে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৩: পরেশের পরশপাথর

শীত ও গ্রীষ্মে রূপসজ্জার সামান্য রকমফের হলেও সৌন্দর্যে কোনও কমতি হয় না গাঙ-সুন্দরীদের। এদের পায়ের পাতা হয় হাঁসের মতো অর্থাৎ আঙুলগুলো পাতলা চামড়া দিয়ে জোড়া। তাই সাঁতার কাটতেও এরা দারুন পটু। আর ডানা দুটি বেশ লম্বা ও শক্তপোক্ত হওয়ায় অনেক সময় ধরে উড়তে পারে। যখন বাতাসের গতি বেশি থাকে তখন বেশ কিছুক্ষণ ডানা সঞ্চালন না করেই উড়তে পারে। ওড়ার সময় এরা যখন সমবেতভাবে অনেকটা কাকের মতো স্বরে “ক্রাঁআআআ ক্রাঁআআআ ক্রাঁআআআ” করে ডাকতে থাকে তখন কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড় হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) গাঙচিলের ডিম। (ডান দিকে) বাদামি মাথা গাঙচিল অপ্রজনন ঋতুতে। ছবি: সংগৃহীত।

বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ হারবার বা কাকদ্বীপের হারউড পয়েন্ট ও সাগরদ্বীপের কচুবেড়িয়া জেটিঘাট সংলগ্ন মুড়িগঙ্গা নদীতে গাঙচিলদের আনাগোনা কমেছে বলে আদৌ মনে হয় না। আগেও যেমন দেখেছি এখনও তেমনই দেখি। ‘IUCN’-ও জানাচ্ছে যে এদের নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তাই যেন থাকে। ওদের সমবেত কলতানে যেন সদা মুখরিত থাকে সুন্দরবনের বেলাভূমি ও মোহনা। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content