রবিবার ১৪ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

মাছ মুখে নিয়ে উড়ন্ত পাতি গাঙচিল। ছবি: সংগৃহীত।

ফ্রেজারগঞ্জ হারবারে গিয়ে বেশ কয়েকবার নজরে পড়েছিল ঠিক গাঙচিলের মতো কিছু পাখি, দলবদ্ধ হয়ে উড়ছে। গাঙচিলের মতো বললাম কারণ আপাতদৃষ্টিতে গাঙচিল বলে মনে হলেও ওদের সাথে গাঙচিলের বহিরাকৃতিগত পার্থক্য রয়েছে। একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই সেই পার্থক্য নজরে আসে। এমনিতেই মৎস্যবন্দরে যেহেতু অনেক ট্রলার প্রায়শই মাছ নিয়ে এসে নোঙর করে আর পচা বা বাতিল মাছগুলো ট্রলারের মৎস্যজীবীরা জলেই ছুঁড়ে দেয় তাই সেগুলোকে জল থেকে ছোঁ মেরে তুলে নেওয়ার জন্য প্রচুর গাঙচিল হাজির হয়। তাই গাঙচিল এবং ওই পাখিগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে আলাদা বলে বোঝা মুশকিল। পার্থক্যটা কী এবার বলি।
গাঙচিল বা ব্রাউন হেডেড গাল (Brown Headed Gull)-দের মাথার রং হয় ধূসরাভ সাদা আর কানের পেছনদিকে হালকা রঙের কালো দাগ থাকে। কিন্তু এই পাখিগুলোকে দেখলে মনে হবে সাদা মাথায় একটা চকচকে কালো টুপি পরে রয়েছে। এই কারণেই বাংলায় এই পাখিদের নাম দেয়া হয়েছে কালো টুপি পানপায়রা। অবশ্য পায়রা আর পানের সাথে কী সাদৃশ্য রয়েছে তা আমার অজানা। তবে ‘কালো টুপি’ নাম কিন্তু সার্থক। এদের আর এক নাম পাতি গাঙচিল। সুন্দরবন অঞ্চলে মোহনা, খাঁড়ি ও উপকূলে এই পাখিগুলো খুবই সাধারণভাবে দেখা যায় বলে হয়তো ‘পাতি’ কথাটা সংযোজিত হয়েছে। কারণ বাংলায় সাধারণ বোঝাতে ‘পাতি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। ইংরেজিতে এই পাখির নাম হল কমন টার্ন (Common tern), বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Sterna hirundo’।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৪: তালবাতাসি

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৯: পথিমধ্যে অতর্কিতে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?

মাঝারি সাইজের পাতি গাঙচিলগুলো লম্বায় হয় মোটামুটি ৩১ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার। এদের দুই ডানা কিন্তু বেশ বড়। যখন দু’দিকে ডানা ছড়িয়ে ওড়ে তখন সব মিলিয়ে ৭৭ থেকে ৯৮ সেন্টিমিটার প্রসারিত হয়। তবে ওজন খুব বেশি নয়, মাত্র ১১০ থেকে ১৪০ গ্রাম। এই যে বললাম এদের মাথার ওপরে টুপির মতো কালো পালক থাকে তা কিন্তু সারা বছর দেখা যায় না। এদের প্রজনন ঋতুতেই এই ধরনের কালো টুপি তৈরি হয়। আর যখন অপ্রজনন ঋতু তখন এই কালো দাগ হালকা হয়ে গিয়ে কালো ছিট ছিট হয়ে যায়। যাইহোক এদের পেটের দিকের রঙ ধবধবে সাদা হলেও পিঠের দিকের রং হালকা ধূসর।
কলকাতায় বৃষ্টি

পাতি গাঙচিলের ছানা। ছবি: সংগৃহীত।

পাতি গাঙচিলদের চঞ্চু খুবই সূচালো এবং সোজা। রঙ লালচে বা কমলা। আর চঞ্চুর আগার দিকের রং কালো। প্রজনন ঋতুতে চঞ্চুর লাল বা কমলা রঙ অনেক গাঢ় হয়ে যায়। পাতি গাঙচিলদের পাগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট আর লালচে-কমলা রঙের হয়। আগেই বলেছি ডানা বেশ লম্বা, আর আগার দিকটা ক্রমশ সরু। ফলে এরা চমৎকার উড়তে পারে। এদের ওড়ার ভঙ্গিটা আমি ভালো করে অনেকবার লক্ষ্য করেছি। দেখেছি ওড়ার সময় দুটো ডানা যেন অনেকটা ‘V’ আকৃতির মতো হয়ে থাকে। এই সময় এদের মাথা আর চঞ্চুর অবস্থান থাকে নিচের দিকে অর্থাৎ জলের দিকে। কারণটা স্পষ্ট, উড়তে উড়তে জলে কোথায় মাছ রয়েছে তা লক্ষ্য করে। এরা কিন্তু অনেক ওপরে ওড়ে না। জলের উপর মোটামুটি ৩ থেকে ২০ ফুটের মধ্যেই ওড়াউড়ি। উড়তে উড়তেই সাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে মাছের উপর। বেশিরভাগ সময়েই জলের ওপর থেকে মাছ তুলে নেয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৯: ক্ষুদ্র শক্তি সংগঠিত হলে বড় শত্রুও হার মানে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

তবে দেখেছি কয়েক সেকেন্ডের জন্য জলের মধ্যে ডুবে যেতে। তবে খুব গভীরে যে যায় না তা নিশ্চিত। জানা গেছে জলের তল থেকে দেড়-দুই ফুটের মধ্যেই এরা ডুব দেয়। যেখানে এদের খাবারের পরিমাণ বেশি বা শিকারযোগ্য মাছ বেশি রয়েছে সেখানে এরা অনেক সময় গোল হয়ে চক্কর কাটতে থাকে, আর তারপর হঠাৎই শিকারের উপর ঝাঁপ দেয়। মাছ প্রিয়তম খাদ্য হলেও এরা চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, জলজ পোকামাকড়, স্কুইড ইত্যাদি প্রাণী, এমনকি জলে পছন্দসই খাবারদাবার না পেলে উড়ন্ত মথ বা বিটল জাতীয় পোকা ধরেও খায়। খাবার শিকার করার পর শিকারের মাথাটাকে আগে গলার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তারপর গিলে নেয়। আর তা না হলে বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য চঞ্চুতে ধরে নিয়ে বাসার দিকে উড়ে যায়। এদের লেজটা কিন্তু গভীরভাবে দ্বিখন্ডিত, আর তাই যখন এরা আকাশে ওড়ে তখন সেই দৃশ্য খুবই দৃষ্টিনন্দন হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

মাথা ও চঞ্চু নিচের দিকে রেখে উড়ন্ত পাতি গাঙচিল। ছবি: সংগৃহীত।

এপ্রিল থেকে জুলাই মোটামুটি এদের প্রজননকাল। এই সময় এরা সমুদ্র তীরে বালিতে বা বালিয়াড়িতে কিংবা উপকূলে লতাপাতা ঝোপের মধ্যে বাসা তৈরি করে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় পুরুষ পাতি গাঙচিল প্রথমে মাটিতে আঁচড় কেটে জায়গা চিহ্নিত করে, আর তারপর স্ত্রী পাতি গাঙচিল সেখানে খুঁড়ে একটা গর্ত তৈরি করে। ওরা বাসার স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতিতে বাসার একাধিক স্থান নির্ধারণের পর একটা স্থান বেছে নেয়। তারপর নির্বাচিত গর্তের চতুর্দিকে শামুক, ঝিনুকের ছোটখাটো খোলক, শুকনো কাঠি বা পাতা, এমনকি শুকনো আবর্জনা বিছিয়ে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় বাসা।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৭: গ্রিন টি /৫

স্ত্রী পাতি গাঙচিল একবারে ২ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো লম্বায় হয় ১.৬ ইঞ্চি আর চওড়ায় হয় প্রায় ১.২ ইঞ্চি। দেখা গেছে প্রথমে পাড়া ডিমের থেকে পরে পাড়া ডিমের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হয়। ক্রিম রঙের ডিমের ওপর কালো বা বাদামি রঙের ছিট থাকায় দূরে থেকে বাসার মধ্যে ডিম কে স্পষ্ট দেখা যায় না। পুরুষ ও স্ত্রী পাতি গাঙচিল দিনে ও রাতে পালা করে তা দেয়। ২১ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। যদি আবহাওয়া খুব গরম হয় তখন দেখা যায় স্ত্রী ও পুরুষ পাতি গাঙচিল জলে পেটের পালক ভিজিয়ে নিয়ে এসে ডিমের ওপর বসে তা দেয়। এতে ডিম কিছুটা ঠান্ডা হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

পাতি গাঙচিলের ডিম। ছবি: সংগৃহীত।

সাধারণত পাখিদের বাচ্চা যখন ডিম ফুটে বেরোয় তখন তাদের চোখ ফোটে না। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে বাচ্চাদের জন্মের সময় চোখ ফুটে যায় এবং গায়ে পরিণত সামান্য ডাউন পালক (Down feather) দেখা যায়। যদিও বাচ্চারা খাদ্যের ব্যাপারে বাবা ও মায়ের ওপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকে। পাতি গাঙচিলদের বাচ্চা খুব বেশি হলে পাঁচ দিন বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে বাসায় থাকে। তারপর কিন্তু এরা বাবা-মায়ের সাথে খাবার শিকার করা শিখতে বেরোয়। এই বাচ্চাদের বাবা-মা কিন্তু প্রয়োজনে খাবার শিকার করে খাইয়েও দেয়। সাধারণতঃ বছরে একবারই এদের প্রজনন হয়। তবে কোনও কারণে ডিম বা বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার ডিম পাড়তে পারে। ডিম ফুটে বেরোনো বাচ্চাদের গায়ের রঙ হালকা ধূসর, আর মাথা, পিঠ ও ডানার ওপরে কালো ছিট থাকে। যদিও বড় হওয়ার সাথে সাথে রঙের পরিবর্তন ঘটে যায়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

পাতি গাঙচিলরা মূলত পরিযায়ী পাখি। সুন্দরবন অঞ্চলে যেসব পাতি গাঙচিল আসে তারা এশীয় গোষ্ঠীর গাঙচিল। এরা আসে ইউরোপ ও এশিয়ার শীত প্রধান এলাকা থেকে। যখন ওখানে প্রবল শীত পড়ে তখন ওরা সুন্দরবনের সমুদ্র উপকূলে চলে আসে প্রজননের জন্য। শীতকালে এদের সুন্দরবন অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এদের প্রজনন ঋতুতে আরও অনেক সমপ্রজাতি ও ভিন্নপ্রজাতির পাখি একই জায়গায় বাসা বাঁধে। কিন্তু শত বাসার মাঝেও নিজের বাসাকে এরা নিশ্চিতভাবে খুঁজে নিতে পারে।
কলকাতায় বৃষ্টি

সন্তানের জন্য খাবার নিয়ে হাজির মা পাতি গাঙচিল। ছবি: সংগৃহীত।

পরিযায়ী পাখি হলেও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে পাতি গাঙচিলদের গুরুত্ব অপরিসীম। মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ইত্যাদি খেয়ে উপকূল অঞ্চলের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় এরা সাহায্য করে। তবে সুন্দরবন অঞ্চলে যেভাবে জলস্তর বাড়ছে এবং ভয়ঙ্কর সাইক্লোনে উপকূল অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে পাতি গাঙচিলদের বাসস্থান ও প্রজননস্থলের সংকট আসতেই পারে। তাছাড়া যেভাবে বিপুল পরিমাণে মাছ সমুদ্র থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে এবং ভয়ঙ্কর প্লাস্টিক ও কীটনাশক দূষণের কারণে উপকূলের বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে তাতে আগামীদিনে পাতি গাঙচিলরা যদি সুন্দরবনে আর না আসে তবে অবাক হবো না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content