শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) ছাদের সিলিংয়ে তালচোঁচের বাসা। (ডানদিকে) তালচোঁচ পাখি। ছবি: সংগৃহীত।

বিকেলবেলা অবসরে বাড়ির ছাদে বসে কিঞ্চিৎ পক্ষীদর্শন করা আমার অনেক শখের মধ্যে একটি। বছরখানেক আগে এমনই একদিন জুলাই মাসের বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ছাদে গিয়ে বসেছি। সেদিন সকালেই এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আবহাওয়া মোটামুটি ঠান্ডা। আকাশে বাদল মেঘ সমুদ্রের দিক থেকে কলকাতার দিকে ভেসে চলেছে। ছাদের প্যারাপেটে ছাতারে, পাশের বাড়ির করোগেটেড টিনের চালে দোয়েল আর সামনে ইলেকট্রিকের তারে ফিঙেদের কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে মনে হল মাথার উপর দিয়ে কী যেন একটা সাঁ করে উড়ে গেল। আকাশের দিকে নজর ঘোরাতেই দেখি চারটে ছোট্ট সাইজের পাখি দ্রুত বেগে উড়ছে। একবার উত্তর থেকে দক্ষিণে, আবার পরক্ষণে দক্ষিণ থেকে পূর্বে। এত দ্রুত বেগে উড়ছে যে ভালো করে বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। আর যখন ফিরছে তখন গোঁত্তা খেয়ে পুরোপুরি ইউ টার্ন নিয়ে ফিরছে।
একনজরে মনে হল এরা তালবাতাসি পাখি। এদের আমি ছোট থেকেই দেখে এসেছি। খুব চেনা পাখি। তবুও আর একটু ভালো করে দেখব বলে কিছুদিন আগে কেনা বাইনোকুলারটা হাতে নিয়েই ছাদে উঠি। তো সেই বাইনোকুলারটা চোখে লাগালাম। নাঃ, খুব ভালো করে যে দেখতে পেলাম তা নয়। কারণ ওদের দ্রুতগতি। কিন্তু মনে হল এদের লেজটা তো তালবাতাসিদের মতো চেরা নয় মনে হচ্ছে। তালবাতাসি দের লেজ ইংরেজি ‘V’-এর মতো চেরা। স্পষ্ট বোঝা যায়। মনে হল এদের লেজ কিছুটা চৌকো ধরনের। যদিও ওড়ার ধরন এবং দুটো ডানা তালবাতাসিদের মতোই। আমার দেখার ভুল হচ্ছে না তো? হাতে থাকা মোবাইলের ক্যামেরা অন করে অনেকগুলো ছবি তুললাম। মোবাইল ক্যামেরায় খুব ভালো ছবি হয় না। তবুও যতটুকু ছবি তোলা গেল তাতে নিশ্চিত হলাম লেজটা তালবাতাসিদের মতো নয়। সঙ্গে সঙ্গেই মনটা আমার সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৫: পাতি গাঙচিল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩০: চুপি-চুপি আসে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?

তাহলে কি তালবাতাসিদের মতো আরও কোনও পাখি এখানে রয়েছে? হয়তো কেন, নিশ্চয়ই রয়েছে। আমি এদেরও নিশ্চয়ই অনেকদিন আগে থেকেই দেখেছি কিন্তু তালবাতাসি পাখিদের সাথে এদেরকে একই পাখি হিসেবে ভেবে নিয়েছি কারণ ওদের লেজের গঠনে পার্থক্য এতটা খুঁটিয়ে আগে দেখিনি। সুতরাং আমার ভরসা পক্ষীবিদ সালিম আলির লেখা “Birds of India” বইখানি। খুব একটা পরিশ্রম করতে হল না। পেয়ে গেলাম তালবাতাসিদের প্রায় কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য ও আকার বিশিষ্ট তালচোঁচ পাখিদের খবর। এদের ইংরেজিতে বলে হাউস সুইফট বা লিটল সুইফট (House Swift or Little Swift), বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Apus affinis’। শুধু সুন্দরবন এলাকা নয় ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর সমস্ত ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে এই পাখিদের উপস্থিতি নাকি প্রবলভাবে দেখা যায়। জানা ও শেখার যে কোনও শেষ নেই তা বার্ধক্যের দোরগোড়ায় পৌঁছেও আরও একবার উপলব্ধি করলাম।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) উড়ন্ত চালচোঁচের দল। (ডানদিকে) পাথরের খাঁজে তালচোঁচের বাসা। ছবি: সংগৃহীত।

তালচোঁচ পাখিদের আকার চড়ুই পাখির মতো বা সামান্য ছোট। লম্বায় ১২ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার, আর ওজনে ৪ থেকে ১৮ গ্রাম। ডানা দুটো অনেক লম্বা হওয়ায় যখন এরা ডানা বিস্তার করে তা ৩৩ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার হয়। এদের পিঠের রঙ কালচে ধূসর। তবে গলা আর পেছনদিকের রং সাদা। ওড়ার সময় এই সাদা রং বোঝা যায়। লেজটা ছোট এবং চৌকো। দ্রুত ওড়ার উপযোগী ডানা দুটো বেশ সরু ও লম্বা এবং ওড়ার সময় তা কাস্তে আকৃতির দেখায়। যখন এরা ওড়ে খুব দ্রুত দুই ডানা দিয়ে বাতাসে ঝাপটা দেয়। ছোট ও কালো রঙের চঞ্চু উড়ন্ত অবস্থায় পোকামাকড় শিকার করার জন্য উপযোগী। এদের পা দেহের তুলনায় অনেক ছোট, আর পা ও আঙুলের গড়ন এমন যে এরা খুব সহজে খাড়া কোনও তলে নিজের দেহকে দিব্যি আটকে রাখতে পারে। এরা কিন্তু গাছের ডালে কখনও বসে না। মাটিতে হাঁটতেও পারে না। কারণ এদের পায়ের আঙুলের বিন্যাস।

পাখিদের পায়ে চারটে আঙুলের তিনটি থাকে সামনে আর একটি থাকে পেছনের দিকে। কিন্তু তালচোঁচদের ক্ষেত্রে চারটি আঙুলই থাকে সামনের দিকে। বাড়িতে জগদানন্দ রায়ের লেখা “বাংলার পাখী” বইটি তাক থেকে খুঁজে বের করে দেখলাম তিনি এদের নিয়ে তাঁর চমৎকার পরীক্ষাভিত্তিক অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন – “আমরা তালচোঁচ পাখীদের মাটিতে ছাড়িয়া দিয়া দেখিয়াছি, তাহারা নানা ভঙ্গীতে ব্যাঙের মতো থপ্ থপ্ করিয়া লাফাইয়া পালাইতে চায়। কিন্তু তাহাদের নখগুলি ভারী ছুঁচ্লো। নখে একবার কাপড় আট্কাইয়া গেলে, তাহা ছাড়ানো মুশকিল হয়।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

পর্ব-৩৭: বানরেন্দ্র-জাতক: শক্তি না বুদ্ধি?

ছোটবেলার দু’ একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল “বার্ডস অফ ইন্ডিয়া” পড়তে গিয়ে। আমাদের গ্রামের বাড়ির খুব কাছে ছিল একটা পোড়ো বাড়ি। সবাই বলতাম সাধুর বাড়ি। বছরে দু’পাঁচ দিনের জন্য এক সাধুবাবা এসে ওই বাড়িতে থাকতেন। মাথায় জটা, গেরুয়া বসন আর তার হাতে থাকত একটা ত্রিশূল। সেই ঘরে কোনও আসবাব বলে কিছু ছিল না, আর দরজায় থাকত একটা শেকল লাগানো। সেই ঘরের মাচা আর কড়িকাঠে দেখা পাখির বাসার কথা মনে পড়ে গেল। দেখতাম বাটির মতো কিছু পাখির বাসা যেন কেউ আঠা দিয়ে কড়িকাঠ আর মাচার সিলিং থেকে ঝুলিয়ে রেখেছে। ছোট ছিলাম বলে তখন এই বাসাগুলো নিয়ে আদৌ উৎসাহ দেখাইনি। এগুলো যে কোন পাখির বাসা তাও জানতাম না। একইরকম বাসা আমার শ্বশুরবাড়ির প্রাচীন ঠাকুর দালানের ভেতরে ছাদের সিলিং ও পিলারের গায়ে ২২/২৩ বছর আগে দেখেছিলাম। কীসের বাসা তখনও বুঝিনি। কিন্তু এতদিন পরে বুঝলাম যে ওগুলো ছিল তালচোঁচদের বাসা। ঘাস, পালক, খড় ইত্যাদি দিয়ে তৈরি গোল বাটির মতো বাসা। উপকরণগুলিকে আঠালো লালা দিয়ে জুড়ে বাসা বানায় এবং তা দেওয়াল বা সিলিং-এর সঙ্গে যুক্ত করে রাখে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৮: গ্রিন টি /৬

তবে বাসা যে খুব সুন্দর ও গোছানোভাবে তৈরি তা নয়। পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল বা গুহার সিলিং ও দেওয়াল, পরিত্যক্ত ও পুরনো বাড়ির সিলিং, কড়িকাঠ, ব্রিজের নিচে বা কোনও খিলানের উপরে তালচোঁচরা অনেকে একসাথে একই জায়গায় এই ধরনের অনেক বাসা বানায়। যদি জায়গাটা ওরা নিরাপদ বলে মনে করে আর কোনও অসুবিধায় না পড়ে তবে সেই জায়গায় ওরা দিনের পর দিন বাসা বাঁধতে পারে। চিনে নাকি তালচোঁচ পাখিদের একটি জাত রয়েছে যাদের বাসা ঝোল রান্না করে খাওয়া হয়। এই বাসার ঝোল নাকি ভারি সুস্বাদু। আঠালো লালা দিয়ে বানানো বাসা বলেই নাকি সুস্বাদু হয়।

মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর হল এদের প্রজনন ঋতু। যদিও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে এর সামান্য রকমফের ঘটতে পারে। বাসা বানানো শেষ হলে স্ত্রী তালচোঁচ ২-৩টি ডিম পাড়ে। এদের বছরে দু’বার ডিম পাড়তে দেখা যায়। একটু লম্বাটে আকারের ডিম। আর ডিমের রঙ ধবধবে সাদা। ১৮ থেকে ২১ দিন স্ত্রী ও পুরুষ পাখি উভয়ে পালা করে ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোনোর পর ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত তারা বাসায় থাকে এবং মা-বাবা পাখি তাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নেয়। অবশ্য সময়ের মধ্যে বাচ্চারা দ্রুত ওড়ার সমস্ত কৌশল রপ্ত করে ফেলে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

তালচোঁচ পাখিরা বেশিরভাগ সময়ই দেখেছি দল বেঁধে একই জায়গায় এলোমেলো ভাবে ওড়াউড়ি করে। উড়ন্ত অবস্থাতেই ওরা উড়ন্ত পতঙ্গ শিকার করে। এরা নাকি রাতে বিশ্রামের সময়টুকু বাদে প্রায় সারাদিনই ওড়ে। এতে যে বিপুল পরিমাণ শক্তিক্ষয় হয় তা নিশ্চিত। হয়তো এই কারণেই এদের প্রচুর পরিমাণে খাবার-দাবার খেতে হয়। এরা নাকি দিনে কম করে হাজার খানেক কীটপতঙ্গ শিকার করে খায়। আমি অবশ্য এদের সন্ধের আগেই বেশি ওড়াউড়ি করতে দেখি। তবে সকালের দিকেও অনেকবার উড়তে দেখেছি। সে যাই হোক, এরা যখন ওড়ে তখন যে এরা খুব আনন্দে থাকে তা ওদের ক্রমাগত ‘চিরি চিরি চিরি’ আওয়াজ শুনেই বোঝা যায়। এই সমবেত শব্দ মোটেই শ্রুতিমধুর নয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) তালচোঁচের ডিম। (ডানদিকে) উড়ন্ত তালচোঁচ। ছবি: সংগৃহীত।

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে তালচোঁচরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক একটি পাখি যেহেতু বিপুল পরিমাণ পতঙ্গ শিকার করে তাই কৃষিজমির বহু ক্ষতিকর পতঙ্গকে শিকার করে কৃষকের উপকার করে। পাশাপাশি উপকারী ও অপকারী পতঙ্গের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে। কিন্তু বর্তমানে কৃষিকাজে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহৃত হওয়ায় উপকারী পতঙ্গের সাথে ফসলের ক্ষতিকর পতঙ্গ অনেক কমেছে। ফলে তালচোঁচ পাখিরা খাদ্যাভাবের সম্মুখীন হয়েছে। আবার সুন্দরবন অঞ্চলে সাইক্লোনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এদের বাসা ও বাসস্থানগুলিও প্রায়শই ধ্বংস হচ্ছে। মনে হয় এইসব কারণেই সুন্দরবনের বসতি এলাকায় তালচোঁচ পাখিদের আর আগের মতো দেখতে পাই না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content