কলকাতায় বৃষ্টি

জলাভূমির ধারে ছোট বাবুইবাটান। ছবি: সংগৃহীত।

কয়েক বছর আগে পুজোর ছুটিতে একদিন বিকেলে হারউড পয়েন্টে সান্ধ্যকালীন নোনা হাওয়া ‘খেতে’ গিয়েছিলাম। জেটিঘাট থেকে ঘুরতে ঘুরতে মুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ধরে দক্ষিণ দিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই নজরে এল ভাটায় জল নেমে যাওয়ার পর বালির চরে ছোট ছোট চড়াই পাখির মতো অনেকগুলো পাখি দ্রুত পায়ে কী যেন খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। সূর্য তখন পশ্চিম দিকে সাগরদ্বীপের গাছ-গাছালির ওপর ঢলে পড়েছে। পাখিগুলোকে দেখে বুঝলাম এ পাখি আগে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। ছোট ছোট পা, আর গায়ের রং অনেকটা ভেজা বালির মতো, ফ্যাকাশে ধূসর। ডানা, পিঠ, ঘাড়, লেজ ফ্যাকাশে ধূসর হলেও গলা, পেট আর লেজের নিচের দিকে রঙ সাদা। লেজের প্রান্তের দিক তিনকোনা আর প্রান্তের রং কালো। ডানার প্রান্তেও যেন মনে হল সরু কালো দাগ রয়েছে। মাথার চাঁদির রং অবশ্য তামাটে। ছোট্ট কালো চঞ্চুর দু’পাশে হালকা কমলা রঙের একটা দাগ। তবে ভারি সুন্দর হল এদের চোখ। কুচকুচে কালো চোখ থেকে কাজলের মতো একটা রেখা টানা হয়ে দুপাশে চঞ্চুর গোড়ায় শেষ হয়েছে। আর চোখের কনীনিকাকে ঘিরে রয়েছে সাদা রঙের সরু একটা বলয়। পা ও নখের রঙও কালো।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্ডকারখানাগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ করে দুই একটা পাখি আকাশে উড়তেই বাকিগুলো তার পিছু পিছু ঝাঁক বেঁধে আকাশে উড়ে গেল। ওড়ার সময় দেখলাম ডানার নিচে সামনের দিকের রঙ কালো আর পেছনদিকের উড্ডয়ন পালক গুলোর রং সাদা। লেজটা ছোট, তালবাতাসি পাখিদের মতো। ডানা দুটোও দেখলাম ওই আবাবিল, তালচোঁচ বা তালবাতাসিদের মতো কাস্তে আকৃতির। তবে এদের ডানা তুলনামূলকভাবে একটু চওড়া।

আমি ভাবছিলাম এবার ওদের দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেব। কিন্তু ওরা যে আমাকে আরেকবার অবাক করবে তা বুঝিনি।। ওরা আকাশে চক্কর কাটতে কাটতে শুরু করল পতঙ্গ শিকার। ঠিক যেমন করে তালবাতাসি, তালচোঁচ বা আবাবিল পাখিরা শিকার করে। সেই একই রকম ভাবে গোঁত্তা খেয়ে পতঙ্গ শিকার করে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে ফিরে আসা। তখন সূর্য প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, কেবল আকাশটা রক্তাভ হয়ে রয়েছে। সেই আলো-আঁধারি পরিবেশে পাখিগুলো যখন দ্রুত চক্কর কাটতে কাটতে পতঙ্গ শিকার করছিল দেখে যেন মনে হচ্ছিল চামচিকের দল উড়ছে। সোজা না উড়ে ওরা ডাঁয়ে বাঁয়ে এঁকে বেঁকে উড়তে লাগল। অদ্ভুত সুন্দর ওদের ছান্দিক গতি। ওদের গাঁট্টাগোট্টা চঞ্চু দেখে আমার মনে আগেই সন্দেহ হয়েছিল যে উড়ন্ত পতঙ্গ শিকার না করলে এমন চঞ্চু তো হওয়ার কথা নয়। ভাবনাটা মিলেও গেল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৭: আবাবিল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৩: এ কে? এ কে গো?

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৫: পূর্বোত্তরে আন্তরাজ্য সীমা বিবাদ

যেহেতু আমি পাখি বিশেষজ্ঞ নই তাই আমার কাছে অপরিচিত পাখি চেনার জন্য আমাকে পাখি বিশেষজ্ঞদের লেখা বিভিন্ন বইয়ের আশ্রয় নিতে হয়। সবার আগে খুঁজি সালিম আলির “Birds of India”। কিন্তু এই পাখির পরিচয় সেখানে খুঁজে পেলাম না। পরবর্তী আশ্রয় অজয় হোমের লেখা “বাংলার পাখি” এবং “চেনা অচেনা পাখি”। এবার কিন্তু হতাশ হইনি। দ্বিতীয় বইটিতে পেয়ে গেলাম পরিচয়। আমার পরবর্তী গন্তব্য ‘W. T. Blanford’ এর লেখা (১৮৯৮) “The Fauna of British India, Birds, Vol-IV”। এখানেও পেয়ে গেলাম পাখিটির পরিচয়। আমার দেখা এবং বইয়ের লেখা ও ছবি মিলে গেল। আমার আর সন্দেহ রইল না যে এই পাখিটি হল ছোট বাবুইবাটান, ইংরেজিতে ‘Small Indian Pratincole’ বা ‘Swallow Plover’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Glareola lactea’।‌
কলকাতায় বৃষ্টি

ছোট বাবুইবাটান ছানা। ছবি: সংগৃহীত।

ছোট বাবুইবাটানকে দেখতে এতটা আদুরে যে আমি মনে মনে বলেই ফেললাম সুন্দরবনের পাখি পরিবারে এ হল ‘ছোটবাবু’! অচেনা পাখির পরিচয় জানতে পারলে মন ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। এদের আর‌ও দেখতে মন ছটফট করে। সুতরাং আবারও কিছুদিন পর হাজির হলাম একই জায়গায়, একই সময়ে। কিন্তু সেদিন কিছুই দেখতে পেলাম না। তবে ভরসা ছিল দেখতে পাব। কয়েক মাস পর ফ্রেজারগঞ্জের সৈকতে ফের ওদের দেখা পেলাম। এরা সমুদ্রের উপকূলে, নদীর খাঁড়ি ও নদীর তীরে বালিময় অংশে অধিকাংশ সময় বিচরণ করে। আবার যেখানে জলাভূমি রয়েছে তার আশেপাশেও এদের ওড়াউড়ি করতে দেখা যায়। এদের রূপের বর্ণনা তো আগেই করেছি। আকারও বলেছি চড়াই পাখির মতো বা তার থেকে সামান্য বড়। লম্বায় হয় ৬.৫ ইঞ্চি আর ডানার দৈর্ঘ্য ৫.৭৫ ইঞ্চি। আর ওজন প্রায় ৪২ গ্রাম। এরা ঝাঁক বেঁধে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। যদিও আমি এভাবে ছোট বাবুইবাটানদের এখনও খুব বেশি দেখিনি তবে আমার বিশ্বাস সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর মোহনায় যে নতুন নতুন চড়া জেগে উঠেছে সেখানে এই পাখিদের দেখা মিলবে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

পাতি গাঙচিলদের সাথে মিলেমিশে এদের একই এলাকায় থাকতে এবং বাসা তৈরি করতে দেখা যায়। শুধু সুন্দরবনে নয়, হিমালয় বাদে প্রায় পুরো ভারতেই এদের দেখা মেলে। তবে নদীর মোহনা ও সমুদ্র উপকূলে এদের উপস্থিতি বেশি। বাংলাদেশ, মায়ানমার ও শ্রীলঙ্কাতেও এদের যথেষ্ট দেখা যায়। এদের প্রজননের ঋতু হল মার্চ, এপ্রিল এবং মে মাস জুড়ে। তবে বন্যা বা নদীর স্রোতে যদি ডিম ভেসে যায় তাহলে আবারও ওদের ডিম পাড়তে দেখা যায়। নখ দিয়ে বালি আঁচড়ে ছোট্ট গর্ত করে তার মধ্যে এরা পাথরের রঙের বা হালকা সবুজাভ ধূসর রঙের ২-৩টি ডিম পাড়ে। ডিমের ওপরে বাদমি রঙের হালকা ছিট দেখা যায়। ডিম লম্বায় হয় গড়ে ২৫.৯ মিলিমিটার ও ব্যাস ২০.৫ মিলিমিটার।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে ) ছোট বাবুইবাটানের ডিম। ছোটো বাবুইবাটান। ছবি: সংগৃহীত।

ছোট বাবুইবাটান স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম। প্রজনন ঋতুতে এদের চঞ্চুর গোড়া উভয়েরই কমলা বা লাল হয়ে যায়। প্রজননের সময় পুরুষ পাখি স্ত্রীকে সামান্য ঠোক্কর দিয়ে বা খাবার দিয়ে তার মন জয় করতে চেষ্টা করে। মন দেয়া-নেয়া হয়ে গেলে খুব কম সময়ের মধ্যে তাদের মিলন হয়। তারপর ডিম পাড়ার পালা। ডিমের রং ও বালির রং প্রায় একইরকম হওয়ায় দূরে থেকে বোঝা যায় না। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে মিলেই ডিমে তা দেয়। ১৮-২০ দিন পর ডিম ফুটে বেরোনো ছানা ২২-২৩ দিনের মধ্যে উড়তে শেখে। তবে স্বনির্ভর হতে প্রায় দেড় মাস লেগে যায়। এই সময় তাদের বাবা ও মা পোকামাকড় ধরে এনে খাওয়ায়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ

ছোট বাবুইবাটানের রং বালির মতো হওয়ায় সহজেই শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ডিম ও ছানাকে রক্ষা করতে পারে। তবুও যদি কোনও শত্রু-প্রাণীর মুখোমুখি হয় বা কোনও বিপদের আভাস পায় তখন ভারি অদ্ভুত আচরণ করে। দুই ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মাটিতে বুক ঘসে ঘসে ‘পাগলের মতো’ আচরণ করতে থাকে। কখনও আবার একটা ডানা যেন ভেঙে গেছে এমনভাবে মাটির উপর ঘসটে ঘসটে নিয়ে যায় আর অন্য ডানাটি ঝাপটাতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে শত্রু বা অনাহূত প্রাণীটি ঘাবড়ে গিয়ে বা ভয় পেয়ে চম্পট দেয়। তবে এই কৌশলে কাজ না হলে নিজেই উড়ে পালায়।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

আগেই বলেছি এদের প্রিয় খাবার পোকামাকড়। উড়ন্ত পোকামাকড়ই এদের প্রথম পছন্দ। তবে হেঁটে হেঁটে পোকামাকড়ও খেতে পারে। ভোর আর সন্ধ্যা হল এদের খাবার সংগ্রহ করার সময়। হেঁটে হেঁটে যখন ঘোরে তখন এদের সমবেত “টে-ট্র্যা টে-ট্র্যা”, “টেক-ট্র্যা টেক-ট্র্যা” ইত্যাদি আরও নানারকম শব্দ করতে শোনা যায়। আবার যখন ওড়ে তখন ‘প্রিপ প্রিপ’ বা ‘ট্রিট ট্রিট’ শব্দ করে। কখনও কখনও টিকটিকির মতো ‘টাক টাক টাক’ করেও ডাকতে শোনা যায়। তবে উত্তেজিত হয়ে উঠলে স্বরের পরিবর্তন হয়। তখন স্বর অনেক কর্কশ হয়ে যায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

উড়ন্ত ছোট বাবুইবাটান। ছবি: সংগৃহীত।

সুন্দরবন অঞ্চলে ছোট বাবুইবাটান আজও যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। তবে আরও এক জাতের বাবুইবাটান সুন্দরবন এলাকাতে খুব কম দেখা যায় বলে জেনেছি। অবশ্য আমার নজরে তা এখনও পড়েনি। এদের আকার ছোট বাবুইবাটানের থেকে কিছুটা বড় বলে এদের বলা হয় বড় বাবুইবাটান (Glareola maldivarum)। এদের গড়ন ও স্বভাব ছোট বাবুইবাটানের মতো। যেহেতু এরা প্রচুর পতঙ্গ শিকার করে তাই চাষের মরশুমে অনেক ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষকের উপকার করে। IUCN-এর তালিকা অনুযায়ী ছোট বাবুইবাটান বিপন্ন নয় ঠিকই তবে যেভাবে সুন্দরবনের পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠছে এবং জনবসতি বাড়ছে তাতে এরা কতদিন নিশ্চিন্তে থাকবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়। — চলবে
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content