বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

“গণশত্রু” ছবির একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত।

গণশত্রুর কথা মনে পড়ে? হেনরিক্ ইবসেনের “অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল্” অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ছবি গণশত্রু। প্রথম ও শেষদৃশ্য। মফঃস্বল শহরের জনৈক চিকিৎসক, অশোক গুপ্ত বুঝতে পেরেছিলেন শহরে জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। নামে অশোক, যিনি শোকোত্তীর্ণ, পদবীতে গুপ্ত। তাঁকে চেনা খানিক কঠিন নয় কি?

এই চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত বলতে চাইবে “আশা আছে”, ডঃ গুপ্তকে বলতে শোনা যাবে, আমরা হারিনি, আমি জনগণের শত্রু হতে পারি, কিন্তু আমার অনেক বন্ধু। পদ, মর্যাদা হারিয়ে তিনি যে উপলব্ধিতে পৌঁছে যান, যে প্রতিষ্ঠায় পৌঁছোন তা অক্ষয়।
প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের ভূমিকা, তথাকথিত সংবাদমাধ্যমের অবস্থান, সামাজিক দৃষ্টিকোণ, মুখ ও মুখোশ সবকিছু পরতে পরতে এই চলচ্চিত্রে এসেছে, উন্মোচিত হয়েছে, আর এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক রিলিজিয়ন, সেখান থেকে মানবধর্মে উত্তরণের আশাসঞ্চারের ইঙ্গিত।

আপাতভাবে দেহে অসুখের যে আশঙ্কা আর তার নিরাময়ের পথে বাধা নিয়ে সমস্যা দানা পাকিয়েছে, প্রথাগত উত্তরণের বাইরে ওই পবিত্র “আশা”টুকুই এই চলচ্চিত্রের প্রাণশক্তি যেন। যখন রাষ্ট্র বিরূপ, গণতন্ত্রের চতুর্থস্তম্ভ প্রায় অর্থহীন, বিবেক যখন ভাঁড়ের ভূমিকায় তখন “রোগ”টা খুঁজতে, তাকে থামাতে একজন ডাক্তারের দরকার পড়ে। অশোক গুপ্ত তাই শরীরের ডাক্তার থেকে সমাজবিপ্লবী হয়ে ওঠেন যেন, রোগটাতো শরীরে আর আটকে নেই, সমাজের আনাচে কানাচে তার বিস্তার, রমরমা।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১: খাওয়াব আজব খাওয়া

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু

চিকিৎসার সূত্রে বিজ্ঞান আর তার বিপ্রতীপে প্রাতিষ্ঠানিক রিলিজিয়নে উদ্ভূত “কু” আর তার প্রতি অন্ধবিশ্বাস, বুদ্ধি-বিবেচনার বিপরীতে সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ এই সবকিছুর প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য দ্বন্দ্ব একটা কথা মনে করাবে। আগন্তুক চলচ্চিত্রে জনৈক আগন্তুক মনে করেন, ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, প্রতিষ্ঠিত ধর্ম এই কাজটি তো করেই।

তাহলে গণশত্রু যে রাষ্ট্র ও ধর্ম অর্থাৎ রিলিজিয়নকে একসূত্রে দেখায়, আর বিপরীতে যে দাঁড়িয়ে থাকে তাকে কী বলা যায়? ন্যায়? সত্য? আদর্শ? বিবেক? কর্তব্য? সামাজিক দায়িত্ব বা দায়? মানবধর্ম?

এই সংগ্রামের একদিকে যদি থাকে রিলিজিয়ন তাহলে অন্যদিকে সেই ধর্ম যা গ্লানিমুক্ত, অধর্মের অভ্যুত্থানে তার প্রকাশ ঘটে, তার নাম কখনও কখনও হয় অশোক গুপ্ত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৮: একটি খালি বিয়ারের বোতল

একটু “মহানগর” চলচ্চিত্রের প্রথমে যাওয়া যাক। সমান্তরাল ওভারহেড তারের পথে এগিয়ে আসছে একটা যন্ত্র, যা আসলে ট্রামের বৈদ্যুতিন পোল বা অ্যাণ্টেনা, তার যান্ত্রিক অব্যাহত গতিপথে চলার সংঘর্ষে মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে আলো, বা বলা ভালো আদি অকৃত্রিম আগুনের ঝলক, যা সভ্যতার শক্তি, কিন্তু এই আগুনটিও নাগরিক আয়োজনের ফসল। সিনেমাটির শেষে মহানগরের ভিড়ে মিশে যাওয়া দম্পতি চোখের বাইরে চলে গেলে অফিসপাড়ার আসন্নসন্ধ্যার বহুতলমণ্ডিত আকাশের বুকে জ্বলতে থাকে, তারা নয়, ল্যাম্পপোস্টের আলো, নাগরিক “আশা”র বাতি। ল্যাম্পপোস্টের ওপর ক্যামেরার দৃষ্টি স্থির হওয়ার মুহূর্তমাত্র আগেই নিচে বহমান ট্রাম বাসের যাতায়াত, অনুভূমিক দুটি সমান্তরাল ট্রামের ওভারহেড তার পার হতে হতে চোখে পড়তে পারে সেই তার বেয়ে সহসা চলে যাওয়া বিদ্যুতের অ্যাণ্টেনাটি, যা ট্রামের শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর ক্যামেরা স্থির হবে আলোকস্তম্ভে, তিনটি বাল্বহোল্ডারের দুটি শূন্য, একটিতে জ্বলে থাকা উজ্জ্বল বাল্বটি সেই সংসারের, নাগরিক “আশার” প্রতিভূ হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮১: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য চালাতে গেলে নিজের লোকেদের পিছনেও চর নিয়োগ করতে হয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা

“গণশত্রু” এর উত্তরকালের সামাজিক সংকট, ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের ছবিটি তুলে ধরবে। আরম্ভেই ফ্রেমে ধরা পড়ে টেবিলে থাকা স্টেথোস্কোপ আর নাগরিক ল্যান্ড ফোনের যুগলবন্দি, ডায়াল ঘুরিয়ে সংযোগস্থাপন করতে ব্যস্ত হাতটি, ফোন থেকে বেরিয়ে থাকা তার। পরিসর আরও বাড়ে, কথা চলতে থাকে। ট্রামের তার যদি নাগরিক জীবনের প্রতীক হয়, এই চলচ্চিত্রের প্রারম্ভিক দৃশ্য জানিয়ে দিতে চাইবে সভ্যতার কল্যাণময় বিজ্ঞানকে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

রোগকে পার হয়ে, মানুষে মানুষে যোগাযোগের নতুন নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়া সেই সায়েন্স কি সমাজে জমে চলা ব্যাধির উপশম ঘটাতে পারে? যোগাযোগের নবযুগেও কি একা হয়ে যেতে হচ্ছে না প্রতিনিয়ত? যূথবদ্ধতার প্রাথমিক সমাজনিয়মটি এখানে যেন পরিহাসমাত্র। কেউ একা হয়ে যায়, বিপরীতে সংঘবদ্ধ হয় অশুভ শক্তি। তাকে পার হওয়ার ইঙ্গিতময় “আশা” জেগে ওঠে যখন দেখা যায় সকলে ভণ্ড নয়, মফঃস্বল থেকে কলকাতার বুকে অচিরেই ছড়িয়ে পড়বে “জনৈক জনশত্রুর জবানবন্দি”, নেপথ্যে শোনা যায় সম্মিলিত মানবকণ্ঠের উল্লাস, শোনা যায় দাঁতে দাঁত চেপে, চোখে চোখ রেখে লড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার, আসলে দূষিত জলশোধনের মাধ্যমেই “রিফর্ম”, সামাজিক বিপ্লবের ডাক যেন। তখন পায়ের নিচে মাটি, মাথার ছাদ হারানো গণশত্রু বলে ওঠেন, আমরা কোথাও যাব না, এখানেই কাজ আমাদের, আমি জনগণের শত্রু হতে পারি কিন্তু আমার অনেক বন্ধু।
কলকাতায় বৃষ্টি

সত্যজিৎ রায়।

ক্যামেরার চোখ এবার সচল হয়। ড্রয়িং রুম পার হয়ে ঢুকে পড়ে চেম্বারের কুঠুরিতে, সাজানো দৃশ্যমান জীবনের পাশেই অলক্ষ্যে থাকা মনের মতো, সেখানে সেই টেবিলের ওপর স্থির হয়, সেখানে সংযোগের যন্ত্র ল্যাণ্ড ফোন আর হৃদস্পন্দন অনুভবের স্টেথোস্কোপের মাঝে চলে এসেছে অপরিশোধিত জল নাকি চরণামৃতের শিশি, দ্বিবিধ বিশ্বাসের রূপ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে, ওপরে দেখা যায় টেবিল ল্যাম্প, আধুনিকতার আলোর নিচেই সব একাকার হয়ে যেতে চায়।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content