
বাসায় শঙ্খচিল। ছবি: সংগৃহীত।
হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে,…”
কবি জীবনানন্দ দাশের এ স্বপ্ন মনে হয় আজ বাংলার সমস্ত প্রকৃতিপ্রেমিক, সমস্ত পক্ষিপ্রেমিকের স্বপ্ন। কারণ এই শস্যশ্যামলা বঙ্গভূমির সুনীল আকাশ থেকে শঙ্খচিলেরা মনে হয় সত্যিই হারিয়ে গিয়েছে। তাই পরজন্মে শঙ্খচিল হয়ে ফিরতে পারলে কী ভালোই না হত! আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলে খুব ছোটো বেলা এদের দেখেছি। আজকাল আর দেখতে পাই না। ‘Chill’ হয়ে গিয়েছে চিলেদের আকাশ! তাই ওরা এখন আমার কাছে মন খারাপ করা কিছু স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নয়।
ছোটবেলা থেকে সুন্দরবন এলাকায় দেখে আসা আরও এক ধরণের চিল আমার স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল— যার নাম ভুবন চিল। ছোটোবেলায় দেখেছি সুন্দরবন অঞ্চলের প্রায় সব পরিবারেই মুরগি পালন করা হত মূলত ডিমের জন্য। সেই সময় উন্নত জাতের বিদেশি ব্রিডের প্রচলন আমাদের এলাকায় হয়নি। তাই দেশি ব্রিড পালন করা হত। দেশি ব্রিডের মুরগি ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা হলে মা মুরগি বাচ্চাদের নিয়ে যখন ঘুরতে বেরোত তখন বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে বিপদ ছিল ওই ভুবন চিল। তক্কে তক্কে থাকত।
আমাদের অর্জুন বা শিরীষ বা মেহগিনি গাছে পাতার আড়ালে বসে লক্ষ্য রাখত আর সামান্য অসতর্কতার সুযোগে ছোঁ মেরে বাচ্চা নিয়ে পালাত। এরা আজও বাংলার আকাশ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। গত সেপ্টেম্বর মাসে ট্রেন ধরার জন্য সন্ধ্যের একটু আগে যাদবপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎই চোখ পড়ে গেল পশ্চিমের সিঁদুর-রঙা আকাশে। দেখি গোল হয়ে চক্কর খাচ্ছে দীর্ঘদিন আমার চোখে না-পড়া ভুবন চিলের একটা দল। সাতটা চিল—গোল হয়ে, মৃদুমন্দ গতিতে, দু’দিকে ডানা ছড়িয়ে। কাছে ক্যামেরা ছিল না। তাই আকাশের রক্তিম ক্যানভাসে আঁকা প্রকৃতির সে মনোরম দৃশ্যের ছবি তুলে নিলাম আমার মনের ক্যামেরায়। সুন্দরবন এলাকায় আমার দেখা এই দু’রকম চিলের কথাই জানি—ভুবন চিল আর শঙ্খচিল।
ভুবন চিল হল মাঝারি সাইজের শিকারি পাখি। লম্বায় প্রায় ৪৭-৫৫ সেন্টিমিটার। ওজন হয় কম-বেশি ৪৫০ গ্রাম। স্ত্রী ও পুরুষ ভুবন চিল দেখতে একইরকম হলেও স্ত্রী পাখির আকার পুরুষের তুলনায় সামান্য বড়ো। পিঠের রং কালচে-বাদামি। ঘাড় ও মাথা বাদামি। বুক আর পেট ফ্যাকাশে বাদামি। ডানার প্রান্তের বড়ো পালকের রং কালো। ওড়ার সময় দেখা যায় ডানার তলার রঙ সাদা। এদের কালো রঙের চঞ্চুর আগাটা বঁড়শির মতো বাঁকা। চোখের রং বাদামি, আর নাকের গোড়ায় সিরি (Cirri)-র রং হলুদ। পায়ের রং হলুদ হলেও বাদামি পালকে ঢাকা। অপরিণত ভুবন চিলের রঙ একটু আলাদা—গায়ে সাদাটে বা হলদেটে হালকা ডোরা দেখা যায়। তবে ভুবন চিলেদের চেনার সবচেয়ে আদর্শ বৈশিষ্ট্য হল কালচে-বাদামি রঙের লম্বা ও আগার দিকে চেরা লেজ।

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?
ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চার লালন-পালনের দায়িত্ব স্ত্রী ও পুরুষ সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। ৩০-৩৪ দিন পর ডিম ফুটে ছানারা বেরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে দেখা যায় বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। এই মারামারিতে কখনও কখনও দুর্বল বাচ্চা মারাও যায়। প্রায় দু’মাস বয়স পর্যন্ত ওরা মা-বাবার তত্ত্বাবধানে থাকে। তারপর আকাশে যখন জলভরা মৌসুমী মেঘের আনাগোনা শুরু হয় তখন ওরা আকাশে ডানা মেলে।
যদিও ‘IUCN’ জানাচ্ছে যে ভুবন চিল ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত পাখি, কিন্তু বাস্তবে দেখছি এদের সংখ্যা যথেষ্ট কমেছে। কমে যাওয়ার প্রধান কারণ কৃষিজমিতে কীটনাশকের বহুল ব্যবহার। কীটনাশকের প্রয়োগে ধানজমিতে প্রচুর মাছ, ব্যাঙ, সাপ মারা যায়। আর এরা এইসব মরা প্রাণী খেতে পছন্দ করে। ফলে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এরা মারা যাচ্ছে। তাছাড়া বট, অশ্বত্থ, পাকুড় ইত্যাদি বড় বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াও একটা কারণ। ওরা বাসস্থান হারিয়েছে। বর্তমানে পোলট্রিতে ব্রয়লার মুরগি পালনের জন্য প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। জৈব বিবর্ধনের (Biomagnification) মাধ্যমে মাছের মধ্যেও প্রচুর ‘DDT’ জমা হচ্ছে। আর ভুবন চিলেরা মাছ ও মাংসের দোকানের এই সব বিষাক্ত বর্জ্য খেয়ে রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে ও বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া শহরে ইলেকট্রিকের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েও কিছু ভুবন চিল মারা যাচ্ছে। আর এর ফলে ভুবন চিলের জন্য ভুবনটা ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে।
শঙ্খচিল:
জীবনানন্দ দাশ তাঁর “হায় চিল” কবিতায় লিখেছেন—
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!”

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল
রূপে শঙ্খচিল সত্যিই অসাধারণ। মাথা, গলা, বুক ও পেটের রং দুধ-সাদা। আর তার উপর যেন তুলির মরচে-রঙা আঁচড়। সাদা রঙের মাথা, গলা, বুক ও পেট নিয়ে এই অংশের আকার শাঁখের মতো বলেই মনে হয় নাম হয়েছে শঙ্খচিল। পিঠের রঙ মরচে-লাল। ডানার উড্ডয়ন পালকের রঙ কালো, তবে ডানার তলার পালক সাদা। এদের চঞ্চু ভুবন চিলের থেকে একটু ছোট হলেও গঠন একইরকম। আর চঞ্চুর রং সাদা। আকারেও এরা প্রায় ভুবন চিলের মতোই। আর পুরুষের চেয়ে স্ত্রী আকারে সামান্য বড়ো। তবে ভুবন চিলের সাথে বড়ো পার্থক্য হল লেজের গঠনে। খয়েরি রঙের লেজের প্রান্ত গোল, ভুবন চিলের লেজের মতো দ্বিখন্ডিত নয়। এদের লেজ ও ডানার দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হয়।
শঙ্খচিলের প্রিয় খাবার হল মাছ। জলের উপর থেকে ছোঁ মেরে মাছ ধরতে এরা খুব পটু। কাঁকড়াও এদের প্রিয় খাবারের মধ্যে পড়ে। তাই পুকুর, নদী ও সমুদ্র উপকূলে এদের ভীড় বেশি। অনেক সময় নদীতে বা উপকূলে মাছ ধরা ট্রলারের পিছু পিছু এদের উড়তে দেখা যায়। অবশ্য স্থলভাগ থেকে গিরিগিটি, ব্যাঙ, সাপ, পোকামাকড়, এমনকি হাঁস-মুরগির ছানাও ধরে খেতে দেখা যায়। বর্ষার পর মাটি থেকে যখন ডানাওয়ালা উইপোকারা ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এসে আকাশে ওড়ে তখন ভুবন চিল ও শঙ্খচিলরা মহানন্দে উইপোকা ধরে ভোজন করে। এরা অন্য মাছ-খেকো পাখিদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের মাছ কেড়ে খেতে ওস্তাদ। কখনও কখনও মাছ ধরার সময় এরা জলেও নেমে যায় এবং সাঁতার কাটে।

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত
পাখি হিসেবে শঙ্খচিল রয়েছে খুব সম্মানের স্থানে। পুরাণে ভগবান বিষ্ণুর বাহন হিসেবে গরুড় পাখির উল্লেখ আছে। আর পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী গরুড়ের যা বিবরণ দেওয়া আছে বা প্রাচীন চিত্রকররা গরুড়ের যে চিত্র এঁকেছেন তা শঙ্খচিলের সাথে হুবহু মিলে যায়। সুতরাং পুরাণের গরুড় যে আদপে শঙ্খচিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। গ্রিক পুরানেও দেখা গিয়েছে, অনেক রাজা শত্রুর চোখে ধোঁকা দিতে চিলের ছদ্মবেশ ধারণ করত। আবার ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক হল এই শঙ্খচিল। প্রাচীনকালে মিশর ও আফ্রিকার বহু উপজাতির মানুষ রাজ-প্রতীক হিসেবে এই চিলের ছবি ব্যবহার করেছে। জাপানে শঙ্খচিল হল সৌভাগ্যের প্রতীক। যুদ্ধের আগে চিলের পায়ে ধনুক ছোঁয়াতে পারলে নাকি যুদ্ধজয় অবশ্যম্ভাবী।
সুন্দরবনের বসতি এলাকায় ভুবন চিলের সংখ্যা যে কারণে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, সেই একই কারণে সুন্দরবনের আকাশ থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছে শঙ্খচিলের সুতীক্ষ্ণ চীৎকার ‘কিঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ কিঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ’। প্রকৃতির এই অনুপম সৃষ্টিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে মানুষের অবিবেচনা আর উপেক্ষা। —চলবে।


















