শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

বাসায় শঙ্খচিল। ছবি: সংগৃহীত।

“আবার আসিব ফিরে, ধানসিড়িটির তীরে—এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে,…”


কবি জীবনানন্দ দাশের এ স্বপ্ন মনে হয় আজ বাংলার সমস্ত প্রকৃতিপ্রেমিক, সমস্ত পক্ষিপ্রেমিকের স্বপ্ন। কারণ এই শস্যশ্যামলা বঙ্গভূমির সুনীল আকাশ থেকে শঙ্খচিলেরা মনে হয় সত্যিই হারিয়ে গিয়েছে। তাই পরজন্মে শঙ্খচিল হয়ে ফিরতে পারলে কী ভালোই না হত! আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলে খুব ছোটো বেলা এদের দেখেছি। আজকাল আর দেখতে পাই না। ‘Chill’ হয়ে গিয়েছে চিলেদের আকাশ! তাই ওরা এখন আমার কাছে মন খারাপ করা কিছু স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নয়।

ছোটবেলা থেকে সুন্দরবন এলাকায় দেখে আসা আরও এক ধরণের চিল আমার স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল— যার নাম ভুবন চিল। ছোটোবেলায় দেখেছি সুন্দরবন অঞ্চলের প্রায় সব পরিবারেই মুরগি পালন করা হত মূলত ডিমের জন্য। সেই সময় উন্নত জাতের বিদেশি ব্রিডের প্রচলন আমাদের এলাকায় হয়নি। তাই দেশি ব্রিড পালন করা হত। দেশি ব্রিডের মুরগি ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা হলে মা মুরগি বাচ্চাদের নিয়ে যখন ঘুরতে বেরোত তখন বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে বিপদ ছিল ওই ভুবন চিল। তক্কে তক্কে থাকত।
আমাদের অর্জুন বা শিরীষ বা মেহগিনি গাছে পাতার আড়ালে বসে লক্ষ্য রাখত আর সামান্য অসতর্কতার সুযোগে ছোঁ মেরে বাচ্চা নিয়ে পালাত। এরা আজও বাংলার আকাশ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। গত সেপ্টেম্বর মাসে ট্রেন ধরার জন্য সন্ধ্যের একটু আগে যাদবপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎই চোখ পড়ে গেল পশ্চিমের সিঁদুর-রঙা আকাশে। দেখি গোল হয়ে চক্কর খাচ্ছে দীর্ঘদিন আমার চোখে না-পড়া ভুবন চিলের একটা দল। সাতটা চিল—গোল হয়ে, মৃদুমন্দ গতিতে, দু’দিকে ডানা ছড়িয়ে। কাছে ক্যামেরা ছিল না। তাই আকাশের রক্তিম ক্যানভাসে আঁকা প্রকৃতির সে মনোরম দৃশ্যের ছবি তুলে নিলাম আমার মনের ক্যামেরায়। সুন্দরবন এলাকায় আমার দেখা এই দু’রকম চিলের কথাই জানি—ভুবন চিল আর শঙ্খচিল।
ভুবন চিল: প্রথমে বলি ভুবন চিলের কথা। এই চিলকে ইংরেজিতে বলে ‘Black kite’। আর তাই বাংলায় কেউ কেউ কৃষ্ণবর্ণ চিল বলে থাকে। তবে সাধারণ মানুষ এদের শুধু চিল নামে ডাকতেই অভ্যস্ত। ভুবন চিলের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Milvus migrans’। দুই মেরু আর দুই আমেরিকা মহাদেশ বাদে পৃথিবীর সর্বত্রই এদের পাওয়া যায়। তবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এদের ভিন্ন ভিন্ন উপ-প্রজাতি মেলে। সুন্দরবন তথা ভারতে ভুবন চিলের যে উপ-প্রজাতির দেখা মেলে তা হল ‘গোবিন্দ’ (Milvus migrans govinda)।

ভুবন চিল হল মাঝারি সাইজের শিকারি পাখি। লম্বায় প্রায় ৪৭-৫৫ সেন্টিমিটার। ওজন হয় কম-বেশি ৪৫০ গ্রাম। স্ত্রী ও পুরুষ ভুবন চিল দেখতে একইরকম হলেও স্ত্রী পাখির আকার পুরুষের তুলনায় সামান্য বড়ো। পিঠের রং কালচে-বাদামি। ঘাড় ও মাথা বাদামি। বুক আর পেট ফ্যাকাশে বাদামি। ডানার প্রান্তের বড়ো পালকের রং কালো। ওড়ার সময় দেখা যায় ডানার তলার রঙ সাদা। এদের কালো রঙের চঞ্চুর আগাটা বঁড়শির মতো বাঁকা। চোখের রং বাদামি, আর নাকের গোড়ায় সিরি (Cirri)-র রং হলুদ। পায়ের রং হলুদ হলেও বাদামি পালকে ঢাকা। অপরিণত ভুবন চিলের রঙ একটু আলাদা—গায়ে সাদাটে বা হলদেটে হালকা ডোরা দেখা যায়। তবে ভুবন চিলেদের চেনার সবচেয়ে আদর্শ বৈশিষ্ট্য হল কালচে-বাদামি রঙের লম্বা ও আগার দিকে চেরা লেজ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা

ভুবন চিলেদের বেশি দেখা যায় শহর এলাকায়। তবে জলাশয় বা নদীর ধার, খোলা মাঠ, পাহাড়ি এলাকা, গ্রামাঞ্চল—প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়। সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ এলাকায় কিন্তু এদের যথেষ্ট সংখ্যায় দেখা যায়। এরা সাধারণত দল বেঁধে গাছে বাস করে। সূর্য ওঠার পর ওরা দল বেঁধে আকাশে কিছুক্ষণ চক্কর খায়। তারপর বেরিয়ে পড়ে শিকারের সন্ধানে। শিকারের তালিকায় রয়েছে জীবিত ও মৃত প্রাণী এবং মাছ ও মাংসের দোকানের বর্জ্য। জলাশয় বা নদীর কাছে যারা থাকে তাদের প্রধান খাবার হল মাছ—সে জ্যান্ত বা মরা যাই-ই হোক না কেন। এজন্য মৎস বন্দরের কাছে বেশি দেখা যায় ভুবন চিলদের। কাকদ্বীপ ও ফ্রেজারগঞ্জ মৎস বন্দরের আকাশে বছর খানেক আগে ওদের উড়তে দেখেছি। ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি, গিরগিটি, সাপ, ছোট পাখি, পাখির বাচ্চা, পোকামাকড়—কোনও কিছুই বাদ যায় না এদের খাবারের তালিকা থেকে। শহরের জনবহুল রাস্তায় কোনও মরা ইঁদুর, সাপ, ব্যাঙ বা পাখি পড়ে থাকলে চলন্ত যানবাহন ও ইলেকট্রিকের তার এড়িয়ে অসামান্য দক্ষতায় এরা ছোঁ মেরে খাবার তুলে নিয়ে যায়। গ্রামাঞ্চলে মুরগি ও হাঁসের ছানা চুরি করার ক্ষেত্রে এরা শিকরে বাজের মতোই চতুর। অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় এরা মুরগি ও হাঁসের ছানা ছোঁ মেরে নিয়ে পালায় নিজের বাচ্চাদের খাওয়াবে বলে। গ্রামের দিকে পুকুর সেচার সময়ও এদের আকাশে চক্কর খেতে দেখা যায়। জল কমে এলে ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিয়ে পালায়। ১০০০-১৫০০ মিটার ওপর থেকেও এরা শিকারকে অব্যর্থভাবে নিশানা করতে পারে—এতটাই প্রখর ওদের দৃষ্টি শক্তি। সূর্য ডোবার আগে ওরা ফিরে আসে ওদের আস্তানায়। গাছে বসার আগে সকালবেলার মতোই বেশ কিছুক্ষণ চক্রাকারে দল বেঁধে চক্কর দিয়ে তারপর গাছে গিয়ে বসে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?

ভুবন চিলের ডাক খুব তীক্ষ্ণ—কিউইইইইইই-উই-উই-উই-উই। অনেক দূর থেকে এই ডাক শোনা যায়। এদের প্রজনন ঋতু সাধারণত শীতকাল। ভারতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে স্ত্রী ও পুরুষ ভুবন চিলকে প্রজননে লিপ্ত হতে দেখা যায়। প্রজননের সময় পুরুষ চিল দূর থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্ত্রী চিলের পিঠে। যদিও পুরুষ ও স্ত্রী ভুবন চিল জোড়ায় থাকে তবে স্ত্রী চিলকে বহুগামী হতেও দেখা যায়। সঙ্গী পুরুষ চিলের অনুপস্থিতির সময় অন্য পুরুষ চিল এসে যৌন মিলনে লিপ্ত হয়। আর সঙ্গী পুরুষ চিল একটি প্রজনন ঋতুতে একাধিকবার স্ত্রী চিলের সাথে যৌন মিলন করে। পুরুষ ও স্ত্রী একসাথে বাসা বানায় কোনও উঁচু গাছের ডালে। শুকনো ডালপালা দিয়ে বানানো বাসা দেখতে মোটেই খাসা হয় না। বড্ড অগোছালোভাবে বানানো। তা বলে বাসা যে খুব পলকা তা নয়। বাসা বানাতে এরা ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, ছেঁড়া কাগজ, ছেঁড়া প্লাস্টিক বা পলিথিন, গোবর বা কাদার শুকনো দলা, পাখির পালক ইত্যাদিও ব্যবহার করে। দেখা গিয়েছে একটা বাসা টানা কয়েক বছর ধরে ওরা প্রজননের জন্য ব্যবহার করে। অন্য কোনও চিলকে তাদের বানানো বাসা ব্যবহার করতে দেয় না। জোর করে কেউ দখল করতে এলে রীতিমতো তাড়া করে। স্ত্রী ভুবন চিল বাসায় ২-৩টি ডিম পাড়ে।

ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চার লালন-পালনের দায়িত্ব স্ত্রী ও পুরুষ সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। ৩০-৩৪ দিন পর ডিম ফুটে ছানারা বেরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে দেখা যায় বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। এই মারামারিতে কখনও কখনও দুর্বল বাচ্চা মারাও যায়। প্রায় দু’মাস বয়স পর্যন্ত ওরা মা-বাবার তত্ত্বাবধানে থাকে। তারপর আকাশে যখন জলভরা মৌসুমী মেঘের আনাগোনা শুরু হয় তখন ওরা আকাশে ডানা মেলে।
যদিও ‘IUCN’ জানাচ্ছে যে ভুবন চিল ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত পাখি, কিন্তু বাস্তবে দেখছি এদের সংখ্যা যথেষ্ট কমেছে। কমে যাওয়ার প্রধান কারণ কৃষিজমিতে কীটনাশকের বহুল ব্যবহার। কীটনাশকের প্রয়োগে ধানজমিতে প্রচুর মাছ, ব্যাঙ, সাপ মারা যায়। আর এরা এইসব মরা প্রাণী খেতে পছন্দ করে। ফলে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এরা মারা যাচ্ছে। তাছাড়া বট, অশ্বত্থ, পাকুড় ইত্যাদি বড় বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াও একটা কারণ। ওরা বাসস্থান হারিয়েছে। বর্তমানে পোলট্রিতে ব্রয়লার মুরগি পালনের জন্য প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। জৈব বিবর্ধনের (Biomagnification) মাধ্যমে মাছের মধ্যেও প্রচুর ‘DDT’ জমা হচ্ছে। আর ভুবন চিলেরা মাছ ও মাংসের দোকানের এই সব বিষাক্ত বর্জ্য খেয়ে রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে ও বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া শহরে ইলেকট্রিকের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েও কিছু ভুবন চিল মারা যাচ্ছে। আর এর ফলে ভুবন চিলের জন্য ভুবনটা ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে।
শঙ্খচিল:
জীবনানন্দ দাশ তাঁর “হায় চিল” কবিতায় লিখেছেন—

“হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল

জীবনানন্দ সোনালি ডানার যে চিলের কথা বলেছেন তা হল শঙ্খচিল বা ব্রাহ্মণী চিল। ইংরেজিতে ‘Brahminy kite’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Haliastur indus’। ধানসিড়ি নদী তো বটেই, একসময় সমস্ত নদীর ঘাটের কাছে, জাহাজঘাটায়, সমুদ্র উপকূলে মৎসজীবীদের গ্রামে ঝাঁক ঝাঁক শঙ্খচিল দেখা যেত। বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জে ছোটবেলায় প্রচুর শঙ্খচিল আকাশে উড়তে দেখতাম। এখন এদের সংখ্যা কমে গিয়েছে মারাত্মকভাবে। হয়তো সঙ্গীহারা এক শঙ্খচিলের হাহাকার বিদীর্ণ করেছিল জীবনানন্দের কবি-হৃদয়। আর আজ মনে হয়, হাহাকার করার মতোও কোনও শঙ্খচিল আর অবশিষ্ট নেই এই বাংলায়। না, একেবারে হারিয়ে যায়নি শঙ্খচিল। সুন্দরবন অঞ্চলে বিশেষ করে সংরক্ষিত অরণ্য অঞ্চলে এদের এখনও দেখা যায়।
রূপে শঙ্খচিল সত্যিই অসাধারণ। মাথা, গলা, বুক ও পেটের রং দুধ-সাদা। আর তার উপর যেন তুলির মরচে-রঙা আঁচড়। সাদা রঙের মাথা, গলা, বুক ও পেট নিয়ে এই অংশের আকার শাঁখের মতো বলেই মনে হয় নাম হয়েছে শঙ্খচিল। পিঠের রঙ মরচে-লাল। ডানার উড্ডয়ন পালকের রঙ কালো, তবে ডানার তলার পালক সাদা। এদের চঞ্চু ভুবন চিলের থেকে একটু ছোট হলেও গঠন একইরকম। আর চঞ্চুর রং সাদা। আকারেও এরা প্রায় ভুবন চিলের মতোই। আর পুরুষের চেয়ে স্ত্রী আকারে সামান্য বড়ো। তবে ভুবন চিলের সাথে বড়ো পার্থক্য হল লেজের গঠনে। খয়েরি রঙের লেজের প্রান্ত গোল, ভুবন চিলের লেজের মতো দ্বিখন্ডিত নয়। এদের লেজ ও ডানার দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হয়।

শঙ্খচিলের প্রিয় খাবার হল মাছ। জলের উপর থেকে ছোঁ মেরে মাছ ধরতে এরা খুব পটু। কাঁকড়াও এদের প্রিয় খাবারের মধ্যে পড়ে। তাই পুকুর, নদী ও সমুদ্র উপকূলে এদের ভীড় বেশি। অনেক সময় নদীতে বা উপকূলে মাছ ধরা ট্রলারের পিছু পিছু এদের উড়তে দেখা যায়। অবশ্য স্থলভাগ থেকে গিরিগিটি, ব্যাঙ, সাপ, পোকামাকড়, এমনকি হাঁস-মুরগির ছানাও ধরে খেতে দেখা যায়। বর্ষার পর মাটি থেকে যখন ডানাওয়ালা উইপোকারা ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এসে আকাশে ওড়ে তখন ভুবন চিল ও শঙ্খচিলরা মহানন্দে উইপোকা ধরে ভোজন করে। এরা অন্য মাছ-খেকো পাখিদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের মাছ কেড়ে খেতে ওস্তাদ। কখনও কখনও মাছ ধরার সময় এরা জলেও নেমে যায় এবং সাঁতার কাটে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত

স্বভাবে ভুবন চিলের সাথে শঙখচিলের অনেক মিল রয়েছে। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল হল এদের প্রজনন ঋতু। এই সময় স্ত্রী ও পুরুষ শঙ্খচিল দুজনে মিলে ভুবন চিলের মতো উঁচু বৃক্ষের মাথায় বাসা বাঁধে। স্ত্রী চিল দুটি ডিম পাড়ে। ডিমের রঙ ধুসর, আর তাতে সাদা ছিট থাকে। ডিমে তা দেয় কিন্তু কেবল স্ত্রী শঙ্খচিল। যদিও বাচ্চার লালন-পালনের দায়িত্ব স্ত্রী ও পুরুষ সমান ভাবে পালন করে। ২৬-২৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। বাচ্চার গায়ের রঙ বাদামি। শঙ্খচিলের বাচ্চাদের একটা ভারি মজার খেলা খেলতে দেখা যায়। যখন ওরা সবে উড়তে শেখে তখন গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে নিচে ফেলে দেয় আর পরক্ষণেই তা ছোঁ দিয়ে ধরে। এভাবেই ওরা শিকার ধরার অনুশীলন সেরে নেয়।

পাখি হিসেবে শঙ্খচিল রয়েছে খুব সম্মানের স্থানে। পুরাণে ভগবান বিষ্ণুর বাহন হিসেবে গরুড় পাখির উল্লেখ আছে। আর পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী গরুড়ের যা বিবরণ দেওয়া আছে বা প্রাচীন চিত্রকররা গরুড়ের যে চিত্র এঁকেছেন তা শঙ্খচিলের সাথে হুবহু মিলে যায়। সুতরাং পুরাণের গরুড় যে আদপে শঙ্খচিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। গ্রিক পুরানেও দেখা গিয়েছে, অনেক রাজা শত্রুর চোখে ধোঁকা দিতে চিলের ছদ্মবেশ ধারণ করত। আবার ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক হল এই শঙ্খচিল। প্রাচীনকালে মিশর ও আফ্রিকার বহু উপজাতির মানুষ রাজ-প্রতীক হিসেবে এই চিলের ছবি ব্যবহার করেছে। জাপানে শঙ্খচিল হল সৌভাগ্যের প্রতীক। যুদ্ধের আগে চিলের পায়ে ধনুক ছোঁয়াতে পারলে নাকি যুদ্ধজয় অবশ্যম্ভাবী।

সুন্দরবনের বসতি এলাকায় ভুবন চিলের সংখ্যা যে কারণে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, সেই একই কারণে সুন্দরবনের আকাশ থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছে শঙ্খচিলের সুতীক্ষ্ণ চীৎকার ‘কিঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ কিঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ’। প্রকৃতির এই অনুপম সৃষ্টিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে মানুষের অবিবেচনা আর উপেক্ষা। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content