
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
জ্যৈষ্ঠ জরিতারি অগ্নি বন্দনা শুরু করলেন— হে অগ্নি, আপনি (আকাশসম্ভূত) বায়ুর পুত্র, আপনি উজ্জ্বল ঔষধিদের শরীর, পৃথিবীর কারণরূপ জল আপনারই বীর্য, তাই আপনি জলের কারণ। আত্মাসি বায়োর্জ্বলন! শরীরমসি বীরুধাম্। যোনিরাপশ্চ তে শুক্রং যোনিস্ত্বমসি চাম্ভসঃ।। জরিতারি অগ্নির সর্বব্যাপী রূপটি বর্ণনা করলেন, মহাতেজস্বী অগ্নির সূর্যরশ্মিতুল্য শিখা ঊর্ধ্ব, অধ,পৃষ্ঠ ও পার্শ্বদেশে প্রসারিত। এরপরে সারিসৃক্কর স্তুতিতে ছিল কাতর অনুনয়ের সুর। পক্ষিশাবকদের মা অদৃশ্য হয়েছেন, পিতাও তাদের অজ্ঞাত, শাবকদের পাখাও হয়নি। অগ্নি ভিন্ন তাদের কোন পরিত্রাতাও নেই। ধূমকেতু অগ্নির কাছে, আকুল আবেদন জানাল সারিসৃক্ক, বালকমাত্র এই শাবকদের রক্ষা করুন অগ্নিদেব। সাতটি শিখাবিশিষ্ট অগ্নি, মঙ্গলময় রূপ ধারণ করে, শরণার্থী আর্ত পক্ষিশাবকদের রক্ষা করুন। বেদ, অগ্নি হতে জাত তাই তিনি জাতবেদা। সকল তপস্যাই অগ্নিদেবের উদ্দেশে নিবেদিত, তাই পৃথিবীতে অগ্নি ভিন্ন অন্য কোনও তপস্বী নেই। অগ্নি বালক ঋষিদের রক্ষা করুন। হব্যবাহ অগ্নি পরম পালকরূপে শাবকদের বন্ধুতুল্য রক্ষক হন।
কনিষ্ঠ দ্রোণের কণ্ঠে ব্যাকুলতা — হে ভুবনেশ্বর, আপনি প্রাণীদের গৃহীত অন্ন এবং আপনি তাদের অন্তর্নিহিত জীবাত্মা। আপনাতেই নিত্য বিদ্যমান প্রবীণতম, নিয়ত সংহারকারী, কাল। ত্বমন্নং প্রাণিভির্ভুক্তম্ অন্তর্ভূতো জগৎপতে!। নিত্যং প্রবৃদ্ধঃ পচসি ত্বয়ি সর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতম্।। অগ্নিদেব স্বয়ং সূর্য হয়ে কিরণের দ্বারা মৃত্তিকা হতে জল ও পার্থিব রসসমূহ গ্রহণ করে, কালক্রমে বৃষ্টির সাহায্যে এখানেই (শস্য) উৎপাদন করে থাকেন। অগ্নিদেব হতেই হরিদ্বর্ণপত্রবিশিষ্ট লতা, জলাশয়গুলি, প্রাণীদের হিতকর মহাসমুদ্রের উদ্ভব হয়েছে। আর্ত ভীত দ্রোণ, তীক্ষ্ণকিরণ অগ্নিকে, আকুল আবেদন জানালেন, এই মহাসমুদ্র, বরুণদেবের পরমাশ্রয়।অগ্নি পক্ষিশাবকদের মঙ্গলময় পরিত্রাতা হোন, তাদের তিনি যেন আজ ধ্বংস না করেন। দ্রোণের প্রার্থনা — হে কৃষ্ণমার্গানুসারী পিঙ্গলচক্ষু, লোহিতকণ্ঠ হুতাশন, অপরকে দগ্ধ করবার উদ্দেশে প্রস্থান করুন, আর সাগরের অভ্যন্তরস্থ গর্তের মতো আমাদেরকে মুক্তি দিন। পিঙ্গাক্ষ! লোহিতগ্রীব! কৃষ্ণবর্ত্মন্! হুতাশন!। পরেণ প্রৈহি মুঞ্চাস্মান্ সাগরস্য গৃহানিব।।
ব্রহ্মবাদী দ্রোণের এমন বক্তব্যের উত্তরে পরিতুষ্ট জাতবেদা অগ্নি, শাবকদের পিতা মহর্ষি মন্দপালের কাছে তাঁর প্রতিজ্ঞার বৃত্তান্ত বললেন। অগ্নি বললেন, পক্ষিশাবকরা অগ্নির উদ্দেশে ব্রহ্মত্বপ্রতিপাদক বাক্য বলেছেন। অগ্নিদেব তাদের ইচ্ছা পূরণ করবেন,তাদের আর কোন ভয় নেই। ঋষি মন্দপাল পূর্বে তাঁর সন্তানদের বিষয়ে এই মর্মে অনুরোধ করেছিলেন যে বনদহনের সময়ে যেন অগ্নিদেব তাদের রেহাই দেন। তাঁর সেই বচন এবং তাঁর সন্তানরা এখানে যা বলল,অগ্নির কাছে সেগুলির গুরুত্ব অনেক বেশি। তাদের জন্যে তিনি কী করতে পারেন? কিং করবাণি তে। অগ্নিদেব এই দ্বিজশ্রেষ্ঠর স্তুতিতে আনন্দিত হয়েছেন। তিনি শাবকদের মঙ্গল কামনা করেন। দ্রোণ বললেন, এই বিড়ালগুলি আমাদের বড়ই উদ্বেগ সৃষ্টি করে। হুতাশন যেন সপরিবারে তাদের দগ্ধ করেন। অগ্নি, খঞ্জনশাবকদের অনুরোধ রক্ষা করে সেটাই করলেন। উদ্দীপ্ত অগ্নি খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করতে লাগলেন।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৮: সত্যনিষ্ঠতার মাপকাঠি কী নাস্তিকতার নিরিখে বিচার্য?

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০২: শ্রীমার অন্তিম সময়কালীন ভবিষ্যবাণী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬২: এক নির্বাসিত রাজপুত্রের কথা
ঋষি যেমন বলছেন, পুত্রদের তেমন ভয়ের সম্ভাবনা নেই। তারা সব তেজস্বী, শক্তিমান। অগ্নি হতে তাদের কোন ভয় নেই। ঋষি স্বয়ং লপিতাকে পুত্রদের রক্ষণোপায়বিষয়ে জানিয়েছিলেন। অগ্নিদেব যে মহাত্মা মন্দপালের কাছে মুনি পুত্রদের রক্ষার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন। লোকপালক অগ্নি প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিথ্যা বলবেন না। পুত্ররা গমনে সক্ষম। কাজেই ঋষির মন শান্ত হোক। লপিতা ঋষি মন্দপালকে, তীব্র বাক্যবাণে বিদ্ধ করলেন। ঋষি নিশ্চয়ই লপিতার সতীনের (জরিতা) বিষয়ে চিন্তা করে মনে মনে পরিতাপ করছেন। ঋষি সেই পূর্বের দাম্পত্যসম্পর্কে যতটা স্নেহশীল ছিলেন এখন লপিতার প্রতি ততটা নন। এক নারীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব রয়েছে আর শুভাকাঙ্ক্ষিনী অন্যের প্রতি স্নেহের অভাব, এমন পুরুষ যিনি পূর্ব রমণীর কাছে যেতে সক্ষম, তাঁর বর্তমান দ্বিতীয়া নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা উচিত নয়। সেই জরিতা যার জন্যে ঋষির এত মনোবেদনা, মন্দপাল বরং তার কাছেই যান।
লপিতা জানালেন, চরিষ্যাম্যহমপ্যেকা যথা কুপুরুষাশ্রিতা। আমি কদর্যপুরুষাশ্রিত একাকিনী নারীর মতোই বিচরণ করব। মন্দপাল লপিতাকে বুঝিয়ে বললেন, লপিতা যেমন বলছে সেই ভাবে ঋষি বিচরণ করেন না। সন্তানদের জন্যেই তাঁর এই বিচরণ, ঋষি তাদের অনেক কষ্ট করে লাভ করেছেন। অতীতকে পরিত্যাগ করে যিনি ভবিষ্যৎকে অবলম্বন করেন তাঁর বুদ্ধি অল্প। এমন ব্যক্তিকে মানুষ অবজ্ঞা করে। তাই মহর্ষি লপিতাকে বললেন, যথেচ্ছসি তথা কুরু যা ইচ্ছে তাই কর। তিনি আরও জানালেন, প্রজ্বলিত এই অগ্নি লেলিহানশিখায় মহীরুহগুলিকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছেন। ঋষির উদ্বিগ্ন চিত্তে অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বামীর কথা শুনে লপিতা ব্যথিতা হল। সে স্বামীকে আবারও সান্ত্বনা দিতে লাগল। ওদিকে অগ্নি সেই জায়গা থেকে অতিক্রান্ত হলে, পুত্রস্নেহাতুরা জরিতা দ্রুত তার শাবকদের কাছে উপস্থিত হল। সে, অগ্নির কবল থেকে মুক্ত, ভীষণ ক্রন্দনরত সুস্থ পুত্রদের দেখল। তাদের দেখে, বার বার জরিতার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে, একেকজন করে প্রণত পুত্রদের সবাইকে ডেকে নিয়ে, কাছে টেনে নিল। তারপরে মহর্ষি মন্দপাল হঠাৎ সেখানে হাজির হলেন। সেই পুত্ররা কিন্তু তখন তাঁকে সম্মান জানাল না। মন্দপাল ঋষি, বার বার জরিতা ও একে একে পুত্রদেরকে নানা কথা বললেন, তখন তারা কিন্তু ঋষিকে ভাল বা মন্দ কিছুই বলল না। জরিতার উদ্দেশে ঋষি বললেন, জ্যেষ্ঠ কে? কে তার অনুজ? কে মধ্যম (তৃতীয়)? তাঁর থেকে কনিষ্ঠই বা কে? দুঃখার্ত ঋষিকে প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন না কেন? সপুত্র জরিতাকে পরিত্যাগ করেও ঋষি এখান থেকে অন্যত্র কোথাও শান্তি লাভ করেননি। জরিতা বললেন, জ্যেষ্ঠকে দিয়ে কোন কাজ হবে?দ্বিতীয়কে?মধ্যমকে (তৃতীয়)? কনিষ্ঠকে দিয়েই বা কোন কাজ হবে?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৩: পরেশের পরশপাথর
মহর্ষি মন্দপাল পুত্রদের জানালেন, পুত্রদের মুক্তির জন্য অগ্নিদেবের প্রতি তাঁর অনুরোধটি অগ্নিদেব অনুমোদন করেছিলেন। অগ্নির বচনে,মায়ের ধার্মিকতায় ও পুত্রদের শৌর্যের প্রভাবের ওপরে আস্থা রেখে, মুনি পূর্বে এখানে আসেননি। পুত্রদের কাছে ঋষির অনুরোধ, পিতার প্রতি তারা মনে যেন কোনঅ ক্ষোভ না রাখে। অগ্নিদেব তাদের ঋষি ও ব্রহ্মজ্ঞানী — এই পরিচয় জেনেছেন। পুত্রদের আশ্বস্ত করে সপুত্র পত্নীকে নিয়ে অন্য দেশে প্রস্থান করলেন মন্দপাল ঋষি। ভগবান তিগ্মাংশু অগ্নি, প্রজ্বলিত অবস্থায় জগতের ভয় সৃষ্টি করে, কৃষ্ণ ও অর্জুনের সঙ্গে একযোগে খাণ্ডববন দগ্ধ করতে লাগলেন। বসা ও মেদের ক্ষুদ্র কৃত্রিম নদীস্রোত হতে পান করে অগ্নি পরম তৃপ্তি লাভ করে, অর্জুনকে বিষয়টি জানালেন। অন্তরীক্ষ হতে মরুদ্গণ পরিবৃত পুরন্দর ইন্দ্র অবতীর্ণ হয়ে পার্থ ও কেশবকে বললেন, দেবগণের অসাধ্য এই দুষ্কর কাজটি তাঁরা দুজনে সম্পন্ন করেছেন। ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়েছেন, মানুষের দুর্লভ বর, তাঁরা বরণ করে নিতে পারেন। পার্থ অর্জুন সমস্ত অস্ত্র প্রার্থনা করলেন। মহাপ্রভাবশালী ইন্দ্র ভবিষ্যতে কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বরদানে সম্মত হলেন। সেটি কখন? যখন মহাদেব প্রসন্ন হবেন তখন ইন্দ্র, পাণ্ডব অর্জুনকে সব অস্ত্র প্রদান করবেন। ইন্দ্র আরও জানালেন, সেই অপেক্ষিত নির্দিষ্ট কাল, তিনি জানতে পারবেন।

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২০: রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের একমাত্র তাঁকেই প্রণাম করতেন

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা
অগ্নির দহনজ্বালা থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে চার পক্ষিশাবকদের পরামর্শটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও জীবনযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য যথাযথ বলা যায়। জরিতারির দায়িত্ব, বংশের স্থায়িত্বরক্ষা। সেটি, যে কোনও জ্যেষ্ঠ অগ্রজের গুরুদায়িত্ব। তাই তিনি বিপদের সম্ভাবনামাত্র জীবনরক্ষাবিষয়ে চিন্তাশীল হয়েছেন। তার বিবেচনায় যে কোনও প্রজ্ঞাবান মানুষ আসন্ন বিপন্নতার প্রতিকারের উপায় আগেই চিন্তা করে থাকেন। কষ্ট তাঁদের মন ভেঙ্গে ফেলতে পারে না। দুঃখের অভিঘাত সহ্য করবার আগাম সহনশীলতার প্রস্তুতি নিয়েই তাঁরা জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তাই বিপদ তাঁদের মানসিক স্থৈর্য নষ্ট করতে পারে না। বিপরীতভিবে আগাম প্রস্তুতিহীন মানুষ বিপদের সম্মুখীন হওয়ামাত্র বিভ্রান্তির শিকার হন। জরিতারির জীবনবীক্ষণে রয়েছে মানবজাতির অস্তিত্বরক্ষার মূলমন্ত্র। সেই তত্ত্বচিন্তার অতলস্পর্শী গভীরতা অনুধাবন করতে পারবেন সমমনস্ক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। দ্বিতীয় পক্ষিশাবক সারিসৃক্ক। তার দায়িত্ব বংশবিস্তার। তাঁর কণ্ঠে নতিস্বীকারের ইঙ্গিত। অগ্নি যিনি বিধ্বংসী শক্তির প্রতীক, যিনি সারিসৃক্কের বংশের অস্তিত্ব মুছে দিতে ক্রমশ অগ্রসর হয়েছেন। সাধারণ মানুষ বংশলতিকার ধারা অব্যাহত রাখতে উচ্চতর শক্তির কাছে নতিস্বীকার করে থাকে। তেমনই সারিসৃক্ক, অগ্নির বিবেচনার প্রতি আস্থাশীল হয়েছেন।
তাঁর মতে, তত্ত্বজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ অগ্নির সুবিবেচিত অনুকম্পাই তাদেরর একমাত্র ভরসা। তাঁর অগ্নিস্তুতিতে আছে বিচক্ষণতা। জীবনযুদ্ধে সাফল্যের অমোঘ বাণী। তৃতীয় স্তম্বমিত্র পরনির্ভরশীল ব্যক্তিত্বের প্রতিভূ। যিনি অবলীলায় জ্যেষ্ঠর প্রতি দায়ভার অর্পণ করে নিশ্চিন্তে জীবন অতিবাহিত করেন, সে তাদের দলে। স্তম্বমিত্রের জন্যে নির্দিষ্ট ছিল তপশ্চর্যা। সংসারে এমন মানুষ আছেন যাঁদের জন্যে এই পার্থিব দৈনন্দিন জীবন নয়, তাঁরা জন্মমৃত্যুর এই সাংসারিক বৃত্তের ঊর্ধ্বে। স্তম্বমিত্রের মনোভাব, সেই নির্লিপ্ত মানুষের মতো। কনিষ্ঠ দ্রোণ আসন্ন সর্বনাশের অপেক্ষায় ভীত, সন্ত্রস্ত, হয়ে সপ্তজিহ্বাবিশিষ্ট লেলিহান শিখা বিস্তার করে অগ্রসরমান অগ্নির গতিবিধি লক্ষ্য করে চলেছে।

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ
দ্বিতীয় সারিসৃক্কের অগ্নিস্তুতিতে ছিল অগ্নির প্রতি অনুনয়মিশ্রিত সম্ভ্রম। পিতামাতা সম্মুখে উপস্থিত নেই, উড়ে যাবার পাখা নেই এমন আপাত অনাথ পক্ষিশাবকদের রক্ষকরূপে অগ্নির মঙ্গলময় রূপটির আবাহন সারিসৃক্কের প্রার্থনায় ধ্বনিত হয়েছে। অগ্নির দ্বৈত ও অদ্বৈতরূপের স্তুতি করেছেন সারিসৃক্ক। জাতবেদা অগ্নি এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি সমস্ত জগৎ জুড়ে বিরাজমান। পৃথিবীতে অগ্নিতুল্য তপ্তা অর্থাৎ তপস্বী আর কেউ নেই। প্রত্যেক জীবাত্মার অন্তর্লোকে তাঁর নিয়ত অবস্থান, তাদের জীবসত্তাকে ছাপিয়ে ওঠার সতত তপস্যা তাঁর। “তত্ত্বমসি” সেই তুমিই সে —এই শ্রুতিতে তা প্রকট। সেই প্রাণী ও বিশ্বের ধারক ও প্রতিপালকের প্রতি সারিসৃক্কের আবেদন।
যজ্ঞাগ্নির হবির্বাহক অগ্নি, জাঠরাগ্নিরূপে তাঁর জীবাত্মায় অবস্থান, পরমাত্মারূপে তাঁর সর্বাত্মক রূপ। তাই এক এবং বহু তিনি। অগ্নি ত্রিলোকস্রষ্টা, নির্দিষ্ট কালান্তরে তিনিই সংহারকর্ত্তা, প্রসূতিতুল্য পালয়িতা অগ্নি, তিনিই আশ্রয়। সেই আশ্রয়ের অনুগ্রহপ্রার্থী হয়েছেন সারিসৃক্ক। কনিষ্ঠ দ্রোণের স্তুতিতে রয়েছে অগ্নির মঙ্গলময় রূপের প্রকাশ। জাঠরাগ্নির অন্তর্গত অন্ন হলেন অগ্নি। তাই জীবাত্মার অন্তর্লীন প্রাণশক্তির উৎস অন্নময় অগ্নি। অগ্নি সেই প্রবৃদ্ধ কাল, যিনি নির্দিষ্ট সময়ান্তে নিয়ত তাঁর সৃষ্টিকে সংহার করে থাকেন। তাই তিনি সকলের আশ্রয়। দ্রোণ সেই আশ্রয়চ্যুত হওয়ার আশঙ্কায়, অগ্নির সর্বোৎপাদকরূপটি বিশদে বর্ণনা করলেন। অগ্নি সূর্য হয়ে কিরণজাল বিস্তার করে পৃথিবীর জল, মৃত্তিকাজাত রস শোষণ করে, আবার কালক্রমে বৃষ্টির ধারাবর্ষণের মাধ্যমে শস্যোৎপাদন করে থাকেন। শস্যোৎপাদনের প্রাণশক্তি বৃষ্টিধারাবর্ষণ। যার মূলে রয়েছে প্রবল উত্তাপের ফলে জলের বাষ্পীভূতরূপ। এই বৃষ্টিধারায় স্নাত হয়েই যে হরিদ্বর্ণ হয় লতা, জলাশয়গুলির সৃষ্টি হয়, জলাধিপতি বরুণের পরম আশ্রয় প্রাণিবৃন্দের মঙ্গলকর মহাসমুদ্রের উদ্ভব হয়। তাই তীক্ষ্ণরশ্মি অগ্নি, পক্ষিশাবকদের বাঁচতে দিন — অগ্নির পরিত্রাতারূপে কল্যাণময় মূর্তির কাছে আনত বিনয়ে প্রার্থনা জানিয়েছেন ব্রহ্মজ্ঞানী দ্রোণ।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
ঋষি মন্দপাল সন্তানসহ জরিতাকে পরিত্যাগ করে এসেও দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেননি। তাঁর আচরণে ক্ষিপ্ত লপিতা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঋষি মন্দপালের উদ্দেশ্য ছিল সন্তানলাভ। তাই বিপন্ন সন্তানদের অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে তাঁর হৃদয়ে প্রেম, প্রীতি,ভালবাসা মুছে গেছে।বাৎসল্যরসের উৎসারণে তিনি পুত্রস্নেহাকুলা জরিতার কাছে উপস্থিত হয়েছেন। পুত্রদের পরিচয় পর্যন্ত তিনি জানেন না। আধুনিক পৃথিবীতে নারীজাতির প্রতি তাঁর মূল্যায়ন, হয়তো সমালোচনার ঊর্দ্ধে নয়। ন স্ত্রীণাং বিদ্যতে কিঞ্চিদন্যত্র পুরুষান্তরাৎ অন্য পুরুষের আশ্রয় ভিন্ন নারীদের গর্হিত কিছুই নেই। অর্থাৎ অন্য কোনও পুরুষের আশ্রয় নৈব নৈব চ। জরিতা এবং আধুনিকতায় অভ্যস্ত অনেক নারীই জরিতার মতো সন্তানদের প্রতি একাকী অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের এই দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মানিত কুর্ণিশ। স্বামীর প্রতি সন্দেহ কদাপি নয়, অন্য নারীতে আসক্তি পুরুষের একচেটিয়া অধিকার। নারীদের ক্ষেত্রে এই আসক্তি কদাপি বাঞ্ছনীয় নয়, স্বামীর এই নারীর প্রতি আসক্তিতে আঙুল তোলাও নিষেধ। পৃথিবীখ্যাত দেবী অরুন্ধতীর সেই দোষ হয়েছিল, সেটি অবশ্য অকারণ সন্দেহের উদাহরণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সন্দেহপ্রকাশ নারীদের ক্ষেত্রে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ঋষি মন্দপালের স্বীকারোক্তিতে ছিল পুরুষালি প্রচ্ছন্ন হুমকির সুর। জরিতা, লপিতা নয় পুরুষপ্রাধান্য ছিল যুগধর্ম। যাঁর শিকার হয়েছিলেন জরিতা ও লপিতা। এই যুগধর্মের প্রভাবমুক্ত নয় আধুনিক ভারতীয়সমাজ। আজও প্রতারিতা জরিতা, লপিতার অভাব নেই, ঋষি মন্দপালের শাসানি আজকের দিনেও কান পাতলেই শোনা যায়। —চলবে।


















