একঝলকে: সিতারে জমিন পর: সবকা আপনা আপনা নর্মাল
● সিনেমা: সিতারে জমিন পর: সবকা আপনা আপনা নর্মাল
● ভাষা: হিন্দি
● পরিচালক: আরএস প্রসন্না
● প্রযোজক: আমির খান, অপর্ণা পুরোহিত
● অভিনয়: আমির খান, জেনেলিয়া দেশমুখ, ডলি আলুওয়ালিয়া, গুরপাল সিং, সিমরন মঙ্গেশকর, আয়ুষ ভনসালি, সম্বিত দেশাই, রিষভ জৈন, আশিস পেন্ডসে, ঋষি সহানি, নমন মিশ্রা, বেদান্ত শর্মা, আরুষ দত্তা, গোপী কৃষ্ণন বর্মা
● সময়: ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট
● রেটিং: ৭.৫/১০
● মুক্তি: ২০ জুন, ২০২৫
আমাদের পাড়ার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়েটিকে তাঁর মা রোজ সকালে স্কুলে নিয়ে যান, বিকেলে সম্ভবত থেরাপিতে নিয়ে যান, মেয়েটির বাবার বয়স হয়ে গিয়েছে তাই মেয়েটির দেখাশোনা মূলত তার মাকেই করতে হয়। দিনের পর দিন সেই সন্তানকে মেনস্ট্রিমে আনার চেষ্টায় বছরে কয়েকবার তার মায়ের চিৎকার শোনা যায়, ‘এই মেয়ে জন্ম দিয়ে সারাজীবন জ্বলে মরলাম’। আমরা শুনতে পাই। জানি যে, সন্তানের জন্য করতে করতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের মুখ দিয়ে তো এমন সব শব্দই বেরোবে, কিছুতেই যে চেয়েও সবকিছু নর্মাল হয় না, মেইনস্ট্রিমে আনা যায় না। কত চেষ্টা, কত ভালবাসা, কত ডাক্তার, কত থেরাপিস্ট, কত তীর্থ, কত গুরু, কত জলপড়া, তেলপড়া; কিন্তু মেইনস্ট্রিম অধরা।
এই ছবির সেই মা (ডলি আলুওয়ালিয়া) যাঁর স্বামী তাঁকে তাঁর আনুমানিক কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর বয়সে ছেড়ে চলে গেছেন? নর্মাল সন্তানের জন্য লড়তে লড়তে যাঁর জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় বেরিয়ে গিয়েছে? সন্তান বেঁটে (ছবিতে ‘টিঙ্গু’ শব্দ ব্যবহৃত) তাই সব জায়গায় বিশেষত বাস্কেট বল টিম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে মায়ের প্রত্যয় ও অনুনয়ে সে টিকে যায়, পরে নিজেই বাস্কেট বল প্রশিক্ষক হয়। সেই মা যদি আবারও পঞ্চান্ন-ষাট বছরে এসে কাউকে ভালোবাসতে চান? কারোর হাত ধরতে চান? ছবির নায়িকা ও তাঁর পুত্রবধূ সুনীতা (জেনেলিয়া দেশমুখ) তখন প্রশ্ন তোলেন অবলীলায়, মায়ের বুঝি মন থাকতে নেই? আর পুত্র গুলশন অরোরা (আমির খান) অনায়াসে বলেন, মা তো আমার টিম, মানে আমার মা (তাঁর আবার কিসের মন? কিসের ভালবাসা?), যদিও এসব শোনার পর সবাই হাসি মজায় গুলশনকে প্রায় উড়িয়ে দিয়েছেন কিন্তু পঞ্চাশ, ষাটোর্ধ্ব মানুষের পুনর্বিবাহের সিদ্ধান্ত অত সহজে ছেলে, মেয়েরা মেনে নেয় না।
সিতারে জমিন পর—সবকা আপনা আপনা নর্মাল, এ ছবি অবশ্য অন্য কথা বলে। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের আনন্দ, খুশিতে, জিতে যাওয়ায়, মিশে যাওয়ায় যে অদ্ভুত আনন্দ, নেশা, সেটা বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে। সবার বেশিটাই নর্মাল, আবার নিজস্ব যাপনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অন্যরকম ভয়, সেটা লিফটে ওঠার ক্ষেত্রে হোক কিংবা টিকটিকি, আরশোলার কিংবা প্লেনে চড়ার, তাতে কী? এতদিন কেটে গিয়েছে, বাকিটাও কেটে যাবে ভেবে সবার জীবন চলে যায়, আর সেখানেই ব্যতিক্রমী প্রযোজক আমির খান আর পরিচালক আর. এস. প্রসন্না। কেন না পারাকে মহিমান্বিত করব? কেন চেষ্টা করব না? কেন অন্যের খুশিতে খুশি হব না? জীবন তো একটাই। আর জীবনের পরীক্ষায় তো সবসময় জেতা যায় না, তাই বলে সেলিব্রেট করব না? প্রতিপক্ষ দুর্বল হলেই কি তাদের অপমান প্রাপ্য?
মূল গল্প স্প্যানিশ ছবি চ্যাম্পিয়ন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। দেশীয় ধাঁচে গল্পটি এরকম যে, দিল্লির বাস্কেট বল প্রশিক্ষক গুলশন অরোরা (আমির খান) যিনি নিজেকে ছাড়া কিছুই বোঝেন না, সবার সঙ্গে তাঁর ‘অনবন’ (মিলমিশ হয় না), স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে না পেরে মায়ের বাড়িতে পড়ে থাকেন, সিনিয়রকে থাপ্পর মেরে, মদ্যপান করে পুলিশের গাড়িতে ধাক্কা মেরে, এক রাত হাজত বাস করে, কোর্টে তাঁর কেস ওঠে; দুঁদে মহিলা জজ আদালতে গুলশনের বচসা শুনে তাঁকে সামাজিক সেবা স্বরূপ ‘সর্বোদয় সেন্টার’-এ তিন মাসের জন্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অর্থাৎ ডাক্তারি পরিভাষায় অটিজম এবং ডাউন সিনড্রোমের নয়জন ছাত্রদের, পরে অবশ্য একজন ছাত্রী যোগ দেয়, তাদের বাস্কেট বল প্রশিক্ষণ দিতে নির্দেশ দেন, কিন্তু কোর্টে বার বার তাদের ‘পাগলদের শেখাব আমি? ‘ জিজ্ঞাসা করায় গুলশনের জরিমানার মূল্য ৫০০০ টাকায় গিয়ে থামে কিন্তু জজ ম্যাডামের সিদ্ধান্ত বদল হয় না।
অগত্যা গুলশন স্যার হাজির হন সেই সেন্টারে। ডাউন সিনড্রোমের থেকেও আশ্চর্য তাদের যাপন, যা আমরা দেখতে অভ্যস্ত নই। সেন্টার যিনি চালান সর্তার (গুরপাল সিং) তিনি ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল। সবার গল্প তাঁর জানা। সবাই বাস্কেট বল অনুশীলনের পাশাপাশি কিছু না কিছু কাজ করে। প্রায় সবাই বাড়ির মানুষদের নয়নের মণি। কোচ স্যার প্রথম প্রথম এদের নিয়ে কী করব বুঝতে না পারলেও উপায়ান্তর না দেখে, বিশেষত কোর্টের অর্ডার মাথায় রেখে, তাদের প্রশিক্ষিত করতে করতে এগিয়ে যান।
নানা হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা, হাসি, মজার মধ্যে দিয়ে নিজেদের নিয়ে বেঁচে, বেঁধে থাকা, মেইনস্ট্রিমে না থেকেও আমরা সব বুঝতে পারি জানিয়ে দেওয়া, মনুষ্য জন্মে অত কিসের ইগো বলতে পারা ছাত্রদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়া স্যার তাঁদের সঙ্গে ওঠাবসা, দিন যাপনের সুবাদে প্রথম বারের জন্য খুব কাছের মানুষদের কাছে ‘সরি’ বলতে শেখেন।
সফল ছবির দাবি মেনে তাঁর ছাত্ররা বেশ কিছু ম্যাচ জিতে, সোশ্যাল মিডিযার দৌলতে জনপ্রিয় হয়ে ফাইনালে খেলতে মুম্বই যায়, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খেলে, হাসিমুখে বাড়ি ফেরা আর জীবন তো শেষ হয়ে যায়নি, আমরা আরও শিখব, আরও খেলব জাতীয় প্রত্যয়ে দর্শককে আশার বাণী শোনায়। কোচ স্যার বদলে যাবে কিন্তু গুরু-শিষ্যদের সম্পর্ক তো আর বদলাবে না! আদ্যন্ত উপভোগ্য এই ছবি স্বাধীনতার এত বছর পরেও মনের ঈশান কোণে আশার সঞ্চার করে, সবাই পারব তো? নতুন করে জানতে বুঝতে শেখার এক আদ্যন্ত ফ্যামিলি ড্রামা।
অভিনয় এই ছবির ইউএসপি। আমির খান আবারও নিজের জাত চিনিয়েছেন, জেনেলিয়া দেশমুখও যথাযথ, সুন্দর, চোখে আঙ্গুল দিয়ে অভিনয় দেখানোর কোনও প্রয়াস নেই, আশিস, আরুষ, আয়ুষ, সিমরান, গোপী সকলেই দুর্দান্ত। চিত্রনাট্য ও পরিচালনার গুণে ছবিটি অবশ্য দ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছে। সবাই নিজের নিজের তথাকথিত অ্যাবনর্মালিটি ছেড়ে একযোগে এগিয়ে যাওয়ায় বিশ্বাসী। তাতে হেরে গেলে ক্ষতি নেই, অন্য পক্ষ তো জিতেছে। ছবির দুর্বলতা গান, থাকা না থাকায় বিশেষ পার্থক্য হয় না। আর আপনারা যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে এই লড়াইয়ে সামিল, আপনাদের কথা একজন বর্ষীয়ান অভিনেতা বলতে এসেছেন, আপনারাও দেখে আসুন, আপনি বা আপনারা একা নন উপলব্ধি নিয়ে ফিরবেন। সব ছবির কাল্ট হওয়ার দরকার নেই, কিছু ছবি থাকুক শুধু মানুষের কথা বলার জন্য।
* ড. বিদিশা মিশ্র বিগত ষোলো বছর ধরে সরকারি কলেজে, বর্তমানে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিষয়— সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী বিদিশা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল —বাঙালি নৈয়ায়িক চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের গ্রন্থ ‘কাব্যবিলাস’। তাঁর এই গবেষণা ২০২১ সালে কর্ণাটকের আইএনএসসি পাবলিশিং হাউস থেকে ‘দ্য কাব্যবিলাস অফ চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য — এ ক্রিটিক্যাল স্টাডি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রদেশের পত্রিকায় তাঁর শোধপত্রগুলি প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাবধানে একাধিক স্কলার গবেষণার কাজ শেষ করেছেন। বিভিন্ন সরকারি কাজকর্ম ও অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি গুরুজি বিপ্লব মুখোপাধ্যায়ের কাছে হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল শিক্ষারতা। ভ্রমণপিপাসু বিদিশা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরেছেন, সেইসব অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com