শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

কৈকেয়ীপুত্র ভরত, জ্যেষ্ঠ রামচন্দ্রের রাজ্যাধিকার ফিরিয়ে দিতে চিত্রকূটপর্বতে অবস্থানরত অরণ্যবাসী রামচন্দ্রের কাছে সমন্ত্রী উপস্থিত হলেন। ভরত ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে গেলেন অযোধ্যায়। পিতৃশর্ত পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাম চিত্রকূটপর্বতে অবস্থানকালীন লক্ষ্য করলেন, তপস্বীরা যেন উদ্বিগ্ন ও ত্রস্ত হয়ে আছেন। চিত্রকূটের নিকটস্থ আশ্রমের তাপসেরা যাঁরা রামকে আশ্রয় করে ব্যস্ত ছিলেন তাঁরা যেন উৎকণ্ঠিত বোধ করছেন। তাঁদের দৃষ্টি ও ভ্রূভঙ্গীতে ভয়ের চিহ্ন, তাঁরা যেন রামকে লক্ষ্য করে কোনও পারস্পরিক গোপন কথোপকথনে ব্যস্ত।

তাঁদের উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করে রাম শঙ্কিত হয়ে, করজোড়ে কুলপতি ঋষিকে বললেন, তাঁর পূর্ব আচরণের বিপরীত কোনও ব্যবহার কী তাপসগণ লক্ষ্য করেছেন? কিংবা রামের আচরণে কোনও বিকৃতভাব লক্ষিত হয়েছে কী? লক্ষ্মণভায়ের প্রমাদবশত কোনও অসঙ্গত আচরণ, মহাত্মাদের নজরে এসেছে কী? তপস্বীদের সেবারতা সীতা কখনও রামের পরিচর্যায় ব্যস্ত থেকে তপস্বীদের সেবায় অবহেলা করেননি তো?

বার্ধক্যজনিতকারণে জরাগ্রস্ত, অভিজ্ঞ বৃদ্ধ মহর্ষি, সর্বপ্রাণীর প্রতি করুণাময় রামকে কম্পিতস্বরে বললেন, কল্যাণময়ী সতত মঙ্গলচিন্তায় নিরতা, বৈদেহী সীতার তপস্বীদের প্রতি কর্তব্যপালন বিষয়ে শৈথিল্য হবে কেন? মহর্ষি জানালেন, রামের কারণেই রামের প্রতি তপস্বীদের এই বিপরীত আচরণ, রামের জন্যে রাক্ষসভয়ে ভীত তপস্বীরা গোপনে পরস্পর বলাবলি করছেন। রাবণের অনুজ, খর নামের এক দুর্ধর্ষ, যুদ্ধজয়ী, নিষ্ঠুর, নরখাদক, গর্বোদ্ধত, পাপাচারী, রাক্ষস, জনপদবাসী তাপসদের উৎপীড়ন করে, এমন কি রামকেও সে তাচ্ছিল্য করে।
যখন থেকে রাম এই আশ্রমে অবস্থান করছেন তখন হতেই রাক্ষসটা তাপসদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে চলেছে। রাক্ষসরা কখনও বীভৎস, কখনও ক্রূর, কখনও ভয়ানক, এমন বহু অশুভদর্শন বিকৃত রূপ ধারণ করে দেখা দেয়। কখনও তাপসদের প্রতি অনুচিত, অশুচি, বস্তু নিক্ষেপ করে। অনিষ্টকর রাক্ষসরা সম্মুখে কোন তাপসকে হত্যাও করে থাকে। সকলের অগোচরে আশ্রমে প্রবেশ করে, দুষ্টবুদ্ধি তারা হতচেতন, নিদ্রিত, শিথিলেন্দ্রিয় তাপসদের হত্যা করে আনন্দে প্রকাশ করে। হবনকাল উপস্থিত হলে যজ্ঞপাত্র ছুঁড়ে ফেলে, যজ্ঞাগ্নিতে জল ঢেলে দেয় এবং কলশগুলি ভেঙে দেয়। সেই দুরাত্মাদের দ্বারা উপদ্রুত আশ্রম পরিত্যাগ করে দেশান্তরে যেতে মনস্থ করে, ঋষিগণ মহর্ষিকে আশ্রমত্যাগের জন্যে অনুরোধ জানিয়েছেন। মহর্ষি রামকে অবহিত করলেন, রাক্ষসরা তাপসদের শারীরিক ক্ষতিসাধন করতে চাইছে, তাই তাঁদের আশ্রম ত্যাগ করতেই হবে। এই আশ্রমের অদূরবর্তী বহুফলমূলসমন্বিত বিচিত্র আশ্রম রয়েছে, সেখানেই তাঁরা দলবলসহ আশ্রয় নেবেন।

মহর্ষি, রামচন্দ্রের বিপদ আশঙ্কা করে প্রস্তাব দিলেন, বাছা ওই খর তোমার প্রতিও অনভিপ্রেত ব্যবহার করতে পারে। তাই যদি তোমার সম্মতি থাকে তবে তুমিও আমাদের সঙ্গে তুমিও চল। খরস্ত্বয্যপি চাযুক্তং পুরা তাত প্রবর্ত্ততে। সহাস্মাভিরিতো গচ্ছ যদি বুদ্ধিঃ প্রবর্ত্ততে।। মহর্ষির অনুমান, যদিও রাম সর্বদাই সতর্ক থাকেন,রাক্ষসদের প্রতিহত করবার সামর্থ্য রামের আছে। তথাপি সপত্নীক এখানে বসবাস তাঁর পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে উঠবে। ঋষির প্রস্তাবের প্রত্যুত্তরে, রাজপুত্র রাম, প্রস্থানোদ্যত তপস্বীকে বাধা দিতে পারলেন না। ঋষি রামকে অভিনন্দিত করে আশ্বস্ত করলেন। অনন্তর কুলপতি, আশ্রমস্থ নিকটজনদের সঙ্গে নিয়ে আশ্রম ত্যাগ করলেন। রাম গমনেচ্ছু ঋষিকে অনুসরণ করলেন। অতঃপর ঋষিকে অভিবাদন করে, ঋষিদের উপদেশমতো নিজের পবিত্র বাসস্থানটিতে প্রীত হয়ে ফিরে এলেন। ঋষিদের পরিত্যক্ত আশ্রম এক মুহূর্তের জন্যেও পরিত্যাগ করলেন না। রামের প্রতি আনুগত্যবিষয়ে যে তাপসগণ সর্বদা সৎগুণের আধার তাঁরা রামকে ছেড়ে গেলেন না।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৫: নলপানজাতক : বুদ্ধিবল

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

সকলে চলে গেলেন। সব কিছু বিবেচনা করে নানা কারণে সেখানে বসবাস করতে রামের আর অভিরুচি নেই। এখানে ভরত, জননীগণ ও নাগরিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে, রাম নিরন্তর অনুশোচনাগ্রস্ত হলেন। সেই মহান ভরতের সৈন্যশিবিরের ঘোড়া, হাতির বর্জ্য এই স্থানটিকে ভয়ানক দূষিত করেছে। তাই অন্যত্র যাওয়া যাক, তস্মাদন্যত্র গমিষ্যামি এই সব চিন্তা করে, সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে প্রস্থান করলেন। মহাযশস্বী রাম অত্রিমুনির আশ্রমে উপস্থিত হয়ে ঋষিকে বন্দনা করলেন। মহর্ষি অত্রি, রামকে পুত্রবৎ গ্রহণ করলেন। রামের জন্য নিজে, পরিশীলিত আতিথ্যব্যবস্থাপনার নির্দেশ দিয়ে, মহাত্মা লক্ষ্মণ ও দেবী সীতার প্রতি সমদর্শিতা প্রকাশ করলেন। ঋষি অত্রি যিনি ধর্মজ্ঞ ও সকল প্রাণীর কল্যাণকামী তিনি, সেখানে উপস্থিত মহাভাগ্যবতী ধর্মচারিণী সকলের সম্মানিতা বৃদ্ধা তাপসী অনসূয়াকে সম্ভাষণ করে, সীতাকে দেখিয়ে বললেন, প্রতিগৃহ্নীথ বৈদেহীম্ বৈদেহীকে গ্রহণ কর।রামের কাছে ধর্মচারিণী তাপসীর পরিচয় দিলেন।

একদা দশ বৎসর যাবৎ অনাবৃষ্টিহেতু ধরণী দগ্ধ হতে থাকলে, ফলমূল সৃষ্টি করে, জাহ্নবীকে প্রবাহিত করেছিলেন যিনি, উগ্র তপস্যায় যুক্ত থেকে, কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে দশ হাজার বৎসর যিনি ঘোর তপস্যায় নিরতা থেকে সমস্ত প্রতিকূলতা দূর করেছিলেন, বাছা, ইনিই সেই অনসূয়া, যিনি দেবকার্যে সাহায্যার্থে দ্রুত দশরাত্রি, এক রাত্রিতে পরিণত করেছিলেন। সর্বজনপূজ্যা, ক্রোধহীনা এই তপস্বিনীর কাছে বৈদেহী সর্বদা গমন করুন। ঋষির বক্তব্য শুনে রাঘব তথা ইতি তাই হবে বলে, ধর্মজ্ঞা সীতার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, হে রাজনন্দিনি ঋষি বাক্য তুমি শুনেছ, নিজের মঙ্গলার্থে সত্বর তপস্বিনীর কাছে যাও। শ্রেয়োঽর্থমাত্মনঃ শীঘ্রমভিগচ্ছ তপস্বিনীম্। যিনি নিজের কর্মগুণে পৃথিবীতে অনসূয়া নামে সুখ্যাতা শীঘ্র তাঁর অনুগামিনী হও। অনসূয়েতি যা লোকে কর্ম্মভিঃ খ্যাতিমাগতা। তাং শীঘ্রমভিগচ্ছ ত্বমভিগম্যাং তপস্বিনীম্।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

রাঘবের নির্দেশানুসারে মৈথিলী ধর্মজ্ঞা অত্রিপত্নীর কাছে গেলেন। অত্রিভার্যার শরীরের গ্রন্থি শিথিল হয়েছে, কুঞ্চিত হয়েছে গাত্রচর্ম, জরাগ্রস্ত কেশরাশি হয়েছে ধূসরবর্ণ, তিনি বায়ুতাড়িত কদলীতরুর মতো কাঁপছেন। নিজের নামোল্লেখ করে, পরিচয় দিলেন বৈদেহী। মহোদয়া, সুস্থির, সমাহিতচিত্ত, পতিব্রতা, তপস্বিনীর পাদবন্দনা করলেন সীতা। অভিবাদনান্তে প্রফুল্লমনে, সীতা, কৃতাঞ্জলি হয়ে, সংযম যাঁর আয়ত্তাধীন এমন সেই তাপসীর সুস্থতাবিষয়ে অবগতা হলেন। মহোদয়া, ধর্মচারিণী সীতাকে দেখে, তাপসী অনসূয়া, তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ভাগ্যক্রমে ধর্মে মতি আছে তোমার। মানিনী সীতা, আত্মীয়স্বজন, মর্যাদাময় অভ্যুদয়, পরিত্যাগ করে, নিজেকে অরণ্যে নির্বাসিত করেছেন, তিনি বনবাসী স্বামীর অনুগমন করেছেন। স্বামী নগরবাসী বা বনবাসী হন না কেন, স্বামী যদি প্রিয় বা অপ্রিয় যেমনটি হন, স্বামী যাঁদের কাছে পরম প্রিয়, তাঁদের জন্য মঙ্গলময়ী পৃথিবী অপেক্ষমানা রয়েছে। যাঁদের পতি দুশ্চরিত্র, যথেচ্ছচারী, নির্ধন যেমনই হন সচ্চরিত্রা নারীর কাছে তিনিই দেবতুল্য হয়ে থাকেন।

তপস্বিনী অত্রিপত্নী অনসূয়া বৈদেহী সীতাকে জানালেন,তিনি বহু চিন্তা করে দেখেছেন, স্বামী হতে বিশিষ্ট বন্ধু আর কেউ নেই। ইহকাল বা পরকাল সর্বদা পতিই অক্ষয় সঞ্চিততপস্যাসম। তাঁর মতে, যে অসচ্চরিত্রা নারীরা, গুণদোষ বিচার করেন না, তাঁদের বুদ্ধি শুধু স্বেচ্ছানুসারে কার্যে চালিত হয়। তাঁরা স্বামীকে অবদমিত করেন। এই ধর্মভ্রষ্টা নারীরা স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করে, অখ্যাতি লাভ করেন। সীতার মতো গুণবতী নারী, যাঁরা পার্থিব সমৃদ্ধি ও ক্ষতির বিষয়ে উদাসীনা, তাঁরা পুণ্যকর্মকর্তা মানুষের মতো সুরলোকে বিচরণ করেন। তাই তুমিও পতির একনিষ্ঠা অনুগামিনী হয়ে, পতিব্রতা স্ত্রীর ধর্মানুসারে, স্বামীর সহধর্মচারিণী হও। এভাবেই তুমি যশ ও ধর্মের অধিকারিণী হয়ে উঠবে। তদেবমেনং ত্বমনুব্রতা সতী পতিব্রতানাং সময়ানুবর্ত্তিনী।ভবস্ব ভর্ত্তুঃ সহধর্মচারিণী যশশ্চ ধর্ম্মঞ্চ ততঃ সমাপ্স্যসি।।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

সুদূর অতীতে কৈশোরোত্তীর্ণ রাম, রাক্ষসদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। মহর্ষি বিশ্বামিত্র, রাজা দশরথের কাছে রাক্ষসনিধনের কারণে, উপদ্রুত আশ্রমটির রাক্ষসদের দ্বারা বিঘ্নিত যজ্ঞকর্মরক্ষার্থে সুরক্ষাকবচরূপে রামকে কামনা করেছিলেন। মহর্ষি বিশ্বামিত্রের সাহচর্যে ও সহায়তায় নির্ভীক রাম, রাক্ষসী তাড়কাকে বধ করে একটি অরণ্য রাক্ষসীর করমুক্ত করেছিলেন। মহর্ষি বিশ্বামিত্রের যজ্ঞভূমি সিদ্ধাশ্রমে যজ্ঞবিঘ্নসৃষ্টিকারী মারীচ ও সুবাহু নামের রাক্ষসদুটি বধ করে আশ্রমটিকে রাক্ষসদের উপদ্রবমুক্ত করেছিলেন। রামের শক্তিমত্তার প্রতি অসীম আস্থায় চিত্রকূটে রামের নিকটবর্তী ঋষিরা পরম নিশ্চিন্তে আনন্দে ছিলেন তাঁরাই ভীত সন্ত্রস্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন হঠাৎ। কারণ সেই রাক্ষসদের উপদ্রব। রাক্ষসরাজ রাবণের ভাই খরের উৎপীড়নে ত্রস্ত তাপসগণ। সেই রাক্ষস দুর্ধর্ষ, নিষ্ঠুর, নরখাদক এমন কি রামকেও সে অবজ্ঞা করে। ঋষি রামকে জানিয়েছিলেন, ধৃষ্টশ্চ জিতকাশী চ নৃশংসঃ পুরুষখাদকঃ। অবলিপ্তশ্চ পাপশ্চ ত্বাঞ্চ তাত ন মৃষ্যতে।।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

একই রাম কৈশোরোত্তীর্ণ ও যুবক রাম দুইয়ের প্রতি একবার তপস্বীদের আস্থা ও অনাস্থা বিস্ময়কর বলে মনে হয়। রাজপুত্র রাম মহর্ষি বিশ্বামিত্রপ্রদত্ত অস্ত্রবলে বলীয়ান, প্রবল আত্মবিশ্বাসী রামের প্রতি অসীম তপঃশক্তির আধার মহর্ষি বিশ্বামিত্রের গভীর আস্থা প্রকারান্তরে বনবাসী সর্বত্যাগী রামের প্রতি এতটাই অনাস্থা যে, রামের উপস্থতি সত্ত্বেও রাক্ষসভয়ে ভীত আশ্রমবাসী তাপসরা চলেছেন স্থানান্তরে। তাঁদের এই ভাবান্তর কেন? সদ্য ভরত বিদায় নিয়েছেন। রামচন্দ্র জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রাজ্যগ্রহণে আগ্রহী নন, পিতৃশর্ত পালন করে, বনবাসজীবন তাঁর কাঙ্খিত লক্ষ্য। ঋষিদের হয়তো এই তথ্য অজানা নয়। তবে কী রামের মধ্যে ক্ষত্রতেজোদীপ্ত রাজপুত্রকে নয়, এক সর্বত্যাগী নিস্পৃহ, উদাসীন, কুমারকে প্রত্যক্ষ করেই আশ্রমবাসী তাপসদের এই ভাবান্তর?হয়তো বা বনবাস জীবনের প্রাথমিকদশায় জীবনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত রামের অশ্রুসজল ভাবমূর্তি তপস্বীদের মনে রামের ক্ষত্রতেজের প্রয়োগবিষয়ে সন্দেহ বা ধন্ধ দেখা দিয়েছিল। তপস্বীরা রামকে পরিত্যাগ করে আশ্রমান্তরে যেতেও দেরি করলেন না।

জীবনের জটিলতা মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে। অস্তিত্বের সঙ্কট, পরনির্ভরশীল মানুষকে প্রবল শক্তিমানের প্রতিও আস্থাহীন করে তোলে। শক্তিমত্তার প্রকাশ অনেকটা আপেক্ষিক, বংশগৌরব, পৃষ্ঠবল, আর্থিকসঙ্গতি, শৌর্যের প্রয়োগ অনেকটা এইসব পারিপার্শ্বিকনির্ভর। মানুষের আত্মিক শক্তিমত্তাবলে বিশ্বাস-অর্জন কয় জন করতে পারে জীবনে? রাম অবশ্য পেরেছিলেন, সে তো সুদূরপ্রসারী রামের অয়ন বা মার্গ বা জীবনপথ প্রমাণ করেছে। চিত্রকূটে অবশ্য সেটি প্রমাণের অপেক্ষায়।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

অত্রিপত্নী সর্বজনের পূজ্যা, পতিগতপ্রাণা অনসূয়ার জীবনদর্শন যুগধর্মের অনুসারী। স্বামী ভালো হন বা মন্দ, নগরে বা অরণ্যে যেখানেই থাকুন, স্বামী যে নারীদের প্রিয়, তাঁরাই সুন্দর পরিমণ্ডল সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। ভালোমন্দতে মেশা পুরুষতান্ত্রিক জীবনে, নারীদের হয়তো এ ছাড়া বিকল্প কিছু ছিল না। পারস্পরিক শ্রদ্ধাই যে কোনও সম্পর্কের বুনিয়াদ। তপস্বিনী অনসূয়া যেমন অনায়াসে বলতে পারেন, নাতো বিশিষ্টং পশ্যামি বান্ধবং বিমৃশন্ত্যহম্। আমি বহু ব্যতিক্রমী চিন্তা করেও স্বামীর মতো বিশিষ্ট বন্ধু আর পেলাম না। ঠিক তেমনই স্ত্রী অনসূয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধায়, স্ত্রীর গৌরবগাঁথা বর্ণনা করে, মহর্ষি অত্রি যখন সীতাকে বলেন, তামিমাং সর্ব্বভূতানাং নমস্কার্য্যাং তপস্বিনীম্। অভিগচ্ছতু বৈদেহী বৃদ্ধামক্রোধনাং সদা।। বৈদেহী,সর্বভূতের সম্মানীয়া ক্রোধহীনা এই তপস্বিনীর কাছে যান। তাঁর এই প্রস্তাবে স্ত্রীর প্রতি পরম নিষ্ঠা ও সম্মানবোধ ফুটে ওঠে।

বাস্তবজীবনে এমনটা ঘটে না মোটেই। স্বামীরাও অনেকক্ষেত্রেই নির্দ্বিধায় স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন না বা তাঁদের আচরণে নিরুচ্চারে শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশিত হয় না আবার স্ত্রীরাও সীতার মতো নির্দ্বিধায় স্বামীর সব কাজের অনুবর্তিনী হন না, বা হওয়া সম্ভব নয়। প্রেক্ষিত আলাদা, যুগধর্মের বৈপরীত্য—এই সব মিলিয়ে এই আদর্শগুলি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কারও মনে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তবুও আবহমান আধুনিক জীবনে সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, রামায়ণের রামকেন্দ্রিক যা কিছু এখনও গ্রাহ্য হয়, এটিও কি পুরুষতান্ত্রিকতার প্রবল আধিপত্যের প্রভাব? —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content