শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে বানররূপী, গায়ে তাঁর হাতির বল। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আকারে-প্রকারে ও শক্তিতে তিনি অসাধারণ হলেন। তখন তিনি বাস করতেন এক নদীর তীরে। সেই নদীর মধ্যস্থলে একটি আম-কাঁঠালের গাছে ঘেরা একটি দ্বীপ ছিল, আর সেই নদীতীর এবং দ্বীপের ঠিক মধ্যস্থ ছিল নদীগর্ভস্থ এক পর্বত। বোধিসত্ত্ব প্রতিদিন নদীতীর থেকে একলাফে পর্বতে, সেখান থেকে আরেক লাফে দ্বীপে এসে নামতেন। সেখানে সারাদিন পেটভরে ফলাদি খেয়ে সন্ধ্যায় একই পদ্ধতিতে নদীতীরে ফিরে যেতেন।
গল্পে দেখা যায় জলে কুমির, ডাঙায় বাঘের ভয় থাকে। উভয়সঙ্কট। শত্রুপরিবেষ্টিত হয়েই জীবকে তার ঐহিক জীবনটি যাপন করতে হয়, বুদ্ধিবলে, চরিত্রবলে, ওজস্বিতায় প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার শিক্ষাটিই জীবনের সহজপাঠ। বিজ্ঞানের চোখে তা ভিন্ন আঙ্গিকে যোগ্যতমের উদ্বর্তন। নদীতীরে বানরের বাস হলে জলে কুমিরকে থাকতেই হয়। এখানেও আছে।

সেই নদীতে এক কুমীর দম্পতি বাস করতো। স্ত্রী কুমিরটি তখন ছিল অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভকালে তার নানা দোহদ জাগত। তারা বোধিসত্ত্বের ওই যাওয়া-আসা দেখতো। একদিন স্ত্রী স্বামীকে বলল, “প্রিয়তম, আমার বানরের স্বাদু হৃদয়মাংস খাওয়ার সাধ হচ্ছে বড়, এনে দাও না!”
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৬: বরুণজাতক: অলস মস্তিষ্কের গল্প

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৮: রাখে হরি, মারে কে?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৯: চেন টেনে উমাচরণের জেল হয়েছিল

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন

কুমির বলল, “এই কথা! ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছাপূরণ করবো। আজ সন্ধ্যায় বানরের হৃৎপিণ্ড খাবে।”

বানরকে বন্দি করার কৌশল ও উপায় স্থির করে কুমির সেই মধ্যস্থলের পর্বতে চড়ে অপেক্ষা করতে থাকল।

বানর যথাকালে প্রত্যাবর্তনের সময় খানিক বিস্মিত হল। প্রতিদিন যাতায়াতের সময় বোধিসত্ত্ব নদীর জলস্তরের হ্রাসবৃদ্ধি ও তাতে পর্বত কতটা জেগে উঠল বা গ্রস্ত হল তা খেয়াল রাখতেন। তাঁর সূক্ষ্মদৃষ্টি ছিল বলাবাহুল্য। সেদিন তিনি দেখলেন, নদীর জল যথাপূর্ব, কিন্তু পর্বতের উচ্চতা যেন বৃদ্ধি পেয়েছে! কেন?
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৮: নীতি কেবল মুখোশ, রাজনীতির মূল হল কৌশল আর ছলনা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

তিনি মনে মনে বুঝলেন, ওখানে তাঁকে ধরার জন্য কুমির আছে। মনে মনে কৌশল স্থির করে তিনি হাঁক দিলেন, “ও ভাই পাথর, কথা কও। একবার, দুবার, তিনবার বললেন। নির্জীব পাথর সাড়া দিল না। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, “কি ভাই? আজ যে উত্তর করছো না যে!”

কুমিরটি মনে মনে ভাবল, “তাইতো, এরা যে রোজ কথা কয় নিজেদের মধ্যে। তাহলে কিছু বলতে হয় বটে।”

তারপর কুমির বলে ওঠে “ কে ওখানে? বানরেন্দ্র বুঝি!”
“তুমি কে ভাই?”
“আমি কুমির গো।”
“ওখানে কি করছো?”
“তোমার হৃৎপিণ্ড খাওয়ার জন্য বসে আছি।”
বোধিসত্ত্ব মনে মনে ভাবলেন যে, কুমিরকে ঠকাতে হবে, কারণ দ্বীপ থেকে ফেরার বিকল্প কোনও পথ নেই। তিনি হাঁক দিলেন “তাই? ঠিক আছে, ভাই, ঠিক আছে। তুমি হাঁ করো তো বড় করে। আমি লাফ দিয়ে তোমার মুখের মধ্যে গিয়ে পড়ব। তুমি আমাকে ধরে নেবে। ব্যস!”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৬: চিত্রকূটে রামচন্দ্রের প্রতি তপস্বীদের অনাস্থাপ্রকাশ এবং অত্রিপত্নী অনসূয়ার উপদেশের কোনও প্রাসঙ্গিকতা আছে?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

কুমিরটি বোধিসত্ত্বের কৌশল বুঝল না। সরল মনে মেনে নিল। কুমির মুখ হাঁ করলে তার চোখদুটি আপনা থেকেই বুজে আসে। এখানেও তা-ই হল। বানররূপী বোধিসত্ত্ব এই মহাক্ষণের অপেক্ষা করছিলেন কেবল। আর কালবিলম্ব না করে একলাফে কুমিরের মাথায়, অপর লাফে নদীতীরে পৌঁছে গেলেন বিদ্যুতের বেগে। অদ্ভুতকর্মা এই বানরটিকে দেখে কুমির বিস্ময়ে অভিভূত হল, বোধিসত্ত্বের প্রশংসা করে ফিরে গেল নিজের ঘরে। কিন্তু যাওয়ার আগে বলে গেল একটি মূল্যবান কথা, সেটিই এই কাহিনি থেকে শিক্ষণীয়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

সত্য, ধৃতি বা ধৈর্য, ত্যাগ ও বিচারক্ষমতা এই চারটিগুণ থাকলে সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ আসে, রিপুসকল পরাভূত হয়। জীবের জীবনে অপর জীব যেমন রিপু হতে পারে, তেমনই তারা লোভাদি ষড়রিপুর বশীভূত হলে অভ্যুদয় ব্যাহত হয়। বানররূপী বোধিসত্ত্ব রিপুজয়ী ছিলেন। দৈহিক বল তাঁর অসীম হলেও কার্যকালে বুদ্ধিবলটিই তাঁর জীবন রক্ষা করলো। সত্যের প্রতি অবিচল না থাকলে আত্যন্তিক জয়লাভ ও অভ্যুদয় ঘটে না। বানরের কৌশল ও বুদ্ধি সেই সত্যের অনুকূল ছিল। তাঁর ধৈর্য না থাকলে এই সঙ্কটে তিনি বিপন্ন হতেন। শঙ্কা, লোভ, অলীক আশা কিংবা ভ্রম অতিক্রম, ত্যাগ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি শেষে রক্ষা পেলেন। আর তাঁর সূক্ষ্ম বিচারক্ষমতার পরিচয় গল্পেই নিবদ্ধ আছে। এমন গুণাবলীই তাঁকে বিপন্ন হতে দেয়নি, এমন গুণাবলীই মানুষকে স্বীয় প্রজ্ঞায় উত্তীর্ণ করে। এই কাহিনি সেই উপদেশটিই রেখে যায়। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content