শুক্রবার ১৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

ঘনরাম চক্রবর্তীর রচনা সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলা সঙ্গত বোধ হইতেছে। বঙ্গের সুসন্তান, সুপ্রসিদ্ধ লেখক স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় ঘনরামের অলৌকিক প্রতিভায় মুগ্ধ হইয়া মুক্তকণ্ঠে “শ্রীধর্ম্মমঙ্গলের প্রশংসা করিলেও বহুকাল বঙ্গীয় সাহিত্য সেবীর মধ্যে এই গ্রন্থের বহুল প্রচার বা বিশেষ সমাদর দেখিতে পাওয়া যায় নাই।…” ভূমিকাটিতে ঘনরাম সম্পর্কে পণ্ডিত চন্দ্রোদয় আরও লিখেছেন—”প্রবাদ আছে ঘনরাম বর্দ্ধমানের মহারাজের সভায় পণ্ডিত ছিলেন।…সুপণ্ডিত অথচ সুকবি ঘনরাম কবিরত্ন, গুণগ্রাহী বর্দ্ধমান-রাজের আদরের পাত্র হওয়াই স্বাভাবিক। ঘনরামের কবিতার স্হানে স্হানে মহারাজের মঙ্গল কামনা দেখিয়াও ঐ প্রবাদ অমূলক বিবেচিত হয় না।”
পণ্ডিত চন্দ্রোদয় সংকলিত ‘শ্রীধর্ম্মমঙ্গল’ গ্রন্হের কয়েকটি লাইন এই রকম, “… গৌড়েশ্বর কর্ণসেনের বিবাহের জন্য চিন্তিত হইলেন। কর্ণসেন বৃদ্ধ, বৃদ্ধের নিকট কেই বা কন্যা দিতে সম্মত হইবে, সদ্বংশে বয়স্হা কন্যাইবা কোথায় পাওয়া যাইবে, বিবাহ সত্বর সম্পাদিত করিতে হইবে ইত্যাদি চিন্তা করিতে করিতে অন্তঃপুরে উপস্থিত হইলেন। রাণী ভানুমতীর গৃহে যাইয়া রূপে গুণে অনুপমা রঞ্জাবতীকে দেখিতে পাইলেন। বুঝিতে পারিলেন না, মেয়েটী কে? ভানুমতীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন, রঞ্জাবতী ভানুমতীর ভগিনী এখনও বিবাহ হয় নাই। রাজা মনে মনে কল্পনা করিলেন, কর্ণসেনের সঙ্গে রঞ্জাবতীর বিবাহ দিতে হইবে।…”
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৫: পাতি গাঙচিল

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩০: চুপি-চুপি আসে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?

১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য কৈলাসহর ও সন্নিহিত ঊনকোটি পরিদর্শন করেছিলেন। রাজার সভাপণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ তা নিয়ে ‘শ্রীশ্রীযুতের কৈলাসহর ভ্রমণ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে উনকোটি সহ সন্নিহিত অঞ্চলের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। সেদিনের উনকোটি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন— “ঊনকোটি গিরি শ্রেণীর যে শৃঙ্গটি তীর্থরূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে, তাহার উচ্চতা নিতান্ত কম নহে। শৃঙ্গটির শিরোভাগে এবং পশ্চিম পার্শ্বে কতকগুলি দেবমূর্ত্তি অদ্যাপি বিদ্যমান আছে। শিরোভাগের মূর্ত্তিগুলো প্রস্তর নির্ম্মিত, পার্শ্বের মূর্ত্তিগুলি পর্ব্বত গাত্রে খোদিত।…পর্ব্বত গাত্রে খোদিত মূর্ত্তিগুলি যে বহু প্রাচীন, তাহাতে কিছু মাত্র সন্দেহ করিবার যো নাই। ঐ সকল মূর্ত্তিতে নির্ম্মাণ কৌশল বিশেষ কিছুই নাই। প্রত্যেক মূর্ত্তির কর্ণে ‘পাণপাশা’র ন্যায় বৃহৎ কুণ্ডল আছে।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

পর্ব-৩৭: বানরেন্দ্র-জাতক: শক্তি না বুদ্ধি?

আজ থেকে প্রায় সোয়াশো বছর আগেই যে প্রত্নভূমি উনকোটিতে ব্যাপক ধ্বংস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা বোঝা যায় চন্দ্রোদয়ের লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন—“পর্ব্বত পার্শ্বে বহুসংখ্যক মূর্ত্তি খোদিত ছিল, কালক্রমে সমস্তই বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে। এখন যাহা আছে,তাহাও আর বেশী দিন থাকিবে বলিয়া বোধ হয় না। কারণ প্রস্তর ক্রমে ধসিয়া পড়িতেছে।” উনকোটিতে একটি প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৮: গ্রিন টি /৬

চন্দ্রোদয় লিখেছিলেন—“শৃঙ্গাগ্রে প্রস্তর ও ইষ্টক রাশি প্রকীর্ণাবস্হায় ইতস্ততঃ পড়িয়া রহিয়াছে। কোন সময় ঐ স্হানে যে প্রস্তর ও ইষ্টক নির্ম্মিত মন্দির ছিল, তাহা বেশ অনুমিত হয়।একটি মন্দির অতি অল্পদিন পূর্ব্বে নষ্ট হইয়াছে, বুঝিতে পারা যায়।” ‘ঊনকোটি তীর্থ মাহাত্ম্য’ নামে এক বিরল প্রচারিত হাতে লেখা পুস্তকের কয়েকটি শ্লোকও তাঁর গ্রন্থটিতে উদ্ধৃত করেছিলেন পণ্ডিত বিদ্যাবিনোদ।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

ত্রিপুরার প্রাচীন গ্রন্থে রয়েছে এরকম নানা মণিমুক্তা। ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের উপাদানও। সেসব বিষয়ে আরও গবেষণা ও অনুসন্ধানের অবকাশ রয়েছে। পণ্ডিত চন্দ্রোদয় একাধারে যেমন সংস্কৃতজ্ঞ,সাহিত্যসেবী ও পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, তেমনই প্রত্নতত্ত্ব বিষয়েও তাঁর প্রবল আকর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর ‘শ্রীশ্রীযুতের কৈলাসহর ভ্রমণ’ গ্রন্থে উনকোটির সেদিনের বিবরণ আমাদের সুদূর অতীতে নিয়ে যায়। ‘শিলালিপি সংগ্ৰহ’ গ্রন্থটিও অতীতের ত্রিপুরা নিয়ে গবেষণার এক দিশারী হয়ে থাকে। এই ভাবেই শতাব্দীকাল আগে প্রত্যন্ত এক দেশীয় রাজ্য ত্রিপুরায় যে জ্ঞানের আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল সেই আলোতে আমরা এখনও যেন আলোকিত হচ্ছি।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content