শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

পণ্ডিত চন্দ্রোদয় ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ।

ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ চিরকালই সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছেন। রাজসভা আলোকিত করেছেন কাছের ও দূরের নানা পণ্ডিত। মাণিক্য রাজাগণ বিভিন্ন সময়ে সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করিয়েছেন এবং প্রজাদের মধ্যে তার বহুল প্রচারের উদ্যোগও নিয়েছেন। পঞ্চদশ শতকে ‘রাজমালা’ রচনার মাধ্যমে ত্রিপুরায় মাণিক্য রাজবংশের সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতার সূচনা ঘটে। ‘রাজমালা’ মূলত ত্রিপুরার রাজাদের গুণকীর্তন নির্ভর এক কাব্যগাঁথা।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতদের মতে, পঞ্চদশ শতকের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ মোটামুটি ত্রিপুরার ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এমনও বলেছেন যে বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চার সূত্রপাত ঘটেছে ত্রিপুরার ‘রাজমালা’র মাধ্যমেই। শুধু সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাই নয়, ত্রিপুরার রাজা ও রাজপরিবারের কেউ কেউ নিজেরাও সাহিত্য চর্চা করেছেন। বীরচন্দ্র মাণিক্য ছিলেন সে যুগের একজন বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি। তাঁর পুত্র সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন একজন বিশিষ্ট গদ্যকার। যাইহোক, সব মিলিয়ে ত্রিপুরার রাজপরিবার সুদূর অতীতকাল থেকেই এক ঐতিহ্যের ধারা বয়ে নিয়ে চলেছিল। বিভিন্ন সময়ে যেসব পণ্ডিত ত্রিপুরার রাজসভা আলোকিত করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয় ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের সভাপণ্ডিত ছিলেন। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ হচ্ছে রাধাকিশোরের রাজত্বকাল। পিতা বীরচন্দ্র মাণিক্যের মতো রাধাকিশোরও ছিলেন সাহিত্য সংস্কৃতির এক বড় পৃষ্ঠপোষক। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। রাধাকিশোরের রাজত্বকালে রবীন্দ্রনাথ পাঁচবার আগরতলা সফর করেন। এই রাজার সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার কথা সেদিন বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাধাকিশোরের রাজত্বকালে সমতল ত্রিপুরার লাছিয়া গ্রাম থেকে পণ্ডিত চন্দ্রোদয় এসেছিলেন রাজধানী আগরতলায়। তিনি ছিলেন একাধারে সংস্কৃত পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ। মহারাজ রাধাকিশোর তাঁকে সভাপণ্ডিত হিসেবে নিয়োগ করেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৬: মিটিং

রাজধানী আগরতলার অহঙ্কার উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদের শিলান্যাস হয়েছিল ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে। শাস্ত্রীয় মতে, এই শিলান্যাস অনুষ্ঠানের পৌরোহিত্য করেছিলেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ। তখন এজন্য একটি তাম্রপত্রও রচনা করেন তিনি। উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদের নামাকরণ নিয়ে ত্রিপুরাতে অনেক চর্চা হয়েছে। অনেকের মতে, রাজপ্রাসাদের এই নাম দিয়েছিলেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয়। আবার কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে মহারাজ রাধাকিশোরের নামও উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

ত্রিপুরার আবৃত ইতিহাস উন্মোচনে রাধাকিশোর খুবই উৎসাহী ও উদ্যোগী ছিলেন। ত্রিপুরার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য রাজা পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপর ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকায় তিনি ক্ষেত্র সমীক্ষা করেন। বিভিন্ন মন্দির ও স্হাপত্য সমূহের শিলালিপি সংগ্ৰহ করে তা লিপিবদ্ধ করেন, অনুবাদ করেন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ‘শিলালিপি সংগ্ৰহ’ নামে মূল্যবান গ্রন্হটি মহারাজ রাধাকিশোরের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদের সংকলনায় প্রকাশিত হয়। ত্রিপুরার ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্হ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে এটি।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

ত্রিপুরার প্রাচীন রাজধানী উদয়পুর সহ সমতল ত্রিপুরার বিভিন্ন দেব দেউলের শিলালিপি-সহ সেসবের অনুবাদ সংকলিত রয়েছে গ্রন্হটিতে। স্বাভাবিকভাবেই ত্রিপুরার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সেসবের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। মহারাজ রাধাকিশোর যেমন রাজ্যের ইতিহাস চর্চায় প্রবল উৎসাহী ছিলেন, তেমনি তিনি ত্রিপুরার আবৃত ইতিহাস উন্মোচনে পণ্ডিত চন্দ্রোদয়ের মতো একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকেই এ জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চন্দ্রোদয় নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শুধু রাজ্যের আবৃত ইতিহাস উন্মোচনে শিলালিপি সংগ্ৰহ করে তার অনুবাদ আর বিশ্লেষণ নয়, পণ্ডিত চন্দ্রোদয় সাহিত্য সেবার ক্ষেত্রেও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content