
পন্ডিত চন্দ্রোদয় ও মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য।
বাংলা সাহিত্যের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য। বঙ্গদেশের তদানীন্তন কয়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্যসেবীকে রাজা নানা ভাবে সহায়তা করেছেন। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুও তাঁর বিজ্ঞান সাধনার জন্য রাজার সহায়তা পেয়েছেন। রাধাকিশোরের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০৫ সালে ত্রিপুরায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘অরুণ’ পত্রিকা। রাজার ইচ্ছানুসারে পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয়। পাক্ষিক এই পত্রিকাটি প্রতি মাসের ১ এবং ১৬ তারিখ প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটির প্রতি সংখ্যার মূল্য ছিল ২ পয়সা।
আগরতলার রাজমালা প্রেস থেকে ‘অরুণ’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। উল্লেখ করা যায় যে, বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের পর দেশব্যাপী আন্দোলনের সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল ‘অরুণ’ পত্রিকায়। এ সি ভট্টাচার্যের ‘প্রোগ্রেসিভ ত্রিপুরা’ গ্রন্হসূত্রে জানা যায়, পণ্ডিত চন্দ্রোদয় ‘হিতবাদী’ নামেও একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ইতিহাস চর্চায়ও সর্বদাই উৎসাহী ছিলেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭১: ত্রিপুরার রাজসভা আলোকিত করেছিলেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয় ভট্টাচার্য

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক
পঞ্চদশ শতকে মহারাজ ধর্ম মাণিক্য ‘রাজমালা’ রচনা করিয়েছিলেন। পরবর্তীকালের রাজাদেরও কেউ কেউ এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। মূলত ত্রিপুরার রাজবংশের কীর্তি গাঁথা হলেও ‘রাজমালা’তে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের উপাদান। অপেক্ষাকৃত আধুনিককালের রাজা বীরচন্দ্র, রাধাকিশোর, বীরেন্দ্র কিশোর, বীরবিক্রম রাজ্যের আবৃত ইতিহাস উন্মোচনে গভীর উৎসাহী ছিলেন। ত্রিপুরার মঠ মন্দির-সহ প্রাচীন স্হাপত্যে যে ইতিহাসের উপাদান ছড়িয়ে আছে তা রাজাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। আর সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে শিলালিপি সংগ্ৰহের মতো উদ্যোগে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে
পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ যে ভাবে মঠ-মন্দিরের শিলালিপি সংগ্ৰহ করে অনুবাদ ও বিশ্লেষণ করেছেন তা আমাদের বিস্মিত করে। সুদূর অতীতের যেসব সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত সেই সব শিলালিপি রচনা করেছিলেন তাতে ভাষার ত্রুটি বিচ্যুতির প্রতিও তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরের শিলালিপি বিশ্লেষণের পাশাপাশি ‘রাজমালা’র কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরের একটি শিলালিপি ও ‘রাজমালা’য় তার উল্লেখ প্রসঙ্গে চন্দ্রোদয় লিখেছেন, “…এই শ্লোকটি এক এক পুস্তকে এক এক রূপ দেখা যায়। কোনওটাতেই ব্যাকরণ ও ছন্দ ঠিক নাই। সংস্কৃত রাজমালা’র শ্লোকটি অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ বোধ হওয়ায় তাহাই উদ্ধৃত করিলাম। রাজমালাতে এই শ্লোকের যে বাঙ্গালা অনুবাদ আছে তাহা অস্পষ্ট ও ভ্রমপূর্ণ।…”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
পণ্ডিত চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদের ‘শিলালিপি সংগ্ৰহ’ গ্রন্থটিতে ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরের বর্ণনা আমাদের নিয়ে যায় সুদূর অতীতে। তিনি লিখেছেন, “ত্রিপুরসুন্দরীর মন্দির একটি উচ্চ টীলার উপরে অবস্থিত।মন্দিরের দ্বার পশ্চিম দিকে; উত্তর দিকেও একটি ছোট দরজা আছে। এই দরজাটি পরে প্রস্তুত বলিয়া অনুমিত হয়; কারণ, প্রাচীন মন্দিরে একটির বেশি দরজা প্রায়ই দেখা যায় না। মন্দিরের সম্মুখে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে একটি নাটমন্দির। নাটমন্দিরটি অতি জীর্ণ হইয়াছিল, বর্ত্তমান মহারাজ তাহা ভাঙ্গিয়া পুনর্ব্বার নির্ম্মাণের আদেশ দিয়াছেন; নির্ম্মাণ কার্য্য চলিতেছে। নাটমন্দিরের পশ্চিমদিকে এখন ফলের বাগান, তাহার কিঞ্চিৎ পশ্চিমে একটি দীর্ঘিকা, তাহার পশ্চিমে সুখসাগর-শোভা এখন “শষ্য-শ্যামলা”। ত্রিপুরসুন্দরীর বাড়ির উচ্চ স্হান হইতে ওই নামশেষ সুখসাগরের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে নয়ন মন সুখসাগরে ভাসিতে থাকে। মন্দিরের উত্তর দিকে একটি দীর্ঘিকার চিহ্ন দেখিতে পাওয়া যায়;এখন তাহা দাম ও জঙ্গলে সমাচ্ছন্ন।…”
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যের সময়কাল,অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দির ও তার চারপাশের চিত্রটি কেমন ছিল তা পন্ডিত চন্দ্রোদয়ের বর্ণনা থেকে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ‘শিলালিপি সংগ্ৰহ’ গ্রন্হটির ভূমিকায় ত্রিপুরার প্রত্ন সম্পদ ও প্রাচীন জলাশয় সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “ত্রিপুরা রাজ্যের নানা স্হানে বহুসংখ্যক দেবালয় ও জলাশয় দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু ইহার প্রত্যেকটী ত্রিপুরা রাজ্যের অনুপম কীর্ত্তি। দুঃখের বিষয় যে, ঐ সকল দেবালয়ের স্হাপয়িতা ও জলাশয়গুলির প্রতিষ্ঠাতার নাম অনেক স্হলেই অজ্ঞানতার ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন রহিয়াছে।”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















