মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মায়েরা প্রায়শই থাকত আঁতুড়ঘরে, সেটাই ছিল তখন স্বাভাবিক। আঁতুড়ঘরের বাইরে থাকলে সর্বকনিষ্ঠটিকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। অন্যদের প্রতিপালনের তেমন ফুরসত পেতেন কোথায়! বাড়ির কাজের লোক, চাকরবাকররাই দেখাশোনা করত। রবীন্দ্রনাথও গৃহভৃত্যদের দ্বারা প্রতিপালিত। খুব শৈশবে ‘শ্যাম’ নামের যে ভৃত্যটি দেখাশোনা করত, তার কথা আমাদের অজানা নয়। রবীন্দ্রনাথই সেসব শুনিয়েছেন। পরে বাড়ির ছোটোদের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে ঈশ্বরের ওপর। ঈশ্বরকে নিয়ে যথেষ্ট মজা-তামাশা হত। কথা বলত সে সাধুভাষায়। ‘বরানগর’ না বলে বলত ‘বরাহনগর’।
ছোটবেলায় ভৃত্যরা যেমন দেখাশোনা করত, পরিণত-বয়সে কবি যখন সুপ্রতিষ্ঠিত, তখনও তাঁর দেখভালের দায়িত্ব পালন করত অন্তত একজন ভৃত্য। অধিকাংশই বিশ্বস্ত সহচর, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এগিয়ে দিত, কী খাবেন, যথাসময়ে খেয়েছেন কিনা, তাদের এমন কত রকমের ভাবনা ছিল, ছিল দায়দায়িত্ব। সারাক্ষণই কবির কাছে, পাশে থাকত সে। জোড়াসাঁকোয়, শান্তিনিকেতনে, শিলাইদহে, যেখানে যখন থেকেছেন, সব সময়ই এ রকম কেউ না কেউ কবির সঙ্গে থেকেছে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৬: বরুণজাতক: অলস মস্তিষ্কের গল্প

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৮: রাখে হরি, মারে কে?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন

উমাচরণ ছিল ‘পুরাতন ভৃত্য’। রবীন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে কখনও শান্তিনিকেতন গিয়েছেন, আবার কখনও বা শিলাইদহে। উমাচরণকে রবীন্দ্রনাথ খুবই পছন্দ করতেন। সবসময়ই হাসিখুশি, সরসতায় ভরপুর। তার হাঁটায়, চলায়, কথা বলায়, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে হাস্যরসের অভাব হয়নি। এমন সব কাণ্ড করত, নিতান্ত বেরসিকও হেসে ফেলত। কবিও হাসতেন, খুব ভালোওবাসতেন তাকে।
কলকাতায় বৃষ্টি

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

উমাচরণের মনে কোনও মালিন্য ছিল না, সরল মনে এমন সব কাণ্ড করে ফেলত, সেসব নিয়ে শুধু ঘরে নয়, বাইরেও রবীন্দ্রনাথকে বিব্রত হতে হয়েছে। প্রতিমাকে দেখে কবি-পত্নী মৃণালিনী মুগ্ধ হয়েছিলেন। পুত্র রথীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেবেন, এমন পরিকল্পনাও করেছিলেন। সে বিবাহ নানা কারণে তখন দেওয়া যায়নি। প্রতিমার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা, বিবাহের কিছুদিন পরই জলে ডুবে মারা গিয়েছিল তাঁর স্বামী। ততদিনে মৃণালিনীও প্রয়াত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ পত্নীর পুরন না হওয়া স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭২: রাজার ইচ্ছানুসারে ‘অরুণ’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছিলেন পণ্ডিত চন্দ্রোদয়

পুত্রের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে বিষাদ-প্রতিমার মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। সবে তখন রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে চলেছেন শান্তিনিকেতনে, সঙ্গে উমাচরণ। প্রতিমা দেবীর লেখা থেকে জানা যায়, বর্ধমানে যখন ট্রেন পৌঁছল, তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ট্রেনে বসে উমাচরণের সঙ্গে নানা রকমের কৌতুক করছিলেন। উমাচরণকে নিয়ে সেদিন একটি গল্প বলেছিলেন তিনি। গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। ভারি মজাদার, উপভোগ করেছিলেন সকলে। ঘটনাটি এরকম, ট্রেনে উমাচরণকে নিয়ে যাচ্ছিলেন কবি। যাচ্ছিলেন কলকাতার দিকে। ট্রেন ছুটতে ছুটতে হঠাৎ থেমে গেল। ব্যাপার কী, এভাবে তো অকারণে থেমে যাওয়ার কথা নয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

প্রতিমা দেবী।

এমন কাণ্ড যে উমাচরণ করতে পারে, আগে কখনও মনে হয়নি। ট্রেনের চেন টেনেছিল সে। হয়েছিল পঞ্চাশ টাকা জরিমানা। শেষে উমাচরণকে জেলেও যেতে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন, প্রতিমা দেবীর লেখায় আছে সে বিবরণ। উমাচরণের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘হঠাৎ দেখি আমাদের চলন্ত গাড়ী থেমে গেল। আমি তো ভেবে পাই না ব্যাপারখানা কি? এমন সময় গার্ড এই বাঁদরটাকে নিয়ে আমার গাড়ীর কাছে হাজির। তিনি বললেন, আপনার চাকর গাড়ীর এলার্ম বেলের চেন ধরে টেনেছে। সে যে যথেষ্ট অপরাধী, তার মুখ দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছিল। আমার কাছে যথেষ্ট টাকা না থাকায়… ফিরে এসে পঞ্চাশ টাকা দণ্ড আমি পাঠিয়েছিলুম। ওকে নিয়ে আমাকে কম ভুগতে হয়েছে! তারপর যখন হাসতে হাসতে জেল ফেরত এসে প্রণাম করে দাঁড়ালো, মনে হল যেন কিছুই হয়নি, একেবারেই নিরীহ।’
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

রবীন্দ্রনাথ মৃদু হেসে চেন টানার কারণ জানতে চেয়েছিলেন উমাচরণের কাছে। সাদা মনে কাদা নেই তার। অকপটে জানিয়েছিল, অনেকেই তাকে বলেছে, চেন টাললে ট্রেন থেমে যায়। সত্যি সত্যি থেমে যায় কিনা, তা পরখ করে দেখছিলেন। উমাচরণ এসব সহজ গলায় বললেও রবীন্দ্রনাথকে সেদিন যথেষ্ট ঝঞ্ঝাটের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। সেই মুহূর্তে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় উমাচরণকে রেল-পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। পরে রবীন্দ্রনাথ টাকা দিয়ে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে বাসকালে যে ভৃত্যটি দেখাশোনা করত, তার নামটি ছিল ভারি মজার, ‘পুঁটে’। রবীন্দ্রনাথ তার নাম পাল্টে দিতে চেয়েছিল। পুঁটে রাজি হয়নি। তার সাফ কথা, নামকরণ করেছেন ঠাকুরমা, এ নাম পাল্টানো যাবে না। রবীন্দ্রনাথ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, তিনি অনেকেরই নামকরণ করেছেন, আরও একটা না হয় করবেন। ভালো নামই করবেন। পুঁটে যুক্তির কথা বলতে থাকে। রবীন্দ্রনাথকে বলে, ছেলেবেলায় নাম দিলে না হয় হত! এখন আর নতুন নাম দিয়ে কী হবে? এই বয়সে নতুন নাম দিলে লোকে তাকে চিনতে পারবে না।
কলকাতায় বৃষ্টি

সুরেন্দ্রনাথ কর।

সত্যিই যদি রবীন্দ্রনাথ নাম বদলে দেন, পুঁটের উদ্বিগ্নতার শেষ ছিল না। রবীন্দ্রনাথের কাছে এলেই তাকে নতুন নতুন নাম বলতেন। ছন্দ মিলিয়ে মজা করতেন, ‘পুঁটে হল কেন? ঘুঁটে হলেই বা দোষ কি ছিল? কিংবা, খুঁটেই বা নয় কেন?’
পুঁটে ভালো রান্না করতে পারত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর রান্না করা নিয়ে একবার কৌতুক-মন্তব্য করায় অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হয়েছিল সে। শান্তিনিকেতন থেকে শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ কর এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন তিনি, তাঁকে কী খাওয়াবেন! চিন্তায় পড়েছিলেন কবি। পুঁটেই রান্না করবে, এই সুযোগটিকে সে কাজে লাগাতে চাইল। বড়ো বড়ো কই মাছ আনার ব্যবস্থা করল। তৈরি হল কই-সর্ষে। চেটেপুটে খেলেও কবি প্রকাশ্যে তার প্রশংসা করলেন না। বললেন,‘এত সর্ষেবাটা দিয়ে মাছ রান্না করেছ, খেলে যে অসুখ করবে। সর্ষেবাটা ছাড়া কি মাছ রান্না করা যায় না!’
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

উমাচরণও ভালো রাঁধত। ইলিশের ছিল মহাভক্ত। রবীন্দ্রনাথ ইলিশের থেকে তোপসে মাছ বেশি পছন্দ করতেন। উমাচরণেরও বিবাহের সাধ জেগেছিল। পাত্রী জোটাতে পারলেও পণ জোটাতে পারেনি। ফলে তার আর বিবাহ হয়নি। জীবনভর উমাচরণ ছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে। কবি তখন জাপানে। খবর পৌঁছালো উমাচরণ অসুস্থ। বিদেশ থেকে চিন্তিত রবীন্দ্রনাথ পুত্রবধূ প্রতিমাকে লিখেছিলেন, ‘রথীকে বোলো তাকে যেন ভালোরকম সাহায্য করে। তার যেন খাওয়া পরা ও চিকিৎসার অযত্ন না হয়।’
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ।

দূর দেশে অবস্থানকালেই উমাচরণের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে সংবাদ পেয়ে কবি বেদনায় কাতর হয়েছিলেন। ব্যথিত হৃদয়ে রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, ‘উমাচরণ বাঁচবে না আমি জানতুম তবু তার মৃত্যুর খবর পেয়ে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে ও আমাদের কাছে মানুষ হয়ে এসেচে। ওর জীবন আমার জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।’
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content