
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
চিত্রকূটপর্বতে রামের নতুন আশ্রয়স্থল, মহর্ষি অত্রির আশ্রমে ঋষিপত্নী অনসূয়া ছিলেন সার্থকনামা প্রবীণা।কোন অসূয়া (গুণের মধ্যে দোষাবিষ্কারের প্রবণতা) তাঁর নেই। শ্রদ্ধেয়া অনসূয়া সীতার পাতিব্রাত্য, রামের প্রতি একান্ত অনুরাগ, পার্থিব সুখভোগে অনীহা, সর্বত্যাগিনী ভাবমূর্তির প্রশংসা ভূয়সী করলেন। সীতা যেন এইভাবেই স্বামীর সহধর্মচারিণী হয়ে যশস্বিনীর গৌরব লাভ করেন,এই মর্মে প্রার্থনা জানালেন।
কৃতজ্ঞ সীতা শ্রদ্ধেয়া অনসূয়ার অভিনন্দনের প্রত্যুত্তরে বললেন, স্বামীর প্রতি আনুগত্যবিষয়ে ঋষিপত্নীর উপদেশগুলি সম্বন্ধে তিনি অবহিত। স্বামী যদি আর্যগুণবর্জিত চরিত্রহীন ও দরিদ্র হন, সংশয়হীন হয়ে, তাঁর অনুসরণ করা, আমার মতো (সাধ্বী) স্ত্রীর কর্তব্য। এ ছাড়াও রাম, প্রশংসনীয় গুণের আধার, সহানুভূতিশীল, সংযতেন্দ্রিয়, অনুরাগের প্রকাশে স্থির, ধর্মনিষ্ঠ এবং মাতাপিতার মতোই প্রিয়। তাঁর আচরণে বলার (আপত্তিকর) কিছুই নেই। মহাবীর রাম, জননী কৌশল্যার প্রতি ও অন্যান্য রাজমহিষীদের প্রতি সমদর্শী। রাজা দশরথ, অন্য যে নারীদের প্রতি একবার মাত্র (কৃপা) দৃষ্টি আরোপ করেছেন, প্রজাবৎসল ধর্মজ্ঞ রাম, সমস্ত স্বাভিমানবোধ ত্যাগ করে, সেই নারীদের মায়ের তুল্য সম্মান দিয়ে থাকেন।
এই ভয়ঙ্কর নির্জন অরণ্যে আগমনসময়ে শাশুড়িমায়ের উপদেশগুলি তাঁর মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে রয়েছে। সম্প্রদানের সময়ে অগ্নির সম্মুখে জননীপ্রদত্ত উপদেশগুলিও সীতার মনে আছে। ধর্মচারিণী আত্মীয়াদের মতানুসারে পতিসেবা, নারীদের তপস্যাতুল্য, এ ছাড়া তাঁদের আর কোন ধর্ম নেই—সীতা এই উপদেশ বিস্মৃত হননি। স্বামীর শুশ্রূষা করে, সাবিত্রী স্বর্গলাভের গৌরব অর্জন করেছিলেন তেমনই শ্রদ্ধেয়া ঋষিপত্নী অনসূয়াও স্বর্গলাভ করবেন। সীতা উপলব্ধি করেছেন, স্বর্গলোকে সকল নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা, দেবতা রোহিণী, চন্দ্রবিনা এক মুহূর্তের জন্যেও দৃশ্যমানা নন। এমন সব কীর্তিময়ী নারীরা নিজেদের কর্তব্যবিষয়ে অটল থেকে, নিজেদের পুণ্যকর্মফলের কারণে দেবলোকে মহিমান্বিতস্থানে বিরাজ করেন।
সীতার কথা শুনে পরমানন্দে ঋষিপত্নী অনসূয়া পরমস্নেহে সীতার মাথার আঘ্রাণ নিয়ে, তাঁকে বরদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মাননীয়া অনসূয়া জানালেন, তিনি বিধি ও নিয়মানুসারে কৃত সুকঠোর তপস্যার ফলে গভীর সঞ্চিতবলের অধিকারিণী। তিনি পবিত্রচরিত্র সীতার যুক্তিসঙ্গত ও পবিত্র কথাগুলির প্রশংসা করে, প্রীতিভরে বললেন, সীতে করবাণি প্রিয়ঞ্চ কিম্। তোমার জন্য তোমার প্রিয় কোন কাজটি করব। তপস্বিনী অনসূয়ার প্রস্তাব শুনে, বিস্মিতা সীতা, অবাকবিস্ময়ে মৃদু হেসে বললেন, তাঁর নিজের কৃতমিতি সব মনোবাঞ্ছাই পূর্ণ হয়েছে।
কৃতজ্ঞ সীতা শ্রদ্ধেয়া অনসূয়ার অভিনন্দনের প্রত্যুত্তরে বললেন, স্বামীর প্রতি আনুগত্যবিষয়ে ঋষিপত্নীর উপদেশগুলি সম্বন্ধে তিনি অবহিত। স্বামী যদি আর্যগুণবর্জিত চরিত্রহীন ও দরিদ্র হন, সংশয়হীন হয়ে, তাঁর অনুসরণ করা, আমার মতো (সাধ্বী) স্ত্রীর কর্তব্য। এ ছাড়াও রাম, প্রশংসনীয় গুণের আধার, সহানুভূতিশীল, সংযতেন্দ্রিয়, অনুরাগের প্রকাশে স্থির, ধর্মনিষ্ঠ এবং মাতাপিতার মতোই প্রিয়। তাঁর আচরণে বলার (আপত্তিকর) কিছুই নেই। মহাবীর রাম, জননী কৌশল্যার প্রতি ও অন্যান্য রাজমহিষীদের প্রতি সমদর্শী। রাজা দশরথ, অন্য যে নারীদের প্রতি একবার মাত্র (কৃপা) দৃষ্টি আরোপ করেছেন, প্রজাবৎসল ধর্মজ্ঞ রাম, সমস্ত স্বাভিমানবোধ ত্যাগ করে, সেই নারীদের মায়ের তুল্য সম্মান দিয়ে থাকেন।
এই ভয়ঙ্কর নির্জন অরণ্যে আগমনসময়ে শাশুড়িমায়ের উপদেশগুলি তাঁর মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে রয়েছে। সম্প্রদানের সময়ে অগ্নির সম্মুখে জননীপ্রদত্ত উপদেশগুলিও সীতার মনে আছে। ধর্মচারিণী আত্মীয়াদের মতানুসারে পতিসেবা, নারীদের তপস্যাতুল্য, এ ছাড়া তাঁদের আর কোন ধর্ম নেই—সীতা এই উপদেশ বিস্মৃত হননি। স্বামীর শুশ্রূষা করে, সাবিত্রী স্বর্গলাভের গৌরব অর্জন করেছিলেন তেমনই শ্রদ্ধেয়া ঋষিপত্নী অনসূয়াও স্বর্গলাভ করবেন। সীতা উপলব্ধি করেছেন, স্বর্গলোকে সকল নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা, দেবতা রোহিণী, চন্দ্রবিনা এক মুহূর্তের জন্যেও দৃশ্যমানা নন। এমন সব কীর্তিময়ী নারীরা নিজেদের কর্তব্যবিষয়ে অটল থেকে, নিজেদের পুণ্যকর্মফলের কারণে দেবলোকে মহিমান্বিতস্থানে বিরাজ করেন।
সীতার কথা শুনে পরমানন্দে ঋষিপত্নী অনসূয়া পরমস্নেহে সীতার মাথার আঘ্রাণ নিয়ে, তাঁকে বরদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মাননীয়া অনসূয়া জানালেন, তিনি বিধি ও নিয়মানুসারে কৃত সুকঠোর তপস্যার ফলে গভীর সঞ্চিতবলের অধিকারিণী। তিনি পবিত্রচরিত্র সীতার যুক্তিসঙ্গত ও পবিত্র কথাগুলির প্রশংসা করে, প্রীতিভরে বললেন, সীতে করবাণি প্রিয়ঞ্চ কিম্। তোমার জন্য তোমার প্রিয় কোন কাজটি করব। তপস্বিনী অনসূয়ার প্রস্তাব শুনে, বিস্মিতা সীতা, অবাকবিস্ময়ে মৃদু হেসে বললেন, তাঁর নিজের কৃতমিতি সব মনোবাঞ্ছাই পূর্ণ হয়েছে।
সীতার কথা শুনে, ধর্মজ্ঞা অনসূয়া আরও উৎফুল্ল হয়ে বললেন, সীতার মনের আনন্দ যেন চিরস্থায়ী হয়, তিনি সেই ব্যবস্থাই করবেন। এই দিব্য মালা, উত্তম বসন, অলঙ্কারসমূহ,অঙ্গে ব্যবহারের মহার্ঘ্য অনুলেপন প্রভৃতি তিনি দেবেন, যেগুলি সীতার অঙ্গের শোভা বৃদ্ধি করবে, এগুলি অঙ্গে লিপ্ত থেকেও একই রূপে, নিত্য অমলিন থাকবে। এই স্বর্গীয় অঙ্গশোভা ধারণ করে, লক্ষ্মী যেমন অনন্ত বিষ্ণুর শোভাবর্ধন করেন তেমনই স্বামীর শোভা হয়ে থাকবেন, জনকতনয়া, সীতা।
অতঃপর যশস্বিনী সীতা সেই বসনভূষণ ও অনুলেপন প্রভৃতি প্রীতি-উপহার কৃতাঞ্জলিপুটে গ্রহণ করে সন্ন্যাসিনীর কাছে বসে রইলেন। সম্মুখে উপবিষ্টা সীতা, কঠোর তপশ্চারিণী অনসূয়া সীতার পূর্ববৃত্তান্ত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। প্রশ্ন করলেন, স্বয়ংবরে কিল প্রাপ্তা ত্বমনেন যশস্বিনা। রাঘবেণেতি মে সীতে কথা শ্রুতিমুপগতা।। শুনেছি স্বয়ংবর সভায় যশস্বী রাম তোমায় লাভ করেছিলেন। তাং কথাং শ্রোতুমিচ্ছামি বিস্তরেণ চ মৈথিলি। যথাভূতঞ্চ কার্ৎস্ন্যেন তন্মে ত্বং বক্তুমর্হসি।। সেই কাহিনির বিস্তারিত বিবরণ শুনতে চাই। হে মৈথিলি, তুমি যা ঘটেছিল সেটি অনুপুঙ্খ বর্ণনা করতে পার।
তবে শুনুন শ্রূয়তামিতি এই বলে, সীতা বললেন,মিথিলারাজ্যের বীর ও ধর্মজ্ঞ অধিপতি জনক, ক্ষত্রধর্মানুসারে ন্যায়সম্মতভাবে পৃথিবী শাসন করেন। লাঙ্গলহাতে তিনি যখন ভূমি চাষ করছিলেন তখন ভূমি বিদীর্ণ করে তাঁর দুহিতারূপে আমার উদ্ভব হয়েছিল। সীতা তাঁর জন্ম এবং বিবাহ বৃত্তান্ত বর্ণনা করে বললেন, রাজা জনক, যিনি মুঠোয় করে মৃত্তিকা নিক্ষেপে ব্যস্ত ছিলেন,তিনি সর্বাঙ্গে ধূলিধূসর অবস্থায় কন্যাটিকে দেখে বিস্মিত হলেন। সন্তানহীন রাজা স্নেহভরে কন্যাটিকে কোলে তুলে নিলেন। মমেয়ং তনয়া ইতি বলে উঠলেন রাজা। রাজার স্নেহদৃষ্টিতে পড়লেন সীতা। অন্তরিক্ষ হতে মানুষের কণ্ঠে বাণী শোনা গেল, এবমেতন্নরপতে ধর্ম্মেণ তনয়া তব। হে নৃপ, এই কন্যাটি আপনার ধর্মসঙ্গত কন্যা। সন্তুষ্ট, ধার্মিক, পিতা মিথিলাধিপতি জনক, সীতাকে লাভ করে, বিপুলসমৃদ্ধির অধিকারী হলেন।
অতঃপর যশস্বিনী সীতা সেই বসনভূষণ ও অনুলেপন প্রভৃতি প্রীতি-উপহার কৃতাঞ্জলিপুটে গ্রহণ করে সন্ন্যাসিনীর কাছে বসে রইলেন। সম্মুখে উপবিষ্টা সীতা, কঠোর তপশ্চারিণী অনসূয়া সীতার পূর্ববৃত্তান্ত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। প্রশ্ন করলেন, স্বয়ংবরে কিল প্রাপ্তা ত্বমনেন যশস্বিনা। রাঘবেণেতি মে সীতে কথা শ্রুতিমুপগতা।। শুনেছি স্বয়ংবর সভায় যশস্বী রাম তোমায় লাভ করেছিলেন। তাং কথাং শ্রোতুমিচ্ছামি বিস্তরেণ চ মৈথিলি। যথাভূতঞ্চ কার্ৎস্ন্যেন তন্মে ত্বং বক্তুমর্হসি।। সেই কাহিনির বিস্তারিত বিবরণ শুনতে চাই। হে মৈথিলি, তুমি যা ঘটেছিল সেটি অনুপুঙ্খ বর্ণনা করতে পার।
তবে শুনুন শ্রূয়তামিতি এই বলে, সীতা বললেন,মিথিলারাজ্যের বীর ও ধর্মজ্ঞ অধিপতি জনক, ক্ষত্রধর্মানুসারে ন্যায়সম্মতভাবে পৃথিবী শাসন করেন। লাঙ্গলহাতে তিনি যখন ভূমি চাষ করছিলেন তখন ভূমি বিদীর্ণ করে তাঁর দুহিতারূপে আমার উদ্ভব হয়েছিল। সীতা তাঁর জন্ম এবং বিবাহ বৃত্তান্ত বর্ণনা করে বললেন, রাজা জনক, যিনি মুঠোয় করে মৃত্তিকা নিক্ষেপে ব্যস্ত ছিলেন,তিনি সর্বাঙ্গে ধূলিধূসর অবস্থায় কন্যাটিকে দেখে বিস্মিত হলেন। সন্তানহীন রাজা স্নেহভরে কন্যাটিকে কোলে তুলে নিলেন। মমেয়ং তনয়া ইতি বলে উঠলেন রাজা। রাজার স্নেহদৃষ্টিতে পড়লেন সীতা। অন্তরিক্ষ হতে মানুষের কণ্ঠে বাণী শোনা গেল, এবমেতন্নরপতে ধর্ম্মেণ তনয়া তব। হে নৃপ, এই কন্যাটি আপনার ধর্মসঙ্গত কন্যা। সন্তুষ্ট, ধার্মিক, পিতা মিথিলাধিপতি জনক, সীতাকে লাভ করে, বিপুলসমৃদ্ধির অধিকারী হলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৭: আশ্রমকন্যা শকুন্তলার পুত্রের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে চিরন্তন মাতৃত্বের প্রকাশ এবং দুষ্মন্তের লাম্পট্য ও প্রতারণা, সব যুগেই বিদ্যমান

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৯: পথিমধ্যে অতর্কিতে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন
রাজা জনক, পুণ্যকর্মে যুক্তা জ্যেষ্ঠা পত্নীকে কন্যাটি প্রদান করলেন। তাঁর কাছেই মাতৃস্নেহে প্রতিপালিতা হতে লাগলেন সীতা। কন্যার স্বামীর সঙ্গে সহবাসের বয়স হয়েছে দেখে, দরিদ্র ব্যক্তি ধননাশ হলে যেমন চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ওঠেন তেমনই হল পিতার দশা। অবিবাহিতা কন্যার পিতা পৃথিবীতে ইন্দ্রতুল্য (প্রভাবশালী) হলেও তিনি সমমর্যাদার বা তুলনায় নিকৃষ্ট মানুষের কাছে অসম্মানিত হয়ে থাকেন। সেই দুর্ব্যবহার অদূরবর্তী দেখে রাজা জনক, উদ্বেগসাগরে নিমজ্জিত হলেন। অকূলসমুদ্রে পতিত পোতটি যেমন কূলকিনারা পায় না চিন্তাকুল রাজার অবস্থা হল তেমনই। রাজা জানেন, সীতা অযোনিসম্ভূতা। সীতার সমকক্ষ (কুলশীল ও সৌন্দর্যে) রূপবান পাত্র খুঁজে পেলেন না। চিন্তা করে তিনি একটি উপায় স্থির করলেন স্বয়ংবরং তনুজায়াঃ করিষ্যামীতি কর্ম্মণঃ। আমি কন্যার ধর্মসঙ্গত স্বয়ংবর সভার আয়োজন করব।
একদা মহাযজ্ঞে মহাত্মা বরুণদেব প্রীত হয়ে (জনকরাজের জ্যেষ্ঠ দেবরাতকে) একটি ধনুক ও অক্ষয়শরপূর্ণ তূণদুইটি প্রদান করেছিলেন। ধনুকটির এতটাই গুরুভার ছিল যে, কোনও মানুষের সেটি উত্তোলন অসাধ্যপ্রায় ছিল। এমন কি কোন রাজা সেই ধনুকটি নত করবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। সীতার সত্যপরায়ণ পিতা সমবেত সমস্ত রাজপুরুষদের আমন্ত্রণ জানালেন, ধনুকটি উত্তোলনবিষয়ে সভামধ্যে ঘোষণা করলেন, ইদঞ্চ ধনুরুদ্যম্য সজ্যং যঃ কুরুতে নরঃ।তস্য মে দুহিতা ভার্য্যা ভবিষ্যতি ন সংশয়ঃ।। যিনি এই ধনুকটি উঠিয়ে (শর) সজ্জিত করতে সক্ষম হবেন আমার কন্যা নিঃসন্দেহে তাঁর ভার্যা হবেন। যার গুরুভার পর্বতসদৃশ সেই ধনুকটির উত্তোলনে অক্ষম হয়ে, সকলে সেটিকে অভিবাদন করে প্রস্থান করলেন।দীর্ঘকাল পরে মহাদ্যুতিময়, এই সত্যপ্রতিজ্ঞ, রাঘব, রাম, ভাই লক্ষ্মণের সঙ্গে, মহর্ষি বিশ্বামিত্রের সাহচর্যে যজ্ঞ দেখতে সেখানে এসেছিলেন। সীতার পিতা, ধর্মজ্ঞ মহর্ষি বিশ্বামিত্রকে সম্মানিত করলেন।
মহর্ষি জানালেন, রাজা দশরথের পুত্রদ্বয় রঘুবংশীয় রাম ও লক্ষ্মণ সেই ধনুকটির দর্শনার্থী। মহর্ষি এই কথা বলা মাত্রই জনকরাজা দৈব ধনুকটি এনে রাজপুত্রকে দেখালেন। এক নিমেষে মহাবীর রাম, ধনুকটিকে আনত করলেন। ধনুকে জ্যা আরোপ করে আকর্ষণ করলেন তিনি। ভয়ঙ্করশব্দে দ্বিখণ্ডিত হল ধনুকটি, যেন ভয়াবহ বজ্রপাতের শব্দ হল। তখন সীতার সত্যপরায়ণ পিতা রামকে কন্যাসম্প্রদানে উদ্যোগী হলেন এবং একটি উৎকৃষ্ট জলপূর্ণ পাত্র দান করতে আগ্রহী হলেন।
একদা মহাযজ্ঞে মহাত্মা বরুণদেব প্রীত হয়ে (জনকরাজের জ্যেষ্ঠ দেবরাতকে) একটি ধনুক ও অক্ষয়শরপূর্ণ তূণদুইটি প্রদান করেছিলেন। ধনুকটির এতটাই গুরুভার ছিল যে, কোনও মানুষের সেটি উত্তোলন অসাধ্যপ্রায় ছিল। এমন কি কোন রাজা সেই ধনুকটি নত করবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। সীতার সত্যপরায়ণ পিতা সমবেত সমস্ত রাজপুরুষদের আমন্ত্রণ জানালেন, ধনুকটি উত্তোলনবিষয়ে সভামধ্যে ঘোষণা করলেন, ইদঞ্চ ধনুরুদ্যম্য সজ্যং যঃ কুরুতে নরঃ।তস্য মে দুহিতা ভার্য্যা ভবিষ্যতি ন সংশয়ঃ।। যিনি এই ধনুকটি উঠিয়ে (শর) সজ্জিত করতে সক্ষম হবেন আমার কন্যা নিঃসন্দেহে তাঁর ভার্যা হবেন। যার গুরুভার পর্বতসদৃশ সেই ধনুকটির উত্তোলনে অক্ষম হয়ে, সকলে সেটিকে অভিবাদন করে প্রস্থান করলেন।দীর্ঘকাল পরে মহাদ্যুতিময়, এই সত্যপ্রতিজ্ঞ, রাঘব, রাম, ভাই লক্ষ্মণের সঙ্গে, মহর্ষি বিশ্বামিত্রের সাহচর্যে যজ্ঞ দেখতে সেখানে এসেছিলেন। সীতার পিতা, ধর্মজ্ঞ মহর্ষি বিশ্বামিত্রকে সম্মানিত করলেন।
মহর্ষি জানালেন, রাজা দশরথের পুত্রদ্বয় রঘুবংশীয় রাম ও লক্ষ্মণ সেই ধনুকটির দর্শনার্থী। মহর্ষি এই কথা বলা মাত্রই জনকরাজা দৈব ধনুকটি এনে রাজপুত্রকে দেখালেন। এক নিমেষে মহাবীর রাম, ধনুকটিকে আনত করলেন। ধনুকে জ্যা আরোপ করে আকর্ষণ করলেন তিনি। ভয়ঙ্করশব্দে দ্বিখণ্ডিত হল ধনুকটি, যেন ভয়াবহ বজ্রপাতের শব্দ হল। তখন সীতার সত্যপরায়ণ পিতা রামকে কন্যাসম্প্রদানে উদ্যোগী হলেন এবং একটি উৎকৃষ্ট জলপূর্ণ পাত্র দান করতে আগ্রহী হলেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৮: নীতি কেবল মুখোশ, রাজনীতির মূল হল কৌশল আর ছলনা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক
রাঘব রাম কিন্তু পিতা অযোধ্যাপতি দশরথের সম্মতিব্যতীত সেই দান অস্বীকার করলেন। তখন শ্বশুরমহাশয় বৃদ্ধ রাজা দশরথকে আমন্ত্রণ জানালেন। পিতা জনক, রাজা দশরথের সম্মতি নিয়ে সীতাকে আত্মজ্ঞ রামের হাতে সম্প্রদান করলেন। স্বয়ং পিতা জনক, লক্ষ্মণের ভার্যারূপে, সীতার ভগিনী সাধ্বী, প্রিয়দর্শিনী, ঊর্মিলাকে দান করলেন। সবকিছু বর্ণনার শেষে, তপস্বিনী ঋষিপত্নী অনসূয়ার কাছে, সীতার সরল অকপট স্বীকারোক্তি—এবং দত্তাস্মি রামায় তথা তস্মিন্ স্বয়ংবরে। অনুরক্তাস্মি ধর্ম্মেণ পতিং বীর্য্যবতাং বরম্।। এইভাবে সেই স্বয়ংবরসভায় আমায় রামকে সম্প্রদান করা হল। সেই থেকে আমি ধর্মানুসারে বীরদের মধ্যে অগ্রগণ্য স্বামীর প্রতি অনুরক্ত রয়েছি।
ধর্মজ্ঞান যাঁর গভীর, ঋষিপত্নী অনসূয়া, এই মহান বৃত্তান্ত শুনে সীতার মস্তকের আঘ্রাণ নিয়ে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরলেন সীতাকে। বললেন, সীতা খুব সুন্দর ও বিচিত্র এই স্বয়ংবর বৃত্তান্তটি স্পষ্ট অক্ষরবিন্যাসে সুমধুর ভাষায় বর্ণনা করেছেন, তিনি সবটাই শুনেছেন। তিনি মধুরভাষিণী সীতার এই কাহিনি শুনে নিরতিশয় প্রীত হয়েছেন। ইতিমধ্যে দিগন্তে অস্তমিত হয়েছেন শ্রীমান সূর্যদেব, পুণ্য রজনী প্রায় সমাগত। আহারের কারণে সমস্তদিনের ব্যস্ততার অবসানে, সন্ধ্যায় নীড়ের আশ্রয়ে নিদ্রাভিভূত হওয়ার অপেক্ষারত পাখিদের কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। জলসিক্তবল্কলধারী মুনিগণ, অবগাহন স্থানান্তে সিক্তদেহে পূর্ণকলস নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন আশ্রমে। মুনিগণের যথাবিধিকৃত অগ্নিহোত্রযাগে, কপোতের কণ্ঠের মতো শ্যামবর্ণ হোমাগ্নির ধূম, বায়ুবেগে উত্থিত হচ্ছে। দিগন্তরেখা যেগুলি ইন্দ্রিয়গুলিদ্বারা স্পর্শ যোগ্য নয়, চারিদিকে ঘনীভূত হয়ে দৃশ্যমান
স্বল্পপত্রবিশিষ্ট, গাছগুলি, সেগুলির প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। নিশাচর প্রাণীগুলি,চ তুর্দিকে বিচরণরত রয়েছে। তপোবনের পবিত্রবেদীতে শুয়ে আছে তপোবনের আশ্রিত মৃগগুলি।
ধর্মজ্ঞান যাঁর গভীর, ঋষিপত্নী অনসূয়া, এই মহান বৃত্তান্ত শুনে সীতার মস্তকের আঘ্রাণ নিয়ে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরলেন সীতাকে। বললেন, সীতা খুব সুন্দর ও বিচিত্র এই স্বয়ংবর বৃত্তান্তটি স্পষ্ট অক্ষরবিন্যাসে সুমধুর ভাষায় বর্ণনা করেছেন, তিনি সবটাই শুনেছেন। তিনি মধুরভাষিণী সীতার এই কাহিনি শুনে নিরতিশয় প্রীত হয়েছেন। ইতিমধ্যে দিগন্তে অস্তমিত হয়েছেন শ্রীমান সূর্যদেব, পুণ্য রজনী প্রায় সমাগত। আহারের কারণে সমস্তদিনের ব্যস্ততার অবসানে, সন্ধ্যায় নীড়ের আশ্রয়ে নিদ্রাভিভূত হওয়ার অপেক্ষারত পাখিদের কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। জলসিক্তবল্কলধারী মুনিগণ, অবগাহন স্থানান্তে সিক্তদেহে পূর্ণকলস নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন আশ্রমে। মুনিগণের যথাবিধিকৃত অগ্নিহোত্রযাগে, কপোতের কণ্ঠের মতো শ্যামবর্ণ হোমাগ্নির ধূম, বায়ুবেগে উত্থিত হচ্ছে। দিগন্তরেখা যেগুলি ইন্দ্রিয়গুলিদ্বারা স্পর্শ যোগ্য নয়, চারিদিকে ঘনীভূত হয়ে দৃশ্যমান
স্বল্পপত্রবিশিষ্ট, গাছগুলি, সেগুলির প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। নিশাচর প্রাণীগুলি,চ তুর্দিকে বিচরণরত রয়েছে। তপোবনের পবিত্রবেদীতে শুয়ে আছে তপোবনের আশ্রিত মৃগগুলি।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৯: চেন টেনে উমাচরণের জেল হয়েছিল

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৬: গ্রিন টি /৪
আসন্ন রাত্রির নক্ষত্রশোভার প্রতি সীতার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন অনসূয়া। তারকামণ্ডল দ্বারা সজ্জিতা রজনী সমাগতা, জ্যোৎস্নার আবরণে আচ্ছাদিত চন্দ্র আকাশে উদীয়মান। সীতার প্রতি ঋষি পত্নীর অনুরোধ, গম্যতামনুজানামি রামস্যানুচরী ভব।কথয়ন্ত্যা হি মধুরং ত্বয়াহমপি তোষিতা।। যাও রামকে সঙ্গ দাও। তোমার মধুর কথায় আমি বড়ই তৃপ্ত হয়েছি। হে মৈথিলি, আমার দৃষ্টির সম্মুখে তুমি নিজেকে অলঙ্কৃত কর। বাছা তুমি, দিব্য আভরণে সজ্জিতা হয়ে আমায় আনন্দ দাও। অলঙ্কুরু চ তাবৎ ত্বং প্রত্যক্ষং মম মৈথিলি। প্রীতিং জনয় মে বৎসে দিব্যালঙ্কারশোভিনি।। দেবকন্যাতুল্যা আভরণমণ্ডিতা সীতা, অবনতমস্তকে তাঁর চরণ বন্দনা করে, রামের কাছে গেলেন। বাক্যবিদ রাম দেখলেন তেমনই সজ্জিতা সীতাকে। তপস্বিনীর প্রীতি- উপহার দেখে, আনন্দে হেসে উঠলেন রাঘব রাম। সীতা, রামকে, অত্রিপত্নী তাপসী অনসূয়াপ্রদত্ত বসন, ভূষণ, মাল্য প্রভৃতির প্রীতি-উপহারপ্রদান বৃত্তান্ত জানালেন। মহারথী রাম ও লক্ষ্মণ, মৈথিলী সীতার মনুষ্যসমাজে দুর্লভ এই সম্মানপ্রাপ্তি দেখে, অতিশয় তুষ্ট হলেন।
পরিশেষে রঘুনন্দন রামচন্দ্র, সকল তাপসগণের বন্দনায় আপ্যায়িত হয়ে, চন্দ্রবদনী পুণ্যা রজনীতে, আশ্রমেই বাস করলেন। রাত্রি অতিবাহিত হলে,পুরুষব্যাঘ্র রাম ও লক্ষ্মণ স্নান করে, হোমাহুতিদানরত বনবাসী আশ্রমিক তাপসবৃন্দের কাছে বিদায় প্রার্থনা করলেন। অরণ্যবাসী, ধর্মাচরণে অভ্যস্ত, তাপসগণ, রাক্ষসদের দ্বারা উপদ্রুত অরণ্যসম্বন্ধে সতর্কবার্তা জানালেন। এই মহারণ্য বিচিত্র সব নরমাংসভোজী রাক্ষস এবং রক্তপায়ী হিংস্র শ্বাপদদের আবাসস্থল। এখানে যে কোন তপস্বী বা ধর্মচারী যে কেউ অপবিত্র ও অসতর্ক অবস্থায় থাকলে তারা তাঁদের ভক্ষণ করে। হে রাঘব তুমি তাদের বাধা দাও। তান্ নিবারয় রাঘব। তপস্বীগণ রামকে পথনির্দেশ দিলেন, মহর্ষিগণ এই পথে বন হতে ফল আহরণ করতে যান, রাম, এই পথ ধরেই দুর্গম গহনারণ্যে প্রবেশ করতে পারবেন।বলতে বলতে, ব্রাহ্মণ তপস্বীগণ অঞ্জলিবদ্ধ অবস্থায় রামের সম্মানে শুভযাত্রাপথের শান্তি প্রার্থনা করতে লাগলেন। অরিন্দম রাম, পত্নী ও লক্ষ্মণসহ,মেঘমণ্ডলে প্রবেশোদ্যত সূর্যের মতো সেই গহনারণ্যে প্রবেশ করলেন।
ইতীরিতঃ প্রাঞ্জলিভিস্তপস্বিভির্দ্বিজৈঃ কৃতস্বস্ত্যয়নঃ পরন্তপঃ। বনং সভার্য্যঃ প্রবিবেশ রাঘবঃ সলক্ষ্মণঃ সূর্য্য ইবাভ্রমণ্ডলম্।।
রামের জীবনে বাধ্য অনুগতা স্ত্রী সীতার ভূমিকা, অবিসংবাদী। সীতাবিনা, রামের, প্রজানুরঞ্জক, জনমনোমোহনরূপ ভাবমূর্তি প্রকট হত কি না এ বিষয়ে হয়তো সন্দেহের অবকাশ আছে। যোগ্যা স্ত্রী হওয়ার জন্যে পাতিব্রাত্য প্রভৃতির শিক্ষা তিনি শৈশবেই মায়ের কাছে পেয়েছেন। তারপরে শাশুড়িমায়ের উপদেশ তো আছেই।
পরিশেষে রঘুনন্দন রামচন্দ্র, সকল তাপসগণের বন্দনায় আপ্যায়িত হয়ে, চন্দ্রবদনী পুণ্যা রজনীতে, আশ্রমেই বাস করলেন। রাত্রি অতিবাহিত হলে,পুরুষব্যাঘ্র রাম ও লক্ষ্মণ স্নান করে, হোমাহুতিদানরত বনবাসী আশ্রমিক তাপসবৃন্দের কাছে বিদায় প্রার্থনা করলেন। অরণ্যবাসী, ধর্মাচরণে অভ্যস্ত, তাপসগণ, রাক্ষসদের দ্বারা উপদ্রুত অরণ্যসম্বন্ধে সতর্কবার্তা জানালেন। এই মহারণ্য বিচিত্র সব নরমাংসভোজী রাক্ষস এবং রক্তপায়ী হিংস্র শ্বাপদদের আবাসস্থল। এখানে যে কোন তপস্বী বা ধর্মচারী যে কেউ অপবিত্র ও অসতর্ক অবস্থায় থাকলে তারা তাঁদের ভক্ষণ করে। হে রাঘব তুমি তাদের বাধা দাও। তান্ নিবারয় রাঘব। তপস্বীগণ রামকে পথনির্দেশ দিলেন, মহর্ষিগণ এই পথে বন হতে ফল আহরণ করতে যান, রাম, এই পথ ধরেই দুর্গম গহনারণ্যে প্রবেশ করতে পারবেন।বলতে বলতে, ব্রাহ্মণ তপস্বীগণ অঞ্জলিবদ্ধ অবস্থায় রামের সম্মানে শুভযাত্রাপথের শান্তি প্রার্থনা করতে লাগলেন। অরিন্দম রাম, পত্নী ও লক্ষ্মণসহ,মেঘমণ্ডলে প্রবেশোদ্যত সূর্যের মতো সেই গহনারণ্যে প্রবেশ করলেন।
ইতীরিতঃ প্রাঞ্জলিভিস্তপস্বিভির্দ্বিজৈঃ কৃতস্বস্ত্যয়নঃ পরন্তপঃ। বনং সভার্য্যঃ প্রবিবেশ রাঘবঃ সলক্ষ্মণঃ সূর্য্য ইবাভ্রমণ্ডলম্।।
রামের জীবনে বাধ্য অনুগতা স্ত্রী সীতার ভূমিকা, অবিসংবাদী। সীতাবিনা, রামের, প্রজানুরঞ্জক, জনমনোমোহনরূপ ভাবমূর্তি প্রকট হত কি না এ বিষয়ে হয়তো সন্দেহের অবকাশ আছে। যোগ্যা স্ত্রী হওয়ার জন্যে পাতিব্রাত্য প্রভৃতির শিক্ষা তিনি শৈশবেই মায়ের কাছে পেয়েছেন। তারপরে শাশুড়িমায়ের উপদেশ তো আছেই।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
এই ভারতীয়পরম্পরা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে। শুধু তাই নয় এটি যেন মজ্জাগত হয়ে, ভারতীয়নারীদের রক্তে মিশে গিয়েছে। তাই সীতার, স্বামীর প্রতি আনুগত্য প্রশ্নাতীত। ঋষিপত্নীর উপদেশগুলির সারার্থ হল, পতির প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য স্ত্রীদের কর্তব্য। তাঁর উপরে রাম যে সে মানুষ নন, তিনি কেমন? কিং পুনর্যো গুণশ্লাঘ্যঃ সানুক্রোশো জিতেন্দ্রিয়ঃ। স্থিরানুরাগো ধর্মাত্মা মাতৃবৎ পিতৃবৎ প্রিয়ঃ।। বলার কথা নয় তিনি এমন প্রশংসনীয় গুণের আধার, সহানুভূতিশীল, স্থির তাঁর অনুরাগ, ধর্মনিষ্ঠ, পিতামাতার মতোই তিনি স্নেহশীল। এই ছিল সীতার বয়ানে রামচন্দ্র। সবগুণগুলিই মানবিকগুণের চরম পরিণত অবস্থা। সীতা রামের মানবিকতাবোধের প্রতি আস্থা রেখেছেন। এগুলি যদি না থাকত তবুও রামের প্রতি তাঁর আত্মসমর্পণ ছিল নিঃশর্ত, দ্বিধাহীন, নিখাদ, ভালবাসার প্রকাশ। ভারতীয় নারীরা এভাবেই মেনে নেন বা মানিয়ে চলেন স্বামীর মত ও পথকে। কারণ তাঁরা আনুগত্যের পাঠ নিতেই অভ্যস্ত ছিলেন। তবে এখন হয়তো এই শিক্ষা অস্বীকার করতেই অভ্যস্ত হচ্ছেন ভাবি প্রজন্মের নারীশক্তি। সেটি সদর্থক কিনা সময় তা বলে দেবে।
সীতার সারল্যে মুগ্ধ হয়েছেন তাপসী অনসূয়া।তিনি তপস্বিনী হয়েও প্রসাধনসামগ্রীতে সীতাকে সাজিয়ে তুলেছেন। বৈরাগ্য ও জীবনাসক্তির কি আশ্চর্য মেলবন্ধন। প্রীতি-উপহারে যেন তার প্রতিচ্ছবি। লাঙ্গল দিয়ে ভূমিচাষের সময়ে মৃত্তিকা হতে জনককন্যা সীতার উত্থান। কত মাটি ছেনে, একটি মাটির দেবীমূর্তির বিনির্মাণ। ভালোবাসা দিয়ে, কত মায়া গায়ে মেখে একটি কন্যাসন্তানের পৃথিবীতে আসা এবং বড় হয়ে ওঠা।সে বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠলে, তাকে নিয়ে পিতার দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। বিবাহযোগ্যা সীতাকে দেখে, দারিদ্র্য দুঃখের অভিঘাতে দুশ্চিন্তাকুল পিতার অবস্থা হল পিতা জনকের। একজন রাজার যদি এই দশা হয় তবে সাধারণের মনের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এখনও ভারতবর্ষের কোন কোন অঞ্চলে এমন চিত্র বিরল নয়। তবে কন্যাদের ধ্যানধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে, তাঁরা এখন অনেকেই স্বয়ংবরা, তবে স্বয়ংবর সভা আর নেই, পরিবেশ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে।
সীতার সারল্যে মুগ্ধ হয়েছেন তাপসী অনসূয়া।তিনি তপস্বিনী হয়েও প্রসাধনসামগ্রীতে সীতাকে সাজিয়ে তুলেছেন। বৈরাগ্য ও জীবনাসক্তির কি আশ্চর্য মেলবন্ধন। প্রীতি-উপহারে যেন তার প্রতিচ্ছবি। লাঙ্গল দিয়ে ভূমিচাষের সময়ে মৃত্তিকা হতে জনককন্যা সীতার উত্থান। কত মাটি ছেনে, একটি মাটির দেবীমূর্তির বিনির্মাণ। ভালোবাসা দিয়ে, কত মায়া গায়ে মেখে একটি কন্যাসন্তানের পৃথিবীতে আসা এবং বড় হয়ে ওঠা।সে বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠলে, তাকে নিয়ে পিতার দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। বিবাহযোগ্যা সীতাকে দেখে, দারিদ্র্য দুঃখের অভিঘাতে দুশ্চিন্তাকুল পিতার অবস্থা হল পিতা জনকের। একজন রাজার যদি এই দশা হয় তবে সাধারণের মনের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এখনও ভারতবর্ষের কোন কোন অঞ্চলে এমন চিত্র বিরল নয়। তবে কন্যাদের ধ্যানধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে, তাঁরা এখন অনেকেই স্বয়ংবরা, তবে স্বয়ংবর সভা আর নেই, পরিবেশ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
বাহুবলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ রাম, বিবাহবিষয়েও পিতার প্রতি আনুগত্যের নিদর্শন রেখেছেন। রাম পেশীশক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তথাকথিত নায়ক হয়েছেন, সদ্য যৌবনে উপনীতা কুমারী সীতার হয়তো মুগ্ধহৃদয় জয় করেছেন তখনই। ধীরে তাঁর আন্তরসৌন্দর্যে আকৃষ্টা সীতা রামের প্রতি হয়তো শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছেন। তাঁর সরল স্বীকারোক্তি ছিল—ধর্মনিষ্ঠ রাম পিতামাতার মতোই স্নেহশীল। স্নেহ নিম্নগামী, স্ত্রী জীবনযুদ্ধের সহযোদ্ধা, তাঁর প্রতি স্বামীর মনোভাব কেমন? সীতার সপ্রশংস উক্তি অনুসারে রাম স্ত্রীর প্রতি স্থিরানুরাগঃ তেমন কী তিনি থাকতে পেরেছিলেন? যেমন আর পাঁচটা ভারতীয় পুরুষের স্ত্রীর প্রতি অনুরাগের স্থিরতা, পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে অনিশ্চিত হয়ে ওঠে তেমনই রামের তথাকথিত স্ত্রীর প্রতি অনুরাগের বাঁধনটি স্খলিত হয়েছিল। রামায়ণে রামসীতার বিয়োগান্তক পরিণতি হয়তো তার প্রমাণ। তবে পত্নীপ্রেমে বিগলিত ঘরোয়া স্বামীটি নন, শৌর্যশালী রাবণবিজেতা রামের রাজকীয় ভাবমূর্তি এখনও উজ্জ্বল। সীতাপতি রামের এই যুগোত্তীর্ণ প্রোজ্জ্বল ভাবমূর্তির মূলে আছে স্ত্রী সীতার অমোঘ অনস্বীকার্য অমল মহিমা, এ কথা হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















