
নায়ক ছবিতে শর্মিলা ও উত্তম।
নায়ক কি মহাপুরুষ? মহাপুরুষ কি নায়ক?
মহাপুরুষ ছবির শেষদৃশ্যটি মনে করুন। নায়কের ঠিক কীরকম পরিণতি হয়, রাতের অন্ধকারে তাড়া খেয়ে পাশে চতুর্ভুজ পঞ্চানন ‘কেবলানন্দ’ মহাদেবকে নিয়ে শূন্য গলির মোড়ের দিকে চলে যেতে হয়। বিরিঞ্চিবাবাকে নায়ক ভাবুন কিংবা না-ই ভাবুন, অরিন্দম চ্যাটার্জি নায়ক। নায়কের সংজ্ঞা ঠিক কী, সেই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। অরিন্দম নিজেই সাংবাদিকের সাক্ষাৎকারের প্রস্তাবে জানান যে, তাঁরা ছায়ার জগতে বিচরণ করেন, অর্থাত্ ছায়া-ছবিই তাঁদের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। তাই তাদের খবর প্রকাশ্যে আসাটা ক্ষতিকর তো বটেই! নায়ক “লার্জার দ্যান লাইফ”, তাঁরা স-ব জানেন।
মহাপুরুষ ছবির শেষদৃশ্যটি মনে করুন। নায়কের ঠিক কীরকম পরিণতি হয়, রাতের অন্ধকারে তাড়া খেয়ে পাশে চতুর্ভুজ পঞ্চানন ‘কেবলানন্দ’ মহাদেবকে নিয়ে শূন্য গলির মোড়ের দিকে চলে যেতে হয়। বিরিঞ্চিবাবাকে নায়ক ভাবুন কিংবা না-ই ভাবুন, অরিন্দম চ্যাটার্জি নায়ক। নায়কের সংজ্ঞা ঠিক কী, সেই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। অরিন্দম নিজেই সাংবাদিকের সাক্ষাৎকারের প্রস্তাবে জানান যে, তাঁরা ছায়ার জগতে বিচরণ করেন, অর্থাত্ ছায়া-ছবিই তাঁদের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। তাই তাদের খবর প্রকাশ্যে আসাটা ক্ষতিকর তো বটেই! নায়ক “লার্জার দ্যান লাইফ”, তাঁরা স-ব জানেন।
খেলাধূলো, পড়াশোনা, প্রগতিশীলতা, চরিত্রগুণ এবং আর যাকিছু হতে পারে সবেতেই তাঁরা চ্যাম্পিয়ন। ফিল্মের হিরো, নায়ক অরিন্দম দিল্লি চলেছেন পুরস্কার নিতে, যা তাঁর অধ্যবসায় ও প্রতিভার স্বীকৃতি। তবুও একটা ভয় তাঁকে তাড়া করে দুঃস্বপ্ন হয়ে। কীসের ভয়? প্রতিষ্ঠা হারানোর থেকে আত্মবিস্মরণ, নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়, বিচ্যুতির গ্লানি থেকে সংগোপনে জেগে ওঠে সেই ভয়। একটি ট্রেনযাত্রা তাঁর ফেলে আসা ও ভাবী জীবনের প্রতীক হয়ে ধরা দেয়। বিরিঞ্চিবাবা কি এরকম দুঃস্বপ্নতাড়িত ভয় পেতেন?
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৯: পথিমধ্যে অতর্কিতে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৩: শকুন
অরিন্দম চ্যাটার্জি দিনদুপুরে ভুতুড়ে স্বপ্ন দেখেন। সেই বিখ্যাত দৃশ্য। টাকার স্তূপে অরিন্দম। শত্রু, প্রতিযোগী সকলকে হারিয়ে তিনি আজ শীর্ষে। কিন্তু রিপু, নিজের ভিতরে বাসা বেঁধে থাকা অস্বস্তি, বিচলন এদেরকে জয় করতে পেরেছেন তিনি? টাকা, আরও টাকা, আরও আরও অর্থের আসক্তি তাঁকে থামতে দেয়নি। তিনি ঝরে পড়া টাকার মধ্যে শিশুর মতো খেলা করেন। মুগ্ধ, সম্মোহিত চোখে তাকিয়ে দেখেন। যেন রত্নপুরীতে আটকে থাকা যক্ষ, লাফিয়ে ওঠেন টাকার পাহাড়ের মাথায়। হঠাৎ কিছু বদলায় যেন। চারপাশে বুঝি সহসা মেঘ ঘনায়। ঝড়ের আওয়াজ, একটা অস্পষ্ট খড়খড় শব্দ, যেন ঘড়ির কাঁটার টিকটিক, যেন ফোনের ডায়াল ঘোরানোর শব্দ, নাকি হাড়ের খটখট? আচমকা দেখা যায় চারপাশে জেগে উঠেছে অজস্র হাত, কঙ্কালের অস্থিসার সাদা হাত, যে হাত টেনে নিয়ে গিয়েছিল নতুন অলঙ্কার পূর্ণিমার রাতে, মণিহারাতে। এখন সেই হাতেই টানা একঘেয়ে ক্রিংক্রিং বেজে চলা টেলিফোন। তারা চারপাশে বেজে চলে, বেজেই চলে। পালাবার পথ নেই। যে দিকেই যাও, কঙ্কালের হাতে জ্যান্ত টেলিফোন। অরিন্দম ভয়ে পিছিয়ে আসেন, কোনো বিকল্প পথ নেই।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৮: নীতি কেবল মুখোশ, রাজনীতির মূল হল কৌশল আর ছলনা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৭: আশ্রমকন্যা শকুন্তলার পুত্রের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে চিরন্তন মাতৃত্বের প্রকাশ এবং দুষ্মন্তের লাম্পট্য ও প্রতারণা, সব যুগেই বিদ্যমান
এই হল উত্তরাধুনিক যন্ত্রসমাজ, যেখানে যোগাযোগে বিপ্লব ঘটেছে অকল্পনীয়, কিন্তু মানুষ হয়েছে আত্মবিচ্ছিন্ন। টেলিফোন এখানে সেই যোগাযোগ ও বিচ্ছেদের বার্তাটি দেয়। ফোনে ঝুলতে থাকা তার বুঝি মনে করাতে পারে সেই হাহা রব, “তার ছিঁড়ে গেছে কবে”… এই টেলিফোন, তার একটানা বেজে চলা অনিবার্যভাবে বয়ে চলা সময়, এগিয়ে চলা মুহূর্তের পর মুহূর্ত, সামগ্রিকভাবে কালের অপ্রতিহত ও অনিবার্য করাল গ্রাসটিকে মনে করাতে চাইবে। কঙ্কালের হাত মর্ত্য-প্রেম, তীব্র আসক্তির বিপ্রতীপে এক বিভীষিকাকে জাগিয়ে তোলে, যাকে মৃত্যুভয় বলে। নেপথ্যে বেজে ওঠে হরিবোল ধ্বনি। এই দৃশ্য কি ভয়ের? ভাবনার? হাসির? কান্নার?
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৯: চেন টেনে উমাচরণের জেল হয়েছিল

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৬: গ্রিন টি /৪
অরিন্দম ডুবতে থাকেন, টাকার পাহাড় তাঁকে গ্রাস করে, তিনি তলিয়ে যেতে থাকেন, এই পতনের, স্খলনের ভয়টিই তাঁর অবচেতনায় ছিল, মনস্তত্ত্বের ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যা কি তাঁর জানা? টাকার পাহাড়ে আর্তনাদ করে ডুবতে ডুবতে শেষ বাঁচার চেষ্টা তিনি করেন। দূরে একটি প্রেতমূর্তি বসে, ইনি তাঁর নাট্যগুরু শঙ্করদা। প্রলয়ের, বিনাশের কালে লয়ের দেবতা শিব—শঙ্করদাকে ডাকার মধ্যে কিছু কৌতুক, খানিক ব্যঞ্জনা খুঁজে পাওয়া যাবে। এ কি সেই কৈলাস? যে পর্বতে প্রলয়াধিপতি মহাভিক্ষুক উচারচিত্ত শিবের বাস? নাট্যপরিচালক শঙ্করদার চরিত্রটিও জেগে ওঠে যেন, যাঁর নিষেধ ও আদর্শ উপেক্ষা করে অরিন্দম ফিল্মে পা রেখেছিলেন। তা বেশ করেছিলেন। তিনি শীর্ষে পৌঁছতে চেয়েছিলেন, সেই শিখরকে স্পর্শ করেছেন-ও বটে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
তবে মনের গভীরে কেন এই ভয়? সেই শিব-শঙ্করের দেহে রাজবেশ, মুখে প্রেতলোকের বীভৎস ছায়া, চোখে বীক্ষণযন্ত্র চশমা। যে যন্ত্রের ওপার থেকে তিনি মেপে নেন জীবন-মৃত্যুর সব হিসেব-নিকেশ। অরিন্দমের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের আঙুল ধরার জন্য তিনি হাত বাড়ান… তখন অরিন্দমের দেহ তলিয়ে গিয়েছে প্রায়, শুধু নাক চোখটুকুই যা জেগে থাকতে চাইছে। সেই পরলোকের হাত যেন অদৃশ্য টান দেয়, শঙ্করদা কি বাঁচান মৃত্যু দিয়ে? তিনি বাঁচান? নাকি মারেন? নাকি টেনে নেন? নাকি জীবন ফিরে পান অরিন্দম? তিনি আরও ডুবে যান, স্বপ্ন অসমাপ্ত থেকেই বুঝি ভেঙে যায়। ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়া অরিন্দম যেন কেঁপে ওঠেন। অরিন্দম, যিনি নামত বিজয়ী, কিছু পরেই যাঁর মাথায় উঠবে সেরার মুকুট, তা কি কাঁটার? নিজেই নিজের শত্রু হয়ে উঠেছেন কি তিনি? পলায়নপর মহাপুরুষ বিরিঞ্চিবাবার পাশেও তো কল্যাণময় শিব সেজে মূর্তিমান কেবলানন্দ, কেবল আনন্দ দান করতে করতেই নিজেদের বিনাশের পথটি প্রশস্ত করেছেন।

মহাপুরুষ ছবির একটি দৃশ্য।
অরিন্দম আরো একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে তা আগামী পর্বের জন্য তোলা থাকুক।
সোনার কেল্লাতে ট্রেন তখন সবে জয়সলমীর ঢুকছে, ঝলমলে রোদের সকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে ফেলুদা, সামনে সোনার কেল্লা… তোপসে দৌড়ে এসে নিদ্রিত জটায়ুকে ঠেলা দেয় “লালমোহনবাবু, উঠুন।” জটায়ু ধড়মড়িয়ে ওঠেন, আতঙ্কিত স্বরে “উট” বলে জিজ্ঞাসু হন। তোপসে হেসে তাকে অভয় দেয়। জটায়ু কি স্বপ্ন দেখছিলেন? জটায়ুর ভয়ের কারণটা ঠিক কী সোনার কেল্লার দর্শকমাত্রেই জানেন। অন্য একটা কথা থাকুক বরং শেষে।
নায়ক অরিন্দম জনৈকা সম্পাদিকাকে অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে সামান্য কথোপকথনের পর জানালেন, “বি এ পাশ করা নায়িকার কখনও বিরহে গান হওয়া উচিত নয়।” নায়িকা উত্তর করলেন, “আর নায়ক হলেই দেবতুল্য লোক হওয়া উচিত নয়।” অর্থাৎ মহাপুরুষ কিংবা নায়কের কারবার ছায়া আর বাজারের পালস্ নিয়ে হলেও রক্তমাংসের জগতে জটায়ুর কথাটাই মনে রাখতে হয়, উটে ওঠার আকস্মিক সুযোগ এসে গেলে তাঁর বহুলালিত স্বপ্ন এমনভাবে বাস্তব হয়ে উঠবে একথা ভেবে তিনি চমত্কৃত হন। তবে ওঠার পরে সেই ঘোর কাটে। ফেলুদার প্রশ্নে জানান, স্বপ্ন এখন ঘোর বাস্তব, উটের জল-জমানোর কুঁজ নিয়ে তাঁর আর ভাবনা নেই, বরং কুঁজো পেলেই ভালো হয়। গলা শুকিয়ে কাঠ! —চলবে।
সোনার কেল্লাতে ট্রেন তখন সবে জয়সলমীর ঢুকছে, ঝলমলে রোদের সকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে ফেলুদা, সামনে সোনার কেল্লা… তোপসে দৌড়ে এসে নিদ্রিত জটায়ুকে ঠেলা দেয় “লালমোহনবাবু, উঠুন।” জটায়ু ধড়মড়িয়ে ওঠেন, আতঙ্কিত স্বরে “উট” বলে জিজ্ঞাসু হন। তোপসে হেসে তাকে অভয় দেয়। জটায়ু কি স্বপ্ন দেখছিলেন? জটায়ুর ভয়ের কারণটা ঠিক কী সোনার কেল্লার দর্শকমাত্রেই জানেন। অন্য একটা কথা থাকুক বরং শেষে।
নায়ক অরিন্দম জনৈকা সম্পাদিকাকে অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে সামান্য কথোপকথনের পর জানালেন, “বি এ পাশ করা নায়িকার কখনও বিরহে গান হওয়া উচিত নয়।” নায়িকা উত্তর করলেন, “আর নায়ক হলেই দেবতুল্য লোক হওয়া উচিত নয়।” অর্থাৎ মহাপুরুষ কিংবা নায়কের কারবার ছায়া আর বাজারের পালস্ নিয়ে হলেও রক্তমাংসের জগতে জটায়ুর কথাটাই মনে রাখতে হয়, উটে ওঠার আকস্মিক সুযোগ এসে গেলে তাঁর বহুলালিত স্বপ্ন এমনভাবে বাস্তব হয়ে উঠবে একথা ভেবে তিনি চমত্কৃত হন। তবে ওঠার পরে সেই ঘোর কাটে। ফেলুদার প্রশ্নে জানান, স্বপ্ন এখন ঘোর বাস্তব, উটের জল-জমানোর কুঁজ নিয়ে তাঁর আর ভাবনা নেই, বরং কুঁজো পেলেই ভালো হয়। গলা শুকিয়ে কাঠ! —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















