বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

অলিভ রিডলে কচ্ছপ। ছবি: সংগৃহীত।

যাঁরা আমার লেখার সাথে অল্পবিস্তর পরিচিত তাঁরা জানেন আমি কাকদ্বীপের তথা সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। সুন্দরবনের পশ্চিম প্রান্তিক জনপদ হল কাকদ্বীপ। সেই কাকদ্বীপের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম এবং সেখানেই আমার বেড়ে ওঠা। এই এলাকার মানুষের মুখে বহুল ব্যবহৃত অনেক আঞ্চলিক শব্দ আমার পরিচিত এবং জন্মাবধি সেগুলো আমরা সবাই প্রয়োগ করেছি। এমনই একটি শব্দ হল ‘কাঠা’। বাঙালির কাছে জমির পরিমাণসূচক একক বোঝাতে ‘কাঠা’ শব্দটি অতি পরিচিত। কিন্তু আমাদের আঞ্চলিক শব্দে এ ‘কাঠা’ সেই ‘কাঠা’ নয়। আমাদের কাছে ‘কাঠা’ হল এক ধরনের সামুদ্রিক কচ্ছপ।

আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে দু’ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এলাকার নামকরা এক গঞ্জ যেখানে প্রাক-স্বাধীনতা সময়কাল থেকে সপ্তাহে দু’দিন— বুধবার ও রবিবার হাট বসে। সেই গ্রামীণ হাটের নাম হল উকিলের হাট। উকিলের হাট যে দুটি জিনিসের জন্য সুবিখ্যাত তা আশৈশব জেনে এসেছি। একটি হল কাঁকড়া আর অন্যটি হল কাঠার মাংস।

বলাবাহুল্য উকিলের হাটে প্রায় দু’ দশক হল সমুদ্র কাঁকড়ার রমরমা হাট প্রায় বিলুপ্ত। আর তিন দশক হল কাঠার মাংস বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ। তাই এই এলাকার বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ‘কাঠা’ শব্দটির সঙ্গে আর পরিচিত নয়। সুন্দরবন অঞ্চলে একসময় অতি পরিচিত এই কাঠা আসলে কী? রূপে মনোহর ও স্বভাবে বিস্ময়কর সামুদ্রিক কচ্ছপের এক প্রজাতি হল এই কাঠা অর্থাৎ অলিভ রিডলে কচ্ছপ (Olive Ridley turtle)। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ‘Lepidochelys olivacea’। পরিণত অলিভ রিডলে কচ্ছপের পিঠের খোলসের রঙ অলিভ সবুজ বলেই ইংরেজি নামে এবং বিজ্ঞানসম্মত নামের প্রজাতিতে অলিভ কথাটি রয়েছে। হিন্দিতে এদের বলে ‘গাধা কাছুয়া’।

কচ্ছপরা হল সরীসৃপ প্রাণীদের মধ্যে বেঁচে থাকা প্রাচীনতম জীব। ১৬০ কোটি বছর ধরে তারা পৃথিবীর ঘটনাবলীর সাক্ষী। বাংলায় কচ্ছপ বলতে ইংরেজিতে টরটয়েজ (tortoise) ও টার্টল (turtle) দুটোই বোঝায়। মূলত স্থলবাসী কচ্ছপরা হল tortoise আর জলবাসী কচ্ছপরা হল turtle। তবে বিশেষ প্রয়োজনে ‘Tortoise’-রা যেমন জলে নামে, ‘Turtle’-রাও ডাঙ্গায় ওঠে। এরা সবাই চেলোনিয়া (Chelonia) বর্গভুক্ত সরীসৃপ গোষ্ঠীর প্রাণী।
বাসস্থানের উপর ভিত্তি করে ‘Turtle’ অর্থাৎ জলবাসী কচ্ছপরা দু’রকম — সামুদ্রিক টার্টল ও মিষ্টি জলের টার্টল। সামুদ্রিক টার্টেলদের সাতটি প্রজাতির মধ্যে পাঁচটি প্রজাতিরই দেখা মেলে ভারতীয় উপকূলে। সামুদ্রিক টার্টলদের পাগুলো প্যাডেলের মতো হওয়ায় জলে সহজে সাঁতার কাটতে পারে। সামনের পাগুলো হল বেশি লম্বা। সাঁতারের সময় এই পা দুটোই এরা বেশি ব্যবহার করে। পিছনের পা দুটো দিক পরিবর্তনে সাহায্য করে। মিষ্টি জলের টার্টল ও স্থলবাসী কচ্ছপদের মতো এরা মাথা, লেজ ও পা খোলসের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে পারে না। আর খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে এরা শাকাশী, মাংসাশী বা সর্বভুক হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের পাঁচটি সামুদ্রিক টার্টল প্রজাতির মধ্যে অন্যতম হল আমাদের আলোচ্য কাঠা অর্থাৎ অলিভ রিডলে কচ্ছপ। ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরে এদের বাস। তবে সুন্দরবনসহ পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ও বাংলাদেশ উপকূলে যে অলিভ রিডলে কচ্ছপরা আসে তারা সবাই ভারত মহাসাগরের বাসিন্দা।

পরিণত অলিভ রিডলে কচ্ছপের পিঠের ওপর খোলস অর্থাৎ ক্যারাপেস (Carapace) লম্বায় হয় প্রায় দু’ ফুট। আগেই বলেছি এদের ক্যারাপেসের রঙ হয় অলিভ সবুজ। ক্যারাপেসের আকৃতি অনেকটা হৃদপিন্ডের মতো। তবে স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপের ক্যারাপেস হয় অনেকটা গোলাকার। পুরুষ অলিভ রিডলের থেকে স্ত্রী অলিভ রিডলে আকারে সামান্য বড় হয়। এদের গড় ওজন হয় ৩৫ থেকে ৫০কেজি। অলিভ রিডলে কচ্ছপের মাঝারি আকারের মাথা অনেকটা ত্রিকোণাকার। তবে তুন্ড (Snout) অন্যান্য সামুদ্রিক কচ্ছপের তুলনায় ভোঁতা। এদের সামনের দুটি পা অর্থাৎ ফ্লিপারে একটি বা দুটি নখর থাকে। এই ফ্লিপার সাঁতার কাটার জন্য এবং বাসা বানানোর জন্য উপযোগী। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই নখর স্ত্রীদের তুলনায় একটু বেশি বাঁকা এবং লেজটাও সামান্য বেশি লম্বা হয়। সম্ভবত যৌন মিলনের সময় পুরুষদের এটা সাহায্য করে। অলিভ রিডলে কচ্ছপের বাচ্চাদের ক্যারাপেস অর্থাৎ খোলসের রঙ হয় গাঢ় ধূসর বা কালো। ডিম ফুটে বেরোনোর পর এরা ৩৭ থেকে ৫০ মিলিমিটার লম্বা হয়। একটু বড় হওয়ার পর এদের খোলসের উপর তিনটে শিরার মতো উঁচু অংশ দেখা যায়, যদিও বড় হলে তা মসৃণ হয়ে যায়। এদের পেটের নিচেও সমস্ত কচ্ছপের মতো আর একটা খোলস থাকে। একে বলে প্ল্যাস্ট্রন (Plastron)। পরিণত অলিভ রিডলে কচ্ছপের প্ল্যাস্ট্রনের রঙ হয় হালকা হলুদ।

অলিভ রিডলে কচ্ছপরা খাবারের ব্যাপারে খুব বেশি বাছবিচার করে না। প্রকৃত অর্থেই এরা সর্বভুক। এদের প্রিয় খাদ্যের তালিকায় রয়েছে জেলিফিশ, চিংড়ি, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, তারামাছ, সমুদ্র সজারু (Sea urchin ) আর বিভিন্ন ধরনের মাছ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৩: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — স্বর্ণগোধিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬০ : সাতসকালের কিস্সা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০০ : প্রাচীন ভারতের ‘স্টিং অপারেশন’-এরও নজির মেলে পঞ্চতন্ত্রের কূটনীতিতে!

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ ১০-১২ বছর বয়স হলে (মতান্তরে ২০-২৫ বছর) তবেই প্রজননক্ষম হয়। প্রজননের সময় স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ উপকূলের স্থলভাগে, বিশেষতঃ ম্যানগ্রোভ অরণ্য এলাকার কাছাকাছি উঠে আসে। পুরুষ কচ্ছপ কখনওই স্থলভাগে আসে না। পুরুষ ও স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ উপকূলের অদূরে অগভীর জলে যৌনমিলিত হয়। তারপর স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ সমুদ্র তীরে উঠে আসে ডিম পাড়ার জন্য। কচ্ছপরা ডিম পাড়ার সময় হাজারে হাজারে দল বেঁধে আসে এবং দল বেঁধে ডিম পেড়ে ফিরে যায়। এরা সাধারণত একই এলাকায় সবাই ডিম পাড়ে। যেখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডিম পাড়ে না। এইরকম দলবদ্ধভাবে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ার বৈশিষ্ট্যকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘Arribada’।

সুন্দরবন অঞ্চলের যেসব দ্বীপ জনবসতিহীন এবং মানুষের আনাগোনা খুব কম বা নেই সেই সব দ্বীপ হল অলিভ রিডলে কচ্ছপদের ডিম পাড়ার নিরাপদ জায়গা। অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এরা দল বেঁধে ডিম পাড়তে আসে। সুন্দরবনের জম্বুদ্বীপ, কলস, লোথিয়ান ইত্যাদি দ্বীপের সমুদ্রের দিকের তটভূমিতে এরা প্রাচীনকাল থেকে দল বেঁধে ডিম পাড়তে আসে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই দলবদ্ধতা তাদের জীবনরক্ষায় সহায়ক। স্ত্রী কচ্ছপ, তাদের ডিম বা বাচ্চা কচ্ছপ একই স্থানে প্রচুর সংখ্যায় থাকলে শিকারি খাদক প্রাণীরা তাদের যথেচ্ছ শিকার করার পরেও যথেষ্ট সংখ্যক বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে। পৃথিবীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হল অলিভ রিডলে কচ্ছপদের ডিম পাড়ার স্থান। কোস্টারিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল এলাকায় দুটি, মেক্সিকো উপকূলে একটি এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যা উপকূল মিলিয়ে একটি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে নানা কারণে অলিভ রিডলে কচ্ছপদের প্রজননস্থল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অনুপযুক্ত হওয়ায় খুব কম সংখ্যক অলিভ রিডলে ডিম পাড়তে আসে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৮ : বিনা বিচারে আটকদের নিয়ে রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে চিঠি লিখেন নেহরু

বর্তমানে উড়িশার গাহিরমাথা বেলাভূমি হল এই কচ্ছপদের জন্য ভারতের সবথেকে বড় ও নিরাপদ প্রজননস্থল। এখানে প্রতিবছর এখন প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক অলিভ রিডলে কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে। দেখা গেছে, পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে ছয় লক্ষের বেশি অলিভ রিডলে কচ্ছপের মিছিল তাদের প্রজনন ক্ষেত্রে পৌঁছে যায়। বর্তমানে পৃথিবীর মধ্যেও অলিভ রিডলেদের এটি বৃহত্তম প্রজননক্ষেত্র। ৪০-৫০ কেজি ওজনের এক একটা স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ সমুদ্রতটে জলের সর্বোচ্চ তরঙ্গরেখা থেকে প্রায় ২৫ মিটার ডাঙায় বালুকাময় বেলাভূমির উপর উঠে আসে। তারপর পিছনের দুটো পা দিয়ে বালি খুঁড়ে নিজের মাপ মতো একটা গর্ত তৈরি করে সেখানে নিজেকে ঢুকিয়ে নেয়। এই অবস্থায় তার কেবল পৃষ্ঠদেশীয় অংশটুকুই দেখা যায়। এই গর্তে স্ত্রী কচ্ছপটি ৮০-১২০ টি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার গতিও বেশ দ্রুত। ঘণ্টায় প্রায় ৯০ টি ডিম। ডিম পাড়া শেষ হলে স্ত্রী কচ্ছপটি পা দিয়ে বালি টেনে গর্তের মধ্যে থাকা ডিমগুলো ঢাকা দেয়। ডিম পাড়ার ৫৪ থেকে ৫৬ দিন পরে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। যদিও বালি ফুঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে তাদের আরও ৪-৬ দিন সময় লাগে। বাচ্চাগুলো বেরোয় রাতে আর বেরিয়েই তারা সমুদ্রের জলের দিকে দল বেঁধে দৌড়াতে থাকে। তখন সে দৃশ্য বড়ই নয়নাভিরাম। সমুদ্রের জলে নেমে এরা যে কোথায় গায়েব হয়ে যায় কেউ জানে না। আবার দেখা মেলে ১০-১২ বছর পর যখন ডিম পাড়তে আসে। বাচ্চারা সম্ভবতঃ সমুদ্রের নিচে সারগাসাম নামে একপ্রকার শ্যাওলার মধ্যে আশ্রয় নেয়। আর বড় হলে এরা প্রবাল প্রাচীরের খাঁজে বা সামুদ্রিক পর্বতের গুহায় বাসা বাঁধে।
কলকাতায় বৃষ্টি

কুকুরের শিকার অলিভ রিডলে কচ্ছপ। ছবি: সংগৃহীত।

একটা স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ তার ৬৫-৭০ বছরের জীবদ্দশায় ৩০-৪০ বার ডিম পাড়তে আসে। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল প্রতিবারই এরা একই জায়গায় ডিম পাড়তে আসে। একটা বাচ্চা অলিভ রিডলে কচ্ছপ যেখানে জন্মগ্রহণ করল সেই একই জায়গায় সে বারবার কীভাবে ফিরে আসে? কেন কখনও ভুল হয় না? বিজ্ঞানীরা রেডিও কলার ব্যবহার করে বিষয়টি যে সত্যি তা প্রমাণ করেছেন। আর বিজ্ঞানীরা এর কারণও নির্ধারণ করে ফেলেছেন। স্ত্রী কচ্ছপের প্রতিটি কোশের নিউক্লিয়াসে যে ডিএনএ থাকে অন্যান্য প্রাণীদের মতোই তার অর্ধেক আসে তার বাবা ও অর্ধেক আসে তার মায়ের কাছ থেকে। কিন্তু তার মাইটোকনড্রিয়াতে (কোশের শ্বসনে শক্তি উৎপাদনকারী কোশ অঙ্গাণু) যে ডিএনএ থাকে তা কিন্তু কেবল মায়ের কাছ থেকে আসে।

মাইটোকনড্রিয়ার এই ডিএনএ সুদূর প্রাচীনকাল থেকে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত অবস্থায় প্রতিটি অলিভ রিডলে কচ্ছপ তাদের মায়ের কাছ থেকে পেয়ে আসছে। আর তাই ভারত মহাসাগরের অলিভ রিডলে কচ্ছপদের প্রত্যেকের এই মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ হুবহু একই। এই যে একই জায়গা প্রজননক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করে, তার জন্য দায়ী জিনের অবস্থান এই মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ-তেই। এই কারণেই ভারত মহাসাগরের অলিভ রিডলে কচ্ছপরা বঙ্গোপসাগরের উপকূলকে সুদূর প্রাচীনকাল থেকে প্রজননক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করে এসেছে। স্থান ও যাতায়াতের পথ নির্বাচনে কোনও ভুল কখনও হয় না। প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের অলিভ রিডলে কচ্ছপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

আগেই বলেছি স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ এক একবারে গড়ে প্রায় ১০০ টি ডিম পাড়ে। কখনও কখনও এক ঋতুতে দু’বার ডিম পাড়তেও দেখা গেছে। যেহেতু একটি স্ত্রী কচ্ছপ তার জীবদ্দশায় ৩০-৪০ বার ডিম পাড়তে আসে ফলে এক একটি স্ত্রী অলিভ রিডলে সারাজীবনে প্রায় ৩০০০-৪০০০ ডিম পাড়ে। কিন্তু সমীক্ষায় দেখা গেছে ডিম ফুটে বেরোনো বাচ্চাদের মধ্যে মাত্র ০.১ শতাংশ বাচ্চা পরিণত বয়স পর্যন্ত বাঁচে। অর্থাৎ প্রতি ১০০০ বাচ্চার মধ্যে মাত্র একটি বাঁচে। এই কারণেই প্রত্যেক প্রজনন ঋতুতে এদের বিপুলসংখ্যক বাচ্চার জন্ম দিতে হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, দলবদ্ধভাবে এদের প্রজনন তাদের জীবনের রক্ষায় সহায়ক হয়। স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ, তাদের ডিম বা বাচ্চা কচ্ছপ একই স্থানে প্রচুর সংখ্যায় থাকলে শিকারি প্রাণীরা তাদের যথেচ্ছ শিকার করার পরেও যথেষ্ট সংখ্যক বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৩: জরাসন্ধ ও কৃষ্ণের কথোপকথন সূত্রে নিহিত আছে রাজনীতির পাঠ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৫ : য-এ যুদ্ধ

সুন্দরবনের উপকূলে অলিভ রিডলে কচ্ছপদের প্রাকৃতিক শত্রু হল গড়িয়োল ও বুনো শুয়োর। এরা বাচ্চা কচ্ছপ ও কচ্ছপের ডিম শিকার করতে ওস্তাদ। কিছুদিন আগে দেখা গিয়েছে যে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারও এই কচ্ছপের শিকার করে। প্রকৃতিতে খাদ্যখাদক সম্পর্ক প্রকৃতির কোন জীবের বিপন্নতার কারণ হয় না, আর জীববৈচিত্রের ওপরেও তার কোনো প্রভাব পড়ে না। তাই যদি হবে তাহলে কেন অলিভ রিডলে কচ্ছপদের একদা নিশ্চিন্ত প্রজননক্ষেত্র সুন্দরবনে এখন ওদের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে কমে গেল? এক সময় আমাদের রাজ্যে মেদিনীপুরের উপকূল এলাকা এবং সুন্দরবনের উপকূল ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ অলিভ রিডলের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে থাকত। বকখালির বালিয়াড়ি থেকে শুরু করে লোথিয়ান, কলস, জম্বুদ্বীপ ইত্যাদির বালুকাবেলা, এমনকি ভাগবতপুর কুমির প্রকল্পের সংলগ্ন এলাকাগুলিও ছিল অলিভ রিডলেদের প্রজনন ক্ষেত্র। কিন্তু কেন গত ৪/৫ দশকের মধ্যে সেই প্রজননক্ষেত্রগুলো হারিয়ে গেল? কারণ একাধিক। প্রথমত: মাংসের জন্য পরিণত অলিভ রিডলেদের ব্যাপক পরিমাণে হত্যা করা হয়েছে। শুরুতেই বলেছি আমার বাড়ির অনতি দূরে উকিলের হাট হল কাঠা অর্থাৎ অলিভ রিডলেদের মাংসের জন্য ছিল বিখ্যাত।

গরিব মানুষ মুরগি বা ছাগলের মাংসের থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে পেয়ে যেত কাঠার মাংস। বিক্রি হত ওদের ডিমও। আমি কোনওদিন সেই মাংস বা ডিম না খেলেও শুনেছি কাঠার মাংস ও ডিম নাকি খুবই সুস্বাদু। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে অলিভ রিডলে কচ্ছপের পিঠের খোলস অর্থাৎ ক্যারাপেস গ্রামাঞ্চলে মানুষের ব্যবহার্য বেতের ধামা বা বাঁশের ঝুড়ির বিকল্প হিসেবে খুব জনপ্রিয় ছিল। ডিম ও মাংসের জন্যই শুধু সুন্দরবন নয়, দীঘা ও পুরী থেকে একসময় অলিভ রিডলে কচ্ছপদের বিপুল বাণিজ্য হয়েছে। গত শতকের ৭০ ও ৮০-র দশকে পশ্চিমবঙ্গই ছিল এই কচ্ছপদের বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। কলকাতার পাইকারি বাজারে বিপুল পরিমাণে কাঠা আসত সুন্দরবন, দীঘা, উড়িশা ও অন্ধপ্রদেশ থেকে। তবে ১৯৯০ এর দশক থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং বনদপ্তরের নিবিড় নজরদারির কারণে অলিভ রিডলে কচ্ছপদের হত্যা করা, তাদের মাংস ও ডিম বিক্রি করা এবং বাণিজ্য রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এই কারণে কাঠার মাংসের জন্য বিখ্যাত উকিলের হাটে বহুদিন হল আর ওই মাংস বিক্রি হয় না। আশির দশকে সুন্দরবনে সজনেখালি ব্যাঘ্র প্রকল্প এবং ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প চালু হওয়ার পর নজরদারি বাড়ানো হয় এবং তার সুফল পাওয়া যায় অলিভ রিডলে কচ্ছপদের সংরক্ষণেও। এরমধ্যে ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এদের প্রজননক্ষেত্রগুলোকেও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২৬: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৭

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

এসব সত্ত্বেও সুন্দরবন অঞ্চলে কিন্তু অলিভ রিডলে কচ্ছপরা আগের মতো ডিম পাড়তে আর আসে না। আসে না পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের উপকূলেও। এর প্রধান কারণ অলিভ রিডলে কচ্ছপদের ব্যাপক অবলুপ্তি এবং প্রজননক্ষেত্রগুলোর স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। মাংস ও ডিমের জন্য প্রাণ দিয়েছে অসংখ্য অলিভ রিডলে কচ্ছপ এবং ডিমের মধ্যে থাকা ভ্রুণ। তবে যত না এদের শিকার করা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি কচ্ছপ মারা গিয়েছে, মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ট্রলার ও ভটভটির পাখার আঘাতে এবং জালে আটকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতের পূর্ব উপকূলে প্রতিবছর অন্তত দশ হাজার স্ত্রী অলিভ রিডলে কচ্ছপ এভাবে মারা পড়ে। অনেকদিন আগেই চিলি, মেক্সিকো, কোস্টারিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশে জেলেদের সমুদ্রে মাছ ধরার জালে কচ্ছপ নির্গমন যন্ত্র (Turtle Excluder Devices বা TED) লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিছুদিন হল উড়িশা সরকারও মাছ ধরার ট্রলারে ‘TED’ লাগানো জাল ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করেছে। জালের সাথে ‘TED’ যুক্ত থাকলে জালে মাছ ধরা পড়ে কিন্তু ‘TED’-এর রিফ্লেক্টর আটকে পড়া কচ্ছপকে ঠেলে জাল থেকে অন্য পথে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর যেসব জেলের জালে ‘TED’ লাগানো আছে তাদের সরকার থেকে বিশেষ কার্ড দেওয়া হয়। এই কার্ড দেখিয়ে তবেই তারা তাদের মাছ বিক্রি করতে পারে। উড়িশায় ‘TED’ লাগানো জাল ব্যবহার করতে জেলেরা প্রথম প্রথম আদৌ সম্মত হয়নি। তারা প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিল। তাদের ধারণা ছিল যে কচ্ছপের সাথে সাথে জালে আটকে পড়া সব মাছই বেরিয়ে যাবে। যদিও তাদের এই ধারণা মোটেই ঠিক নয় এবং দেখা গেছে যে আটকে পড়া মাছের অতি সামান্য অংশই ‘TED’ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এতে মৎস্যজীবীদের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও ক্ষতি হবে না। উড়িষ্যায় মৎস্যজীবীদের এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু কর্মশালা ও আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। ফলে মৎস্যজীবীরা তাদের ভুল ধারণা ত্যাগ করে এখন ‘TED’ যুক্ত জাল ব্যবহার করছে। দুঃখ ও হতাশার কথা হল পশ্চিমবঙ্গে এই উদ্যোগ আজও গ্রহণ করা গেল না।

এসব ছাড়াও ভারতের সমুদ্র উপকূলে এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে একেবারে সর্বোচ্চ তরঙ্গরেখা ঘেঁষে যেভাবে হোটেল ও রিসর্ট গজিয়ে উঠছে এবং পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে চলেছে তাতে অলিভ রিডলে কচ্ছপরা তাদের প্রজনন ক্ষেত্র হারাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে প্রজনন ক্ষেত্রের নির্জনতা। ফলে ডিম না পেড়েই বহু স্ত্রী অলিভ রিডলে সমুদ্রে ফিরে যাচ্ছে। সমুদ্র উপকূলে ব্যাপক ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস এদের প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত করেছে। বিপুল পরিমাণে চিংড়ির ভেড়ি নির্মাণ, ভাঙন ঠেকানোর জন্য কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ, এমনকি পর্যটন শিল্পের বিকাশের উদ্দেশ্যে সমুদ্র উপকূলে সারি সারি ঝাউ গাছ রোপন ওদের বিস্তীর্ণ প্রজননক্ষেত্রকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে।
কলকাতায় বৃষ্টি

বাসা তৈরির জন্য ঝাঁক বেঁধে বেলাভূমিতে উঠে আসছে অলিভ রিডলে কচ্ছপ। ছবি: সংগৃহীত।

মাছ ধরার পরিত্যক্ত জাল সমুদ্রে ফেলে দেওয়ায় তাতে আটকা পড়ে শিশু ও পরিণত বহু অলিভ রিডলে কচ্ছপ প্রাণ হারাচ্ছে। এর সাথে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও তেল দূষণের কারণে অলিভ রিডলে কচ্ছপরা সুন্দরবনের উপকূল তথা সমগ্র পূর্ব ভারতীয় উপকূলে ডিম পাড়তে আসা নিরাপদ বোধ করছে না। পর্যটন শিল্পের প্রসার কীভাবে অলিভ রিডলেদের কাছে দুঃসহ হয়ে উঠেছে তা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে আসছে। একই সময়ে ডিম ফুটে বেরোনো হাজার হাজার শিশু অলিভ রিডলে কচ্ছপ রাতের আঁধারে চাঁদের আলোয় চকচক করা সমুদ্রের জলের দিকে আকৃষ্ট হয়ে সেদিকে দৌড়ে যায়। কিন্তু উন্নয়নের জোয়ারে রাতে উপকূলবর্তী রাস্তাগুলো এখন ভেসে যায় আলোর বন্যায়। ওদের প্রজননস্থলের কাছাকাছি গজিয়ে ওঠা অসংখ্য হোটেল, রিসর্ট ও বাড়িতেও রাতভর জ্বলে অসংখ্য উজ্জ্বল আলো। ফলে শিশু কচ্ছপরা ওই উজ্জ্বল আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সমুদ্রে না গিয়ে এগিয়ে যায় ডাঙার দিকে, আর তারপর বেঘোরে প্রাণ হারায়। মানুষের বসতি যত গড়ে উঠছে ততই প্রজননক্ষেত্রগুলোতে কুকুর ও কাকদের উপদ্রব বাড়ছে। এদের শিকার হচ্ছে অসংখ্য শিশু অলিভ রিডলে কচ্ছপ ও ডিম। সম্প্রতি গবেষণায় জানা গেছে যে সমুদ্রে তেল দূষণের কারণে অলিভ রিডলে কচ্ছপদের দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে। আর এর ফলে ডাঙাতে তারা সহজেই শিকারে পরিণত হচ্ছে। রয়েছে প্রাকৃতিক কারণও। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের জলতলের উচ্চতা বৃদ্ধি গ্রাস করে নিয়েছে ওদের বহু প্রজননক্ষেত্র।

আমাদের অবিমৃষ্যকারিতায় হারিয়ে যেতে বসেছে ১৬০ কোটি বছরের একটা শান্ত ও নিরীহ প্রজাতি। আমাদের চাহিদার সাপেক্ষে ওদের চাহিদা তো নগণ্য— বছরে তিন-চারটে মাসের জন্য সমুদ্র উপকূলের একটা নির্জন স্থান আর দূষণমুক্ত বালুকাবেলা। কিন্তু তাও আমরা দিতে অপারগ। সুন্দরবনে বর্তমানে টিকে থাকা সামান্য কয়েকটি প্রজননক্ষেত্র যদি আমরা গুরুত্বসহকারে এখনও সংরক্ষণ না করতে পারি এবং মৎস্যজীবীদের ‘TED’ যুক্ত জাল ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক না করতে পারি তাহলে সুন্দরবন থেকে কাঠা শব্দটি শুধু নয়, প্রাণীটিও চিরতরে হারিয়ে যাবে। এজন্য ওরা আমাদের ক্ষমা করলেও সুন্দরবনের প্রকৃতিদেবী কিন্তু আমাদের কখনও ক্ষমা করবে না।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content