শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সামুদ্রিক কচ্ছপের গল্প করতে গেলেই অবধারিতভাবে আমার স্মৃতিতে চলে আসে উকিলের হাটের কথা। আগেই বলেছি, উকিলের হাট বিখ্যাত ছিল সমুদ্র কাঁকড়া আর কাঠার মাংসের জন্য। কাঠা মানে সামুদ্রিক বড় বড় কচ্ছপ। আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগেও বুধবার ও রবিবার বিকালে অর্থাৎ হাটবারে উকিলের হাটে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপের মাংস বিক্রি হত, আর সেই মাংসের ক্রেতা ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষজন। মাংসের সাথে সাথে বিক্রি হত কচ্ছপের ক্যারাপেস অর্থাৎ পিঠের খোলক। সুদৃশ্য খোলকগুলি সেই সময় ধামা বা গামলার বিকল্প হিসেবে গৃহস্থ ব্যবহার করত। খোলকের আকার এবং খোলকের রং-বৈচিত্রের ওপরে নির্ভর করে নির্ধারিত হত দাম।
বালিকাঠা আর অলিভ রিডলে কচ্ছপের খোলক বেশি বিক্রি হত। তবে মাঝে মাঝে অদ্ভুতদর্শন এক ধরনের খোলক দেখতাম। ডিম্বাকার, প্রায় তিন ফুট লম্বা খোলকগুলোর পেছনদিকে যেন করাতের মতো খাঁজকাটা। শুধু তাই নয়, কচ্ছপের খোলক যে বড় বড় আঁশ বা স্কুটস (Scutes) দিয়ে তৈরি হয় সেগুলো টালির মতো একটার উপর আরেকটা কিছুটা চাপাচাপি করে সাজানো। আবার প্রত্যেকটা টালির মতো বড় আঁশ বা স্কুট অদ্ভুত সুন্দর রং করা। হলুদের উপর বাদামি রঙের যেন রশ্মির ছটা। দেখে মনে হয় যেন শিল্পী রং-তুলি দিয়ে এঁকেছে। এমন সুন্দর খোলকের প্রতি যে কোনও মানুষের দৃষ্টি এড়ানো মুশকিল। এই খোলকগুলোর দাম নাকি সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৬: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— সবুজ কাছিম

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০১ : ত্রিপুরাতেও সিপাহি বিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল

শৈশবের সেই স্মৃতিতে খোলকগুলোই রয়ে গিয়েছে, সামুদ্রিক সেই কচ্ছপকে কিন্তু আমি কখনও দেখিনি। তবে এই কচ্ছপগুলোকে শিকরেঠুঁটো কাছিম নামে বলতে শুনেছি। এমন নামের কারণ, এই কচ্ছপের উপরের ঠোঁট বা চোয়াল শিকরে বাজপাখির চঞ্চুর মতো বাঁকা। একসময় যথেষ্ট পরিমাণে সুন্দরবন অঞ্চলে যে এদের পাওয়া যেত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যান্য সামুদ্রিক কচ্ছপের মতো মাংস, খোলক ও ডিমের লোভে এদেরও একসময় প্রচুর পরিমাণে শিকার করা হয়েছে। এখন সুন্দরবন অঞ্চলে এদের কদাচিৎ উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। অতি বিপন্ন এই সামুদ্রিক কচ্ছপ সুন্দরবন অঞ্চলে আমার আর স্বচক্ষে দেখা হয়ে ওঠেনি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৩ : রিমিতার ব্রেকিং-নিউজ

একলা নববর্ষ

যেহেতু নিচের ঠোঁট বা চোয়াল V-এর মতো হয়ে সরু হয়ে গেছে আর উপরের ঠোঁট কিছুটা বেঁকে বাজপাখি বা টিয়া পাখির চঞ্চুর মতো আকার নিয়েছে তাই ইংরেজিতে এদের নাম ‘Hawksbill turtle’, বাংলায় শিকরেঠুঁটো কাছিম। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Eretmochelys imbricata’। এদের পিঠের খোলক বা ক্যারাপেসের রং ও আকার কেমন হয় আগেই বলেছি। তবে এদের এই অদ্ভুত ধরনের ঠোঁট ওদের প্রিয় খাবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ওদের প্রিয় খাবার হল স্পঞ্জ যা জন্মায় সমুদ্রের তলদেশে প্রবাল প্রাচীর বা পাথরের ফাটলে বা খাঁজে। সরু ফাটল বা খাঁজের মধ্যে থেকে খাবার সংগ্রহ করতে এই ধরনের ঠোঁট বিশেষভাবে সাহায্য করে। অন্যান্য সামুদ্রিক কাছিমের মতো এদেরও রয়েছে চারটে ফ্লিপার অর্থাৎ সাঁতার কাটার উপযোগী চারটে পা। সামনের পায়ে একজোড়া করে নখর আছে। চারটে পা এবং মাথার ওপর যে আঁশ থাকে তাও দেখতে ভারি সুন্দর। আগেকার দিনে বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিদের পাকা বাড়িতে মোজাইক করা মেঝে দেখা যেত। এদের পা আর মাথা দেখলে সেই মোজাইকের কথা মনে পড়বেই। একটা পূর্ণাঙ্গ শিকরেঠুঁটো কাছিম লম্বায় হয় প্রায় আড়াই থেকে তিন ফুট, আর ওজন হয় গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি। বাচ্চাদের পিঠের খোলক অনেকটা হৃদপিন্ডের মতো আকারের হলেও বড় হলে তা ডিম্বাকার হয়ে যায়। আর বাচ্চাদের খোলকের রং হয় বাদামি, আর তার উপর হালকা ছিট থাকে।
কলকাতায় বৃষ্টি
পৃথিবীর সমস্ত ক্রান্তীয় সমুদ্র অঞ্চলে শিকরেঠুঁটো কাছিমদের নিবাস হলেও সুন্দরবন অঞ্চলে যাদের আনাগোনা তারা মূলত ভারত মহাসাগরের বাসিন্দা। এরা কিন্তু জীবনের বিভিন্ন দশায় বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশে স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। ডিম ফুটে বেরোনোর পর বাচ্চারা উপকূল থেকে অনেকটা দূরে বসবাস করে সেখানে সামুদ্রিক বিভিন্ন আগাছার মধ্যে থেকে খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু যখন এরা তারুণ্যে পৌঁছয় অর্থাৎ ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তখন আবার এরা ফিরে আসে উপকূলে এবং বিভিন্ন দ্বীপের কাছাকাছি কিংবা প্রবাল প্রাচীরে এদের বিচরণ করতে দেখা যায়। ভারতে লাক্ষাদ্বীপ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ হল শিকরেঠুঁটো কাছিমদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। একসময় সুন্দরবন অঞ্চলে উপকূল ও খাঁড়িগুলোতে তরুণ বয়সি শিকরেঠুঁটো কাছিম প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত। আর এখন যে এদের কদাচিৎ দেখা যায় সে কথা তো আগেই বলেছি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৬: প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ও প্রাণীদের অস্থিরতা : যুদ্ধের দূষণ, মনে, প্রাণে, বাতাবরণে, সর্বত্র

ত্রিপুরা: বছর সন্ধির পার্বণ ও নববর্ষ

শিকরেঠুঁটো কাছিম কিন্তু তাদের প্রজননের জন্য যেসব বেলাভূমি পছন্দ করে সেগুলো একেবারেই নির্জন এবং সমুদ্রমুখী। যেসব উপকূল পাথর এবং ঝোপঝাড়যুক্ত সেগুলোই এরা বেশি পছন্দ করে। অবশ্য সুন্দরবন অঞ্চলে যেসব দ্বীপে মনুষ্য বসতি নেই এবং ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল রয়েছে সেইসব দ্বীপের বালুকাবেলায় এদের বাসা করতে দেখা গেছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস এদের প্রজনন ঋতু হলেও সুন্দরবন অঞ্চলে এদের প্রজননিক সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ফেব্রুয়ারি মাসে। সাধারণতঃ সর্বোচ্চ জোয়ার সীমার ৩০ থেকে ১৫০ মিটার উঁচুতে এরা বাসা তৈরি করে। স্ত্রী শিকরেঠুঁটো কাছিম একটি ঋতুতে তিন থেকে পাঁচটি বাসা তৈরি করে এবং প্রতিটি বাসায় ১৩৯ থেকে ১৬০ টি ডিম পাড়ে। প্রায় ৬০ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। এদের আরেকটা বিশেষত্ব হল এরা বালিকাঠা বা অলিভ রিডলে কচ্ছপদের মতো দল বেঁধে ডিম পাড়তে আসে না। এরা বিচ্ছিন্নভাবে একা একাই বাসা বানায়। তবে প্রতিবছর নয়, দু-তিন বছর অন্তর। অর্থাৎ একটি পরিণত স্ত্রী শিকরেঠুঁটো কাছিম ২-৪ বছর অন্তর পুরুষের সাথে যৌনমিলন করে। ২০-৩৫ বছর বয়সের মধ্যে এরা প্রজননগতভাবে সক্ষম হয়। এরা গড়ে ৫০ বছর বাঁচে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা / ৬৫

আগেই বলেছি, এদের প্রিয় খাদ্য হলো সামুদ্রিক স্পঞ্জ। এদের খাবারের ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশই হল স্পঞ্জ। তবে সুন্দরবন অঞ্চলে আসা শিকরেঠুঁটো কাছিমদের খাদ্যতালিকায় জেলিফিশ এবং সাগর কুসুম বা সি অ্যানিমোন যথেষ্ট পরিমাণে উপস্থিত। এছাড়াও শ্যাওলা, সামুদ্রিক ঘাস, ম্যানগ্রোভের ফল ও বীজ, প্রবাল, স্কুইড, শামুক, ঝিনুক, সমুদ্র শশা বা সি কিউকাম্বার, সমুদ্র সজারু বা সি আর্চিন, চিংড়ি, কাঁকড়া, ছোট মাছ ও মাছের ডিম সবই রয়েছে এদের খাদ্য তালিকায়। অনেক সামুদ্রিক স্কুইড বিষাক্ত পদার্থ ছেটায় আর তাই যখন শিকরেঠুঁটো কাছিম ওদের শিকার করে তখন চোখ দুটো বন্ধ করে নেয় যাতে চোখে ওই বিষাক্ত পদার্থ ঢুকতে না পারে। আবার যেসব শিকারের কাঁটা আছে তাদের থেকে রক্ষা পেতে মাথায় বর্মের মতো আঁশ বা স্কুট সাহায্য করে।
কলকাতায় বৃষ্টি
শিকরেঠুঁটো কাছিমের সবচেয়ে বড় বিপদ হল পরিবেশগত চাপ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে এদের প্রজননস্থলের পরিবেশের দ্রুত আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস, নির্জন দ্বীপগুলোতে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি এবং উপকূল, নদী ও খাঁড়িতে মাছ ধরা ট্রলারের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নষ্ট হয়ে গিয়েছে ওদের প্রজননস্থল। বন্য শুকর গোড়িয়োল, গোসাপ ইত্যাদি তো শিকরেঠুঁটো কাছিমের বাচ্চাদের প্রাকৃতিক শত্রু। কিন্তু মাংস, খোলক ও ডিমের জন্য মানুষ এদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। মাছ-ধরা জালে আটকেও মারা গিয়েছে। এর সাথে রয়েছে নদী ও সমুদ্রের দূষণ। আর সব মিলিয়ে শিকরেঠুঁটো কাছিমরা বর্তমানে চরমভাবে সংকটের মধ্যে রয়েছে। ভারতীয় বন্যপ্রাণ আইনে এরা শিডিউল-১ তালিকাভুক্ত প্রাণী। সুন্দরবন অঞ্চলে এখন আর এরা প্রায় আসেই না। হয়তো এভাবেই স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে সুন্দরবনের আরও এক জলজ সম্পদ শিকরেঠুঁটো কাছিম।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content