
লাঞ্চ আওয়ারে বেশি সময় নষ্ট করেন না একেজি। দুটো স্যান্ডউইচ এবং এক কাপ ব্ল্যাক কফি হলেই তাঁর হয়ে যায়। কফিটা অবশ্য অনেকক্ষণ ধরে খান। টেবিলে ফাইল জমে উঠুক তা চান না যেমন, তেমনই মেইল বক্সে নানা জনের পাঠানো মেইল, ইনফো না-দেখা থাকুক, তাও চান না। যেগুলির উত্তর দেওয়া দরকার সেগুলি দেন, যেগুলি পরে দিলেও চলবে, প্রাপ্তিস্বীকার করে রাখেন। ঘণ্টায়-ঘণ্টায় নানা কেসের আপডেট নেওয়া তাঁর অভ্যাস। ব্যতিক্রম কিছু স্পেশাল কেস। সেগুলির জন্য সময় দেওয়া দরকার। যেমন, পিশাচ পাহাড়ের কেসটা। এই কেসটা তাড়াহুড়ো করে সমাধান করার নয়। কিন্তু তারপরেও তিনি চান কেসটা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ওখানকার থানা প্রথম থেকেই গড়িমসি না করলে হয়তো এতটা বাড়াবাড়ি হত না। তৎকালীন এসপি সাহেবের ভূমিকাও স্ক্যানারের নিচে আসা উচিত। লোকাল থানা না-হয় গড়িমসি করেছিল, কিন্তু এসপি নিজে কী করছিলেন? তাঁর কাছে তো সব রিপোর্ট যেত। তিনি কিন্তু একবারও লোকাল থানার ব্যর্থতার কথা জানিয়ে অন্য কোনও অফিসার কিংবা লালবাজারের সাহায্য চেয়ে আবেদন করেননি। প্রথম থেকেই সকলে ধরে নিল যে, কাজটা অলৌকিক, অতএব পুলিশ-প্রশাসনের কিচ্ছু করার নেই এতে। এই অতি-সরলীকরণ ব্যাপারটাই কিন্তু সন্দেহজনক। শাক্যর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই তাঁর। শাক্যকে যদি আরও আগে পাঠানো যেত! এখন যেরকম অবস্থা, তা এক-আধদিনে হয়নি সেটা বোঝাই যায়। দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকার না-জমলে তবে তার গভীরতা এত প্রগাঢ় হতে পারে না। এখন কারা-কারা এই অন্ধকারগুলি জমিয়েছে, তাদের এক-এক করে খুঁজে বার করাই হল অন্ধকার দূর করার একমাত্র রাস্তা। শাক্য যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে তার উপর আশাবাদী তিনি। কিন্তু তাও মাঝেমাঝে অধৈর্য্য হয়ে পড়ছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, আর একটু দেরি হলে আবার হয়তো আরেকজন কেউ কালাদেওর বলি হবে! এই কারণেই সব কিছু দ্রুত করতে হবে। তাঁর মনে হচ্ছে, শাক্য যেন একটু বেশি সময় নিচ্ছে। পাভেল থাকলে যে তার সুবিধা হতো, একা তাকে অনেককিছুই করতে হচ্ছে এখন, সেটা অবশ্য সঙ্গত কারণ দেরি হওয়ার। তবে সুদীপ্ত বলে ছেলেটি আছে। শাক্য নিজেই বলেছে, ছেলেটি সৎ এবং খুবই উদ্যমী। পাভেলের সাবস্টিটিউট হিসেবে সুদীপ্ত যে আরও অনেক বেশি ফিটেস্ট এমন সার্টিফিকেটও সে দিয়েছে। অতএব আর দেরি না করে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। কালাদেওকে তো পাওয়া যাবে কি যাবে না, সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু কালাদেও কেসটার সঙ্গে যারা-যারা ইনভলভড, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ইত্যাদি সব্বাইকে এক ছাতার তলায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তবেই হয়ত অনেকখানি আঁধারে আলো দেখতে পাওয়া যাবে।
চিন্তাক্লিষ্ট মুখে মেইল চেক করছিলেন একেজি। আজ রাতে শাক্য ফোন করলে তাকে তাগাদা দিতে হবে।
— “আসতে পারি স্যার?”
একেজি চোখ তুলে তাকালেন। ইরাবতী মিত্র। কিছুদিন হল জয়েন করেছে ডিপার্টমেন্টে। চৌকশ মেয়ে। ধুরন্ধর বুদ্ধি ধরে। কেস সলভের প্রতি আগ্রহ আছে, যেনতেনপ্রকারেণ সাফল্যের শীর্ষে ওঠার অভিসন্ধি নেই। কাজ দিলে কাজের গুরুত্ব বুঝে নিয়ে করে যত দ্রুত সম্ভব। এইরকম লোকজনদের একেজি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন। সে-কারণেই পিশাচপাহাড়ের কেসটায় জড়িয়ে যাওয়া সকলের পাস্ট হিস্টরি কালেক্ট করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন ইরাবতীকেই। অবশ্য তার অনেক সহযোগীও আছে, তারা একসঙ্গে মিলেই কাজটি করেছে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কাজটি অ্যাসেম্বেল করার দায়িত্ব আর কাউকে দিতে মন সায় দিচ্ছিল না তাঁর। ইরাবতীকে কোন কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। যেমন শাক্যকে।
একেজি বললেন, “ইয়েস ইয়েস, কাম ইম মিস্ মিত্র!”
—“স্যার, আমাকে ইরাবতী বলে ডাকলেই ভালো লাগবে। মিস্ মিত্র-টিত্র যেন কেমন একটা শোনায়!”
একেজি হাসলেন। শিশুসুলভ হাসি। বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, গতবার বলেছিলেন। আমারই খেয়াল থাকে না। মনে রাখার চেষ্টা করব এবার থেকে। এখন বসুন ইরাবতী।”
ইরাবতী বসতে-বসতে বলল, “আর আপনি আজ্ঞেও ছাড়তে হবে স্যার। আপনার অন্যান্য অফিসারদের আপনি যেমন নাম ধরে ডাকেন এবং তুমি বলেন, আমাকেও তেমনই বলতে হবে। হতে পারে তাঁরা আপনার স্নেহের যোগ্য, কিন্তু আমিও সময় পেলে সেই যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত!”
একেজি হেসে ফেললেন। বললেন, “তুমি ভারি ক্লেভার। অভিযোগটাও জানিয়ে দিলে, সঙ্গে-সঙ্গে নিজের পোটেনশিয়ালিটিও। বেশ, তুমি করেই বলব। এখন বল, কাজ কতদূর?”
— “সেই জন্যই তো এলাম স্যার। কাজ কমপ্লিট।” ইরাবতী বলল।
— “এত তাড়াতাড়ি? এতজন সাসপেক্ট, তারপরেও? বাহ্, এই জন্যই তোমাকে আমি স্নেহ করতে শুরু করেছি। নিজের গুণেই কখন যে তুমি আমার স্নেহভাজনদের বৃত্তে ঢুকে বসে আছ, তুমি নিজেই জান না।”
— “স্যার!” একেজি যে তার কথাই ফিরিয়ে দিলেন, তা বুঝতে ইরাবতীর অসুবিধা হয়নি।
—একেজি হেসে বললেন, “নাও, নাও। ক্যারি অন…।”
— “স্যার, আমি আপনাকে মেইল করার আগে এর একটা হার্ডকপি নিয়ে এসেছি। আপনার সুবিধা হবে। মেইলও চলে এসেছে এতক্ষণে। চেক্ করুন। মেইলটা আপনি শাক্যবাবুকে পাঠিয়ে দিন আপনার সুবিধামতো। আমার মনে হয়, এই হোয়্যারঅ্যাবাউটস্ আপনাদের তদন্তে সাহায্য করলেও করতে পারে!” বলে ইরাবতী তার হাতের একখানি ফাইল এগিয়ে দিল একেজির দিকে। একেজি ফাইলটা নিলেন হাত বাড়িয়ে। নিয়ে ফাইল খুলে আপাতত পাতা উল্টে দেখতে লাগলেন।
— “আসতে পারি স্যার?”
একেজি চোখ তুলে তাকালেন। ইরাবতী মিত্র। কিছুদিন হল জয়েন করেছে ডিপার্টমেন্টে। চৌকশ মেয়ে। ধুরন্ধর বুদ্ধি ধরে। কেস সলভের প্রতি আগ্রহ আছে, যেনতেনপ্রকারেণ সাফল্যের শীর্ষে ওঠার অভিসন্ধি নেই। কাজ দিলে কাজের গুরুত্ব বুঝে নিয়ে করে যত দ্রুত সম্ভব। এইরকম লোকজনদের একেজি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন। সে-কারণেই পিশাচপাহাড়ের কেসটায় জড়িয়ে যাওয়া সকলের পাস্ট হিস্টরি কালেক্ট করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন ইরাবতীকেই। অবশ্য তার অনেক সহযোগীও আছে, তারা একসঙ্গে মিলেই কাজটি করেছে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কাজটি অ্যাসেম্বেল করার দায়িত্ব আর কাউকে দিতে মন সায় দিচ্ছিল না তাঁর। ইরাবতীকে কোন কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। যেমন শাক্যকে।
একেজি বললেন, “ইয়েস ইয়েস, কাম ইম মিস্ মিত্র!”
—“স্যার, আমাকে ইরাবতী বলে ডাকলেই ভালো লাগবে। মিস্ মিত্র-টিত্র যেন কেমন একটা শোনায়!”
একেজি হাসলেন। শিশুসুলভ হাসি। বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, গতবার বলেছিলেন। আমারই খেয়াল থাকে না। মনে রাখার চেষ্টা করব এবার থেকে। এখন বসুন ইরাবতী।”
ইরাবতী বসতে-বসতে বলল, “আর আপনি আজ্ঞেও ছাড়তে হবে স্যার। আপনার অন্যান্য অফিসারদের আপনি যেমন নাম ধরে ডাকেন এবং তুমি বলেন, আমাকেও তেমনই বলতে হবে। হতে পারে তাঁরা আপনার স্নেহের যোগ্য, কিন্তু আমিও সময় পেলে সেই যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত!”
একেজি হেসে ফেললেন। বললেন, “তুমি ভারি ক্লেভার। অভিযোগটাও জানিয়ে দিলে, সঙ্গে-সঙ্গে নিজের পোটেনশিয়ালিটিও। বেশ, তুমি করেই বলব। এখন বল, কাজ কতদূর?”
— “সেই জন্যই তো এলাম স্যার। কাজ কমপ্লিট।” ইরাবতী বলল।
— “এত তাড়াতাড়ি? এতজন সাসপেক্ট, তারপরেও? বাহ্, এই জন্যই তোমাকে আমি স্নেহ করতে শুরু করেছি। নিজের গুণেই কখন যে তুমি আমার স্নেহভাজনদের বৃত্তে ঢুকে বসে আছ, তুমি নিজেই জান না।”
— “স্যার!” একেজি যে তার কথাই ফিরিয়ে দিলেন, তা বুঝতে ইরাবতীর অসুবিধা হয়নি।
—একেজি হেসে বললেন, “নাও, নাও। ক্যারি অন…।”
— “স্যার, আমি আপনাকে মেইল করার আগে এর একটা হার্ডকপি নিয়ে এসেছি। আপনার সুবিধা হবে। মেইলও চলে এসেছে এতক্ষণে। চেক্ করুন। মেইলটা আপনি শাক্যবাবুকে পাঠিয়ে দিন আপনার সুবিধামতো। আমার মনে হয়, এই হোয়্যারঅ্যাবাউটস্ আপনাদের তদন্তে সাহায্য করলেও করতে পারে!” বলে ইরাবতী তার হাতের একখানি ফাইল এগিয়ে দিল একেজির দিকে। একেজি ফাইলটা নিলেন হাত বাড়িয়ে। নিয়ে ফাইল খুলে আপাতত পাতা উল্টে দেখতে লাগলেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক পর্ব-১৬২ : আঁধারে আলো

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০১ : ত্রিপুরাতেও সিপাহি বিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল
ইরাবতী বলল, “প্রত্যেকের সম্বন্ধে এক পাতা, দু পাতা করে সংক্ষেপে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। ইন ডিটেইলস্ কিছু চাইলে আমাদের বলবেন, আমরা দিয়ে দেবো। তবে অ্যাট এ গ্লান্স যাতে অল্প সময়ে এক-একজন সাসপেক্ট সম্পর্কে ভিশন ক্লিয়ার হয়, সে-জন্যই এভাবে আমরা রিপোর্টটা তৈরি করেছি স্যার।”
একেজির ভালো লাগল যে, ইরাবতী “আমি” না বলে “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করল। কাজের ক্ষেত্রে অন্যকে এই রেসপেক্ট এবং যার-যা-ভূমিকা, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া আজকের দিনে মহৎ চরিত্রের লক্ষণ।
একেজি বললেন, “ধন্যবাদ ইরাবতী। অনেক সাহায্য হল তোমাদের এই রিপোর্টটি পেয়ে।”
“ইটস্ আওয়ার ডিউটি স্যার। আসছি। আপনি দেখুন।” বলে ইরাবতী বেরিয়ে গেল।
একেজি ফাইলটা খুললেন। পড়তে যাবেন, এমনসময় ফোনটা বেজে উঠল। অসহিষ্ণু চিত্তে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, রিমিতা। ভ্রু-কুঞ্চিত হলে উঠল তার। এই সময়ে ফোন ? আবার কোন ঝামেলায় পড়ল নাকি মেয়েটি ? সামান্য বিরক্ত হলেন। কী দরকার ছিল উড্-বিকে নিয়ে এতদূরে যাওয়ার ? পিশাচপাহাড়ে উইকেন্ডের প্ল্যান করা যে কতখানি ভুল ছিল, এখন হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে। আর কষ্ট তো কেবল সেই পাচ্ছে না, এদিকে বোন লাগাতার একেজিকে ফোন করে-করে পাগল করে দিচ্ছে। ওখানে রিমিতা থাকলে কালাদেও ওকে বাঁচতে দেবে না। যদি অ্যাটাক্ করে বসে ? আজকালকার ছেলেমেয়েদের ভাবনাচিন্তার কুল পান না তিনি। ফাইলটা রেখে ফোনটা তুললেন তিনি।
— “হ্যালো।”
— “হ্যালো, মামা!”
— “হ্যাঁ বল। এমন অসময়ে ফোন? আমি অফিসে আছি।”
— “এইসময়ে তুমি অফিসে থাকবে তা জানি আমি। আর তখন আমরা কেউ ফোন করলে বিরক্ত হও, তাও জানি। কিন্তু এমন একটা খবর, যেকে বলে ব্রেকিং-নিউজ, তা তোমায় না-বলে পেটের ভাত ঠিক হজম হচ্ছিল না!”
— “কী ব্যাপার বল তো? তোর কথায় রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। আবার কিছু ঘটেছে নাকি পিশাচপাহাড়ে? কই শাক্য তো কিছু জানায়নি আমায়!”
— “রাখ তোমার ওই শাক্য। কেমন একটা লোক। হিরো-হিরো চেহারা, এদিকে পুলিশের কাজ করে। তার উপর কী-যে সারাক্ষণ ভাবে, কে জানে। সবার সঙ্গে আমাকে আর পূষণকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে, জানো?”
— “না রাখার কী আছে? পুলিশ এ-ধরণের কেসে সবাইকে সন্দেহ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক ব্যাপার। তুই আমার ভাগ্নি বলে কী তুই খুন-জখম করলে তোর অপরাধের গুরুত্ব কমে যাবে? নাকি পুলিশ তোকে মাথায় তুলে বাড়িতে দিয়ে আসবে?”
— “সেই ! মামা তুমি থাকলে আমাদের জেলযাত্রা আটকায় কে?”
— “তুই জেলে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিস মানে নিশ্চয়ই কোন অপরাধ করেছিস! তাহলে কিন্তু আমি তোকে কোনভাবেই শেলটার দেব না!”
— “মামা! তুমি চুপ করো তো। যা বলছি, মন দিয়ে শোন এখন। আমি আজ সকালবেলায় রিসর্ট থেকে বেরিয়ে থানার দিকে এসেছিলাম। আমি আসলে জানতে চাইছিলাম, আমাদের কলকাতা ফেরার ব্যাপারে পুলিশ কী সিদ্ধান্ত করলেন। থানায় সুদীপ্ত বাবু নেই। কোন কাজে বেরিয়েছেন। উনি থাকলে ভালো হতো। উনি ঠান্ডা মাথার মানুষ। তাছাড়া জবাবও দেন দায়সারাভাবে। মালাকার ছিলেন। লোকটিকে আমার একেবারেই সহ্য হয় না। আমি তাও তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, তিনি কী ভেবেছেন এ-ব্যাপারে? তাতে মালাকার অদ্ভুতভাবে বললেন, ‘আর যাওয়া। কালাদেও কাকে যেতে দেবে, কাকে নয়, তা ঠিক করার থানা কে?’ আমি একটু অবাক হলাম। উনি এমন নির্লিপ্তভাবে বললেন। আমি বললাম, আপনি পুলিশ হয়ে এ-সব গাঁজাখুরিতে বিশ্বাস করেন? তাতে ভদ্রলোকের চোখ দপ্ করে জ্বলে উঠল। আমাকে বললেন, ‘আপনি কলকাতার লোক। সেখানে ফিরতে পারবেন কি-না সেটা ভাবুন। অন্যের ঠাকুরদেবতা নিয়ে আপনার এত মাথা না-ঘামালেও চলবে!’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমায় থ্রেট করছেন? আপনার কোন স্বার্থে ঘা দিলাম বুঝি ? তাতে লোকটা স্রেফ গোঁজ হয়ে বসে রইলো। আমিও আর কথা না-বাড়িয়ে চলে এলাম। তবে রিসর্টে ফিরে গেলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, ওই মালাকার লোকটিকে কালচার করার দরকার। আর কালচার করার জন্য মফসসলে সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে চায়ের দোকান, সেলুন ইত্যাদি। সেলুনে আমার যাওয়ার উপায় নেই। অতএব চায়ের দোকানই ঠিক আছে। এখানে থানার আশেপাশে দু-তিনটি দোকান আছে। তারই একটিতে লোকজন তেমন নেই দেখে সেখানেই বসলাম। কাঁচের গ্লাসে এক গ্লাস চা নিয়ে বসে ভাবছিলাম কীভাবে কথাটা পাড়া যায়। আদৌ যে কোন কিছু পাওয়া যাবে, তার তো কোনও ঠিক নেই। একসময় তুললামও, “আপনাদের থানার ওসি ভদ্রলোকটি এত খারাপ ব্যবহার করেন কেন বলুন তো ? উনি কি কোনও বড় নেতা-টেতার আত্মীয় নাকি?”
একেজির ভালো লাগল যে, ইরাবতী “আমি” না বলে “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করল। কাজের ক্ষেত্রে অন্যকে এই রেসপেক্ট এবং যার-যা-ভূমিকা, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া আজকের দিনে মহৎ চরিত্রের লক্ষণ।
একেজি বললেন, “ধন্যবাদ ইরাবতী। অনেক সাহায্য হল তোমাদের এই রিপোর্টটি পেয়ে।”
“ইটস্ আওয়ার ডিউটি স্যার। আসছি। আপনি দেখুন।” বলে ইরাবতী বেরিয়ে গেল।
একেজি ফাইলটা খুললেন। পড়তে যাবেন, এমনসময় ফোনটা বেজে উঠল। অসহিষ্ণু চিত্তে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, রিমিতা। ভ্রু-কুঞ্চিত হলে উঠল তার। এই সময়ে ফোন ? আবার কোন ঝামেলায় পড়ল নাকি মেয়েটি ? সামান্য বিরক্ত হলেন। কী দরকার ছিল উড্-বিকে নিয়ে এতদূরে যাওয়ার ? পিশাচপাহাড়ে উইকেন্ডের প্ল্যান করা যে কতখানি ভুল ছিল, এখন হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে। আর কষ্ট তো কেবল সেই পাচ্ছে না, এদিকে বোন লাগাতার একেজিকে ফোন করে-করে পাগল করে দিচ্ছে। ওখানে রিমিতা থাকলে কালাদেও ওকে বাঁচতে দেবে না। যদি অ্যাটাক্ করে বসে ? আজকালকার ছেলেমেয়েদের ভাবনাচিন্তার কুল পান না তিনি। ফাইলটা রেখে ফোনটা তুললেন তিনি।
— “হ্যালো।”
— “হ্যালো, মামা!”
— “হ্যাঁ বল। এমন অসময়ে ফোন? আমি অফিসে আছি।”
— “এইসময়ে তুমি অফিসে থাকবে তা জানি আমি। আর তখন আমরা কেউ ফোন করলে বিরক্ত হও, তাও জানি। কিন্তু এমন একটা খবর, যেকে বলে ব্রেকিং-নিউজ, তা তোমায় না-বলে পেটের ভাত ঠিক হজম হচ্ছিল না!”
— “কী ব্যাপার বল তো? তোর কথায় রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। আবার কিছু ঘটেছে নাকি পিশাচপাহাড়ে? কই শাক্য তো কিছু জানায়নি আমায়!”
— “রাখ তোমার ওই শাক্য। কেমন একটা লোক। হিরো-হিরো চেহারা, এদিকে পুলিশের কাজ করে। তার উপর কী-যে সারাক্ষণ ভাবে, কে জানে। সবার সঙ্গে আমাকে আর পূষণকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে, জানো?”
— “না রাখার কী আছে? পুলিশ এ-ধরণের কেসে সবাইকে সন্দেহ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক ব্যাপার। তুই আমার ভাগ্নি বলে কী তুই খুন-জখম করলে তোর অপরাধের গুরুত্ব কমে যাবে? নাকি পুলিশ তোকে মাথায় তুলে বাড়িতে দিয়ে আসবে?”
— “সেই ! মামা তুমি থাকলে আমাদের জেলযাত্রা আটকায় কে?”
— “তুই জেলে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিস মানে নিশ্চয়ই কোন অপরাধ করেছিস! তাহলে কিন্তু আমি তোকে কোনভাবেই শেলটার দেব না!”
— “মামা! তুমি চুপ করো তো। যা বলছি, মন দিয়ে শোন এখন। আমি আজ সকালবেলায় রিসর্ট থেকে বেরিয়ে থানার দিকে এসেছিলাম। আমি আসলে জানতে চাইছিলাম, আমাদের কলকাতা ফেরার ব্যাপারে পুলিশ কী সিদ্ধান্ত করলেন। থানায় সুদীপ্ত বাবু নেই। কোন কাজে বেরিয়েছেন। উনি থাকলে ভালো হতো। উনি ঠান্ডা মাথার মানুষ। তাছাড়া জবাবও দেন দায়সারাভাবে। মালাকার ছিলেন। লোকটিকে আমার একেবারেই সহ্য হয় না। আমি তাও তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, তিনি কী ভেবেছেন এ-ব্যাপারে? তাতে মালাকার অদ্ভুতভাবে বললেন, ‘আর যাওয়া। কালাদেও কাকে যেতে দেবে, কাকে নয়, তা ঠিক করার থানা কে?’ আমি একটু অবাক হলাম। উনি এমন নির্লিপ্তভাবে বললেন। আমি বললাম, আপনি পুলিশ হয়ে এ-সব গাঁজাখুরিতে বিশ্বাস করেন? তাতে ভদ্রলোকের চোখ দপ্ করে জ্বলে উঠল। আমাকে বললেন, ‘আপনি কলকাতার লোক। সেখানে ফিরতে পারবেন কি-না সেটা ভাবুন। অন্যের ঠাকুরদেবতা নিয়ে আপনার এত মাথা না-ঘামালেও চলবে!’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমায় থ্রেট করছেন? আপনার কোন স্বার্থে ঘা দিলাম বুঝি ? তাতে লোকটা স্রেফ গোঁজ হয়ে বসে রইলো। আমিও আর কথা না-বাড়িয়ে চলে এলাম। তবে রিসর্টে ফিরে গেলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, ওই মালাকার লোকটিকে কালচার করার দরকার। আর কালচার করার জন্য মফসসলে সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে চায়ের দোকান, সেলুন ইত্যাদি। সেলুনে আমার যাওয়ার উপায় নেই। অতএব চায়ের দোকানই ঠিক আছে। এখানে থানার আশেপাশে দু-তিনটি দোকান আছে। তারই একটিতে লোকজন তেমন নেই দেখে সেখানেই বসলাম। কাঁচের গ্লাসে এক গ্লাস চা নিয়ে বসে ভাবছিলাম কীভাবে কথাটা পাড়া যায়। আদৌ যে কোন কিছু পাওয়া যাবে, তার তো কোনও ঠিক নেই। একসময় তুললামও, “আপনাদের থানার ওসি ভদ্রলোকটি এত খারাপ ব্যবহার করেন কেন বলুন তো ? উনি কি কোনও বড় নেতা-টেতার আত্মীয় নাকি?”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৬: প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ও প্রাণীদের অস্থিরতা : যুদ্ধের দূষণ, মনে, প্রাণে, বাতাবরণে, সর্বত্র

একলা নববর্ষ
দোকান চালাচ্ছিলেন মধ্যবয়স্ক একটি লোক। আর একজন মহিলাও ছিলেন। তবে সাত হাত ঘোমটার নিচে তাঁর মুখ দেখতে পাইনি। যাক্ গে, যা বলছিলাম। আমি তো কথাটা তুললাম, কিন্তু দেখলাম, লোকটি কাষ্ঠ হাসি ছাড়া আর কোন প্রত্যুত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ এটা-ওটা বকেও যখন কোন ফল হল না, তখন বিস্বাদ চা গ্লাসে বেশিরভাগটিই ফেলে রেখে উঠে পড়েছি, এমনসময় লোকটি বলল, “দিদির কি কোন ডায়ারি করার ছিল না-কি? নেয় নি বড়সাহেব?”
আমি তার দিকে কটাক্ষপাত করলাম। বললাম, “কেন? তুমি বলে দিলে নেবেন না-কি উনি?”
লোকটি জিভ কেটে বলল, “বালাই ষাট, তা নয়। তবে ওই যে কোণার দিকে দোকানটি দেখছেন, ওখানে গেলে শিবনাথ মুর্মুকে পাবেন। বড়কর্তার খাস লোক। ওঁকে কিছু দিলে উনি ঠিক কর্তার কানে আপনার কেসটা তুলবেন!”
অনেকক্ষণ এটা-ওটা বকেও যখন কোন ফল হল না, তখন বিস্বাদ চা গ্লাসে বেশিরভাগটিই ফেলে রেখে উঠে পড়েছি, এমনসময় লোকটি বলল, “দিদির কি কোন ডায়ারি করার ছিল না-কি? নেয় নি বড়সাহেব?”
আমি তার দিকে কটাক্ষপাত করলাম। বললাম, “কেন? তুমি বলে দিলে নেবেন না-কি উনি?”
লোকটি জিভ কেটে বলল, “বালাই ষাট, তা নয়। তবে ওই যে কোণার দিকে দোকানটি দেখছেন, ওখানে গেলে শিবনাথ মুর্মুকে পাবেন। বড়কর্তার খাস লোক। ওঁকে কিছু দিলে উনি ঠিক কর্তার কানে আপনার কেসটা তুলবেন!”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৭: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— শিকরেঠুঁটো কাছিম

ত্রিপুরা: বছর সন্ধির পার্বণ ও নববর্ষ
আমি লোকটিকে তার চায়ের দাম মিটিয়ে যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বেরিয়ে এলাম দোকান থেকে। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে শিবনাথের খোঁজে সামনে এগিয়ে যাব ভাবছি, শুনলাম, লোকটি বলছে, “মাহাতো ঘরের ছেলে, বরাতজোরে বড়সাহেব হইঁছে, তার কি অত ভদ্দর ঘরের মেয়েছ্যালার সঙ্গে কথা বলা আসে?” ব্যস্, আর কিচ্ছু বলল না। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে এলাম। কিন্তু সেই দোকানে তখন শিবনাথ ছিল না। সে না-কি সদরে গেছে, কী সব জরুরি কাজ আছে। ভাবে দ্যাখ মামা, এই মালাকার যদি বদমাশদের দলে নাম লিখিয়ে নিজেই কালাদেও সেজে এইসমস্ত কাণ্ড করে বেড়ায়, তাহলে? দেখ না, গোয়েন্দা-থ্রিলারে কাহিনির শেষে দেখা যায়, পুলিশের মধ্যেই কেউ অপরাধগুলি করেছে, আবার সে নিজেই তদন্ত করছে, ফলে আসল অপরাধী কোনদিন ধরা পড়ছে না। আচ্ছা, এক্ষেত্রেও তেমন কিছু নয় তো? তাহলে তোমাদের কি উচিত নয়, মালাকারকে আগে ওই মামলার দায়িত্বভার থেকে সরিয়ে দিয়ে গ্রেপ্তার করে পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়া? নাহলে আবার কী অপরাধ ঘটাবে!”
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা / ৬৫
একেজি মন দিয়ে শুনছিলেন। রিমিতার দেওয়া তথ্যগুলি নেহাৎ ফেলনা নয়। মালাকার অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশে এইসমস্ত হত্যা-প্রতিহত্যা করলে, তদন্ত করেও কিছু পাওয়া মুশকিল। যেসব এভিডেন্স থাকবে স্পটে, মালাকার সেগুলি তদন্তের নাম করে নষ্ট করে দিতে পারেন। হয়তো দিয়েছেনও। একেজি মনে-মনে ঠিক করলেন, শাক্যর সঙ্গে আজ রাতে কথা হলে এই সম্ভাবনার কথা জানাবেন।
—মামাকে চুপ দেখে রিমিতা বলল, “মামা, কিছু ঠিক করলে?”
— “ভাবছি। দেখি শাক্যর সঙ্গে পরামর্শ করে!” একেজি বললেন।
— “উফ্! সেই শাক্য? আর কেউ জোটে না তোমার?” রিমিতা রাগ করে ফোনটা কেটে দিল।—চলবে।
—মামাকে চুপ দেখে রিমিতা বলল, “মামা, কিছু ঠিক করলে?”
— “ভাবছি। দেখি শাক্যর সঙ্গে পরামর্শ করে!” একেজি বললেন।
— “উফ্! সেই শাক্য? আর কেউ জোটে না তোমার?” রিমিতা রাগ করে ফোনটা কেটে দিল।—চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















