
ছবি: প্রতীকী।
সেবার বোধিসত্ত্ব এক লঙ্ঘন-নর্তককুলে জন্ম নিয়েছেন। অর্থাৎ, বাজিকর। দড়ি ওপর শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে নানা উপায়কৌশল দেখানোর সেই বিদ্যা ক্রমে ক্রমে আয়ত্ত করে তিনি পরিণত ও প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠলেন। হলেন প্রাপ্তবয়স্ক।
জনৈক আচার্যের কাছে তিনি শক্তিলঙ্ঘনবিদ্যা শিখেছিলেন এবং গুরুর সঙ্গেই অর্জিত বিদ্যা প্রদর্শন করে অর্থোপার্জন করতেন। শক্তি একপ্রকার অস্ত্রবিশেষ। ওই আচার্য নৃত্য প্রদর্শনের সময় চারটি শক্তি অতিক্রম করতে পারতেন, কিন্তু পাঁচটি শক্তিলঙ্ঘনের উপায় তাঁর অজ্ঞাত ছিল। এর প্রচেষ্টা প্রাণঘাতী। একবার বিপদ নেমে এল এভাবেই।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৫: অকালরাবী জাতক—সময় গেলে সাধন হবে না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৩ : রিমিতার ব্রেকিং-নিউজ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০১ : ত্রিপুরাতেও সিপাহি বিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল
সেবার কোনও এক গ্রামে তাঁরা খেলা দেখাচ্ছিলেন। আচার্য সেদিন নেশাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি লঙ্ঘনের জন্য চারটির পরিবর্তে পাঁচটি শক্তি সাজিয়ে রাখলেন নেশার ঝোঁকে। বোধিসত্ত্ব উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে স্মরণ করালেন, “পাঁচটি শক্তি অতিক্রমের কৌশল তো আপনার অজ্ঞাত, একটি শক্তি তুলে নিন। এই দুঃসাহস করলে পঞ্চম শক্তিতে আপনি বিদ্ধ হবেন। নেমে আসবে আকস্মিক অপমৃত্যু।”
মত্ততায় আচার্যের স্বাভাবিক বোধ ও বুদ্ধি লুপ্ত হয়েছিল। তিনি তাই ঔদ্ধত্যে জানালেন তাঁর ক্ষমতা কম নয়, তাঁর ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা জানার ক্ষমতা নেই বোধিসত্ত্বের। সুতরাং…
মত্ততায় আচার্যের স্বাভাবিক বোধ ও বুদ্ধি লুপ্ত হয়েছিল। তিনি তাই ঔদ্ধত্যে জানালেন তাঁর ক্ষমতা কম নয়, তাঁর ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা জানার ক্ষমতা নেই বোধিসত্ত্বের। সুতরাং…
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

একলা নববর্ষ
চারটি শক্তি লঙ্ঘন করার পর পঞ্চম শক্তিটি তিনি লঙ্ঘনের চেষ্টা করলেন, অবিলম্বেই ভগ্নবৃন্ত পুষ্পের মতোই সেই ভূমিস্থ শক্তি থেকে ঝুলতে থাকলেন। তাঁর মর্মন্তুদ আর্তনাদ বিফল হল। পঞ্চম শক্তিটি লঙ্ঘন করতে গিয়েই তাঁর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হল। হতভাগ্য আচার্যের দেহ শক্তি থেকে উত্তোলন করে বোধিসত্ত্ব তাঁর অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন করলেন।
ঔদ্ধত্য কখনও কখনও হিতাহিত-জ্ঞানশূন্য করে। তখন নিষেধ কিংবা অবশ্যম্ভাবী বিপন্নতাও উপেক্ষিত হয়। এর একমাত্র ফল বিনষ্টি। সঙ্কটের কল্পনাতে ম্রিয়মান হয় না সে-ই, যে আত্মশক্তিতে বলীয়ান। নচেত্ হিতাহিতজ্ঞানের অভাব কিংবা লোপে ওই আচার্যের মতোই হীনবল হয়ে শক্তিবিদ্ধ হতে হয়।
ঔদ্ধত্য কখনও কখনও হিতাহিত-জ্ঞানশূন্য করে। তখন নিষেধ কিংবা অবশ্যম্ভাবী বিপন্নতাও উপেক্ষিত হয়। এর একমাত্র ফল বিনষ্টি। সঙ্কটের কল্পনাতে ম্রিয়মান হয় না সে-ই, যে আত্মশক্তিতে বলীয়ান। নচেত্ হিতাহিতজ্ঞানের অভাব কিংবা লোপে ওই আচার্যের মতোই হীনবল হয়ে শক্তিবিদ্ধ হতে হয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৭: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— শিকরেঠুঁটো কাছিম

ত্রিপুরা: বছর সন্ধির পার্বণ ও নববর্ষ
এই কাহিনিতে লক্ষণীয় বিষয় হল, আচার্যমাত্রেই পথপ্রদর্শক, আলোকপ্রাপ্ত নন। মদমত্ততা এই কাহিনিতে অজ্ঞানের পরিপূরক। খেয়াল করতে হয়, লঙ্ঘন করে চলার পথেও সীমাবদ্ধতা থাকে। তা অতিক্রমের উদ্যোগে যথাযথ ক্ষমতা না থাকলে তা প্রাণঘাতী হয়। কৌশল কিংবা বিদ্যা জ্ঞান, পরিণতি দেয়, কুশলী করে। কিন্তু অজ্ঞানের অবসান ঘটাতে পারে না। সেই অজ্ঞানের পথে আসে ঔদ্ধত্য, উপেক্ষা। ঔদ্ধত্য ঔদার্যের পরিপন্থী। এই পরিস্থিতি যে পরিণামকে ডেকে আনে তা আকাঙ্ক্ষিত না হলেও, অনিবার্য। এই কাহিনি মনে করায় সেই সেই চাণক্যবচন যেখানে বলা হয়েছিল বিদ্যায় জাগে বিনয়, বিনীত মানুষের ব্যক্তিত্ব জাগে। ব্যক্তিত্ব, অর্থাৎ আন্তরধর্ম বা বোধের প্রকাশে অর্জিত হয় ধন। এই “ধন” কি “অর্থ”? যাকে অর্জন করতেন আচার্য সশিষ্য সেই গ্রামে কৌশলপ্রদর্শনে ব্রতী হয়েছিলেন? তা কি পরাজ্ঞান, প্রজ্ঞান নাকি ভূমি, যে উর্বর ভূমি প্রাণবতী শস্যশ্যামলা হয়ে সম্পন্ন করে? সে যাই হোক না কেন, সেই ধন থেকে রক্ষিত হয় ধর্ম, সম্পন্ন হয় কর্তব্যের পরিপালন। তাতেই জাগে ঐহিক, পারত্রিক কিংবা আধ্যাত্মিক সুখ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৬: প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ও প্রাণীদের অস্থিরতা : যুদ্ধের দূষণ, মনে, প্রাণে, বাতাবরণে, সর্বত্র

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম
যে বিদ্যা আক্ষরিক অর্থে বিনীত করে অর্থাৎ শিক্ষিত, পূর্ণ, সচেতন ক’রে সকল কাপট্য থেকে মুক্তি দিতে পারে সেই বিদ্যা হয়তো আচার্যের ছিল না। আর ছিল না বলেই বিদ্যাগরিমায় তাঁর সীমাকে ভুলেছিলেন আচার্য। মেঘ স্বতঃপ্রকাশ সূর্যকে আচ্ছন্ন করতে পারে না, আচ্ছন্ন করে কেবল অজ্ঞানীর দৃষ্টিকে। জ্ঞানস্বরূপ সূর্যের তাতে কিছুমাত্র হানি ঘটে না। আচার্যের মধ্যে তাই জেগে ওঠেনি যথার্থ ব্যক্তিত্ব। তাই “সুখ” অধরাই থেকে যায়। দুর্বচ-জাতক সেই দীর্ঘ প্রতর্কের বীজ। যা বলি ভেবে বলি কি? যা বলি তার দায় একান্তই আমার কি নয়? যে বাক্যে দায়িত্বহীন মাধুর্য থাকে কেবল তা যেমন বৃথা, তেমন-ই যে কথা অন্যায়, রূঢ়, অন্তঃসারশূন্য, অসংবেদী, অপ্রিয় কিংবা ঔদার্যহীন উদ্ধত— সেই কথা জীবনকে বিফল ও বিপর্যস্ত করে। তা গুরুবাক্য হলেও লঘু থেকে লঘুতর হয়ে যায়। এ কাহিনি অন্যান্য জাতককাহিনির মতোই জীবনের সামনে আয়না ধরে। তাকে একটি অনাবিল নিরপেক্ষ মণিময় মুকুরে বিম্বিত করে দেখাতে চায় বুঝি। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















