রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

যার ইচ্ছা বিগত হয়েছে, তিনিই বীতেচ্ছ। এমন বীতরাগের নিরাসক্তি এই কাহিনির প্রতিপাদ্য। নিঃশ্রেয়স-প্রাপ্তির জন্য যে যে আদেশ ও উপদেশ শাস্ত্রে পাওয়া যায়, তার প্রথম ও প্রধান হল ঐহিক আকাঙ্ক্ষার পরিত্যাগ কিংবা নিয়ন্ত্রণ। ভোগ ও ত্যাগের পৃথক পথে যাত্রা অথবা তাদের সমুচ্চয়, কর্মে ফলোদ্ভব কিংবা নিষ্কাম কর্ম ইত্যাদি সকলই বিশেষ চর্চিত। দর্শন তার বিধিবদ্ধ পথে নেতি নেতির মধ্য দিয়ে ইতির দিকে যাত্রা করে, তাতে উপনীত হয় কিন্তু তত্ত্বে যা পাওয়া যায়, তা কি সর্বদাই অনুভূতিবেদ্য হয়? তত্ত্বের আশ্রয় যে সত্যানুভূতি, তা তো অনুভবের বিষয়, উপলব্ধির পথেই তো সেই বোধ জাগে। তাহলে তত্ত্ব-ই সত্য নাকি যা প্রকৃত সত্য তা কেবল তত্ত্বসর্বস্ব নয়, বরং তার থেকেও মহত্তর কোনও উপলব্ধি? একান্ত তত্ত্বানুরাগ কি যথার্থ নিরাসক্তির অনুকূল? আজকের জাতকমালার কাহিনিতে তার একটি দিগ্‌দর্শন পাওয়া যাবে।

একবিংশ শতকের ভোগ ও পুঁজির জগতেও হয়তো এই উপলব্ধি অসার নয়, কারণ ঐহিক, আধ্যাত্মিক সিদ্ধির পথে একান্ত উপলব্ধি আবশ্যক। আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মোপলব্ধি তো নিজের প্রতি নিরাসক্ত, নির্মোহ দৃষ্টি ব্যতীত জাগে না। এই আত্মবিশ্লেষণহীন আত্মবিচ্ছিন্ন মানুষ আজকের রাষ্ট্রের, পৃথিবীর বিশ্বনাগরিক। আত্মসর্বস্ব, আত্মকেন্দ্রিক মানুষের পক্ষে এমন বীতেচ্ছ হয়ে যথার্থ সিদ্ধিলাভ কি আদৌ সম্ভব হয়? জানাবে এই কাহিনি।
বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে কাশীরাজ্যের এক ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন। ঐহিক কামনা ও ভোগবাসনার প্রতি তিনি একান্তই নিরুত্সুক হলেন। বহুকাল হিমালয়ে অবস্থান করে একদিন নেমে এলেন সমতলে। কোনও এক গণ্ডগ্রামের কাছে যেখানে গঙ্গা বাঁক নিয়েছে, সেখানে এক পর্ণকুটির এখন হয়ে উঠল তাঁর আবাসস্থল।

একদিন কোনও এক পরিব্রাজক সেই গ্রামে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি সমগ্র জম্বুদ্বীপ ভ্রমণ করেছেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে তর্কে সমতুল হয় এমন তার্কিক এখনও পাননি। তিনি তর্কের উত্সাহে তার্কিকের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এখন। এখানেও তিনি সন্ধান করলেন তেমন তার্কিকের।

“কী হে, আমার সঙ্গে তর্কে এঁটে ওঠে, এমন বিচারক্ষম লোক আছে নাকি এখানে?”
“আছে বৈকী!” গ্রামবাসীরা সোৎসাহে জানায়, বোধিসত্ত্বের ক্ষমতা বর্ণনা করে তারা।

দুই সংসারত্যাগী এবার মুখোমুখি হবেন। দুজনেই হয়তো সাধক, কিন্তু বীতেচ্ছ কি? যার সন্ধান করছেন তাকে পাওয়ার জন্য যথার্থ সচেষ্ট কি দুজনেই?
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৬ : ভাগ্য যখন ফেরে

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: রাক্ষস খর ও রামের সংঘাতে, যুদ্ধের বিবিধবার্তা

বোধিসত্ত্বের বর্ণনা শুনে পরিব্রাজক আগ্রহী হলেন। গ্রামবাসীরা ভিড় করে চলল তাঁর সঙ্গে। বোধিসত্ত্বের পর্ণশালায় উপস্থিত হয়ে তাঁকে সম্ভাষণ জানালেন সেই পরিব্রাজক, তারপর উপবিষ্ট হলেন। বোধিসত্ত্ব অতিথিকে আপ্যায়ন করলেন। জানতে চাইলেন, “বনগন্ধযুক্ত গঙ্গোদক পান করবেন কি?”

পরিব্রাজক অযথা সময় অপব্যয় করলেন না। বাক্যজালে আবদ্ধ করার এই মাহেন্দ্রক্ষণ। তিনি সত্বর তর্ক আরম্ভ করলেন—
“গঙ্গা কি? গঙ্গা কি বালি না জল? গঙ্গা বলতে ঠিক কী বোঝায়, এপার না ওপার?” ইত্যাদি প্রশ্নে তিনি মহাবিতর্কের সূত্রপাত ঘটালেন।

সুকুমার রায়ের “অবাক জলপান” মনে পড়ছে? একটু অংশ উদ্ধৃত করা যাক!
“পথিক: মশাই, একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন ?
ঝুড়িওয়ালা : জলপাই ? জলপাই এখন কোথায় পাবেন ? এ ত জলপাইয়ের সময় নয় । কাঁচা আম নিতে চান দিতে পারি।
পথিক : না না, আমি তা বলিনি।
ঝুড়িওয়ালা : না, কাঁচা আম আপনি বলেননি, কিন্তু জলপাই চাচ্ছিলেন কিনা, তা ত আর এখন পাওয়া যাবে না, তাই বলছিলুম।
পথিক : না হে আমি জলপাই চাচ্ছিনে।
ঝুড়িওয়ালা : চাচ্ছেন না ত ‘কোথায় পাব’ ‘কোথায় পাব’ কচ্ছেন কেন ? খামকা এরকম করবার মানে কি?
পথিক : আপনি ভুল বুঝেছেন‒ আমি জল চাচ্ছিলাম।
ঝুড়িওয়ালা : জল চাচ্ছেন তো ‘জল’ বললেই হয়‒ ‘জলপাই’ বলবার দরকার কি? জল আর জলপাই কি এক হল ? আলু আর আলুবোখরা কি সমান? মাছও যা মাছরাঙাও তাই? বরকে কি আপনি বরকন্দাজ বলেন ? চাল কিনতে এসে চালতার খোঁজ করেন?”

যাইহোক, বোধিসত্ত্ব যে প্রতিপ্রশ্ন করলেন, তাতে তর্কের অবসান ঘটে গেল।
তিনি বললেন, “যদি বালুকা, জল, এপার, ওপার বাদ দেওয়া হয় তবে গঙ্গা পাবেন কোথায়?”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫০: তারখেল

ক্যাবলাদের ছোটবেলা, পর্ব-৩৭: লোকে যারে বড় বলে

সেই পরিব্রাজক এমন প্রতিপ্রশ্নে নির্বাক হয়ে গেলেন। নিরুত্তর হয়ে সেখান থেকে পলায়ন করলেন। একেই হয়তো যথার্থ জব্দ করা বলে, কিন্তু এই প্রতি প্রশ্নেই তিনি হয়তো তাঁর প্রশ্ন ও কর্মকাণ্ডের উত্তর পেয়ে গেলেন। উত্তর পাই আমরাও।

না চাইলে, ত্যাগ করলেও যার প্রাপ্তি ঘটে তার কথা রবীন্দ্রগানে বার বার ফিরে আসে। আবার আকাঙ্ক্ষিতের অপ্রাপ্তি তো জগৎবিশ্রুত। কেউ ধন চায়, কেউ চায় যশোলাভ, কেউ পরমার্থ। সকলে কি পায় তা? কবি বলবেন, “আমার মন বলে, ‘চাই চা ই, চাই গো— যারে নাহি পাই গো/ সকল পাওয়ার মাঝে আমার মনে বেদন বাজে ‘নাই, না ই নাই গো।” যোগক্ষেমের পথে অলব্ধের লাভ, লব্ধের রক্ষা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত বিষয়ের চিরপ্রতিষ্ঠা ঘটে। এ যেমন ত্রিবর্গের ক্ষেত্রে সত্য, তেমন-ই সত্য সাধনার পথেও। কিন্তু চাওয়া ও পাওয়ার মাঝে থেকে যাওয়া অনেক প্রশ্ন ও ব্যবধান কি দুরপনেয়?
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৬: দুর্বচ-জাতক : উল্লঙ্ঘন

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

অভীষ্টনীতিক, তন্নিষ্ঠ ধৃতব্রতের কাছে তাঁর লক্ষ্যের স্বরূপ ও মোক্ষের উপায় যথার্থ স্ফুট হবে এটিই কাম্য। যা তিনি বিশ্বাস করেন, উপলব্ধি করেন, কায়মনোবাক্যে আকাঙ্ক্ষা করেন এবং তাকে অর্জনের জন্য যথার্থ উদ্যোগ নেন, তাঁর সিদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু যে পথিক তার গন্তব্য সম্পর্কে একান্তই নির্বিকার তার পথ অনন্ত। স্রোতস্বিনী গঙ্গা এর কাহিনিতে এই তত্ত্বের রূপক হয়ে ধরা দেয়। যিনি তর্কের পথে সত্যে উপনীত হতে চান, অনুভবে নয়, তাঁর কাছে তর্ক ও বিচার অনন্ত। যে সত্য স্বতঃপ্রকাশ, তার স্বীকৃতি তর্কনিষ্ঠ হলেও একদেশদুষ্ট হয় তখন। সেই একদেশদর্শী তার্কিক পূর্ণের স্বরূপ উপলব্ধিতে একান্তই অপারগ হন। তাঁর কাছে গঙ্গাও পারাপারে খণ্ডিত, স্রোতস্বিনী নদীজলকেও তিনি বালুকা বলে অনুমান করতে চান। এই বিচার যে নিতান্ত ও একান্ত নিরর্থক তা বলাবাহুল্য। পরাজ্ঞানের স্বরূপ প্রতিপত্তি কিংবা পার্থিব সমস্যার নিষ্পত্তির পথেও তত্ত্বনিষ্ঠের এই অসংযত তর্কৈষণা আমাদের নিত্যদিনের চেনা বিষয়। এই অসার প্রয়াস যে মূলতঃ নিষ্ফল, তা-ই এ কাহিনির প্রতিপাদ্য বিষয়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

বোধিসত্ত্ব জানাবেন যে, যা লভ্য তার প্রতি একান্ত বিরাগ, যা দুর্লভ, অদৃশ্য বা অদৃষ্ট, তার প্রতি একান্ত অনুরাগ কিংবা আসক্তির পরিণামে থাকে অপ্রাপ্তি। সেই ঈপ্সিতের লাভ বহু আয়াসেও কখনও হয় না। এমন মতিহীন অজ্ঞান মানুষ যা পায়, তাতে কখনও সন্তুষ্ট হয় না। প্রবাহিনী গঙ্গাতটে বসেও তারা গঙ্গার স্বরূপ নিয়ে একান্তই সন্দিহান থাকে। প্রাপ্ত বিষয়েও তারা নিঃসংশয় হয় না। চির অপ্রাপণীয় যা তার সন্ধানেই তার বেলা কাটে। যা আকাঙ্ক্ষা করে, তাকে পেয়েও হারায় তাই। এদের অসীম আকাঙ্ক্ষা কখনোই তৃপ্ত হতে দেয় না। যা পায় তাকে একান্ত অবহেলায়, অবজ্ঞায় হারিয়ে ফেলে। এরা নিরাসক্ত নয়, কিন্তু বীতেচ্ছ বটে। একান্ত অভীষ্টের প্রতি এদের ইচ্ছা, লিপ্সা থাকে না। ওই পরিব্রাজক এমনই বীতেচ্ছ। কিন্তু তর্কনিষ্ঠ সানুরাগ। পাশাপাশি বোধিসত্ত্ব-ও বীতেচ্ছ। তিনি যথার্থ বীতরাগ, প্রজ্ঞাবান। তাই তাঁর সত্যদৃষ্টির উন্মোচন হয়েছে। জাতকমালার এই কাহিনি সেই দ্বিবিধ মানুষের কথাই বলে, যাঁরা আত্মজ্ঞানী, প্রাপণীয়ের প্রতি তন্নিষ্ঠ, তাই অভীষ্টকে লাভ করেন এবং যাঁরা “মনোহরণ চপলচরণ” অপ্রাপণীয়ের আকাঙ্ক্ষা করে মরীচিকার পিছনে ধাবমান হয়ে অভীষ্টকে উপেক্ষা করেন। এই দ্বিবিধ মানুষ-ই আমাদের মধ্যে, চারপাশে সর্বদাই আছে। তাই এই জাতককথা চিরদিনের পাথেয়। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content