বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

এক জোড়া দাঁডাশ সাপের সাথে বেজির লড়াই। ছবি : সংগৃহীত।

ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের পাশের দোলুই পাড়ায় বিশ্বম্ভর নামে একজন লোক ছিল যে যখনই রাস্তায় হেঁটে যেত লোকে দেখত তার কাঁধে বসে আছে তার পোষা বেজি। তাই বেজি যে পোষ মানে তা শৈশব থেকেই জানতাম। ছোট থেকে অনেক শিশুদের মতো পঞ্চতন্ত্র আর ঈশপের গল্প শুনতে আমারও খুব ভালো লাগত। পঞ্চতন্ত্রে বেজি নিয়ে একটা গল্প ছিল। যখনই বিশ্বম্ভর কাকুকে দেখতাম গল্পটা মনে পড়ত। গল্পটা প্রায় সবাই জানেন। তবুও সংক্ষেপে বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। এক ব্রাহ্মণ দম্পতির এক শিশু পুত্রসন্তান ছিল। তাঁদের একটা পোষা বেজিও ছিল। ব্রাহ্মণ বেজিটিকে বিশ্বাস করলেও ব্রাহ্মণী বিশ্বাস করত না, সব সময় ভাবত সে তাঁর শিশু পুত্রের কোনও ক্ষতি করতে পারে।

একদিন ব্রাহ্মণকে শিশুটিকে পাহারা দিতে বলে ব্রাহ্মণী জল আনতে গেল। কিন্তু ব্রাহ্মণ বেজিটিকে তাঁর শিশুপুত্রের পাহারার ভার অর্পণ করে ভিক্ষার জন্য বেরিয়ে গেলেন। সেই সময় ফনা তুলে একটা বিষাক্ত সাপ শিশুটিকে দংশন করতে এল। তখন বেজিটি ঝাঁপিয়ে পড়ল সাপটির ওপর এবং ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। ব্রাহ্মণী জল নিয়ে ঘরের ঢোকার মুখে দেখতে পেল বেজির মুখে রক্ত লেগে আছে। ব্রাহ্মণী ভেবে নিল বেজি তাঁর শিশুপুত্রকে হত্যা করেছে। প্রচন্ড ক্রোধে তিনি জল ভর্তি কলসি বেজির ওপর ছুঁড়ে মারলেন ফলে বেজিটি মারা গেল। তারপর কাঁদতে কাঁদতে ঘরের ভেতর ঢুকে দেখেন তাঁর শিশুপুত্রটি খেলছে আর পাশেই সাপটির ছিন্ন ভিন্ন দেহ। ব্রাহ্মণী তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন এবং অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলেন। এই গল্পটি থেকে দুটো জিনিস শিখেছিলাম। প্রথমত: সাপের শত্রু হল বেজি। দ্বিতীয়ত: অনুমান নয় বা বদ্ধমূল ধারণা নয়, চোখে দেখে সব কিছু যাচাই করে তবেই সিদ্ধান্তে আসা উচিত।
সাপের সঙ্গে বেজির লড়াই আমার জ্ঞান হওয়া থেকে আজ পর্যন্ত দেখেছি তিনবার। এর মধ্যে বিষধর সাপের সাথে লড়াই দু’বার। প্রথমবার যখন দেখি তখন আমি স্কুলে পড়ি। একদিন বিকেলে আমাদের বাঁশবাগানে বেজির সাথে একটা গোখরো সাপের লড়াই দেখেছিলাম। সেই লড়াইতে জিতে গিয়েছিল বেজি। প্রায় আধঘন্টার সেই লড়াই শেষে সাপটা লড়াই করার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। আসলে এটাই বেজির কৌশল। সাপ যখনই ছোবল দিতে উদ্যত হয় তখনই দক্ষ জিমন্যাস্টদের মতো সে অসাধারণ অ্যাক্রোব্যাটিক কৌশলে নিজেকে ছোবল থেকে সরিয়ে নেয়। আর সাপটিকে সামনে, পিছনে, ডাইনে, বামে ক্রমাগত ছুটিয়ে ক্লান্ত করিয়ে দেয়। তারপরই সে সাপের মাথায় দেয় মোক্ষম কামড়। তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলে তার দেহ। দ্বিতীয়বার দেখেছি ৫ বছর আগে। আমাদের স্কুলের চারটি ভবনের মাঝে রয়েছে বেশ বিস্তৃত মাঠ। বর্ষায় সেই মাঠে প্রচুর ঘাস ও শোলা গাছ জন্মায়। সময়টা ছিল আগস্ট মাস। বর্ষা প্রায় বিদায় নিলেও মাঠে হাঁটু সমান উচ্চতা আগাছায় ভরে ছিল। স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকের ভবনে ক্লাস নিতে যাওয়ার সময় দেখি ওই ভবনের একতলা, দোতলা ও তিনতলায় ছাত্রছাত্রীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে হৈ-হল্লা করছে। ওরা যেদিকে দেখছে সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটা বেজি আগাছার ভেতরে প্রচন্ড লাফালাফি করছে। আর একটু ভালোভাবে তাকাতেই বোঝা গেল ঝোপের ভিতর ফনা তুলে একটা কেউটে সাপ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫১: ইরাবতী ডলফিন

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৭: বীতেচ্ছ-জাতক — তুই যাহারে দিলি ফাঁকি

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬৯: আকাশ এখনও মেঘলা

ছাত্রদের সঙ্গে আমিও দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম সাপ-বেজির লড়াই। ততক্ষণে আরও কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষিকা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ওই লড়াই দেখার জন্য। কিন্তু লড়াই বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। হঠাৎই সাপটি অদৃশ্য হয়ে গেল আর বেজিটি কিছুক্ষণ হতাশ হয়ে এদিক-ওদিক খুঁজে দেখতে না পেয়ে দৌড়ে পালাল। মাঠে প্রচুর ইঁদুরের গর্ত রয়েছে জানতাম। সাপটি সম্ভবত সেই গর্তের মধ্যেই সেঁধিয়েছে। বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে সাপে-নেউলে, অর্থাৎ জন্মগত শত্রুতা। বেজি বা নেউলের সঙ্গে বিষধর সাপের এই সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে অনেক পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তবে কেবল কৌশল দিয়েই যে বেজি বিষধর সাপের মোকাবিলা করে তা নয়, ওদের আরও কয়েক স্তর প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন ধরুন লোম। ওদের ঘন, লম্বা ও শক্ত লোম ভেদ করে সাপের দংশন চামড়া পর্যন্ত পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। আবার যদি দংশন চামড়া পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয় তাহলেও ওদের শক্ত চামড়া ভেদ করা মুশকিল। আবার চামড়া ভেদ করলেও চামড়ার নিচে রয়েছে পুরু চর্বিস্তর যা ভেদ করে বিষ রক্তে মেশা প্রায় অসম্ভব। আবার যদি রক্তে মিশে যায় তাহলেও বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হবে না। কারণ বেজির স্নায়ুতন্ত্র নিউরোটক্সিক বিষে আক্রান্ত হয় না।

কেউটে, গোখরো, শঙ্খচুড়, কালাচ, শাঁখামুটি ইত্যাদি সাপের বিষ নিউরোটক্সিক। স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় প্রোটিনধর্মী উপাদান অ্যাসিটাইল কোলিন রিসেপ্টর নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় নিউরোটক্সিক বিষের প্রভাবে। কিন্তু বেজির জিনে এমনই মিউটেশন দেখা যায় যে এদের অ্যাসিটাইল কোলিন রিসেপ্টরের গঠনগত পরিবর্তন ঘটে, ফলে ওই বিষ এই রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হতে পারে না। আর তাই এইসব সাপের বিষ বেজির রক্তে মিশে গেলেও বেজির মৃত্যু ঘটাতে পারে না। প্রসঙ্গত, জানিয়ে রাখি হিমাটোটক্সিক বিষ বেজির মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। চন্দ্রবোড়া সাপের বিষ হিমাটোটক্সিক। তবে বেজি কিন্তু শুধু বিষধর সাপকেই নিধন করে না, খাদ্য হিসেবে বিষহীন সাপকেও ছাড় দেয় না। বিষহীন দাঁড়াশ সাপের সাথে একবার লড়াইও দেখেছি অনেকদিন আগে। বেজিটা দাঁড়াশের মাথাটাকে মুখের ভেতর নিয়ে কামড়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। আর সাপটাও তার সারা শরীর দিয়ে বেজিটাকে পেঁচিয়ে ধরেছিল। তাতে বেজি মনে হয় খুব বিচলিত হয়নি। সাপটা মরে যেতে বেজিটার শরীর থেকে আপনি সাপটা খসে পড়েছিল।
কলকাতায় বৃষ্টি

সুন্দরবনে বেজি। ছবি : সংগৃহীত।

বেজিকে অনেকেই বলে নেউল বা নকুল। ইংরেজিতে ‘Indian Grey Mongoose’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Herpestes edwardsi’। বেজি বা নেউলের সাথে আমার পরিচয় আজন্ম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যখন তখন দেখতাম জোড়া স্ত্রী ও পুরুষ বেজি কিংবা এক জোড়া বাচ্চা-সহ মা ও বাবা বেজি খামারে, বাগানে, পুকুর পাড়ে, খালের ধারে ঝোপ-ঝাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে খাবারের খোঁজে। এই দৃশ্য এখনও প্রায় প্রতিদিনই দেখি। এরা যত না জঙ্গলে থাকে তার থেকে অনেক বেশি থাকে মনুষ্য বসতিপূর্ণ এলাকায়। গর্ত বা ঘন ঝোপ আছে এমন জায়গাই এদের বেশি পছন্দ কারণ সেখানেই এদের আস্তানা। হেতাল গাছেরর ঝোপ এদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ।

বেজির গায়ের রং তামাটে ধূসর বা লালচে ধূসর বা হলদেটে ধূসর। আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলে বসতি এলাকায় তামাটে ধূসর রঙের বেজি বেশি দেখা যায়। এদের লোম কিন্তু মোটেই ধূসর নয়। প্রত্যেকটি লোম সাদা-কালোর এমন এক অদ্ভুত বলয় দিয়ে তৈরি যে দেহটা ধূসর মনে হয়। চারটে পায়ের রং দেহের রঙের থেকে গাঢ়, অনেকটা বাদামি। বেজির গায়ের রঙের কথা বলতে গেলেই মহাভারতের অশ্বমেধিকা পর্বের চমৎকার সেই গল্পটির কথা আমার মনে পড়ে যায়। গল্পটি আমাদের অসাধারণ একটা শিক্ষাও দেয়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে যুধিষ্ঠির যুদ্ধের পাপক্ষয় ও পুণ্য অর্জনের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছেন এবং সেই উপলক্ষ্যে অগণিত মানুষকে অপরিমেয় খাদ্য ও উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সেই যজ্ঞসভায় এক অদ্ভুতদর্শন বেজি উপস্থিত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা খাবারের উপরে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দিতে দিতে বারবার নিজের গায়ের রং দেখছিল আর হতাশ হচ্ছিল। বেজিটি অদ্ভুত দেখতে কারণ তার শরীরের একদিকের রং কাঁচা সোনার মতো আর আরেকদিকের রং স্বাভাবিক।

যুধিষ্ঠির যখন জিজ্ঞাসা করলেন যে বেজির এইরকম আচরণের কারণ কী তখন মানুষের গলায় বেজিটি যুধিষ্ঠিরসহ সভায় উপস্থিত সবাইকে একটা গল্প শোনাল। এক গ্রামে এক হতদরিদ্র ব্রাহ্মণ তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূকে নিয়ে বাস করতেন। দুর্ভিক্ষের কারণে তাঁরা দীর্ঘদিন অনাহারে ছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ বহু কষ্টে ভিক্ষে করে সামান্য চাল সংগ্রহ করে আনেন। তাঁর পুত্রবধূ যখন সেই চাল ফুটিয়ে ভাত রান্না করে চারটি অংশে ভাগ করে খেতে বসার উপক্রম করছেন তখনই এক ক্ষুধার্ত পথিক হাজির হলেন এবং খাবার চাইলেন। পথিক এতটাই ক্ষুধার্ত ছিলেন যে পরিবারের চারজনই তাদের নিজ নিজ ভাগের খাবার পথিককে খাইয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে ছদ্মবেশী পথিক তাঁর আসল রূপ ধারণ করলেন। তিনি হলেন ধর্ম দেবতা। ব্রাহ্মণ পরিবারের নিঃস্বার্থ আতিথেয়তায় খুশি হয়ে তিনি তাঁদের অনেক বর দিলেন। এই সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিল ওই বেজি। সেও ছিল ক্ষুধার্ত। মেঝেতে পড়ে থাকা দু’একটা ভাতের দানা বেজির শরীরে লেগে যাওয়ার সাথে সাথে তার শরীরের অর্ধাংশ সোনার রঙ ধারণ করে। তারপর থেকে সে যেখানেই এমন দান-ধ্যান যজ্ঞানুষ্ঠান দেখে সেখানে এসে খাবারের টুকরোর উপর গড়াগড়ি দেয় যাতে শরীরের বাকি অর্ধাংশ সোনার রঙ হয়ে যায়। তাই সে যুধিষ্ঠিরের এই যজ্ঞসভায় হাজির হয়েছিল কিন্তু ওই দান ধ্যান যে নিঃস্বার্থ ও আন্তরিক ছিল না, বরং অনেক বেশি ছিল লোক-দেখানো তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৭ : হাঙরের পেটে মুক্তো

বেজির প্রতি পায়ে পাঁচটা করে আঙুল আছে। আর প্রতি আঙুলে রয়েছে তীক্ষ্ণ নখর। এই নখর ওদের মাটি খুঁড়তে এবং খাবার সংগ্রহের কাজে সাহায্য করে। মুখটা লম্বা ও সূচালো। নাকের সামনে আর চোখের চারদিকে লোমের রঙও মরচে-বাদামি। চোখ ও নাকের রঙের এই বিন্যাস ওদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এদের লেজ প্রায় দেহের সমান লম্বা এবং খুবই লোমশ। লেজ বাদে দেহের দৈর্ঘ্য যেখানে ১৪ থেকে ১৭ ইঞ্চি হয় সেখানে লেজের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ১৭ ইঞ্চি। লেজের শেষ প্রান্তে হালকা হলুদ বা হালকা সাদা ছোপ থাকতে পারে। যদিও পুরুষ বেজি স্ত্রী বেজির থেকে আকারে কিছুটা বড় হয় তাও এদের ওজন ৯০০ গ্রাম থেকে ১.৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের কান দুটো বেশ ছোট ও গোলাকার। বেশিরভাগ সময় বড় লোম দিয়ে দুটো কান ঢাকা থাকে বলে স্পষ্ট বোঝা যায় না। আর চোখ দুটো ছোট, গোল গোল ও নীলচে রঙের। এদের দৃষ্টিশক্তি খুবই প্রখর এবং এরা রঙের পার্থক্য খুব ভালো বুঝতে পারে।
কলকাতায় বৃষ্টি

বিষধর সাপের সাথে বেজির লড়াই। ছবি : সংগৃহীত।

বেজিদের যখনই দেখা যায় দেখি মুখটাকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে এসে কিছু খুঁজতে খুঁজতে চলেছে। দেখে মনে হয় সব সময় খাবার খুঁজছে। তবে সন্দেহজনক কিছু টের পেলে পেছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দূরে দেখে। এই ভঙ্গিমা খুব দৃষ্টিনন্দন। ওরা প্রধানত প্রাণীভোজী। তবে স্থানভেদে খাদ্যতালিকায় কিছু পরিবর্তন হয়। যেসব বেজি জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় থাকে তাদের খাদ্য তালিকার সঙ্গে জনবসতি এলাকায় থাকা বেজির খাদ্যতালিকায় পার্থক্য রয়েছে। যে সব এলাকায় বেজির সংখ্যা বেশি সেখানে কিন্তু সাপের সংখ্যা কম থাকে, কারণ বেজির অন্যতম প্রিয় খাদ্য সাপ। সমস্ত ধরনের সাপই এরা খায়। তাছাড়া সাপের ডিম এদের খাদ্য। এদের আর এক প্রিয় খাদ্য হল ইঁদুর। এইতো ক’দিন আগেই আমার পাঁচিলের পাশে একটা বড় মেঠো ইঁদুরকে প্রায় আধ ঘন্টার চেষ্টায় সম্পূর্ণরূপে মেরে ফেলতে দেখলাম। ইঁদুর নিধন করে বেজিরা কৃষকের এবং গৃহস্থের দারুণ উপকার করে। এগুলো ছাড়াও গিরগিটি, টিকটিকি, মাটিতে বাসা বানায় এমন পাখি, পাখির ছানা ও ডিম, আরশোলা, ফড়িং, কেন্নো, কাঁকড়াবিছা, গুবরে জাতীয় পোকা, কাঁকড়া, ব্যাঙ, মাছ ইত্যাদি রয়েছে এদের মেনুতে। জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় খরগোশ এবং জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় বক শিকার করতেও এদের দেখা গিয়েছে। তবে স্বাভাবিক খাদ্যাভাব হলে বিভিন্ন ফল ও রসালো মূল খেতে দেখা গেছে। এদের শিকার করার পদ্ধতিটি ভারি অদ্ভুত। সাপের সাথে যখন লড়াই করে সেটা অবাক হয়ে দেখতে হয়। বিদ্যুৎ গতিতে ওরা সাপের ছোবল এড়িয়ে সরে যেতে পারে। ফলে সাপের প্রতিটি ছোবল ভুল জায়গায় গিয়ে পড়ে। এতে বিষধর সাপের বিষ থলি থেকে বিষ নিঃশেষ হয়ে যায় এমনকি বিষ দাঁত ভেঙেও যেতে পারে। তারপর এইভাবে যখন সাপকে প্রচন্ড ক্লান্ত করে দেয় তখন তার মাথায় বা ঘাড়ে মোক্ষম কামড় দিয়ে মেরে ফেলে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: রাক্ষস খর ও রামের সংঘাতে, যুদ্ধের বিবিধবার্তা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট

স্ত্রী বেজি বছরে দু-তিনবার বাচ্চা দেয়। প্রতিবার ২-৪টি বাচ্চার জন্ম হয়। তবে আমি যত মা বেজি দেখেছি সবারই দুটি বাচ্চা। প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী ও পুরুষ বেজি জোড় বাঁধে। অন্য সময় এরা একা একাই ঘোরে। সাধারণতঃ মে-জুন মাসে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বাচ্চার জন্ম দেয়। এদের গর্ভাবস্থা ৬০-৬৫ দিন স্থায়ী হয়। জন্মের পর বাচ্চারা প্রায় ছয় মাস মায়ের সঙ্গে ঘোরে। তবে জন্মের সময় বিড়ালের বাচ্চাদের মতো বেজির বাচ্চাদের চোখ ফোটে না। ৬-৯ মাস বয়সের মধ্যে বাচ্চারা পরিণত হয়ে যায়। ভারতীয় বেজি গড়ে ৭ বছর বাঁচে।
কলকাতায় বৃষ্টি

বাগানে বেজি। ছবি : লেখক।

অনেকেই বলে থাকেন যে বেজি নাকি নিজেই নিজের ডাক্তারি করে। বিষধর সাপ দংশন করলে সে নাকি সর্পগন্ধা গাছের মূল খেয়ে নেয়। এসবই একেবারে ভ্রান্ত ধারণা। এ পর্যন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক সুধাংশু পাত্র তাঁর “বাংলার বিপন্ন পশু পাখি ও কীটপতঙ্গ” বইতে বেজির কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন— “কথাটার মধ্যে কিছুটা সত্য আছে।” তিনি লিখেছেন যে তিনি দেখেছেন একবার একদল আদিবাসী যারা বিভিন্ন প্রাণী শিকার করে তারা একটা বেজিকে শিকার করতে গিয়ে ফসকে যায় কিন্তু বেজিটার পায়ে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। কয়েকদিন পরে সুধাংশু বাবু দেখেছিলেন তার বাড়ির পেছনের ছাই গাদায় মাথা বাদে পুরো শরীরটা পুঁতে দিয়ে বেজিটা বসে রয়েছে। কাছে যেতে বেজিটা বেরিয়ে না এসে খ্যাঁক খ্যাঁক করছিল। দশ দিন একইভাবে থেকে সুস্থ হয়ে তারপর সে চলে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!

বেজিরা বিষধর সাপ নিধন করে এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ইঁদুর খেয়ে যেমন উপকার করে তেমনই পরিবেশের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সুন্দরবনের এই সুন্দর প্রাণীটি সুন্দরবনের বেশিরভাগ অঞ্চলে আপাতত যথেষ্ট সংখ্যায় দেখা গেলেও এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে এরা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। যেমন ঘোড়ামারা দ্বীপে স্থলজ সাপ যেমন নেই, তেমনই একটাও বেজি নেই। বাসস্থান ধ্বংস, খাদ্যাভাব এবং কৃষিকাজে রাসায়নিক কীটনাশকের বহুল ব্যবহার ওদেরকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। অনেক জায়গায় দেখেছি কেউ কেউ বেজির বাচ্চাকে পোষ মানায়। পোষা বেজি দিয়ে বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব কমানো সম্ভব।
কলকাতায় বৃষ্টি

বেজির ছানারা। ছবি : লেখক।

২০০২ সালের আগে ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনে বেজি শিডিউল-IV তালিকাভুক্ত ছিল। অর্থাত এদের বিপন্নতা ছিল খুবই কম। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, আমাদের দাড়ি কাটার সেভিং ব্রাশ এবং আঁকার জন্য ব্যবহৃত তুলি বেজির লোম দিয়ে তৈরি করা হয়। আর ঠিক এই কারণে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় প্রচুর পরিমাণে বেজি হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালে উত্তরপ্রদেশের বনদপ্তর এবং ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো অনুসন্ধান চালিয়ে ১৫৫ কেজি বেজির লোম বাজেয়াপ্ত করেছিল। এই পরিমাণ লোম পেতে অন্তত ৩ হাজার বেজিকে হত্যা করতে হয়েছিল। তাই ২০০২ সাল থেকে বেজিকে সংরক্ষণ তালিকায় শিডিউল-II –তে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই আইনে বেজিকে হত্যা করা, বাড়িতে পোষা কিংবা এর দেহাংশ ব্যবহার করা আইনত দন্ডনীয়। ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাবাস হতে পারে। সুন্দরবনে আপাতত বেজিরা বিপন্ন নয়, কিন্তু আগামীতে আমাদের সচেতনতাই পারবে বেজিদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content