শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

সুন্দরবনের জঙ্গলে বানরের বাচ্চাসহ মা। ছবি : সংগৃহীত।

ছোট থেকে সুন্দরবনের জঙ্গলে যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতল হরি্ বুনো শূকর আর বানরের অবস্থান তা শুধু আমি নয়, সুন্দরবন অঞ্চলের বাইরে বসবাসকারী মানুষও জানেন। সুন্দরবনে জঙ্গলের রাজা ‘দক্ষিণ রায়ের’ প্রধান খাদ্য চিতল হরিণ হলেও অন্যতম প্রধান শিকার হল বুনো শূকর এবং বানর। চিতল হরিণের সাথে সুন্দরবনের বানরদের সখ্যতার কথাও সুন্দরবন এলাকায় বহুচর্চিত। বানররা যেহেতু শাখাবাসী তাই খাবার সংগ্রহ করতে করতে পাতা, ফল, কচি শাখা গাছ থেকে ছিঁড়ে হরিণদের জন্য নীচে ফেলে দেয়।
সুন্দরবন অঞ্চলে যেহেতু নিয়মিত জোয়ার ভাঁটা খেলে এবং মাটি অত্যন্ত লবণাক্ত তাই হরিণের খাদ্য উপযোগী ঘাসের অভাব রয়েছে। সুন্দরবনের চিতল হরিণকে লবণাম্বু গুল্ম ও বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদের পাতা প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। বানরদের ফেলে দেওয়া পাতা, শাখা ও ফল খেয়ে হরিণরা তাদের উদরপূর্তি করে। তাই গাছের ওপরে বানরের দল আর গাছের নিচে চিতল হরিণের দল দেখতে পাওয়ার দৃশ্য সুন্দরবনের জঙ্গলে খুবই সুলভ। শুধু তাই নয়, বানররা গাছের উপর থেকে দূরে দক্ষিণরায়কে দেখতে পেলেই সর্তকতাসূচক শব্দ করে হরিণদের বিপদ সম্পর্কে সজাগ করে দেয়। অন্যদিকে হরিণদের ঘ্রাণশক্তি বানরদের থেকে অনেক বেশি হওয়ায় তারাও যদি বানরদের কোনও বিপদের গন্ধ পায় অস্বাভাবিক শব্দ সৃষ্টি করে বা অঙ্গভঙ্গি করে আগাম তাদের সতর্ক করে দেয়। সুন্দরবনের জঙ্গলে চিতল হরিণ আর বানরদের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেমন সুবিদিত তেমনই বহুচর্চিত।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৫: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৭: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — পাতিশিয়াল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫২: শিকার এবং শিকারী

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯৫ : রাজনীতির দাবার ছকে ত্যাগের মহাকাব্য: এক অন্য পঞ্চতন্ত্রের খোঁজে

সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকা ছাড়া এই বানরদের লোকালয়ে দেখতে পাওয়া মুশকিল। তবে জঙ্গল থেকে ধরে আনা লালমুখো এই বানরদের ছোট থেকে পাড়ায় পাড়ায় খেলা দেখাতে দেখেছি। মানুষের পূর্বপুরুষ তো, তাই সহজেই মানুষের আদব-কায়দা শিখে নিতে পারে। বুঝে নিতে পারে মানুষের নির্দেশ। আর শৈশব ও কৈশোরে তাই পাড়ায় বানরওয়ালার ডুগডুগি বাজানোর শব্দ শুনলেই বাচ্চার দলকে দৌড়োতে দেখেছি। এখন অবশ্য সে দৃশ্য আর দেখা যায় না। যে কথা বলছিলাম, ওদের আচার-আচরণও মানুষের আচার-আচরণের সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। আর বুদ্ধি তো রীতিমতো তাক লাগানোর মতো।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৭: অরণ্যজাতক : বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

সুন্দরবন ভ্রমণকালে ব্যক্তিগতভাবে আমার নজরে না এলেও বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনের মাধ্যমে জানতে পেরেছি সুন্দরবনের বানরদের এক অদ্ভুত আচরণের কথা। তাঁদের তোলা ছবিও দেখেছি, ফলে অবিশ্বাসের কোনও কারণ নেই। সুন্দরবনের এই লালমুখো বানররা নদী, খাঁড়ি ইত্যাদির তীরে এসে কাদায় নেমে রীতিমতো কাদার ভেতর থেকে কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুক ধরে জলে ধুয়ে তারপর খায়। এমনকি অল্প জল যেখানে আটকে গিয়েছে এবং তার মধ্যে কোনও মাছ রয়েছে দেখতে পেলে হাত দিয়ে সেই জল সেচে সেখান থেকে মাছ ধরে খায়। এমনকি এই দৃশ্যও দেখা গেছে যে নদীর ধারে ম্যানগ্রোভের কচি শ্বাসমূল তুলেও খাচ্ছে। তবে বনবিভাগের নিশি-ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বানর মধ্যরাতে খাবারের খোঁজে বেরিয়েছে যা তাদের স্বভাববিরুদ্ধ। কেন? দিনে যদি তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য থাকে এবং বিপদের সম্ভাবনা না থাকে তাহলে তো তাদের রাতে বেরোন উচিত নয়। তাই না?
কলকাতায় বৃষ্টি

মধ্যরাতে খাবারের খোঁজে বানর। ছবি : সংগৃহীত।

সুন্দরবনের বানরদের আরও এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল এরা রীতিমতো সাঁতার দিতে সক্ষম। এই তথ্যটি বহুদিন আমার কাছে অজানা ছিল। কিন্তু বছর দুয়েক আগে আমার এক পরিচিত ব্যক্তি সুন্দরবন ভ্রমণ করতে গিয়ে মাতলা নদীতে জোয়ারের সময় একটা বানরকে সাঁতরে নদী পারাপার করতে দেখেন এবং সেই দৃশ্য তিনি ক্যামেরাবন্দিও করেন। বানররা দলবদ্ধ প্রাণী ফলে একটা বানরকে সাঁতরে নদী পার হতে দেখা বেশ বিস্ময়কর ঘটনা। কী কারণে তার এই সন্তরণ? সে কি দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল? অন্যরা ভাঁটার সময় ফিরে এলেও সে ফিরতে পারেনি? নাকি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় সেই বানরটি একাই একদিকের জঙ্গল থেকে আরেক দিকের জঙ্গলে যাচ্ছিল সাঁতরে তা অবশ্য আমার কাছে রহস্যময়। নদীতে বা খাঁড়িতে যখন খুব সামান্য জল থাকে তখন একদিকের জঙ্গল থেকে অন্য দিকের জঙ্গলে খাবারের সন্ধানে বানরের দলের পাড়ি দেওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ভরা জোয়ারে একটা বানরের সাঁতরে নদী পার হওয়া অস্বাভাবিকই বটে। আসলে সুন্দরবনের জীবজন্তুদের কাণ্ডকারখানা বা আচার-আচরণ আমরা কতটুকুইবা জানি! তবে জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা সুন্দরবনের স্বাভাবিক ঘটনা হওয়ায় ওদের বেশ দক্ষতার সাথে সাঁতার দেওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয়েছে। অবশ্য সাঁতার দেওয়ার উপযোগী কোনও অঙ্গ ওদের নেই। মানুষকে সাঁতার শিখতে হলেও সুন্দরবনের বানরদের শিখতে হয় না, জন্মগতভাবেই সাঁতার জানে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

সুন্দরবনের বানরের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Macaca mulatta’। ইংরেজি নাম ‘Rhesus Macaque’। সুন্দরবন ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ায় এই প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে। তবে স্বভাব ও আচরণে অন্যদের থেকে সুন্দরবনের এই বানরদের অনন্যতা রয়েছে। পূর্ণবয়স্ক বানর লেজ বাদে লম্বায় হয় ৪৫ থেকে ৬৪ সেন্টিমিটার। তবে এদের লেজের দৈর্ঘ্য কিন্তু অন্যান্য বানরের প্রজাতির তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট, মাত্র ২০-৩০ সেন্টিমিটার। অবশ্য স্ত্রী বানরদের তুলনায় পুরুষ বানরের আকার বড় হয়। একটা পুরুষের ওজন যেখানে হয় ৬ থেকে ১১ কেজি সেখানে একটা স্ত্রী বানরের ওজন হয় চার থেকে ছয় কেজি। এদের সারা গায়ে লোমে ঢাকা থাকলেও মুখমণ্ডলে কোন লোম নেই। মাথা ঘাড় ও পিঠের দিকের লোমের রং পাঁশুটে বাদামি বা হালকা বাদামি হলেও মুখমণ্ডলের ত্বকের রং গোলাপি বা হলদেটে গোলাপি। দেহের নিচের দিকের লোমের রং অবশ্য কিছুটা ফ্যাকাশে। আর লেজটা অন্যান্য প্রজাতির বানরের মতো লম্বা ও সোজা নয় বরং ছোট এবং সামান্য বাঁকা। এদের দেহ যেমন বলিষ্ঠ তেমনই বলিষ্ঠ চারটে পা। এই কারণে এরা ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গলের মধ্যে যেমন এক গাছ থেকে আরেক গাছে অনায়াসে লাফ দিতে পারে তেমনি মাটিতে বা নদীর ধারে স্বচ্ছন্দে দৌড়োদৌড়ি করতে পারে, মাটি খুঁড়ে, কাদা তুলে কিংবা জল সরিয়ে খাবার দাবার সংগ্রহ করতে পারে, শক্ত ফলের খোসা ছাড়াতে পারে, এমনকি গাছের শাখা দিয়ে যন্ত্র বানিয়ে তা ব্যবহার করতে পারে। বিজ্ঞানীরা দেহ ও মস্তিষ্কের অনুপাত তুলনা করে দেখেছেন সুন্দরবনের বানরের এই প্রজাতির মস্তিষ্কের আয়তন অন্যান্য বানর প্রজাতির তুলনায় বেশি। সুতরাং বোঝাই যায় কেন সুন্দরবনের বানররা এত বুদ্ধিমান।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮২ : সখের চোর

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

সুন্দরবনের বানরদের খাবারের ব্যাপারে আগেই বলেছি। পৃথিবীর সব প্রজাতির বানরেরই প্রধান খাদ্য হল উদ্ভিজ্জ উপাদান যেমন কচি পাতা, কাণ্ডের আগা, নরম মূল, কন্দ, ফল, বীজ এবং নরম বাকল। এরা নদী ও খাঁড়ির তীরবর্তী ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ফল বেশি পছন্দ করে কারণ এইসব গাছের ফল ওদের কাছে সুস্বাদু ও বেশি পুষ্টিকর। তাই মনে হয় গভীর অরণ্যের চেয়ে নদী ও খাঁড়ির তীরবর্তী এলাকায় বানরদের বেশি দেখা যায়। তবে উদ্ভিজ্জ খাদ্য ছাড়া সুন্দরবনের বানরদের প্রধান খাদ্য তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হল কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুক, ঝিনুক, মাছ, সরীসৃপ, জলজ পোকামাকড়, জলজ পাখি ও পাখির ডিম। অল্প জল থেকে বা নদীর কিনারা থেকে হাত দিয়ে মাছ ধরে কিংবা কাদা ও গর্তের মধ্যে আঙুল বা হাত ঢুকিয়ে কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি ইত্যাদি তুলে আনা ও তা জলে ধুয়ে খাওয়ার দৃশ্য দেখলে মানুষের সাথে খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু খেলেই তো হল না, সেই খাবার হজমও করা চাই। বিজ্ঞানীদের মতে, সুন্দরবনের বানরদের বিচিত্র সব খাদ্য হজম করার বিরল ক্ষমতা রয়েছে। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, এরা নদীর ধারে সারা গায়ে কাদা মেখে কখনো কখনো এমনভাবে থাকে যে দূর থেকে বোঝা মুশকিল হয়। এভাবে এরা অনেক সময় বাঘের দৃষ্টি এড়াতে সক্ষম হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

সুন্দরবনের শাখামৃগ। ছবি : সংগৃহীত।

সুন্দরবনের জঙ্গলে প্রাইমেট বর্গভুক্ত একমাত্র স্তন্যপায়ী হল এই বানর। যদিও এরা দল বেঁধে থাকে তবে একেকটি গোষ্ঠীতে একটি স্ত্রী বানর একাধিক পুরুষ বানরের সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হয়। দুই থেকে চার বছরের ব্যবধানে স্ত্রী বানর একটি করে বাচ্চার জন্ম দেয়। চার বছর বয়স হলে বাচ্চারা যৌন ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে শুধু মানুষ নয় বন্য জীবজন্তুদের জীবনধারণ অত্যন্ত প্রতিকূল। জঙ্গলের মধ্যে প্রতিকূলতা বেশি থাকায় বাচ্চাদের নিয়ে বানরের পরিবার সাধারণত মাটিতে নামে না, বেশিরভাগ সময় গাছের শাখাতেই কাটায়।

এ প্রসঙ্গে আইইউসিএন জানাচ্ছে, সুন্দরবনের বানরদের অস্তিত্ব আপাতত সংকটজনক নয়। তবে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভের সংখ্যা যেভাবে কমছে তাতে এই বানরদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে কতক্ষণ? আর তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মৃগদের সংখ্যা তো দিন দিন ভীষণ কমে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে শাখামৃগ অর্থাৎ বানররাও কি খুব সুখে আছে সুন্দরবনে? —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content