
মায়ের সঙ্গে পাতিশিয়াল ছানা। ছবি : সংগৃহীত।
অনেক লেখাতেই বলেছি যে আমার শৈশবে আমাদের বাড়ির সামনে একটা বেশ গভীর ও চওড়া খাল ছিল যেখানে নিয়মিত জোয়ার ভাটা খেলত এবং নৌকো চলাচল করত। খালের এপারে অর্থাৎ আমাদের বাড়ির দিকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে ছিল একটা বিশাল ভাগাড়। আর খালের ওপারে কিছুটা পূর্ব দিকে অর্থাৎ ভাগাড়ের ঠিক বিপরীতে ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা একটা শ্মশান। ছোটবেলা থেকেই ঠাকুমার মুখে সন্ধ্যেবেলা ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী, লালকমল নীলকমল, রামায়ণ, মহাভারতের গল্প শোনার সাথে যথেষ্ট পরিমাণে ভূত, পেত্নী, শাকচুন্নি, ব্রহ্মদৈত্য, বাঘ, বাঘরোল, খাটাস, শেয়াল ইত্যাদির গল্প শুনতাম। শেয়ালের গল্প বলার সময় ঠাকুমা কখনও কখনও বলত বড় বড় শেয়াল রাত্রিবেলা শ্মশানের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে খাল সাঁতরে এপারে ভাগাড়ে এসে মরা গোরুর মাংস খেত। শেয়াল কিন্তু আমি আশৈশব যথেষ্ট দেখেছি, কিন্তু কোনও শেয়ালকে কখনও খালে সাঁতার দিতে কিংবা ভাগাড়ে মরা গোরুর মাংস খেতে দেখিনি।
আসলে আমি খ্যাঁকশিয়াল ছাড়া অন্য কোনও শিয়াল দেখিনি। তাছাড়া খ্যাঁকশিয়ালেরা আকারে বেশ ছোটখাট। ঠাকুমার মুখে কিন্তু শুনতাম গায়ের রং অনেকটা হলদেটে আর আকারে বড়। রাতে নাকি এরা দল বেঁধে খুব চিৎকার করত। মেজো জেঠুর কাছেও মাঝে মাঝে এমন গল্প শুনতাম। মেজো জেঠু বলত ফটিকপুর গ্রামের পূর্ব দিকে চুনপিড়ি নদীর ওপারে চুনপিড়ি জঙ্গল থেকে নাকি রাত্রিবেলায় বড় বড় শেয়ালরা নদী পার হয়ে গ্রামে এসে হাঁস-মুরগি, ছাগল ও ভেড়ার বাচ্চা, এমনকি সদ্য জন্মানো বাছুরকে গোয়াল থেকে টেনে নিয়ে পালাত। যেহেতু এসব দৃশ্য আমি নিজের চোখে কখনও দেখিনি, তাই পরবর্তীকালে এই গল্পগুলো মাথা থেকে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ যে হারায়নি তা মালুম হল ৪-৫ বছর আগে সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত একটি সংবাদ দেখে। সংবাদটা ছিল এরকম যে একদল পর্যটক নাকি সুন্দরবনে নেকড়ে দেখেছে। আর সেই নেকড়ের ছবিও তোলা হয়েছে যে ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে সংবাদপত্র থেকে সমাজ মাধ্যমে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৪ : যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৫: আকাশ এখনও মেঘলা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২১ : পরশপাথর— ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে…
প্রচার যা-ই হোক সুন্দরবনে কস্মিন কালেও নেকড়ে ছিল না আর থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাহলে ছবি? ছবি দেখে মনে হল হয় এটি দেশি ও বিদেশি কুকুরের প্রজননে জন্মানো কোনও সংকর কুকুর কিংবা শৈশবে ঠাকুমা ও মেজো জেঠুর মুখে শোনা সেই শিয়াল। সুতরাং খোঁজখবর এবং পড়াশুনা করতেই হল এ ব্যাপারে। আমার নিজের ধারণা, ওটি ছিল একটি পাতিশিয়াল। ইংরেজিতে ‘Golden jackal’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Canis aureus’। সুন্দরবনের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী হল এই পাতিশিয়াল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
পাতিশিয়ালরা সত্যিই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের জন্য চমৎকারভাবে অভিযোজিত প্রাণী। আর তাই এরা ছোট নদী, খাঁড়ি, খাল ইত্যাদিতে দিব্যি সাঁতার কেটে এপার ওপার হতে পারে। কাছাকাছি জঙ্গল থাকলে রাতে নদী বা খাল সাঁতরে রাতে কাছাকাছি গ্রামের মধ্যে এরা হানা দিতে পারে। জঙ্গলের মধ্যে যেমন বাঘে খাওয়া মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ এরা পরমানন্দে খায় একইভাবে গ্রামাঞ্চলে হানা দিয়ে ভাগাড় থেকে মৃত পশুর মাংসও খায়। তবে জঙ্গলের মধ্যে যেমন মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন পাখি, সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, ছুঁচো, পোকামাকড় ইত্যাদি শিকার করে তেমনি জঙ্গলে খাদ্যাভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ও কষ্ট স্বীকার করে গ্রামের মধ্যে হাঁস-মুরগি শিকার করতে আসে। কখনও কখনও এদের মানুষের খাবারের উচ্ছিষ্ট খেতেও দেখা গেছে। ঠাকুমার মুখেই শুনেছিলাম যে গ্রামে কোনও বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান থাকলে শিয়ালের দল রাত্রিবেলা ফেলে দেওয়া এঁটো কাঁটা খেতে আসত। আবার এও শুনেছি যে এরা নাকি কালোজাম খেতে খুব পছন্দ করে। জঙ্গলের মধ্যে কোনও দুর্বল বা অসুস্থ হরিণ বা শুকরকে দল বেঁধে আক্রমণ করে মেরে ফেলে তার মাংস খেতেও দেখা গিয়েছে।

সন্ত্রস্ত এক পাতিশিয়াল। ছবি : সংগৃহীত।
পাতিশিয়ালরা যে খ্যাঁকশিয়ালের থেকে আকারে বড় তা আগেই বলেছি। চেহারায় এরা প্রায় নেকড়ের মতোই। শক্তপোক্ত ঋজু দেহ। মুখের সামনের দিকটা বেশ সূচালো। ওজন ৮ থেকে ১৬ কেজি আর কান পর্যন্ত উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। যদিও পুরুষদের থেকে স্ত্রী পাতিশিয়ালদের আকার সামান্য বড় হয়। লোম সাধারণত ছোট ও কর্কশ। লোমের রঙ সাধারণত হলদেটে ধূসর বা হালকা সোনালি, আর তার মধ্যে পিঠের দিকে সামান্য কালচে ছিটে দেখা যেতে পারে। এই হালকা সোনালি রঙের জন্যই ইংরেজিতে নাম হয়েছে Golden jackal। চোখের নিচে দুপাশে গালে একটা করে ছোট কালো ছোপ থাকে। এদের লোমের রঙ কিন্তু সারা বছর একই রকম থাকে না। পিঠের কালচে ছিট বর্ষাকালে কিছুটা গাঢ় হয়। আর খ্যাঁকশিয়ালদের সাথে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে লেজের দৈর্ঘ্যে। দেহের তুলনায় লেজ অনেকটাই ছোট, মাত্র ২০-৩০ সেন্টিমিটার লম্বা। কান দুটো মাথার ওপর খাড়াভাবে থাকে আর তিনকোণা। কানের ভেতরের দিকের লোমের রঙ সাদা। গলা, বুক আর পেটের রঙও অনেকটা ফ্যাকাশে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫২: শিকার এবং শিকারী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
আগেই বলেছি এরা সুন্দরবনের জঙ্গলের বাসিন্দা। লোকালয়ে কখনওই থাকে না। তবে লোকালয় সংলগ্ন জঙ্গল এদের বেশি পছন্দ। সাধারণত পরিবারভিত্তিক দলে এরা থাকে। রাতে এদের সমবেতভাবে ‘উয়ো উয়ো উয়ো, হু হু হু, আউউউউউউ’ শব্দ করতে শোনা যায়। সাধারণতঃ নিজের এলাকা চিহ্নিত করতে একদল এমন শব্দ করে আর এক দলকে জানান দেয়। চিৎকার করার সময় ওরা মুখটাকে নেকড়েদের মতো আকাশের দিকে তুলে ধরে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮১ : খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
একটা স্ত্রী ও পুরুষ পাতিশিয়ালের জোড় প্রায় সারাজীবন স্থায়ী হয়। নদী বা খালের ধারে বড়সড় গর্তের মধ্যে বাচ্চা জন্মানোর আগে এরা বাসা বানায়। স্ত্রী পাতিশেয়াল গর্ত খোঁড়ে বা অন্য কোনও প্রাণীর ফেলে আসা গর্তকে ব্যবহার করে। সেই গর্তের মধ্যে স্ত্রী পাতিশিয়াল সাধারণত একসঙ্গে ২-৪টি বাচ্চার জন্ম দেয়। জন্মের সময় বাচ্চাদের চোখ ফোটে না। জন্মের ১০ দিন পর চোখ ফোটে। প্রথম প্রথম বাচ্চারা কেবল মায়ের দুধের উপর নির্ভরশীল হলেও কিছুদিন পর থেকে মা ও বাবা পাতিশিয়াল বাচ্চাকে অর্ধপাচিত খাবার উগরে দিয়ে খাওয়ায়। কখনও কখনও বাচ্চাদের দাদা দিদিরাও তাদের ভাই-বোনদের লালনপালনে মা-বাবার সাথে সাহায্য করে। সাধারণত তিন মাস বয়স হলে বাচ্চারা শক্ত খাবার খেতে শেখে। আট মাস বয়স হলেই এরা মায়ের দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়। আর প্রায় ১১ মাস বয়সে এরা প্রজননে সক্ষম হয়ে ওঠে।

পাতিশিয়ালের ছানারা। ছবি : সংগৃহীত।
সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে পাতিশিয়ালরা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। কিন্তু সুন্দরবনে ক্রমাগত মনুষ্যবসতি বিস্তার এবং অরণ্য সংকোচন পাতিশিয়ালদের বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। জঙ্গলে খাদ্যাভাবও অন্যতম কারণ। বাঘ তার শিকার করা প্রাণীর মাংস খাওয়ার পর সুন্দরবনের জঙ্গলে এরাই হল প্রধান উচ্ছিষ্টভোগী। বাঘের সংখ্যা হ্রাসও তাই এই শিয়ালদের খাদ্যাভাবকে প্রকট করে দিয়েছে। সম্প্রতি পর্যটকরা সুন্দরবনের জঙ্গলে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি পাতিশিয়াল দেখেছেন বলে জানা গিয়েছে। নিশি ক্যামেরাতেও ধরা পড়েছে এদের অস্তিত্ব ও অবস্থান। তবে সুন্দরবনের এই আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীটি কতদিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা ভবিষ্যতই জানে। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















