
বিশু পালের মেয়ের সঙ্গে তাঁর যৌথব্যবসা ছিল। স্ত্রী আগেই মারা গিয়েছে। তাই মেয়ের নামটা ছিল। বিশুবাবুও কিছুদিন আগে চলে গেলেন। মেয়েই এখন খাতাকলমে গ্যাস এজেন্সির মালিক। সে ব্যবসার কিছুই বোঝে না। মাঝে মাঝে বাবার পিঠ উঁচু গদিওলা চেয়ারটায় বসে। দিয়ার মায়ের মাইনে বাড়েনি। তবে চাকরিটা আছে। মেয়ের স্বামী বকলমে মালিক! তার প্রতাপ প্রতিপত্তি বেশি।
দিয়া ফেসবুক ইনস্টা টেলিগ্রাম ঘেঁটেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আধুনিক ভীষ্মের খোঁজ করেছে। পায়নি। না, নাম গোপন করে সোশ্যাল মিডিয়া করবেন না। অতনু তেমন মানুষ নন। লোকটার মধ্যে রাগ আছে, কিছুটা ঔদ্ধত্য আছে! বন্ধুবিদ্বেষী নাকি নারীবিদ্বেষী। কিন্তু দিয়াকে সুপারিশ করেছে! আশ্চর্য!
তবে কোন ফোন করেননি। রবীন চ্যাটার্জি মানুষটার মধ্যে ফিল্টার নেই। গড়গড় করে নিজের স্টার্ট আপ গড়ার ইতিহাসের মতোই অতনু সেনের ফোনের কথা নিশ্চয়ই জানাতেন দিয়াকে। অতনু সেনকে একটা ধন্যবাদ জানানো উচিত। ফোন নাম্বার চাইবে? কিন্তু মিঃ চ্যাটার্জি যদি কিছু মনে করেন?
তবে কোন ফোন করেননি। রবীন চ্যাটার্জি মানুষটার মধ্যে ফিল্টার নেই। গড়গড় করে নিজের স্টার্ট আপ গড়ার ইতিহাসের মতোই অতনু সেনের ফোনের কথা নিশ্চয়ই জানাতেন দিয়াকে। অতনু সেনকে একটা ধন্যবাদ জানানো উচিত। ফোন নাম্বার চাইবে? কিন্তু মিঃ চ্যাটার্জি যদি কিছু মনে করেন?
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৫: আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৭: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — পাতিশিয়াল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫২: শিকার এবং শিকারী

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯৫ : রাজনীতির দাবার ছকে ত্যাগের মহাকাব্য: এক অন্য পঞ্চতন্ত্রের খোঁজে
অতনু সেন সম্বন্ধে আর কোনও উৎসাহ দেখাবে না। অকারণে রবীন চ্যাটার্জির মতো মানুষের মনের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে এই চাকরিতে টিকে থাকাটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দিয়ার হঠাৎ মনে হল সে এসব নিয়ে বড্ড বেশি ভাবছে। দিয়া আর অতনু সেনের পিছনে সময় দেবে না। ছকেবাঁধা প্রেমের ছবির চিত্রনাট্যের শর্ত। দিয়া আর অতনুর প্রেমে পড়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তার কোনও সম্ভাবনা নেই। সেক্টর ফাইভেই রয়েছেন। ঈশ্বর চাইলে দেখা হবে। কৃতজ্ঞতা তখন জানাবে। ঈশ্বর না চাইলে তো এ চাকরিটাই হোত না ! কখনও দেখা হবে। তখন ‘থ্যাংক ইউ’ বলা যাবে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৭: অরণ্যজাতক : বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও
শনিবার দুপুর তিনটে। অতনু সেনের গাড়িটা চিংড়িহাটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছি। ‘মা’ ফ্লাইওভারের টপকে যেতে দেখলাম। রবীন্দ্রসদন ফেলে ফ্লাইওভার থেকে নেমে মাটি ছুঁলো। পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের আগের বাঁ-হাতি রাস্তায় ঢুকল। না, সেই রাস্তার শেষে গিয়ে গাড়ির দেখা নেই। গাড়িটা কেন দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রেসিডেন্সি জেলের চত্বরে? সেটা এখন আমরা জানি।
—দাড়িটা কেন কাটোনি বাবা?
দুলাল সেন চুপ করে থাকেন। উত্তর দেন না। জালে ওপারে দাড়িগোঁফে ঢাকা একটা মুখ। শূন্যদৃষ্টি। অতনুকে ছাড়িয়ে যেন পিছনের ফ্যাকাসে সাদা রঙের দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। রংচটা গরাদ ছুঁয়ে আছে আঙ্গুল! অতনুর প্রশ্নে চোখে মুখে বিকার নেই। গরাদ ছোঁয়া আঙুল যেন অস্থির হল। দুলাল সেন অতনুর বাবা। খুনের আসামী।
—কেটে ফেলবে! সামনের সপ্তাহে এসে যেন দেখি।
অতনু প্রতি শনিবার আসে। প্রতি শনিবার তার দুটো কাজ। বাবার সঙ্গে দেখা করা। আর চুঁচুড়ার চার্চে যাওয়া। সেখানে ফাদার স্যামুয়েল আছেন। দুলাল উত্তর দিচ্ছেন না দেখে অতনু বলে ওঠে
—কি গো?
—হ্যাঁ !
—দাড়িটা!
—হুঁ!
—ব্লাড প্রেশার ঠিক আছে?
—হুঁ!
—মাথার যন্ত্রণা?
—কম!
— রাতে এখন ঘুম হচ্ছে!
—হুঁ!
—আর কোন বই লাগবে?
—রূপকথার বই! ঠাকুমার ঝুলি এনে দিবি!
—দাড়িটা কেন কাটোনি বাবা?
দুলাল সেন চুপ করে থাকেন। উত্তর দেন না। জালে ওপারে দাড়িগোঁফে ঢাকা একটা মুখ। শূন্যদৃষ্টি। অতনুকে ছাড়িয়ে যেন পিছনের ফ্যাকাসে সাদা রঙের দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। রংচটা গরাদ ছুঁয়ে আছে আঙ্গুল! অতনুর প্রশ্নে চোখে মুখে বিকার নেই। গরাদ ছোঁয়া আঙুল যেন অস্থির হল। দুলাল সেন অতনুর বাবা। খুনের আসামী।
—কেটে ফেলবে! সামনের সপ্তাহে এসে যেন দেখি।
অতনু প্রতি শনিবার আসে। প্রতি শনিবার তার দুটো কাজ। বাবার সঙ্গে দেখা করা। আর চুঁচুড়ার চার্চে যাওয়া। সেখানে ফাদার স্যামুয়েল আছেন। দুলাল উত্তর দিচ্ছেন না দেখে অতনু বলে ওঠে
—কি গো?
—হ্যাঁ !
—দাড়িটা!
—হুঁ!
—ব্লাড প্রেশার ঠিক আছে?
—হুঁ!
—মাথার যন্ত্রণা?
—কম!
— রাতে এখন ঘুম হচ্ছে!
—হুঁ!
—আর কোন বই লাগবে?
—রূপকথার বই! ঠাকুমার ঝুলি এনে দিবি!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
অতনুর হঠাৎ খুব কষ্ট লাগে। ও জানে বাবা জেলে তার ইনমেটদের সঙ্গে কখনও কথা বলেন না। সারাদিন হাতের কাজ করেন। ওয়ার্কশপে টেবিল চেয়ার বানান। জুটের পুতুল তৈরি করেন। আর বই পড়েন রাশি রাশি বই। ধর্মকথা বা ভারী জ্ঞানের বই নয়। হাল্কা রম্যরচনা লীলা মজুমদার, সুকুমার রায়। রাজশেখর বসু, শিবরাম চক্রবর্তী। তারাপদ রায় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় আর দেশবিদেশের রূপকথার গল্প। বাবার সঙ্গে দেখা করার সময় অতনু নিজের আবেগ চেপে রাখে। একেবারে স্বাভাবিক
কথাবার্তা বলে। জেলে নয় যেন অন্য কোথাও বাবা আছেন। ছেলে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
—ফাদার স্যামুয়েল কেমন আছেন?
বাবার প্রশ্নে অতনুর ভাবনা সুতো ছিঁড়ে যায়।
—ভালো !
—একটা চোখে ক্যাটার্যা ক্ট অপারেশন হয়েছে, অন্যটার এখন দরকার নেই!
—দেখতে কোনও অসুবিধে নেই?
—না পাওয়ার কারেকশন হয়ে গিয়েছে!
—তাহলে এবার আগের থেকে স্পষ্ট দেখবেন।
কথাবার্তা বলে। জেলে নয় যেন অন্য কোথাও বাবা আছেন। ছেলে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
—ফাদার স্যামুয়েল কেমন আছেন?
বাবার প্রশ্নে অতনুর ভাবনা সুতো ছিঁড়ে যায়।
—ভালো !
—একটা চোখে ক্যাটার্যা ক্ট অপারেশন হয়েছে, অন্যটার এখন দরকার নেই!
—দেখতে কোনও অসুবিধে নেই?
—না পাওয়ার কারেকশন হয়ে গিয়েছে!
—তাহলে এবার আগের থেকে স্পষ্ট দেখবেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮২ : সখের চোর

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
বাবা কি জীবনের আশপাশটা স্পষ্ট দেখতে পাননি! তাই এখন অন্ধকারকে বেছে নিতে হয়েছে। ঘণ্টা বাজল। ঘণ্টা বাজিয়ে সময় শেষ হয়। পরীক্ষার সময়। হাসপাতালে আত্মীয়ের পাশে বসার সময়। পাগলা গারদে। জেলখানায়। আলোয় থাকা মানুষের সাথে অন্ধকারজীবীদের দেখা হওয়ার সময়। কিন্তু জীবন থেমে গেলে? সব ঘণ্টা সব কোলাহল নিঃশব্দ! জীবনরেখার আর কোনও উথাল-পাথাল নেই। সে তখন ধীর স্থির শান্ত। অজস্র বিন্দুতে বয়ে যাওয়া। অবিরাম। অবিরল।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

















