রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
বোধগম্য শব্দে বললে ক্রৌঞ্চজাতক। ক্রৌঞ্চের কাহিনি মনে পড়ে? ঋষি বাল্মীকির আদিকাব্যে শোকসঞ্জাত শ্লোক জেগে উঠেছিল সঙ্গমরত ক্রৌঞ্চযুগলের ওপর নেমে আসা আকস্মিক অনভিপ্রেত মৃত্যুকে দেখে। ক্রৌঞ্চের প্রসঙ্গ থাকলে তার সঙ্গে জুড়ে থাকে যেন মৃত্যুর আখ্যান। আজকের জাতকমালার গল্পটিও এক হতভাগ্য ক্রৌঞ্চীর দগ্ধ মাতৃহৃদয় থেকে উদ্গত শোক ও উত্তরণের ভাষ্য।

তখন বোধিসত্ত্ব বারাণসীরাজ। তিনি ধার্মিক ও নিরপেক্ষ। অর্থাৎ রাজকীয় কল্যাণগুণে ভূষিত। এই ক্রৌঞ্চীটি রাজার দৌত্যকার্য সম্পাদন করতো। রাজার পত্রবার্তা নিয়ে উড়ে যেত অন্য রাজ্যের রাজার কাছে। তাই নিজের শাবকদুটিকে রাজভবনে যথাস্থানে রেখেই তাকে যেতে হতো রাজকর্ম, আজকের চাকুরিরতা মায়েদের মতোই। এই অবসরে রাজভবনের বালকের দল বাচ্চাদুটিকে হাতে টিপে মেরে ফেলল। কেন তারা এমন করল, তাদের উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে জাতকমালা নীরব। যুগে যুগে এমনটাই ঘটে চলেছে ধরে নিয়ে এগোনো যাক। কাজ থেকে ফেরে মা ক্রৌঞ্চী। বাচ্চাগুলিকে না পেয়ে বোঝে কী ঘটেছে। জানতে চায়, লোকেও জানিয়ে দেয় যা ঘটেছে।
ক্রৌঞ্চী এরপর থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সেই সুযোগ এসেও যায়। রাজপুরীর পোষা কিন্তু স্বভাব-হিংস্র বাঘটিকে দেখতে বালকরা একদিন বাঘের কাছে গেল। তাদের অনুসরণ করে ক্রৌঞ্চী উপস্থিত হল সেখানে। এই বালকরাই তার শাবকদের হত্যা করেছে, সুতরাং এখন ক্রৌঞ্চী তাদের ঠেলে দিল বাঘের মুখে। হাতের নাগালে সেই ভীষণপ্রকৃতির বাঘ তাদের পেয়ে নিমেষে উদরসাৎ করল। ক্রৌঞ্চীর মনোরথ পূর্ণ হলে সে ঠিক করল এবার হিমালয়ের পানে উড়ে যাবে।

মানুষের রাজ্যে এমন হত্যা সংঘটিত হলে হত্যাকারী পালায় কিংবা ধরা পড়ে অথবা ধরা দেয়। পাখিটি উড়ে যাওয়ার আগে প্রভুকে সবকিছু জানিয়ে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করল। শেষ সাক্ষাৎ এবং এই স্বীকারোক্তির পথেই জাতকমালার কাহিনিটি স্বতন্ত্র হয়ে উঠবে। কী বলেছিল সে রাজ্যের সর্বময় কর্তা, ভালো-মন্দের আশ্রয় প্রভুকে?
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৫: অকৃতজ্ঞ-জাতক : কৃতঘ্ন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৩: খাটাস

প্রণাম করে বলেছিল যে, রাজা! আপনার অনবধানতাতেই শাবকগুলির হত্যা সংঘটিত হয়েছিল। এখন ক্রোধবশত আমিও হত্যাকারী বালকদের প্রাণান্ত ঘটিয়েছি। আপনি অন্নদাতা, কিন্তু আশ্রয়দাতার ক্ষতি করে তার আশ্রয়ে থাকা চলে না। তাই, আমি চললাম।

তাই তো! রাজার পাপেই তো রাজ্য নষ্ট হয়। একথা মনুও অস্বীকার করেননি। ক্রেডিট নেওয়া আর দায় চাপানোর এই জগতে যথার্থ সত্যটি এই যে, রাজা দায় তো অস্বীকার করতে পারেন না।

তবে কি জাতকমালা রাজাকে এবার কাঠগড়ায় তুলে বিচারপতির বিচারসভা বসাবে? আজ্ঞে না। নাকি, রাজা শোনামাত্র-ই গর্দান নেবেন অবিমৃষ্যকারী তুচ্ছ পাখিটার? তাও না। তবে? রাজার কথাটা শুনে আশ্চর্য হতে হয়। পাপের প্রতিশোধে পাপ সংঘটিত হয়েছে। মৃত্যুর প্রতিশোধে মৃত্যু, প্রতিহিংসা, চোখের বদলে চোখ তো নেওয়া হয়ে গেল। তবে আর শত্রুতার ভাব বাঁচিয়ে রাখার কী অর্থ? অপত্যশোক ভুলে এখানেই থাকো। থেকে যাও।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

ক্রৌঞ্চী এবার যা বলবে, রাজা যে প্রত্যুত্তর দেবেন জাতকমালার কাহিনি সেখানেই পৌঁছে দিতে চেয়েছে এতক্ষণ। ক্রৌঞ্চী মনে করে, যার ক্ষতি হয়, আর যে ক্ষতি করে এই উভয়ের মধ্যে প্রীতিবন্ধন? না, তা হয় না। তাই সে চলে যাবে। এদিকে রাজা মনে করেন যে, এই প্রীতিবন্ধন সম্ভব। সম্ভব, যদি উভয়পক্ষ-ই স্থির, ধীর, শুদ্ধমতি হয়? এ কি সোনার পাথরবাটি নাকি আকাশকুসুম নাকি শশকের মাথায় শৃঙ্গ? হত্যাকারী ক্রুদ্ধ হয়ে হত্যা করবে, তখন তার চিত্তচাঞ্চল্য স্বীকৃত, কিন্তু শত্রুপক্ষের কিংবা হতের স্বজন-সান্নিধ্য এড়িয়ে যেতে চাইলে তখন মনের দোষ? তবে কি সামাজিক লজ্জাটুকুও এখানে অস্বীকৃত? অন্যায়ের প্রতিশোধে সংঘটিত অপরাধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটিও কেন কথা নেই?
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

তবে জাতককাহিনি কী বলতে চায় এখানে? তার আগে, কাহিনির শেষটুকু জানা যাক। রাজা বলবেন, এই হত্যা ও প্রতিহননের পরবর্তী সদ্ভাব-অসদ্ভাবের তত্ত্বে অসদ্ভাব করে তারাই, যারা মূর্খ। আমরা মূর্খ নই, তাই অসদ্ভাব দূরে রেখে মৈত্রীবন্ধনে থেকে যাই এসো। তবে ক্রৌঞ্চী এই প্রস্তাব অস্বীকার করে প্রভুকে প্রণাম করে হিমালয়ের দিকে উড়ে গেল।

পাঠক রাজাকে জ্ঞানী ভাবতে পারেন। ক্রৌঞ্চীকেও প্রাজ্ঞ ভাবতে পারেন। পরবর্তী সংঘাত এড়িয়ে যেতেই হয়তো ক্রৌঞ্চী চলে গেল। পত্রবাহক পাখিটিকে ধরে রাখার জন্য রাজার নীতিবাক্য নেহাত্ কূটনীতিও ভাবা যেতে পারে। রাষ্ট্রশক্তি কিংবা ক্ষমতার আশেপাশে জমে থাকা ঘাত-প্রতিঘাতের বাইরে গিয়েও যদি ভাবা যায় তবে ক্রৌঞ্চীর কাজে ন্যায় কিংবা অন্যায়ের প্রসঙ্গ এসেই পড়বে। কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ এই যে, প্রতিশোধ, হত্যার যৌক্তিকতা ও সহিংস-অহিংসনীতির যাথার্থ্য কিংবা অসাফল্যের চর্বিতচর্বণের বাইরেও একটি ক্ষেত্র থাকতে পারে। সেটি দ্বন্দ্বের উত্তরভাগ, যখন প্রতিহিংসা উপশান্ত, তখন কি আবার পূর্বাবস্থা ফিরে আসে? যুদ্ধং দেহি পার করে করে যুদ্ধশেষে উভয়পক্ষ-ই সমাবস্থাতেই কি এসে পড়ে? এই প্রশ্নের মুখে হত্যার তত্ত্বটি কিছুটা অসার, ক্ষুণ্ণ, নিষ্প্রভ যেন। এত হানাহানি কেন এই তর্কের পথে অহিংসার উপদেশে পৌঁছোয়নি এই কাহিনি। বরং, শোণিততৃষ্ণা মিটে গেলে কী হয়, কী হতে পারে, কী হওয়া উচিত ছিল কিংবা কী কখনোই হয়ে ওঠে না তা এই উভয়পক্ষের মৈত্রীভাবনার মধ্যে নিহিত আছে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

বাঁধা গতের সমাধান নয়, বরং মহত্তর কোনও সম্ভাবনার আলোয় ঘটে যাওয়া পূর্বাপর সকল অন্যায়, প্রতিশোধ, ন্যায় কিংবা জীবনের সার্কাসে রঙচঙে সঙের নেপথ্যে থেকে যাওয়া আঁধার, অসারতা অথবা অশ্রুজলটুকুকে ফিরে দেখার, বুঝে ওঠার সামর্থ্যটুকুই হয়তো বা জাতকমালার এই কাহিনি রচনা করতে চেয়েছে, যেখানে হিংসার পথে ঘনায়মান বিভেদ নয়, জীবনের বৃহত্তর পরিসরে হিংসা-অহিংসা, ভেদ-বিভেদের ওপারেও থেকে যাওয়া অকারণের সুখ, অলক্ষ্য রঙ, দুরধিগম্য আলোর উদ্ভাসটুকুই একমাত্র সত্য।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content