বুধবার ১০ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
মানুষ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বজগতের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার কথা চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। সেখানে একটি ‘টেক্সটের’ সম্ভাবনা থেকে যায়, যথার্থ সাহিত্য থেকে সার্থক চলচ্চিত্রের রূপায়ণে একটি ‘টেক্সটের’ নবতর আরেকটি ‘টেক্সটে’ রূপান্তর ঘটে।

যেমনটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ থেকে ‘চারুলতা’র রূপায়ণে দেখা যায়। আজকের পর্বে চারুলতা ছবির প্রারম্ভিক অংশে চোখ রাখা যাক। মানুষের অন্তর্লোক থেকে বিশ্বপ্রকৃতি পর্যন্ত যে সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার কথা হচ্ছিল, সেখানে টানাপোড়েন, উত্তরণ-অবনমন, সংঘাত-দ্বন্দ্ব, বিয়োগ কিংবা মিলনের নানা ক্ষেত্র থাকে। কাহিনির চলনে থাকে সম-বিষম, দ্রুত-মন্থর গতি। চারুলতার শুরুতেই তাই সেই বিখ্যাত রবীন্দ্রগান, “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে”র হাসি-কান্না হীরা-পান্নার ভালো-মন্দের তাল-লয়-ছন্দের কম্পন। এই শীর্ষসঙ্গীত দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিপাদ্য বিষয়ের ভাবরূপ, যার মূল সুরটি জীবনের উত্থান-পতনের সঙ্গে অন্বিত, যেখানে জীবনের নীড়ে বেজে ওঠা সুরের ধ্বনি অথবা অ-সুর, বেসুর কিংবা নষ্ট সুরের অনুরণন দেখবেন, শুনবেন দর্শক।
তবে কেবল শীর্ষসঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে চলমান নামের তালিকা দেখছেন না দর্শক। দেখছেন একটি যাপনের দৃশ্য, গড়ে ওঠার ছবি।
কী দেখা যায় সেখানে?
কাঠের বড় বেড়িতে টানটান করে প্রস্তুত সাদা কাপড়ের পটে সূচের ওঠা নামা। সূচের ভর করে সুতো বুনে চলে কাপড় ফুঁড়ে ফুঁড়ে। একটি নির্মীয়মান পাতা। বেড়ির কোনায় দুহাত দিয়ে ঘিরে থাকা প্রদীপের শিখার ছন্দে একটি লতা রচিত হচ্ছে যার শাখায় শাখায় তিনটি করে পাতা।

অথবা বলা ভালো, লতাটি পূর্ণ রূপ পেয়ে গেছে প্রায়। সূচিকর্মটির সমাপন আসন্নপ্রায়। সূচ তখন বুনে চলেছে লতার একেবারে অগ্রভাগের তিনটি পাতার মধ্যমপত্রটি, অচিরেই তাও শেষ হয়, শেষ হয় শীর্ষসঙ্গীত। ক্যামেরার চোখ এতক্ষণের “জুম” থেকে বিমুক্ত হয়ে ত্বরিতে দূরে সরে যায়। যার হাতের কাজ, তাকে দেখা যায় একটি সজ্জিত ঘরের মাঝে পালঙ্কে বসে কোনও অলস দুপুরে। কাজ সেরে দাঁতে কেটে কাপড় থেকে সুতো ছিন্ন করে নেয় সে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৮ : অপরাজিত: অপুর প্রত্যাবর্তন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৩: খাটাস

চারুলতা। কোনও এক অলস দুপুরে বসে সময় কাটায় চারুকলার অভ্যাসে। লতার মতো সে ঘিরে আছে ওই প্রদীপ শিখাটিকে। যে লতা চারু, নৈপুণ্যে সজ্জিত, সুন্দর। কিন্তু হাতে ঘেরা প্রদীপ শিখাটির মতো লতা কাকে ঘিরে থাকে? ইংরাজি “B” অক্ষরটিকে। পরিচালক কেবল সঙ্গীতের ব্যঞ্জনাতেই থামেননি, তাকে আরও গভীর, তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট করেছেন এই সূচিকর্মের প্রয়োগে। সহৃদয় তন্নিষ্ঠ দর্শক দেখে সচকিত হন, “B” থাকার অর্থ তার আগে পরে ‘A’ ও ‘C’ র অস্তিত্বের অনুমান। রসজ্ঞ দর্শক “C” কে খুঁজে পাবেন চারুর মাঝে। কাহিনি এগোলে অমলের মাঝে পান ‘A’কে।

‘A’ ও ‘C’ যে ভরকেন্দ্রের দুপাশে থাকে, সেই ‘B’ চারুর স্বামী ভূপতি। এতক্ষণে দর্শকের যাত্রাপথ এ সে পৌঁছয় একটি ত্রিকোণ অস্তিত্বের উপপাদ্যে। দর্শক ওই লতা, ওই লতাগ্রের তিন পাতা, ওই তিনপাতার মধ্যমটিকে সুতোর টানাপোড়েনে বুনে তোলা, ওই আকস্মিক বিচ্ছেদ, ওই সূ়চের ওঠানামাকে বোধহয় বুঝতে পারেন, উপলব্ধি করতে করতে এগিয়ে চলেন, শেষে চারু ও ভূপতির মিলিত না হতে পারার ‘ফ্রিজ’ শটে দৃশ্যমান হাতদুটিতে যা অব্যক্ত থাকে তা তো প্রারম্ভেই ব্যঞ্জনাগম্ভীর হয়ে ওঠে ওই লতাগ্রভাগের মধ্যমপত্রটি থেকে ছিন্ন সুতোতেই যেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৬: পরবাস প্রস্তুতি (দুই)

“B” কে মাঝে রেখে এই গাণিতিক আয়োজন, যেখানে এই ত্রিভুজকে ঘিরে থাকে একটি বৃত্ত, ওই কাঠের বেড়ি। সাদা কাপড়ের শূন্য, রিক্ততার নিষ্ফল ভূমিতে জেগে ওঠা ওই ত্রিকোণকে দূর থেকে ঘিরে রাখে ওই বৃত্ত, বৃহত্তর জীবনের সামগ্রিকতায়, যেখানে সূ়চের উত্থান-পতনটির পথ ধরে ধরে সম্পর্কের নির্মাণ ও ছেদ একমাত্র সত্য হয়ে জেগে থাকে। অঙ্কের মাস্টারমশাই যেমন বোর্ডে তাঁর প্রতিপাদ্য বিষয়টি পেশ করে চকের দ্রুত টানে ঘিরে দেন তাঁর মূল উদ্দিষ্টকে, হাইলাইট করে তুলে ধরেন গোড়ার কথাটিকে, এও যেন তাই বুঝি। দর্শক একাত্ম হবেন হাসি কান্নার জীবনে কেঁপে ওঠা পৌষ-ফাগুনের পালাটিতে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

চারুলতার ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁক পাড়ে, ‘ব্রজ’। ভৃত্যকে আনুষঙ্গিক নির্দেশ দিয়ে বেড়ি থেকে ক্রমশ খুলে নেয় রুমালটি। হাতে তুলে নেয় বই। বঙ্কিমের বই। গুণগুন করে গান করে। কীভাবে কাটাবে তার নিঃসঙ্গ দীর্ঘ দিন, ভেবে পায় না যেন। তার অস্থির, ধীর, চঞ্চল চলাচল অনুসরণ করতে থাকে ক্যামেরা। অলস দুপুর গড়িয়ে সদ্য আড়মোড়া ভাঙা বিকালের নানা শব্দ আসে, চারু শোনে, জানলার খড়খড়ি তুলে বাইরের চাঞ্চল্যকে খুঁজে নিতে চায়, দ্রুত পদক্ষেপে ঘর থেকে বের করে আনে বাইনোকুলার, বীক্ষণযন্ত্র। অনুসরণ করে ব্যস্ত পথচারীকে। অবলম্বিতা লতা যে, তার সত্তার নেপথ্যেই থেকে যাওয়া চারু-সত্তাটি উঁকি দেয়। পরপর খুঁজে নেওয়া নানা কাজের ঔত্সুক্যেও সে যেন ঠিক তৃপ্ত হতে পারে না, অপূর্ণ এক আকাঙ্ক্ষা নিয়েই প্রকাণ্ড সুসজ্জিত হলঘরের মাঝে রাজপুরীর বৈভবেও সে একা, এইসময় বেজে ওঠে চারুর বিপন্নতা, একাকীত্বের জ্ঞাপক সুপ্রসিদ্ধ সুরটি, ক্রমে বীক্ষণযন্ত্র ছেড়ে পিয়ানোর দিকে এগোয় চারু।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

ওই বীক্ষণযন্ত্রে মূর্ত হয়ে ওঠা জীবন-রহস্য, ওই অচঞ্চল জীবনের ব্যাকুলতা, ওই গোপনপুরের বিজনঘরে নিভৃতচারী জীবনের উন্মোচন কীভাবে ঘটে, তা দেখায় চলচ্চিত্র। ব্রজ নামটির অনুষঙ্গে সংস্কৃতভাষার অন্যতম ক্রিয়াপদে প্রতিপাদিত চলার দ্যোতনাটি থেকে যায় কি? থাকে কি শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলার ব্রজের অনুষঙ্গ? বঙ্কিমের পাঠিকা চারুর সাপেক্ষে বঙ্কিম-উপন্যাসে ত্রিকোণ সম্পর্ক, সেই সময়ের সমাজভাবনাকেও যেন ইঙ্গিতবহ করে তুলতে চায় চলচ্চিত্র। চারুর একাকীত্ব ও জীবনে হঠাত্ ধেয়ে আসা উতল অমল হাওয়ায় চরিত্রের প্রেক্ষাপট বদলে যেতে থাকে। চরিত্রের পটভূমিতে “নেগেটিভ স্পেসের” চরিত্র বদলে যেতে থাকে। সেই আলোচনা, পরের পর্বে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content