
নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার যাত্রাপথ শেষ হয়েছিল মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে। কলকাতার শিমলা পাড়া আর শিকাগোর মাঝে এক দুস্তর সাগর। এ পারের দক্ষিণেশ্বর থেকে ওপারের বেলুড়মঠের মাঝে নিত্য বহমানা পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গা। মাঝে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষ, যার অরণ্যের গোপনলোকের রহস্যবেদ ঢাকা পড়েছে সমাজের কানাগলি কুয়োতলা পাকশালা স্নানঘর হয়ে দরবার পর্যন্ত ঘনিয়ে ওঠা যুগলালিত অন্ধকারের মাঝে এক স্তব্ধ চরাচরে।
দাদাঠাকুর শরৎ পণ্ডিতের কথায়, জগৎটা কার বশ? জগৎ টাকার বশ। অদ্বৈতভাব যার জেগেছে তার কাছে কারণ-কার্যভেদ তিরোহিত। তার কাছে জগত্ একটি অজ্ঞানজাত ভ্রান্তি, রজ্জুতে সর্পভ্রম, যাদুকরের ইন্দ্রজাল। নেই অথচ আছে বলে মনে হয়, আছে তো বটেই অথচ নেই। মায়ামোহের আধার জাগতিক বিষয়ের বোধ চলে গেলে যে প্রবোধচন্দ্রোদয় ঘটে, ঘটে সঙ্কল্পসূর্যোদয়ের মতো কিছু, তাতে আমরা-তোমরা, জীব-জড়, আদি-অন্তের ভেদ, দ্বৈধীভাব মুছে যায়। অথবা, যা প্রকৃতই নেই, যা কখনও ছিল না তার অপসরণ নয়, সেই ভ্রান্তিটুকু অপসৃত হয়ে যায় কেবল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৯ : চারুলতা: নাচে মুক্তি? নাচে বন্ধ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়
তখন জেগে ওঠে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত চেতনসত্তা। যা অবাঙ্মনস্-গোচর, ত্রিগুণাতীত অক্ষর, অদ্বয়, পরম আনন্দরূপ ব্রহ্ম। আর ব্রহ্ম একমাত্র সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীব ব্রহ্মভিন্ন আর কিছুই নয়। ওই আকাশের সূর্যমণ্ডল এবং জলে প্রতিফলিত বিম্ব পৃথক্ নয়, জল না থাকলে প্রতিবিম্ব থাকবে না, কিন্তু থেকে যাবে নিত্যভাস্বর স্বতঃপ্রকাশ সূর্য।
এই অদ্বৈতভাব জাগলে চতুর্বর্গ, চতুরাশ্রম, বর্ণভেদ, অভাব, বিপন্নতা, সমৃদ্ধি, জাড্য, গতি, স্বর্গ, নরক কিংবা বিচিত্ররূপ জীবন কিছুই আর সত্য নয়, ভ্রান্তি। এ তো তত্ত্বের কথা। কিন্তু ওই অর্থ-স্বার্থপরিকীর্ণ দৃশ্যমান জগতের রূপ-রস, ভোগ থেকে ভক্তি কিছুই তো চক্ষুষ্মান মানুষের কাছে মিথ্যা হয় না। জেগে থাকে শ্রেয়ঃ-প্রেয়ের ভেদ, জেগে থাকে তৃষ্ণাতুর ইন্দ্রিয়গণ, সত্য ও ঋত, জন্ম-জরা-মরণ। তার পাশেই ভয় হতে অভয়ের পথে, সংশয় থেকে সত্যসদনে উত্তরণের আলো-পথে বহমান বিবেক, আনন্দ, আত্মজাগরণ, অক্ষয় কর্মপ্রেরণাস্রোত।
এই অদ্বৈতভাব জাগলে চতুর্বর্গ, চতুরাশ্রম, বর্ণভেদ, অভাব, বিপন্নতা, সমৃদ্ধি, জাড্য, গতি, স্বর্গ, নরক কিংবা বিচিত্ররূপ জীবন কিছুই আর সত্য নয়, ভ্রান্তি। এ তো তত্ত্বের কথা। কিন্তু ওই অর্থ-স্বার্থপরিকীর্ণ দৃশ্যমান জগতের রূপ-রস, ভোগ থেকে ভক্তি কিছুই তো চক্ষুষ্মান মানুষের কাছে মিথ্যা হয় না। জেগে থাকে শ্রেয়ঃ-প্রেয়ের ভেদ, জেগে থাকে তৃষ্ণাতুর ইন্দ্রিয়গণ, সত্য ও ঋত, জন্ম-জরা-মরণ। তার পাশেই ভয় হতে অভয়ের পথে, সংশয় থেকে সত্যসদনে উত্তরণের আলো-পথে বহমান বিবেক, আনন্দ, আত্মজাগরণ, অক্ষয় কর্মপ্রেরণাস্রোত।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৬: পরবাস প্রস্তুতি (দুই)
স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর পৃথিবী হয়তো দেখেননি। জোড়াসাঁকোর বিশ্বকবির পাড়া থেকে তাঁর পূর্বাশ্রমের বাসভবন দুই কিলোমিটার দূরে, স্বামিজীর আবির্ভাব বিশ্বকবির দু’বছর পরে। নিত্য ঘটে চলা অগণ্য তথ্য, তত্ত্ব, স্মৃতি-বিস্মৃতির মাঝে এমন কিছুর সামনে খানিক থমকাতে হয়। বাঙালির দুই বরেণ্য চিন্তানায়ক পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষ থেকে বিশ্বপথিক হয়েছিলেন যথার্থ-ই। স্বামী বিবেকানন্দের অদ্বৈতভাবনার সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্ববোধের সংঘাত ছিল। পরে কেশবচন্দ্র সেন কিংবা অ্যানি বেসান্তের ভাবলোকে অদ্বৈতদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্তি ও অদ্বৈতভাবের একসঙ্গে পথচলায় নিতান্ত অবিশ্বাসের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনা, ধারণার সংঘাত ছিল।
দেশে দীর্ঘকালের অহিংস-সহিংস আন্দোলন, নিজের মাটির অধিকারলাভের লড়াই, দুর্ভিক্ষে দারিদ্র্যে রোগে জর্জরিত দেশ, সমাজ-জীবন-রাজনীতি-মনুষ্যত্ব সকল দিক থেকেই প্রবল অসাম্যে ঘেরা দেশ দেশমাতৃকার ধারণায় একনিষ্ঠতার আহ্বান শুনেছে কালে কালে। জেগেছে দারুণ গণবিপ্লব, বিদ্রোহ, হয়েছে গণহত্যা, বন্ধন থেকে মুক্তিকামী দেশ, রাষ্ট্র মুক্ত হয়েছে কালে কালে।
দেশে দীর্ঘকালের অহিংস-সহিংস আন্দোলন, নিজের মাটির অধিকারলাভের লড়াই, দুর্ভিক্ষে দারিদ্র্যে রোগে জর্জরিত দেশ, সমাজ-জীবন-রাজনীতি-মনুষ্যত্ব সকল দিক থেকেই প্রবল অসাম্যে ঘেরা দেশ দেশমাতৃকার ধারণায় একনিষ্ঠতার আহ্বান শুনেছে কালে কালে। জেগেছে দারুণ গণবিপ্লব, বিদ্রোহ, হয়েছে গণহত্যা, বন্ধন থেকে মুক্তিকামী দেশ, রাষ্ট্র মুক্ত হয়েছে কালে কালে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার
স্বামী বিবেকানন্দ মানুষের অন্তর্লোকের বন্ধনমুক্তির পথ প্রশস্ত করছিলেন তখন। দেশের মানুষের জাগতিক দৈন্য-অপ্রাপ্তি-অসহায়তার মূলে তার ন্যুব্জ তমসাবৃত জীবনের অচলায়তনকেই তিনি কারণ মনে করেছেন। তাঁর প্রায়োগিক অদ্বৈতবাদ এখানেই প্রযুক্ত, সেই নিষ্ফল স্থবির জীবনকে জাগিয়ে, আলোড়িত করে, প্রকম্পিত করে অভীষ্টপানে ধাবমান করার বিপুল তরঙ্গ তুলেছিলেন তিনি সব চরাচর উদ্বেল করে। অন্তর থেকে বিদ্বেষ বিষ, স্বার্থমগ্ন আত্মপরতা দূর করে সর্বস্তরে যে সাম্যাবস্থা জেগে উঠবে এই অদ্বৈতভাবে, তার সঙ্গে মার্কসীয় দর্শন থেকে পাশ্চাত্ত্যদর্শনের ডুয়ালিজম কিংবা যিশুখ্রিস্টের দর্শনভাবনার ভেদাভেদ নিয়ে বহু সারস্বত বিতর্ক-প্রতর্কের উপস্থাপন পার হয়ে স্বামী বিবেকানন্দের সমাজদর্শন, যুক্তি-বিজ্ঞানমিশ্রিত অদ্বৈতবাদ ও শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবেদান্তের সম্মিলিত পরিসরটিকে স্বতন্ত্র-স্বাধীন, ব্যাপক ও অভিনব বলেই মনে হয়। সেখানে ভক্তি ও অদ্বৈতভাবে বিরোধ নেই, ভক্তির পথেই অদ্বৈতবোধে উত্তরণ।
অরণ্যচারীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলা বৈরাগ্যভূষিত বেদান্ত সেখানে অক্লেশে মিশেছে মর্ত্যভাবনায়, দৈন্যক্লিষ্ট সমাজজীবনে, অধ্যাত্মচিন্তার মগ্নচৈতন্য জেগেছে গৃহীর বিপন্ন দৈনন্দিনে, যা সকলের নয় তা হয়েছে সর্বজনীন, যা কেবল কার্য-কারণ, মর্ত্য-অমর্ত্য, বিদ্যা-অবিদ্যার তত্ত্বাক্রান্ত তা সংক্রামিত নিত্য বিপন্নতায় পীড়িত জীবনের সকল জাগতিক অসাম্য, বৈষম্যের অবসানে, নবতর প্রোজ্জ্বল উত্তরণের মহতী সঙ্কল্পে।
অরণ্যচারীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলা বৈরাগ্যভূষিত বেদান্ত সেখানে অক্লেশে মিশেছে মর্ত্যভাবনায়, দৈন্যক্লিষ্ট সমাজজীবনে, অধ্যাত্মচিন্তার মগ্নচৈতন্য জেগেছে গৃহীর বিপন্ন দৈনন্দিনে, যা সকলের নয় তা হয়েছে সর্বজনীন, যা কেবল কার্য-কারণ, মর্ত্য-অমর্ত্য, বিদ্যা-অবিদ্যার তত্ত্বাক্রান্ত তা সংক্রামিত নিত্য বিপন্নতায় পীড়িত জীবনের সকল জাগতিক অসাম্য, বৈষম্যের অবসানে, নবতর প্রোজ্জ্বল উত্তরণের মহতী সঙ্কল্পে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
বহুরূপে সম্মুখে যে, যা, যারা আছে তার পথেই বিশ্বজনীন যোগসাধন, “ভাসে ব্যোমে ছায়া-সম ছবি বিশ্ব-চরাচর” হয়ে আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মজাগরণ, এক ও বিপুল অহমের উদ্ভাস থেকে ক্রমে ক্রমে বাক্যমনের অতীত গভীর গহন নিবিড় আচ্ছন্নতার নিশীথরাতে দ্বন্দ্বহীন পরমবোধের বাদলধারা নামে। অসত্ থেকে সতে, তমসা থেকে জ্যোতির্লোকে উত্তরণের মরণ থেকে অমৃতময় জাগরণের মহাসঙ্গীত বেজে ওঠে তখন। অধ্যাত্মবোধ তখন নিত্যধন হয়, দর্শন আর বিজ্ঞানের মহাসম্মিলন সেখানে। আজকের তীব্র অসাম্যদীর্ণ বর্তমানে স্বামী বিবেকানন্দ এবং তাঁর অদ্বৈতবোধের সমুজ্জ্বল প্রাসঙ্গিকতা এখানেই।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















