
এক ফ্রেমে। ছবি : সংগৃহীত।
ফেলুদা মগজাস্ত্র নিয়ে চলে। সেটা আছে তার মাথার মধ্যে, যেমন আর পাঁচজনের মধ্যে থাকে। কিন্তু ফেলুর এই অমোঘ অস্ত্রটি মাঝে মাঝে ঘ্যাচাং করে মানুষের মনের মধ্যে ঢুকে তার ভিতরের কথা সব জেনে নেয়। সেভাবে দেখলে ফেলু কি ম্যাজিশিয়ন নাকি যোদ্ধা নাকি মন-বুদ্ধির দর কষাকষির স্নায়ুযুদ্ধের রাজত্বের এক অপ্রতিহত শাসক?
রাজ্যের শাসক কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখেন সকলকে? প্রাচীন রাজনীতিশাস্ত্রে তার অনেক কৌশল লেখা আছে। আজকের পর্বে চতুর্বিধ উপায়ের কথাই ধরা যাক যেখানে চাররকম উপায় সাম, দান, দণ্ড ও ভেদের প্রয়োগ করে শাসক অপ্রতিহত থাকবেন। ফেলু তার ডিটেকশনের রাজত্বে এসব করে নাকি? দেখাই যাক না!
রাজ্যের শাসক কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখেন সকলকে? প্রাচীন রাজনীতিশাস্ত্রে তার অনেক কৌশল লেখা আছে। আজকের পর্বে চতুর্বিধ উপায়ের কথাই ধরা যাক যেখানে চাররকম উপায় সাম, দান, দণ্ড ও ভেদের প্রয়োগ করে শাসক অপ্রতিহত থাকবেন। ফেলু তার ডিটেকশনের রাজত্বে এসব করে নাকি? দেখাই যাক না!
ভালো ভালো কথায় তুষ্ট করে অন্যকে নিজের অধীনে আনার তত্ত্বটি সামে দেখা যায়। ভালো কথায় মন না ভুললে তখন দান করতে হয়। অর্থ, দ্রব্য কিংবা সম্মান বা সাম্মানিক, পারিতোষিক কিছু। এমনিতেই হয় না, খরচা করতে হয়। এসবেও চিড়ে না ভিজলে দণ্ড! আর তাতেও যদি জব্দ না করা যায়, তাহলে ভেদনীতি প্রয়োগ করতে হয়। যার জন্য যেমন দরকার, তার জন্য তেমন। এসব প্রয়োগ ঠিকঠাক করতে পারলে রাজা সুফল পাবেন। ভেদনীতির বিষয়টা একটু বিশদে বলা যাক। এই যেমন যদু আর মধুর বন্ধুত্বে ফাটল ধরানোর জন্য দু’জনের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে যদুকে জানানো যে মধু তার বদনাম করছে গোপনে। আবার মধুকে গিয়েও সেই এক-ই কথা বলা। বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারলে পরের দিন থেকে যদু আর মধু কেউ কারও মুখদর্শন আর করবে না। এ একটা উদাহরণ কেবল। ব্যাপারটা এতটাও অনায়াস নয়। নীতি অনীতির সঙ্গে যতটা সামাজিক দূরত্ব রাখতে চায়, রাজার নীতি তার চেয়ে খানিক অন্যরকম চলে। শাস্ত্রে, কাব্যে দেখা যায় সফল রাজা নীতিজ্ঞ হন, তাঁর নীতি, কূটনীতিই তাঁকে বিজয়ীর মুকুট দেয়। অস্ত্রশস্ত্র, সৈন্যবল তাঁর থাকে বটে, তবে সেসব প্রয়োগ করতে হয় না তেমন।
ফেলুদার-ও তাই রিভলভার আছে। তাতে ছ’টা গুলি ভরা থাকে। দরকারে তাকেও তা প্রয়োগ করতে হয়েছে বৈকী! তবে তা মগজাস্ত্রের কূটনীতি, নীতিজ্ঞানের কাছে নগন্য। যে কথা হচ্ছিল, ফেলুদা কি এই চাররকমের উপায় প্রয়োগ করে?
ফেলুদার-ও তাই রিভলভার আছে। তাতে ছ’টা গুলি ভরা থাকে। দরকারে তাকেও তা প্রয়োগ করতে হয়েছে বৈকী! তবে তা মগজাস্ত্রের কূটনীতি, নীতিজ্ঞানের কাছে নগন্য। যে কথা হচ্ছিল, ফেলুদা কি এই চাররকমের উপায় প্রয়োগ করে?
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৫ : নিশীথে
সাম-নামক উপায়টির জন্য বিশেষ উদাহরণের প্রয়োজন নেই বোধহয়। চলচ্চিত্রের সকল কোণেই বাগ্মী ও মেধাবী ফেলুর আশ্চর্য ক্ষমতার পরিচয়। লালমোহন জটায়ুর সঙ্গে কিংবা ভিলেন মগনলালের সঙ্গে কথোপকথনের সূত্রে দর্শক দেখতে পান যে ঠিক কেমন করে বিপরীতে থাকা মানুষটি ক্রমে ক্রমে ফেলুর মগজাস্ত্রের অধীন হয়ে পড়ে। এখানে বলা যায় লালমোহনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা, বলা যায় আসল ডঃ হাজরার সঙ্গে সাক্ষাতের কথা, কিংবা দুর্ধর্ষ দুষমন মগনলাল মেঘরাজের কথা, কিন্তু মনে করানো যাক সেই বিশ্বশ্রী গুণময় বাগচীর কথা, যিনি কাশী এসেছেন বেঙ্গলি ক্লাবের আমন্ত্রণে দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শনের জন্য। কিন্তু হোটেলে ফেলু, তপেশ আর জটায়ুর রুমমেট হঠাৎ পেলেন হুমকি চিঠি। তাঁর পেশীর কারুকার্যমণ্ডিত দেহমন্দির বাঁচাতে ত্রস্ত তিনি যঃ পলায়তে সঃ জীবতি এই পন্থা নেবেন ভেবেছেন। তবে ফেলুর দুটি কথায় তিনি নির্ভয় হলেন। কী বলল ফেলু? “হুমকিটা আপনাকে দেওয়া হয়নি, দেওয়া হয়েছে আমাকে… আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি মিস্টার বাগচী, এ ঘরে যদি কোনও উৎপাত হয়-ও আপনার দেহ অক্ষত থাকবে…কাজেই আপনি বেঙ্গলি ক্লাবকে ডোবাবেন না। বিশ্বনাথের মন্দির তো সবাই দেখে কাশীতে, বিশ্বশ্রীর মন্দির আর কজন দেখে বলুন!”
এই হল “সাম”… তখনও গ্যারান্টির যুগ ছিল।
এই হল “সাম”… তখনও গ্যারান্টির যুগ ছিল।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু: পর্ব-১৪২: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২২

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৮: কালো ইঁদুর
সোনার কেল্লা ছায়াছবিতে দেখা যাচ্ছে, মুকুলের পাড়ায় আরেকটি মুকুল নামের ছেলে ছিল। আসল মুকুলকে ধরতে গিয়ে নকল হাজরা নকল মুকুলকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ভুল বুঝে ছেড়েও দেয়। তো ফেলু তদন্তের জন্য এই দ্বিতীয় মুকুলের বাড়ি গিয়েছে, কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে নেবে। দেখা যায়, বিপদেও সাহস হারিয়ে না ফেলা সেই বাচ্ছাটির জন্য ফেলু এনেছে খেলনা পিস্তল। বলে দেয়, গুলি ভরা আছে। ছেলেটির ঠাকুরদা নাতিকে আশ্বস্ত করে জানান, এঁরা খুব ভাল লোক। বালকটি নিঃসন্দেহে ত্রস্ত, তার মুখেও তার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু পিস্তল চালিয়ে তার গুলির শব্দে ছেলেটির মুখে হাসি ফোটে, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে হতে জানাতে থাকে ঠিক কী ঘটেছিল।
ফেলুর মগজাস্ত্র বুঝেছিল কীসে কাজ হবে, ভাল ভাল মিষ্টি কথায় যা হবে না, খেলনা পিস্তল সেই কাজ করে দিয়েছে। এই হল দানের মহিমা।
ফেলুর মগজাস্ত্র বুঝেছিল কীসে কাজ হবে, ভাল ভাল মিষ্টি কথায় যা হবে না, খেলনা পিস্তল সেই কাজ করে দিয়েছে। এই হল দানের মহিমা।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৭: রাজসূয়যজ্ঞ কী শুধু একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রদর্শনী? না স্বতঃস্ফূর্ত গণসমর্থনলাভের উদ্যোগ?

সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৩৮: নন্দিতা কৃপালনি— বিশ শতকের বিদুষী
“দণ্ড” তো ফেলু দিয়েছে। দিয়েছে রিভলভারের নলের মুখে রেখে বিকাশ সিংহকে, যিনি মগনলালকে পৌঁছে দিয়েছেন গণেশমূর্তি আর খুন করার জন্য চিনিয়ে দিয়েছেন হতভাগ্য বৃ্দ্ধ প্রতিমাশিল্পীকে। অথবা, নকল হাজরা, ফেলুর একটি নিখুঁত গুলিতে যাঁর মাথার টুপি উড়ে গিয়ে বেরিয়ে আসে বেবাক টাক আর বেঁচে যায় একটা নিরীহ ময়ূর, কিংবা মুকুল। কিংবা মগনলাল, মছলীবাবার বেশে ফেলুদা তার পাশে গুণে গুণে বুনে দেয়ে বুলেটের ক্ষত, কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেয় সব অপমানের হিসেব। তবে এই দণ্ডের মূলেও তার সেই মর্মভেদী মগজাস্ত্র, যা প্রাচীর হয়ে জেগে থাকে সাধুর পরিত্রাণ আর দুষ্কর্মকারীর বিনাশের মাঝে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
আর ভেদ? না, ফেলুর মনে হয় এতদূর আসতেও হয় না চলচ্চিত্রে। তার আছে মগজাস্ত্র। কিছু উপায় অবলম্বন করতে হলেও, তার বুদ্ধির জোরেই সে জিতে যায়। কিশোরদের জন্য লেখা কাহিনির নায়ক সে। যা হওয়া উচিত আর উচিত নয় এই সামাজিক আদর্শের মাঝে রূঢ় বাস্তবটুকু না-ই বা থাকল, তাতে অবিচল সত্য আর শিল্পিত সৌন্দর্যের কিছু হানি হয় না মনে হয়। তবে ভেদ ঘটানোর চেষ্টা তো ছবির আনাচে কানাচে। ভিলেনরা সেই চেষ্টা করেই জিততে চায়। ফেলু তাদের ভেদ করে, জব্দ করে দেয় যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। যারা এসবকেই মূলধন করে ভেদ বজায় রাখতে চায়, তাদের ফেলুর মগজাস্ত্র ভেদ করে বৈকী! তাই নকল হাজরা কিংবা মগনলালের মতো দুষ্টু লোকেদের জারিজুরি টেকে না। আর নকল হাজরা ভবানন্দের চ্যালা “ব্রেজিলের বিচ্চু” মন্দার বোস, যে তার সকল অপকর্মের জুড়িদার, যে ভূপর্যটক সেজে ভাব জমাতে এসেও ঠিক এঁটে উঠতে পারে না, সে “ভেদ” করার চেষ্টা করে ফেলু আর লালমোহন ওরফে জটায়ুর মধ্যে; একটা পরামর্শ দিতে চায় শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে। খর্বকায় জটায়ুর উচ্চতাকে কটাক্ষ করে জানায় “পুরুষ মানুষ সাড়ে পাঁচ ফিটের কম দেখলেই তাকে সাসপেক্ট করবেন!”
এই হল “ভেদ”। তবে ফেলু কী বলল, সে কি ভিন্ন হয় এই কূটনীতিতে?
“আমার মন কি বলছে জানেন? আবার দেখা হবে।”—চলবে।
এই হল “ভেদ”। তবে ফেলু কী বলল, সে কি ভিন্ন হয় এই কূটনীতিতে?
“আমার মন কি বলছে জানেন? আবার দেখা হবে।”—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















