
চারুলতা ছবির একটি দৃশ্য।
ছবিতে চারুলতাকে একটি দূরবিন ব্যবহার করতে দেখা যায়। আজকের পর্বে ওই দূরবিনটির শৈল্পিক প্রয়োগ নিয়ে কিছু কথা, কিছু দৃশ্য। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, দূরবীনকে উপলক্ষ্য করে বীক্ষণযন্ত্র কীভাবে চলচ্চিত্রের চরিত্রের মনোজগতের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বটে। সেখানে চারুলতার হাতে ধরা দূরবীন অথবা মহানগরের জনৈক প্রবীণ আদর্শবাদী শিক্ষকের দৈনন্দিনের চশমাটি অথবা ফেলুদার হাতে ধরা পেপারকাটিংয়ে মুকুল ধরের ছবির ওপরে ধরা আতসকাচ… বীক্ষণযন্ত্রের দৃষ্টিপথে প্রতীয়মান চিত্রভাষা ছবির অন্তর্লোকে বহমান অব্যক্ত কিছুকে ইঙ্গিতে দর্শকের ভাব ও বোধের জগতে মূর্ত করতে চায়। সেরকম একটি দৃশ্য মহানগর থেকে।
বিএ পাশ ব্যাঙ্ক কর্মচারীর সংসার। মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসার। স্ত্রী ও সন্তান ছাড়াও ছোট বোন, বয়স্ক মা ও বাবার দায়িত্ব ক্রমশ যেন দায় হতে বসে। অর্থের সংকট থেকে ব্যাঙ্কফেল ও চাকরি হারানোর সেই বাস্তবতায় আদর্শগত ও মানসিক সংঘাতের পিছু পিছু কিছু শব্দ ঘোরাফেরা করে ছবি জুড়ে। বৃ্দ্ধ অবসৃত “ইস্কুল মাস্টার” বাবা সপরিবারে কলকাতায় ছেলের সংসারে এসে থাকছেন। অর্থাভাবে গোপনে লটারির টিকিট কেটে আকস্মিক সৌভাগ্যলাভের চেষ্টা করেন। সব কিছুই বদলে গিয়েছে বলে তাঁর মনে হয়, ছেলেও তাঁকে সেটা মনে করিয়ে দেয়। সাংসারিক দায়ে পুত্রবধূর সেলসগার্লের চাকরি তাঁর অনভিপ্রেত, ছেলেও বদলে গিয়েছে বলেই তাঁর মনে হয়। কেননা, তাঁর চশমা তৈরির ব্যাপারে ছেলে কিছু উদ্যোগ দেখায় না। ফলে, থমকে গিয়েছে সারস্বত চর্চা।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৯ : চারুলতা: নাচে মুক্তি? নাচে বন্ধ?

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১৭: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৬

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়
ছেলের চোখে চশমা। বোনটির চোখেও চশমা। চশমা চোখের দৃষ্টি ও লক্ষ্যবস্তুর মাঝে থেকে দৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। চশমার সাহায্য নিয়ে অস্পষ্ট স্পষ্ট হয়, দূরের বিষয় খানিক কাছে আসে। এতে কিছু জাগতিক লাভ থাকে বটে, তবে একটি চরিত্রের ব্যবহৃত বীক্ষণযন্ত্রের উপস্থাপনায় থাকে অবলম্বনের ভাব, তার ব্যাহত কিংবা বিবর্দ্ধিত দৃষ্টি, মননের একটা শৈল্পিক ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ ঘটার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে সেখানে। যেমন, ফেলুদা সত্যসন্ধানী। তার সতর্ক চোখ, সাবধানী মন কোনও অবলম্বনে ভর করে যুক্তির পথে হাঁটে না। সেখানে সে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। আবার বীক্ষণযন্ত্রকে অবলম্বনের পাশাপাশি নির্ভরতার প্রকরণ ভাবলেও তা চরিত্রের সাপেক্ষে ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৯: রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা, অনুক্ত কৈলাসচন্দ্র
মহানগর ছবিতে নানা সাংসারিক জটিলতার অন্যতম হয়ে থাকে একটি চশমার আকুতি, যে চশমা প্রেক্ষাপট ও প্রয়োগের তারতম্য কখনও চরিত্রের নির্ভরতার সূচক, কখনও ইতিবাচক নিরপেক্ষ অবলম্বনের বার্তাবহ, কখনও চশমার ব্যঞ্জনা চরিত্রটিকে পক্ষপাতদুষ্ট করে, করে চোখ থাকতেও অন্ধ। চশমা সেই অন্ধ অহংবোধের প্রতীক হয়ে থাকে। তবে সবটুকুই প্রয়োগ ও প্রেক্ষিতনির্ভর, কখনও আপেক্ষিক-ও বটে।
চারুর হাতে ধরা দূরবীন তার আত্মজাগরণের দ্যোতনা বহন করে। যা এককালে তার কাছে অব্যক্ত ছিল, তা যখন প্রকাশ পেল তখন তার জীবনদর্শন বদলে গেল খানিক, যা দূরে ছিল নিকটে এল এও যেমন সত্য, তেমন-ই সেও অনেক কিছু থেকেই দূরে চলে গেল বুঝি। তার বীক্ষণযন্ত্র এখানে জীবনকে কখনও মুক্ত করেছে কখনও দোলাচলের চলাচলে তাড়িত করেছে, কখনও তার নিরপেক্ষ বোধকেও গ্রাস করেছে এক দুর্নির্ণেয় আচ্ছন্নতায়।
চারুর হাতে ধরা দূরবীন তার আত্মজাগরণের দ্যোতনা বহন করে। যা এককালে তার কাছে অব্যক্ত ছিল, তা যখন প্রকাশ পেল তখন তার জীবনদর্শন বদলে গেল খানিক, যা দূরে ছিল নিকটে এল এও যেমন সত্য, তেমন-ই সেও অনেক কিছু থেকেই দূরে চলে গেল বুঝি। তার বীক্ষণযন্ত্র এখানে জীবনকে কখনও মুক্ত করেছে কখনও দোলাচলের চলাচলে তাড়িত করেছে, কখনও তার নিরপেক্ষ বোধকেও গ্রাস করেছে এক দুর্নির্ণেয় আচ্ছন্নতায়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৯: সত্যব্রতের মুখোমুখি
সেই বীক্ষণযন্ত্র যখন চশমার আকার নেয়, তখন এক বৃ্দ্ধ শিক্ষক তাঁর জীবনের অভাব, অপ্রাপ্তি ও উচ্চপদস্থ ছাত্রদের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান কিংবা দাবীর কানাগলিতে হাতড়ে বেড়ান। চশমাটি কলকাতা আসার পথে সঙ্গ ত্যাগ করেছে। ছেলে বিমুখ, অগত্যা… শুরু হয় তাঁর অভিযান। শ্রদ্ধাস্পদ মাস্টারমশাই চক্ষু চিকিৎসক, ব্যারিস্টার প্রমুখ কলকাতাবাসী ছাত্রদের সন্ধান পেয়ে তাঁদের শরণাগত হয়ে আনুকূল্য দাবী নাকি ভিক্ষা করেন? ছাত্ররাও কর্তব্য, দায়িত্ব কিংবা দায়ে, ভক্তিতে কিংবা করুণায় অনুকূল হলেও সেখানে মনের যোগাযোগ যে একেবারেই নেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা স্পষ্ট হতে দেরি হয় না। শিক্ষকের সম্মান, দাবী, গুরুদক্ষিণা কি আজ দান ও দাতা, গ্রহীতার সম্পর্কে এসে ঠেকল? এই অধিকারের দাবি ন্যায্য নাকি অন্যায্য, ছাত্রের গড়ে ওঠা জীবনবোধ থেকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী… নানা প্রশ্ন ও দীর্ঘশ্বাস, আলো ও অন্ধকারের সামনে দাঁড়াতে হয় তবে, দাঁড়াতে হয় নিজের সামনে, জীবনের সামনে, বীক্ষণযন্ত্রের নিচে তারাও কথা বলে বৈকী! তবে সেকথা অন্য কোনও পর্বে বরং।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
মাস্টারমশাইয়ের এই ছেলেমানুষী অভিযান ফুরিয়ে যায় অচিরেই। ততদিনে চক্ষুবিশেষজ্ঞ ছাত্রের গুরুদক্ষিণা চশমাটি তাঁর চোখে, চোখ ঢেকে শোভমান। ততদিনে ব্যারিস্টার ছাত্র পরম ঔদাসীন্য ও কারুণ্যে কটা টাকা ভিক্ষে দিয়েছে। ততদিনে আরেক চিকিৎসক ছাত্র চেম্বারে আনুকূল্য-প্রার্থী হয়ে অকস্মাৎ সমাগত, দুপুর রোদে অবসন্ন হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া মাস্টারমশাইকে সযত্নে বাড়ি পৌঁছে দিয়েও তির্যক মন্তব্য করে গেছেন। এবং, সেই পতনের ভার সামলাতে না পেরে চশমাটিও ভেঙে গিয়েছে।

মহানগর ছবির একটি দৃশ্য।
সেই কবে কবি কালিদাস দেখিয়েছিলেন যা থাকার নয়, যা চিরন্তন নয় তা থাকে না। যা অনন্তগামী তা-ই থাকে। এই না থাকাটিকে কেউ যা গিয়েছে তা যাক বলে ঝেড়ে ফেলে, কেউ কেউ তা পারে না। কারণ-কার্যের জগতে অনিত্যের বিনাশ হয়, তাই চশমাটিও থাকে না বুঝি। সেই বাধা সরে গেলে মানুষ চক্ষুষ্মান হয়, লজ্জিত হয়। ছেলের অসাফল্য কিংবা, অক্ষমতার বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে আদায় করা অথবা ভিক্ষার্জিত অধিকারের, উপকারের প্রতিদানগুলির প্রতিনিধি না-থাকা বীক্ষণযন্ত্রটি জীবনের যন্ত্রণার পরেও উদ্ভাসিত চিরন্তন সত্যরূপটির আভাস দেয়। মহানগরের এক অনামা তস্যগলির কোণে জীবনের রিক্ত, সিক্ত বদলে যাওয়া পরিসরের অস্তি-নাস্তির দোলাচলের মাঝেও কিছু স্নিগ্ধ-করুণ আলো নেমে আসে। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

















