
হাত বাড়ালেই বন্ধু।
একঝলকে
প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাহিনি-চিত্রনাট্য ও গীতরচনায়, নচিকেতা ঘোষের সুরে এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ-মূর্ছনায় ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’ ছিল সেই সময়ের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালজয়ী চলচ্চিত্র যা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার এক সুন্দর গল্পের যুগ্মরূপক। উত্তম-সাবিত্রী জুটির রোমান্টিক আবেদন এবং তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
বাংলাদেশে রোম্যান্টিক নায়ক নামে একটি শব্দ চালু আছে। বলাবাহুল্য এই শব্দটির সঙ্গে প্রেম বা বিরহের দৃশ্যে সপ্রতিভ অভিনয়ের এক অনুন্নত ধারণা যুক্ত হয়ে আছে। উত্তমকুমার সেই ধারণার বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ছিলেন। যেহেতু তথাকথিত রোমান্টিকতার প্রতি বাঙালির দুর্নিবার আকর্ষণ, উত্তমকুমারও বাঙালির কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিলেন। এটাও ওঁর বুদ্ধি আর দূরদর্শিতার লক্ষণ। সেই সময় ‘টেকনিক্যাল’ অভিনেতা হিসেবে তাকে লক্ষ্য করার মতো সুযোগ অনেকেই পেয়েছেন।
বাংলাদেশে রোম্যান্টিক নায়ক নামে একটি শব্দ চালু আছে। বলাবাহুল্য এই শব্দটির সঙ্গে প্রেম বা বিরহের দৃশ্যে সপ্রতিভ অভিনয়ের এক অনুন্নত ধারণা যুক্ত হয়ে আছে। উত্তমকুমার সেই ধারণার বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ছিলেন। যেহেতু তথাকথিত রোমান্টিকতার প্রতি বাঙালির দুর্নিবার আকর্ষণ, উত্তমকুমারও বাঙালির কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিলেন। এটাও ওঁর বুদ্ধি আর দূরদর্শিতার লক্ষণ। সেই সময় ‘টেকনিক্যাল’ অভিনেতা হিসেবে তাকে লক্ষ্য করার মতো সুযোগ অনেকেই পেয়েছেন।
বাংলাদেশে যে অনুন্নত, সাধারণ এবং দেশজ দৃশ্যগ্রহণের রীতি প্রচলিত আছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি তা হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন সন্দেহ নেই। দুর্বল পরিচালকের ক্ষেত্রে সেই কারণেই তিনি আধিপত্য করতে পারতেন। এছাড়া সীমিত বাক্য ব্যবহার ছন্দগাম্ভীর্য এবং তার ইমেজ ব্যবহারের বুদ্ধিমত্তায় এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে জানতেন।
অন্যথায় এক সজীব স্বাভাবিক কৌতূহলী উদার ও সাধারণ শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচয় আবিষ্কার করতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। উত্তমকুমারের ক্ষমতাকে আমরা অধিকাংশ সময়েই অপব্যবহার করেছি। এর জন্য উত্তমকুমার এবং চলচ্চিত্রশিল্প দু-পক্ষই দায়ী। এর মধ্যেই যে মুষ্টিমেয় ছবিতে তাঁকে স্বমহিমায় আবিষ্কার করা গিয়েছে তার থেকেই আমরা আমাদের অর্জন ও গ্রহণ করে নেব। অন্যথায় চলচ্চিত্র নির্মাণের বা অভিনয়ের দেশজ ধারা পরিণত হবে আর কোন পন্থায়!
অন্যথায় এক সজীব স্বাভাবিক কৌতূহলী উদার ও সাধারণ শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচয় আবিষ্কার করতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। উত্তমকুমারের ক্ষমতাকে আমরা অধিকাংশ সময়েই অপব্যবহার করেছি। এর জন্য উত্তমকুমার এবং চলচ্চিত্রশিল্প দু-পক্ষই দায়ী। এর মধ্যেই যে মুষ্টিমেয় ছবিতে তাঁকে স্বমহিমায় আবিষ্কার করা গিয়েছে তার থেকেই আমরা আমাদের অর্জন ও গ্রহণ করে নেব। অন্যথায় চলচ্চিত্র নির্মাণের বা অভিনয়ের দেশজ ধারা পরিণত হবে আর কোন পন্থায়!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫২: আকাশ এখনও মেঘলা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২০ : চারুলতা-মহানগর — বীক্ষণযন্ত্র

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ
উপরের কথাগুলো উত্তম কুমারের প্রশস্তি বাক্য হতে পারে। কিন্তু যে সময়ে এই ছবি মুক্তি পেয়েছে, যাঁরা তাঁকে কাছাকাছি দেখেছেন তাদের সঙ্গে দর্শকদের সেতু নির্মাণ করত এই অনুভূতিগুলো। অর্থাৎ মানুষের আবেগ অনুভূতি সবকিছুর দায় যেন উত্তমবাবু নিয়ে বসেছিলেন পরোক্ষভাবে। যেকোনো গল্পে যখন চেতনার জগতকে নাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হতো দর্শক যেন মনে মনে প্রতীক্ষা করতেন যে এই অবস্থানে উত্তমবাবু কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান; আর উত্তম কুমারও সচেতন থাকতেন দর্শকদের চাহিদা সম্পর্কে যা, আগের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।
দর্শক-চাহিদা মাথায় রেখেই উনি কাহিনি ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে এক হয়ে যেতেন। পাত্র-পাত্রী বা কুশীলবরা নন। ওঁর ইষ্টদেবতা ছিলেন পর্দার বাইরে সেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকা মানুষগুলো। তাঁদের হৃদয়ের ভাষা পড়তে পারতেন বলেই “হাত বাড়ালেই বন্ধু” ছবিটিতে উনি সেভাবে প্রাণসঞ্চার করতে পেরেছিলেন। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মত একজন ক্ষণজন্মা অভিনেত্রীকে সঙ্গে পেয়ে সহশিল্পী হিসাবে তিনি যে মান এই ছবিতে দেখিয়েছেন তা যে কোন দেশের বৌদ্ধিক সমাজের গর্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দর্শক-চাহিদা মাথায় রেখেই উনি কাহিনি ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে এক হয়ে যেতেন। পাত্র-পাত্রী বা কুশীলবরা নন। ওঁর ইষ্টদেবতা ছিলেন পর্দার বাইরে সেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকা মানুষগুলো। তাঁদের হৃদয়ের ভাষা পড়তে পারতেন বলেই “হাত বাড়ালেই বন্ধু” ছবিটিতে উনি সেভাবে প্রাণসঞ্চার করতে পেরেছিলেন। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মত একজন ক্ষণজন্মা অভিনেত্রীকে সঙ্গে পেয়ে সহশিল্পী হিসাবে তিনি যে মান এই ছবিতে দেখিয়েছেন তা যে কোন দেশের বৌদ্ধিক সমাজের গর্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
একটা বাণিজ্যিক ছবির মূল্যায়ন করতে বসে এ ধরনের বাক্য বিন্যাস অনেকের কাছে আপত্তিজনক মনে হতে পারে কিন্তু যদি কালিক বিচারে আমরা ফ্রেম টু ফ্রেম বিশ্লেষণ করি সেখানে দেখব আত্মিক অভিব্যক্তি কিভাবে শব্দ ও ছবির মেলবন্ধনে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করছে তা এই ছবিগুলির নিরিখেই বিচার করা উচিত। বাংলা চলচ্চিত্রের সেভাবে কোন বিভাজন তথা যুগনির্মাণ না হলেও দর্শককে যুগে যুগে ভাবিয়ে তোলার জন্য বইয়ের পাতা থেকে তুলে আনা চরিত্রগুলোকে মুন্সীয়ানায় উঠিয়ে তোলা হতো সেগুলোর গঠনগত দিক অবশ্যই যুগের কাছে আবেদন রাখত আর উত্তম কুমার সেই দিক দিয়েই ছিলেন সার্থক শিল্পী।
যে ভাষাশিল্পীরা ভাষা দিয়ে ছবি আঁকেন তারা ভাষার ক্রমকে যেভাবে মার্জিত ভঙ্গিতে ধ্রুপদী আসরে পরিবেশন করেন সেই অংশটা ভীষণ বৌদ্ধিক হয়ে যায়। উত্তমকুমারের বা সেলুলয়েডি শিল্পীদের দায়বদ্ধতা দুটি জায়গায়—ভাষা এবং ছবি। বাচিক শিল্পীর একটাই অস্ত্র স্বরক্ষেপণ। মাইক্রোফোনের সামনে তিনি যখন স্বরবিন্যাস ঘটান মনটাকে একদিকে সংযুক্ত রাখা যায়।
যে ভাষাশিল্পীরা ভাষা দিয়ে ছবি আঁকেন তারা ভাষার ক্রমকে যেভাবে মার্জিত ভঙ্গিতে ধ্রুপদী আসরে পরিবেশন করেন সেই অংশটা ভীষণ বৌদ্ধিক হয়ে যায়। উত্তমকুমারের বা সেলুলয়েডি শিল্পীদের দায়বদ্ধতা দুটি জায়গায়—ভাষা এবং ছবি। বাচিক শিল্পীর একটাই অস্ত্র স্বরক্ষেপণ। মাইক্রোফোনের সামনে তিনি যখন স্বরবিন্যাস ঘটান মনটাকে একদিকে সংযুক্ত রাখা যায়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)
কিন্তু ভিজুয়াল আর্টের মূল দাবি যতদিন নির্বাক ছিল ততদিন নিরাপদ ছিল। সবাক হওয়ার পর থেকে ছবির সাথে অভিব্যক্তির সাথে শব্দের যদি ঠিকঠাক দাম্পত্য নির্মাণ না হতে পারে তাহলে সেই শিল্পের প্রাণ প্রতিষ্ঠা মাঠে মারা যায়। এখানেই আবার অন্য একটা বিভাজন একজনকে এগিয়ে দেয় একজনকে পিছিয়ে দেয়। সেটা হল মঞ্চ অভিনেতা এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো অভিনেতা। সত্যজিৎ বাবুর চোখ দিয়ে ‘ক্যামেরার সামনে অতি অভিনয় চলে না একটু বাড়িয়েছো কি দশগুন বেড়ে যাবে’…এ স্বরলিপি পৃথিবীর বুকে যতদিন সেলুলয়েড এসে মানুষের ভাবকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিবহণ করার দায়িত্ব নিয়েছে ততদিনই চলে আসছে সে কারণে চলচ্চিত্র শিল্পে আমাদের দেশে খ্যাতিমান হয়েও অখ্যাত থাকার দায়ভার বহন করতে হয়েছে তুলসী চক্রবর্তীর মত জাত অভিনেতাকে যাঁর,শব্দ এবং ছবি দুটিতেই পারঙ্গমতা ছিল আকাশ ছোঁয়া।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
অন্যদিকে যদি ছবি ও শব্দের মধ্যে বিচ্ছেদ অনেকটা হয়ে যায় তখন নেপথ্যে শব্দক্ষেপ করে তার মেরামতি খুব বেশিক্ষণ টানা যায় না। সে কারণেই শুধু গানের অভিব্যক্তিকে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য উত্তম বাবুর মতো অভিনেতার এত যত্ন ছিল এরপর আসি কাহিনির বাঁধুনির দিকে। প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রান্তিক মানুষের চাওয়া পাওয়া তাদের সম্পর্কের ওঠা নামা তাদের জৈবিক ও মানসিক সংকট সবকিছুর সাক্ষাৎ দলিল নির্মাণ করতে পারতেন। এ অংশেও বা এই ছবির নির্মাণেও তার সে যত্নের ত্রুটি ছিল না।

১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবির তালিকা।
ছবির পরিচালক হিসেবে সুকুমার দাসগুপ্ত আর একটি ছবি করে নিজের ক্যারিয়ার ইতি টানবেন। তিনি যতদিন উত্তম কুমারকে পেয়েছেন অন্য কোন অভিনেতাকে দিয়ে খুব বেশি ছবি করাননি। সেই পরিচালক খুব যত্ন নিয়ে ছবির প্রতিটি অংশ নির্মাণ করেছেন কারণ সময়ের সাথে সাথে তিনিও পরিণত হয়েছেন।
উত্তম-সুচিত্রার ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতেন এবং উত্তম কুমার নিজে যখন চলচ্চিত্র শিল্পের অভিভাবক হতে চলেছেন—এই দুটি পর্বের রাখিবন্ধন সুকুমারবাবু খুব ভালো করে করতে পেরেছিলেন তাই ছবিটি কালো উত্তীর্ণ হয়েছে বলে মনে হয়।—চলবে।
উত্তম-সুচিত্রার ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতেন এবং উত্তম কুমার নিজে যখন চলচ্চিত্র শিল্পের অভিভাবক হতে চলেছেন—এই দুটি পর্বের রাখিবন্ধন সুকুমারবাবু খুব ভালো করে করতে পেরেছিলেন তাই ছবিটি কালো উত্তীর্ণ হয়েছে বলে মনে হয়।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















