শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

বনবাসের শেষ পর্যায়ে রামের সঙ্গে মহর্ষি অগস্ত্যের সাক্ষাৎকার হয়েছিল। মহর্ষির আশীর্বাদধন্য রাম তাঁর নির্দেশানুসারে পঞ্চবটীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যাত্রাপথে, সম্মুখে মহাপরাক্রমশালী বিশালাকৃতি এক শকুনের দেখা পেলেন তিনি। সেই অরণ্যমধ্যে শকুনকে দেখে মহাভাগ রাম ও লক্ষ্মণ, পাখিটিকে রাক্ষসভ্রমে জিজ্ঞাসা করলেন, কো ভবানিতি আপনি কে? সেই পাখি স্নিগ্ধ মধুরবচনে তাঁদের প্রতি প্রীতিভরে আত্মপরিচয় দিলেন, উবাচ বৎস মাং বিদ্ধি বয়স্যং পিতুরাত্মনঃ। বাছা, আমায় তোমার পিতার বন্ধু বলে জেনো। রাঘব রাম, তাঁকে পিতৃসম সম্মান প্রদর্শন করে নাম ও বংশপরিচয় জানতে চাইলেন। রামের কথা শুনে পাখিটি তখন নিজের নাম, বংশ ও প্রসঙ্গক্রমে সব প্রাণীদের উৎপত্তি বর্ণনা করতে লাগলেন। তিনি পূর্ববর্তী প্রজাপতিদের নাম বললেন। প্রথম প্রজাপতি ছিলেন কর্দ্দম। তারপরে প্রজাপতি হলেন বিকৃত। শেষে এলেন সংশ্রয়, তিনি ছিলেন শৌর্যশালী ও বহু পুত্রবান। এর পরে প্রজাপতি হলেন যথাক্রমে স্থানু, মরীচি, অত্রি, মহাবলী ক্রতু, পুলস্ত্য, অঙ্গিরা, প্রচেতা, পুলহ, দক্ষ, সূর্য ও অরিষ্টনেমি।
সবশেষে প্রজাপতি হলেন মহাতেজা কশ্যপ। প্রজাপতি দক্ষের ষাটটি কীর্তিমতী কন্যা বিখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অদিতি, দিতি, দনু, কালকা, তাম্রা, ক্রোধবশা, মনু ও অনলা নামের আটজন সুন্দরী কন্যাকে বিবাহ করেন কশ্যপ। কশ্যপ প্রীতিভরে কন্যাদের বললেন, তাঁরা কশ্যপতুল্য ত্রিলোকপালক পুত্রদের জন্ম দেবেন। অদিতি, দিতি, দনু ও কালকা এই বিষয়ে (পুত্রদের জন্মদানবিষয়ে) মনোনিবেশ করেন। অন্যরা এই বিষয়ে মনোযোগ দিলেন না। অদিতি তেত্রিশজন দেবতার জন্ম দিলেন। তাঁরা হলেন দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র ও দুই অশ্বিনীকুমার। দিতি যশস্বী দৈত্যদের জন্ম দিলেন, তাঁদের আয়ত্তাধীন ছিল, অরণ্যসমেত সসাগরা ধরিত্রী। অশ্বগ্রীব নামে এক পুত্রের জন্ম দিলেন দনু। কালকার হল নরক ও কালক নামে দুই পুত্র সন্তান। তাম্রা প্রসব করলেন, ক্রৌঞ্চী, ভাসী, শ্যেনী, ধৃতরাষ্ট্রী ও শুকী,এই পাঁচ জগদ্বিখ্যাত কন্যাকে। ক্রৌঞ্চী উলূক অর্থাৎ পেঁচাদের, ভাসী ভাস অর্থাৎ শকুনদের, শ্যেনী মহাতেজস্বী শ্যেনদের অর্থাৎ বাজপাখিদের এবং গৃধ্রদের (শকুন), ধৃতরাষ্ট্রী হংস, কলহংস ও চক্রবাকদের জন্ম দিলেন। শুকী প্রসব করলেন নতাকে এবং নতার কন্যা হলেন বিনতা। ক্রোধবশার হল দশটি কন্যা। তাঁরা হলেন, মৃগী, মৃগমন্দা, হরী, ভদ্রমদা, মাতঙ্গী, শার্দ্দূলী, শ্বেতা, সুরভি ও সুলক্ষণা সুরসা এবং কদ্রুকা। জটায়ু এইভাবে বিশদে প্রাণীকুলের উৎপত্তি বর্ণনা করতে লাগলেন। মৃগী মৃগদের জন্ম দিলেন। মৃগমন্দার গর্ভজাত সন্তান হল ঋক্ষ অর্থাৎ ভল্লুক, সৃমর নামে মৃগবিশেষ এবং চমরী মৃগ। ভদ্রমদার কন্যা ইরাবতী। ইরাবতীর পুত্র হল পৃথিবীর মহাগজ ঐরাবত। হরীর গর্ভজাত সন্তান— সিংহ, তপস্বী বানর ও গোলাঙ্গুল।মাতঙ্গী হাতিদের এবং শার্দূলী বাঘদের জন্ম দিলেন। শ্বেতার গর্ভে জন্ম নিল দিগ্গজরা। সুরভির হল দুই যশস্বিনী কন্যা, রোহিণী ও গন্ধর্বী। রোহিণী গোসমূহ ও গন্ধর্বী অশ্বদের জন্ম দিলেন। সুরসার সন্তান হল নাগগণ। কদ্রূ জন্ম দিলেন পন্নগ অর্থাৎ সাপদের। মনু কশ্যপের ঔরসে মানবদের প্রসব করেন। মানবগণ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র, এই চার বর্ণে বিভক্ত ছিল। বেদ অনুসারে, মুখ হতে ব্রাহ্মণদের,বুক হতে ক্ষত্রিয়দের, ঊরু দুটি হতে বৈশ্যগণের এবং চরণ দুটি হতে শূদ্রদের উৎপত্তি হল। অনলা হতে জন্ম নিল পুণ্যফলদায়ক তরুরাজি।শুকীর পৌত্রী বিনতা। সুরসার ভগিনী কদ্রূ। কদ্রূ, পৃথিবীধারণকারী সহস্র নাগের জন্মদাত্রী। বিনতা, গরুড় ও অরুণ নামে দুই পুত্রের জন্ম দিলেন। জটায়ু নিজের পরিচয় প্রকাশ করলেন, তস্মাজ্জাতোঽহমরুণাৎ সম্পাতিশ্চ মমাগ্রজঃ। জটায়ুরিতি মাং বিদ্ধি শ্যেনীপুত্রমরিন্দম।। হে শত্রুদমনকারী রাঘব, আমি অরুণের ঔরসজাত এবং শ্যেনীর সন্তান। সম্পাতি আমার জ্যেষ্ঠ অগ্রজ। আমার নাম জটায়ু। রামের পিতৃবন্ধু স্নেহশীল জটায়ু প্রস্তাব দিলেন, সোঽহং বাসসহায়স্তে ভবিষ্যামি যদীচ্ছসি। সীতাঞ্চ তাত রক্ষিষ্যে ত্বয়ি যাতে সলক্ষ্মণে।। যদি তুমি সম্মত হও, তবে, বনবাসকালে আমি তোমার সহায় হব। বাছা, যখন তুমি লক্ষ্মণসহ অন্যত্র যাবে আমি তখন সীতাকে রক্ষা করব।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯২: অবিবেচনা যত দ্রুত সিদ্ধান্ত আনে, তত দ্রুত ধ্বংসও আনে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ

রাঘব রাম জটায়ুর বন্দনা করে সানন্দে আলিঙ্গন করে বিনত হলেন। শুদ্ধচিত্ত রাম, পিতার সঙ্গে জটায়ুর বন্ধুত্বের কথা তাঁর মুখ হতে বার বার শুনতে লাগলেন। রাম, সীতার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মহাবলশালী জটায়ুর হাতে ন্যস্ত করলেন। জটায়ুকে সঙ্গে নিয়ে, শত্রুদহনের ইচ্ছায় এবং অরণ্যরক্ষার্থে পঞ্চবটীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন রাম।

হিংস্রশ্বাপদ ও হরিণে পরিপূর্ণ পঞ্চবটীতে উপস্থিত হয়ে রাম,দীপ্ততেজা লক্ষ্মণভায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, মহর্ষি অগস্ত্য যে দেশের কথা বলেছেন সেই দেশেই তাঁরা এসেছেন। এই সেই ফুলেভরা পঞ্চবটী। কোনও জায়গায় আশ্রমনির্মাণ সমীচীন হবে, সেটি নিরূপণ করবার নৈপুণ্য লক্ষ্মণের আছে। লক্ষ্মণ, বনের সর্বত্র নিরীক্ষণ করে দেখুন, কোনখানে আশ্রমনির্মাণ সম্ভব। রাম নির্দেশ দিলেন, হে লক্ষ্মণ, যেখানে বৈদেহী আনন্দে ঘুরে বেড়াবেন, সেই সঙ্গে আমি এবং তুমিও। যাঁর কাছেই থাকবে জলাশয়। রমতে যত্র বৈদেহী ত্বমহং চৈব লক্ষ্মণ। তাদৃশো দৃশ্যতাং দেশঃ সন্নিকৃষ্টজলাশয়ঃ।। রাম আরও বললেন, এমন স্থান যেখানে আছে গাছপালাভরা এমন বন,যে বনে সহজলভ্য জল, সমিৎ অর্থাৎ যজ্ঞের কাঠ, ফুল ও কুশ যেখানে সুলভ। এই কথা শুনে, লক্ষ্মণ, করজোড়ে দেবী সীতার উপস্থিতিতে রামকে বললেন,আপনার শতবর্ষব্যাপী জীবদ্দশায় আমি যে পরাধীন (আপনার অধীন)। আপনি পছন্দসই জায়গাটি বেছে নিয়ে আমায় জানান। পরবানস্মি কাকুৎস্থ ত্বয়ি বর্ষশতং স্থিতে। স্বয়ন্তু রুচিরে দেশে ক্রিয়তামিতি মাং বদ।।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

লক্ষ্মণের কথায় মহাদ্যুতিমান রাম তৃপ্ত হয়ে সানন্দে, বিবেচনা করে সর্বগুণযুক্ত একটি স্থান নির্বাচন করলেন। সেই সুন্দর জায়গাটিতে গিয়ে, লক্ষ্মণের হাত ধরে আশ্রমনির্মাণের কাজসম্বন্ধে বললেন, এই সমতল সুন্দর জায়গাটি পুষ্পিততরুরাজিতে পরিপূর্ণ। এখানেই একটি রমণীয় যথাযোগ্য আশ্রম নির্মাণ কর। ইহাশ্রমপদং রম্যং যাবৎ কর্ত্তুমর্হসি। অদূরেই দেখা যায় মনোরম এক নদী, পদ্মের সুগন্ধযুক্ত সূর্যসম প্রস্ফুটিত কমলদল তার শোভা। আত্মমগ্ন মহর্ষি অগস্ত্য যেমন বলেছেন, এই সেই গোদাবরী নদী, যাঁর দুই তীর ব্যাপ্ত করে আছে কুসুমিত তরুদল। কত হাঁস, কারণ্ডবে সমাকীর্ণ, নদীটির শোভা হল চক্রবাক, সেখানে মৃগযুগলেরা সাবলীলভাবে বিচরণরত। ময়ূরের কেকারব নিনাদিত রম্য গিরিগুহাগুলি, দৃশ্যমান পর্বগুলি পুষ্পিততরুরাজিতে আবৃত। জায়গায় জায়গায় রয়েছে সোনা, রূপা ও তামার বর্ণময় রেখায় চিত্রিত হাতিগুলি,তারা যেন সুন্দরভাবে সজ্জিত জানালার মতো প্রতীয়মান। জায়গাটির শোভা হল সাল, তাল, তমাল, খেজুর, কাঁঠালগাছ আরও আছে নীবার ধান, তিনিশ ও পুন্নাগ। আম, অশোক, তিলক, কেতকী, চম্পক প্রভৃতি পুষ্পিত লতাগুল্মে আবৃত এই জায়গাটি। স্যন্দন, চন্দন, কদম্ব, কাঁঠাল, লকুচ, ধব, অশ্বকর্ণ, গদির, শমী, পলাশ, পাটল, এই সব গাছে ভরা পবিত্র রমণীয় এই আশ্রম বহু হরিণ ও পাখিতে পরিপূর্ণ। রাম জানালেন, ইহ বৎস্যাম সৌমিত্রে সার্দ্ধমেতেন পক্ষিণা। হে সৌমিত্র লক্ষ্মণ, এই পাখির (জটায়ুর) সঙ্গে এখানেই বাস করব। পরমবীরদের নিহন্তা লক্ষ্মণকে রাম এই কথা বলায়, মহাবলশালী লক্ষ্মণ অচিরেই ভাইয়ের জন্য আশ্রম নির্মাণ করলেন। নির্মিত হল বিশাল পর্ণশালা,এর মাটি সমতল, আছে সুদৃঢ় স্তম্ভ (খুঁটি), ছাদটি লম্বা বাঁশ দিয়ে তৈরি। শমীশাখা বিস্তৃত করে, কুশ, কাশ, শর ও পাতা দিয়ে নির্মিত এর আচ্ছাদন। সুমহান বলশালী লক্ষ্মণ, মাটির ওপরের ভাগটি সমতল করে তুলে, রামের বাসযোগ্য অনুপম আবাস সুন্দরভাবে সাজালেন।এরপরে,শ্রীমান লক্ষ্মণ গোদাবরীনদীতে স্নানান্তে পদ্মফুল ও ফল নিয়ে ফিরে এলেন। তারপরে, পুষ্প দিয়ে পুজো করে, যথাবিহিত বাস্তুশান্তি সম্পন্ন করে রামকে আশ্রমটি দেখালেন। সীতা-সহ রাম পর্ণশালায় রমণীয় আশ্রমটি দেখে অতি আনন্দ লাভ করলেন। প্রীতিভরে লক্ষ্মণকে বাহুবেষ্টনে জড়িয়ে ধরে, অতি স্নেহস্নিগ্ধ প্রগাঢ়স্বরে বললেন, হে কর্মবীর, তুমি এই মহৎ কাজটি করেছ। সেই কারণেই তোমার পুরস্কার এই আলিঙ্গন। প্রীতোঽস্মি তে মহৎ কর্ম্ম ত্বয়া কৃতমিদং প্রভো। প্রদেয়ো যন্নিমিত্তং তে পরিষ্বঙ্গো ময়া কৃতঃ।। রাম,অকপটে জানালেন, লক্ষ্মণ ভাবজ্ঞ, কৃতজ্ঞ ও ধর্মজ্ঞ, তোমার মতো পুত্র থাকতে আমাদের পিতার মৃত্যু হলেও, তা মৃত্যু নয়।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫২: আকাশ এখনও মেঘলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)

লক্ষ্মীমন্ত রাঘব রাম, লক্ষ্মণকে এমন কথা বলে,সেই বহুফলদায়ক জায়গাটিতে বাস করতে লাগলেন। ধর্মপ্রাণ রামের সেবায় নিরত হলেন দেবী সীতা ও লক্ষ্মণ। সুরলোকের দেবতাদের মতো রামচন্দ্র কিছু সময় সেখানে অবস্থান করলেন।

পঞ্চবটীবনের যাত্রাপথে রামের সঙ্গে জটায়ুর সাক্ষাৎ হল। রাম জানলেন,জটায়ু পাখী তাঁর পিতার বন্ধু। প্রাণী ও মানুষের মিত্রতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত জটায়ুর সঙ্গে রামের পিতার মিত্রতা। রামের আছে বিশ্ব চরাচরের সব প্রাণীদের সঙ্গে সখ্যতার মহান পরম্পরাগত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মহাকাব্যের পাখী, বানর প্রভৃতি তথাকথিত নামানুষেরা মানুষের ভাষায় কথা বলে। সেখানে প্রাণীদের মধ্যে মমত্ববোধ, করুণা, প্রীতি প্রভৃতি মানবিকগুণের প্রাচুর্য, মানুষের থেকে কোন অংশে কম তো নেই-ই বরং কোন কোন ক্ষেত্রে এই বিষয়ে মানুষকে পরাজিত করায়, তাঁদের উত্তরণ যেন এক মহান উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রকৃতিতে মানুষ ও মানুষের থেকেও ইতর প্রাণীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ভাববিনিময় ও ভালবাসার আদানপ্রদানে আস্থাশীল ছিলেন আদিকবি।তারই যেন উদাহরণসহ আদর্শ স্থাপন করেছেন ঋষি কবি বাল্মীকি। মিথ্ শুধু কল্পকথা থাকেনি সেটি যেন জীবনের গভীরে প্রবেশ করে আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছে বিশ্বচরাচরকে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

রাম জটায়ুকে পিতৃতুল্য সম্মান প্রদর্শন করেছেন। জটায়ু তাঁর বন্ধুত্বের ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি রামের অনুপস্থিতিতে স্বেচ্ছায় সীতাকে রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি রামের যাত্রাপথে সঙ্গীও হয়েছেন। জটায়ু তাঁর দায়িত্বপালনের দায়বদ্ধতা কীভাবে পালন করেছিলেন,সময় সেটা জানে, আর জানে আপামর ভারতবাসী। সুপ্রাচীনকাল থেকেই তাঁদের পৃথিবীখ্যাত পক্ষিপ্রীতির মহিমা এতটাই, তাই পাখী লোককথা ও কাব্যকথার একেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। পাখিদের প্রতি ভালবাসা ভারতবাসীদের অন্তরাত্মায় মিশে রয়েছে। সেই রক্তে মেশা ভালবাসা এখনও আধুনিক ভারত ভুলে যায়নি,মনে রেখেছে এবং প্রজন্মান্তরেও নিশ্চয়ই তা ধরে রাখবে।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

পঞ্চবটীতে রাম, কর্মদক্ষ ভাই লক্ষ্মণকে তাঁদের বাসযোগ্য পর্ণকুটিরনির্মাণের দায়িত্ব দিলেন। বৈদেহীর স্বাচ্ছন্দ্য এবং তাঁদের দুই ভাইয়ের আনন্দ যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে সেইদিকে লক্ষ্য রাখতে নির্দেশ দিলেন রাম। রামের ছায়া যে লক্ষ্মণ। তাই রাম বিনা তাঁর স্বতন্ত্র কোন অস্তিত্ব নেই। রামের পর্ণকুটিরের নির্মাতা লক্ষ্মণ। এ যেন রামের জীবনের সস্নেহ মায়াময় শ্রদ্ধার আশ্রয়। ছাদটি সুরক্ষার ঘেরাটোপ, স্তম্ভ দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে নিরাপত্তার আধার ছাদটিকে, শমীশাখার আশ্রয়ে নরম পেলব পাতাগুলি শ্রদ্ধা সম্ভ্রমবোধের প্রতীক হয়ে আড়াল করে রেখেছে অমোঘ যত দুর্বিপাকের অভিঘাত। রামের মাথার ওপরে এমন সুশীতল স্নিগ্ধ ছায়াময় আশ্রয় যেন লক্ষ্মণ। রামের পায়ের তলার সমভূমির স্রষ্টা তিনি। জীবনের ঝড়,বৃষ্টি,উত্তাপের রোষ সহ্য করে, তিনি স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়েছেন রামের পাশে। বড় শ্রদ্ধায় ভালবাসায় পিছুটান অগ্রাহ্য করে মাথার ওপরে ছায়া নিবিড় আশ্রয় হয়ে রয়েছেন এই হিংস্রশ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে। পর্ণকুটিরটি যেন ভারতীয় গার্হস্থ্যজীবনের প্রতিচ্ছবি।যেটির বিনির্মাণে প্রত্যেক অগ্রজ থেকে অনুজ পর্যন্ত সকলের অবদান রয়ে যায়। অনুজের শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম, ভালবাসার প্রতিদানে জ্যেষ্ঠ, তাঁদেরকে গভীর মায়ায় বাঁধনে জড়িয়ে রাখেন। পিতার গভীর পারিবারিক মমত্ববোধ প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়ে এক আবহমান স্নেহ মায়ার ফল্গুস্রোত প্রবাহিত হতে থাকে। তাই দশরথের মতো পিতাদের মৃত্যু নেই। প্রজন্মান্তরে লক্ষ্মণের মতো পুত্রদের মধ্যে, তাঁদের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত ঐক্যবন্ধন, কালের বলিরেখাঙ্কিত প্রলেপ অগ্রাহ্য করে সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। এইভাবেই বয়ে চলে অনাবিল, স্বচ্ছ প্রেমময় ভারতীয় জীবন।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content