শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
মানুষের ঐহিক অস্তিত্ব দুঃখময় না আনন্দঘন? প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি-জীবন-মৃত্যু-সুখ-শোকের টানাপোড়েন অভিভূত করে চলে এই চলমান জগতে, যে জগতে “চরৈবেতি”র উদ্ঘোষণা, “অতিমৃত্যুমেতি”র অবিনশ্বর দৃঢ়নিশ্চয় সঙ্কল্পের পাশেই মৃত্যুকঠিন শোকমেদুর জীবনে বিমূঢ় সংশয়, তীব্র মর্ত্যমায়া, অনিত্যের আকাঙ্ক্ষার মোহপাশ। তত্ত্ব-দর্শন এবং জাগতিক অভিজ্ঞতাসঞ্জাত বোধের মধ্যে সংঘাত ও সমন্বয়ের পরিসর অতিক্রম করতে করতে জগত্ ও জীবনজুড়ে ভেসে থাকা নানা সংশয়, জিজ্ঞাসা, বেদনার ভার বহন করে, অতিক্রম করেই মানুষ পূর্ণ হয়। সেখানে তার ঐহিক আবেগ এবং সম্ভাব্য ক্রমোত্তরণ উভয়-ই সত্য বলেই মনে হয়। তাত্ত্বিক অজ্ঞানে অভিভূত আচ্ছন্ন ক্লেশদীর্ণ যে জীবন অনন্তের আহ্বান থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে বলেই প্রসিদ্ধি, সেই জীবনের চলার পথ দীর্ঘ সংঘাত, দ্বন্দ্বে শোণিতপিচ্ছিল, ক্ষমতা, সম্পদের অধিকার ও অহংবোধের পাশেই অনিবার্য হয়ে জেগে থাকে মৃত্যু, জীবনের পরিণতি। তা পরম না চরম, শোকাবহ না স্বাভাবিক, আকাঙ্ক্ষিত নাকি উপেক্ষিত, বিচ্ছেদ নাকি মিলন এই নিয়ে প্রভূত চর্চা ও চর্যা, তথ্য ও তত্ত্বের পরে তা জন্মের মতোই একটি জৈবিক পরিণাম বা অবস্থান্তর বলে গ্রহণ করতে পারলে অনন্ত কলস্রোতের মাঝে একটি জীবন থেকে জেগে ওঠা আরেকটি জীবনদীপের স্বাতন্ত্র্যের ক্ষেত্রটি স্বীকৃত হয়। আজকের জাতকমালার কাহিনি এই দ্বন্দ্বটিকে ঘিরেই প্রকল্পিত।
গল্পে প্রবেশের আগে সেই বৃদ্ধার কথা মনে পড়ে? যিনি নগরের সকল গৃহ ঘুরে ঘুরেও দিনের শেষে কোনও মৃত্যুহীন গৃহ থেকে সংগ্রহ করতে পারেননি একমুঠো সর্ষপ, সর্ষের দানা। যদি তা মিলে যেত কোনও উপায়ে, তাহলে মৃতের পুনরুজ্জীবন ঘটতো এই মরলোকে। তবে তা তো হল না, হয় না বলেই। বুদ্ধদেবের কাছে তিনি ফিরে এসেছিলেন ভগ্নহৃদয়ে। স্বজনের যে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু তাঁকে ধ্বস্ত করেছিল, তার থেকে উত্তরণের কোনও পথ তিনি পেয়েছিলেন হয়তো বুদ্ধদেবের উপদেশে। আজকের গল্পেও সেই পরিচিত তত্ত্বটিই পরিবেশিত ভিন্নতর আঙ্গিকে, এখানেও এক বিমূঢ় অবুঝ হৃদয় চক্রের গতিকে যেন বিপরীতগামী করতে চায়, পারে কি?
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৭: অরণ্যজাতক : বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৭: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — পাতিশিয়াল

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৫: আকাশ এখনও মেঘলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯৫ : রাজনীতির দাবার ছকে ত্যাগের মহাকাব্য: এক অন্য পঞ্চতন্ত্রের খোঁজে

সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব এক ভূস্বামিপুত্র, নাম তাঁর সুজাতকুমার। তিনি ক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক হলেন। এইসময় তাঁর পিতামহ লোকান্তরিত হলেন। এই বিয়োগে সুজাতের পিতা এতোই শোকাকুল হলেন যে, শ্মশান থেকে বৃদ্ধের চিতাভস্ম থেকে অস্থি সংগ্রহ করে বাসভবনের উদ্যানে এক মৃন্ময়স্তূপ নির্মাণ করে নিয়মিত সেখানে পুষ্পার্পণ ও পূজা করতেন। তিনি সর্বদাই শোকভারে নিতান্ত ব্যথিত হয়ে থাকতেন। ক্রমে ক্রমে ত্যাগ করলেন ভোজনস্নানানুলেপনাদি। বিষয়কর্মেও তীব্র নিরাসক্তি এল।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

সুজাতকুমার পিতার এই মনোভার লাঘবের জন্য মনে মনে এক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। তিনি প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিত ছিলেন। তাই বীতরাগ শোকবিহ্বল মানবহৃদয়ের চৈতন্যসম্পাদনের উপযোগী অন্তর্দৃষ্টি তাঁর ছিল।

তাই একদিন নগরের বাইরে একটি মৃত গরুর সন্ধান পেয়ে তিনি সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন। মৃত গরুটির মুখের কাছে ঘাস-জল নিয়ে গিয়ে বার বার তাকে খেয়ে নেওয়ার অনুরোধ উপরোধ জানাতে লাগলেন। শুভাকাঙ্ক্ষীরা নানাভাবে বোঝাতে লাগল, নিষেধ করল। শেষে নিবৃত্ত করতে না পেরে তাকে উন্মাদ মনে করে তার পিতার কাছে গিয়ে পুত্রের এই উন্মত্ততার সংবাদ জানালো শীঘ্র। এই সংবাদে ভূস্বামীর পিতৃশোক অপগত হয়ে পুত্রশোক জন্মাল। ব্যাকুল হয়ে তিনি ছুটে গেলেন পুত্রের কাছে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫২: শিকার এবং শিকারী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

বড়-র ডাক এলে ছোট ভেসে যায়। জীবনে বৃহত্তর বর্তমান সমস্যা অতীতের গ্লানি, সংশয়, বিপন্নতা, দুঃখকে নিমেষে অপসৃত করে।

ভূস্বামী পুত্রের কাছে সমাগত হয়ে জানতে চাইলেন পণ্ডিত হয়েও তার এমন অসংলগ্ন কাজের কারণ কি? অন্নজলে তো ওই মৃত গরুর দেহে প্রাণসঞ্চার ঘটবে না। গরুটি যে মৃত! তবে ধীমান মানুষের এমন প্রলাপের কী অর্থ?
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮২ : সখের চোর

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

“কেন নয়?” সুজাত তার যুক্তিজাল বিস্তার করে। “গরুটির মাথা, চারটি পা, দুটি কান সকলকিছুই তো দৃশ্যমান, যেন এখনই সে গাত্রোত্থান করে চরে বেড়াতে উদ্যত হবে। তাই তাকে অন্নজলে প্রলুব্ধ করাই যায়! তুলনায় আমার গতায়ু পিতামহের নশ্বর হস্তপদাদি ভস্মীভূত হয়ে গেছে, সেগুলি আর দৃশ্যমান না হলেও আপনি বেদনাবিধুর, রোদনকাতর। আপনার এই কাজ যদি সম্ভব হয় তবে এটি কী দোষ করল? হ্যাঁ, তবে এখন আপনিই বিচার করুন কে বড় পাগল!”

মুহূর্তে পিতার সত্যদৃষ্টি উন্মুক্ত হল। তাঁর চৈতন্যোদয় ঘটল। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, প্রাজ্ঞ পুত্রটি তাঁর জ্ঞানাঞ্জনশলাকা দিয়ে তাঁকে প্রবোধিত করেছে। এখন জগতের অনিত্যতার স্বরূপ নিয়ে তাঁর আর কোনও সংশয় নেই, গ্লানি নেই। এখন তিনি শোকোত্তীর্ণ। ঘৃতপুষ্ট প্রজ্জ্বলিত অগ্নি জলের সান্নিধ্যে নির্বাপিত হয়। প্রজ্ঞাবান ও হৃদয়বান মানুষের যথার্থ ও যথাকালীন উপদেশে শোকশল্যের পীড়নে হৃদ্গত মালিন্য মুছে গিয়ে জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটে। সুজাতকুমারের পিতা পুত্রের প্রচেষ্টায় মৃত্যুর স্বরূপ, জীবনের মাহাত্ম্য এবং জীবন-মৃত্যুর ব্যবধানের মাঝে ঘনীভূত সংশয় থেকে সত্যসদনে উত্তরণের পথটির সন্ধান পেয়েছিলেন বলে মনে হয়।
—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content