রবিবার ৭ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সত্যি বলতে কি শঙ্করের কিছু করবার নেই। আজকের পুরো দিনটা মনে হচ্ছে মাঠে মারা গেল। দেশে থাকতে গোপনে স্বদেশীর দল করত। সাত সকালে গোটা পাঁচেক কালমেঘ আর থানকুনির কাঁচাপাতা চিবিয়ে প্রথমে সাঁতার। তারপর একখানা গোটা পাতি লেবুর সঙ্গে সামান্য বিটলবণ মিশিয়ে বড় এক গ্লাস ছাতুর জল। শুরু হত কুস্তি যোগাসন লাঠি খেলা। তারপর ইস্কুল। আর দিনের শেষে ঘন হয়ে আসা সন্ধ্যায় ‘তারা মা’ আখড়ার ঝাঁপ ফেলা ডেরায় হ্যারিকেনের আলো নিভু করে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি। আঁধার নামা বাদাড়ে বন্দুকের টিপ প্র্যাক্টিস। একের পর এক প্রশিক্ষণ শিবির। গরম রক্তের স্রোত বইত স্নায়ুতে শিরায়। মাঘের শীতেও গায়ে পশম উঠত না।

হাইস্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড ব্রজেন মাস্টারমশাই হাতে ধরে পথ দেখাতেন। মধ্যে মধ্যে নিয়ে আসা হত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ছেলেরা হুমড়ি খেয়ে তাঁদের পায়ের কাছে বসে শুনতো সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাস। জীবনের অবিশ্বাস্য সব অভিজ্ঞতা। আদিনাথের তৃতীয় পুত্র এবং সুনীতির প্রথম সন্তান শংকর তার বয়ঃসন্ধি মনের কোষে কোষে সঞ্চয় করে রাখতো সেই অমৃত কথন। অবশ্যই বাড়ির এবং পাড়ার চোখে ধুলো দিয়ে।

এদেশে এসে সব গোল্লায় গিয়েছে। শঙ্কর তবু একাই চালিয়ে যাচ্ছে যতটা সাধ্য। স্বাধীনতার এখন এক বছর বয়স। ব্রিটিশের ফেলে যাওয়া থুতু চেটে কিছু মানুষ এখন সেই স্বাধীনতার রস নিংড়ে ছিবড়ে করে দেবার তালে আছে। গরিব মানুষের বেঁচে থাকার শিকড়ে বিষ মেশাচ্ছে। লোভের জিভ নাভি অব্দি ঝুলছে ওদের। আদিগন্ত ভূমিপথ আবনান্ত বীথিপথের মধ্যিখানে এখন অনিঃশেষ ষড়যন্ত্রের নিথর দেওয়াল। সেই দেওয়ালের অচিন পাড়ে আজ শংকরদের মত মানুষের উদ্বাস্তু জীবন। তবে ওর দৃঢ় বিশ্বাস, এভাবে চলবে না। গরিব মানুষ আগুন জ্বালাবেই। পরিষ্কার বুঝে নেবে নিজেদের ফসলের ভাগ। জমির জিরেত। শ্রম আর ঘামের দাম। ওদের সঙ্গে তখন একশো ভাগ জুড়ে থাকবে শঙ্কর।
কলকাতা আর ডায়মন্ডহারবারে কয়েকটা গোপন ঠেক বানানো হয়েছে। কলকাতায় আজ যাবার কথা ছিল। আফজাল রসিক পানু এতক্ষণে নিশ্চয়ই পৌঁছে গিয়েছে। তিলজলা বাই লেনের আট নম্বর বস্তি। কেষ্ট মেসোর দশ বাই সাত ফাঁকা খুপরি। সন্ধ্যে ছটায় মিটিং। শ্যামাপল্লী থেকে ওখানে পৌঁছে যাবে শঙ্কর আর নির্মল। পাঁচ মুন্ডু এক হবে। বেলেঘাটার অ্যাসিড কারখানা থেকে বোমার মসলা আসছে। সঙ্গে কিছু ব্লু-প্রিন্ট। নিউ এক্সপেরিমেন্ট। নিউ টার্গেট।

সব ঠিক ছিল। কিন্তু বাদ সাধল প্রকৃতি। দুপুর থেকে আকাশের বুকে ছাই। ছাই রং ক্রমে নিকষ কালো। দুপুর দুটো নাগাদ চিলতে আলো দেখা দিয়েই হারিয়ে গিয়েছে গুমোট আঁধারের নিচে। সঙ্গে অঝোর বৃষ্টি। লাইনে জল। ট্রেন বন্ধ। বাড়ির পাশে খেজুর গাছের উঁচু ঢিপিতে বাঁশি নিয়ে বসেছে শঙ্কর। ডায়মন্ড হারবার থেকে সুদূর তিলজলা বস্তি। বংশীধ্বনি তো অতদূর পৌঁছবে না। মুচকি হাসল শঙ্কর। পৌঁছনোর কথা নয়। কিন্তু তবুও যেন উড়ে গেল। আর ফিরে এলো অন্য কোন সংবাদ নিয়ে।

নবীন আসছে ছুটতে ছুটতে। সমুদ্রের নোনা জল গায়ে মাখা তাগড়া নবীন চন্দ্র। সেজদা বলতে অজ্ঞান। আদিনাথ দাশগুপ্তর খাস চাকর ছিল নবীনের বাবা অনন্ত মাহাতো। তখন ওরা পাকাপাকি পূর্ববঙ্গে। ক্ষুদে শঙ্কর অনন্ত কাকার কোলে পিঠেই বড় হয়েছে। কোটালিপাড়ায় আদিনাথের বিপুল সম্পদ এবং প্রতিপত্তির মধ্যে। তারপর শুধুই ভাঙচুর। গুঁড়িয়ে যাওয়া দাপটের ধুলোকণায় প্রভুভৃত্যের বনেদি রেয়াৎ এখন নেই। কেবল তার একটা অস্পষ্ট আভা রয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২: মালা বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৫ ন হন্যতে

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৭, অন্য পুজো: ইতিহাসের আলোকে ত্রিপুরায় দুর্গাপূজা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৯: হাট্টিমা

পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমে চলে আসা অগুন্তি মানুষের মধ্যে আদিনাথদের দলে ভিড়েছিল অনন্ত। বড় বড় ট্রাঙ্ক তোরঙ্গ ছেলেমেয়ে স্ত্রী সবাইকে নিয়ে আদিনাথ যখন তাঁর সম্পন্ন ভিটে ছাড়ছেন অনন্ত নিজের জোয়ান ছেলেকে নিয়ে হাত লাগিয়েছিল স্টেশন পর্যন্ত সব মালপত্র পৌঁছে দিতে। ফরিদপুর রেল স্টেশনে লাগেজ জড়ো করবার পর দেখা গেল ইতস্তত দূরত্বে আরো কিছু পেটরার স্তূপ। গলা পর্যন্ত ঘোমটা টেনে সেখানে বসে আছে অনন্তর বউ সাবিত্রী। চোখে পড়েছিল আদিনাথের।
হেঁকে বলেছিলেন, অনন্ত…বৌমা এখানে ক্যান? করজোরে অনন্ত বলে, আপনাগো ছাইড়্যা আমরা কুথাকে যাই কত্তা! ক্ষ্যামা করেন, কেবল সঙ্গটুক দ্যান।
ট্রেনে রিজার্ভ কামড়ায় আদিনাথরা বসেছিলেন সিটে। আর অনন্ত সপরিবারে মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে। ট্রেন শিয়ালদা পৌঁছয়। স্টেশনে নেমে ঘনিয়ে আসে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ সময়। শিয়ালদহের লোকারণ্যময় অনিশ্চিতে আদিনাথ ছেড়ে দিতে চান অনন্তদের হাত। সেই মুহূর্তটা আজও ছবি হয়ে আছে শঙ্করের আত্মায়। বাবা ফাঁকা গলায় অকারণ জোর লাগিয়ে অনন্ত কাকাকে বলছিলেন, অনেক হইছে সঙ্গলাভ। এবার আগায়ে যা দেখি অনন্ত ত’র বোনের বাসায়, যেথা যাইবি কইছিলি!
ফ্যাকাসে মুখে অনন্ত বলে, ক্যান কত্তা আপনাদের লগে নিবেন না?

এবার সত্যিই রেগে গেছিলেন আদিনাথ। ঝাঁঝিয়ে বলেছিলেন, কইলাম না এখন ত’রা যা। আমরা আগে বাসায় গিয়া থিতু হই, তারপর ত’রা আসবি খন। বড় পোলা চিন্তা করে, আমাগো গাড়ি স্টেশনের বাইরে বহুক্ষণ খাড়্যায়া।

শঙ্কর দেখে, বাবা যেন মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিতে চাইছেন ওদের অস্তিত্ব। পরে অবশ্য গলা নরম হয়েছিল। ভারি চশমার নিচে থমকে ছিল সজলতা। আদিনাথ বলেছিলেন, নূতন জায়গা। বড় মেজ পোলার সাজানো সংসার। ঠাকুর চাকর গাড়োয়ান সবটুক মজুদ ওখানে। বোঝস না? তোদের সকলরে লইয়া আমারে তো ভারী মুশকিলে পড়তে হইব। তাই কই।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৩: মহর্ষিকে অনুসরণ করে তাঁর পত্নীও বাড়ির পুজোতে যোগ দিতেন না

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

অনন্ত আর নবীনের পা সরছিল না। পরিষ্কার বুঝতে পারছিল শংকর। তবু বাবুর আদেশ। চলে যেতেই হবে‌। নকুল বারবার আড় চোখে চাইছিল শঙ্করের দিকে। যদি কিছু একটা বন্দোবস্ত হয়! ধুলোমাখা কয়েক জোড়া পা ধীরে ধীরে অসহায় বাঁক নিচ্ছিল অন্য মুখে। বুকের টনটনে বেদনভার ওদের হা ক্লান্ত পেশি বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল। হয়ত ভাবছিল, কেন এতটা নিষ্ঠুর হলেন তাদের কর্তা মশাই। এমন কি ক্ষতি হতো কলকাতা বাড়ির কোন একটা ঘুজিতে ঠাঁই দিলে! অত্ত বড় সংসার। কাজের লোক তো কতই লাগে! কিন্তু ওরা জানে বাবুমশায়ের না মানে না। আদিনাথ দাশগুপ্তর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবার শক্তি যদি কারোর থাকে তো একমাত্র সেজদার ই আছে। তাই শেষ বারের মত কাতর বোবা চোখ দুটো মেলে শংকরের দিকে চেয়েছিল নবীন।

অনন্তরা চোখের জলে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সেরে একে একে বিদায় নিচ্ছিল।‌ শিয়ালদা স্টেশনের অজানা ভিড়ের মধ্যে বাবা বলছিলেন, সাবধানে যাস অনন্ত অচেনা পথ। বউমারে সাবধান কইরা নিস। ঠিকানা তো আছেই, পরে একসময় আসিস কেমন?
ঠিক তখনই নবীনের উদ্দেশ্যে হাঁক দিয়েছিল শঙ্কর। আদিনাথের দৃষ্টির বিস্ময় আর রুক্ষতাকে মাড়িয়ে। স্পর্ধায়। কৃতার্থ নবীন ছুটে এসে বলেছিল, কিছু কইবেন সেজদা?

শঙ্কর বলে, তোদের কিছু মালপত্র বাইরে রাখ। মাথায় তুলে নিবি। আর ভারী বেডিং পত্তর আমাদের গাড়িতে তোল। নবীন লাফিয়ে ওঠে। এখনই করি সেজদা…বলে ছুট লাগায়। আদিনাথের চোখে ভয়। আবার কী বাঁধাবে কে জানে! শঙ্কর ততক্ষণে পৌঁছে গেছে মায়ের পাশে। মিতভাষিনী সুনীতি বলেন, কি করতে চাস রে শঙ্কু নবীন গো লয়্যা?
লাগবো মা।
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৩: যুধিষ্ঠিরের সভায় উপস্থিত মহর্ষি নারদের প্রশ্নগুলি যেন রাজনীতির সার্বিক দিগদর্শন

শঙ্করের যেন জবাব দেবার শ্রমটুকুও সইছে না আর। হাই তুলে বলে, গোরা দুর্বল মন্টু, রাম ছোট। আর আমার ঘুম পায়। আমি কিছু পারুম না।

বাকরুদ্ধ আদিনাথ অতঃপর দেখেন অনন্ত আর নবীনের তদারকিতে মালপত্রের বিধি বন্দোবস্ত শুরু হয়েছে। আদিনাথের হেরে যাওয়া মুখ। অনন্তর খুশি উপচোনো চোখ। সাবিত্রীকে ডেকে বলে, হেই ছোট বউ। চল আমরাও বাবুদের গাড়ির লগে লগে যাই।
শঙ্কর গলা গম্ভীর করে নবীনকে নির্দেশ দেয়, কাকিরে মায়ের সঙ্গে গাড়িতে বসা। আগে যত্ন কইরা বাবারে তোল।

এতসব কাণ্ড দেখে অনন্তর বউয়ের অস্বস্তির শেষ নেই। গলা পর্যন্ত ঘোমটার নিচে সাবিত্রী ছটফট করতে থাকে। হাসিমুখে সুনীতি তাকে নিজের কাছে ডেকে নেন। হাততালি দিয়ে লাফাতে থাকে সুধা গৌরী রাম আর মন্টু। কটাক্ষে বাবাকে জরিপ করছিল শঙ্কর। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল বাবার বুকের ভিতর অথৈ জলপ্রপাতের শীর্ণ শব্দ। বাইরের শুকনো চামড়ার আস্তরণ ফেটে যে প্রপাত বেরিয়ে আসতে চাইছে। আপাত উদাসীনতার ভারহীন খই আদিনাথকে ঘিরে উড়ছে। উড়ে গিয়ে পড়ছে জল থই থই উজান নদীর ঢেউয়ে। হারিয়ে যাচ্ছে মিশে যাচ্ছে সেই অতল জলের ডাকে।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

শঙ্কর এখন বোঝে শিয়ালদা স্টেশনে সেদিন নবীনদের কেন একটানে ছুঁড়ে দিতে চেয়েছিলেন ওর বাবা। কোন দুর্বিষহ অসহায়তায়। অধীন ভৃত্যের সামনে নিজের শূন্যতায় মোড়া পরাধীন অস্তিত্ব প্রকট হয়ে না যেতে দেবার ভয়ে। কিন্তু যা প্রকট হবার তা হয়েছিল। ৫বি, ডি এল রায় স্ট্রিটের বাড়িতে অনন্তদের প্রবেশ আর প্রস্থানের মধ্যে ছিল মাত্র দু’দিনের সময়সীমা। প্রায় বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়েছিল ওদের। এখন থাক সেসব ভাবনা। পরে অবশ্য ওরা আসত । নিয়মিতই। বিশেষ করে নবীন। ও তো এই পরিবারের ছায়া সহচর। শুধু অনন্ত কাকা আর আসেননি, কলকাতায় আসবার পর দ্রুতগামী রাজপথ ওকে কেড়ে নেয়।

প্রবল বৃষ্টিতে নবীন ভিজে স্নান। হাঁপাতে হাঁপাতে জানাল কলকাতার সংবাদ। তিলজলা বস্তিতে আজ সকালে পুলিশ রেড করেছে। ঘরে ঘরে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছে। কেষ্ট মেসোর ঘরেও। কপাল ভালো কিছু পায়নি। তাই আজকের অপারেশন ক্যান্সেল বলে আফজল দাদারা জানিয়েছে। ওদের সন্দেহ পিছন থেকে কেউ ছুরি মারছে।— চলবে

* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content