
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাম, মহাশক্তিশালী রাক্ষস বিরাধকে হত্যা করে, সীতাকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে, সান্ত্বনা দিলেন। তিনি মহাশৌর্যবান, প্রদীপ্ততেজস্বী,ভাই লক্ষ্মণকে বললেন, এই দুর্গম কষ্টদায়ক বনের পরিচয় আমাদের জানা নেই। কষ্টং বনমিদং দুর্গং ন চ স্মো বনগোচরাঃ। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সত্বর তপস্বী শরভঙ্গের আশ্রমে যাওয়া যাক। রাম, শরভঙ্গের আশ্রমাভিমুখে রওনা দিলেন। তিনি দেবপ্রিয়, তপস্যার দ্বারা প্রভাবিত, শরভঙ্গের আশ্রমের নিকটে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সম্মুখীন হলেন। দেখলেন,ভূমি স্পর্শ না করে শূন্য গগনে বিরাজমান যে উত্তম রথটি, সেই রথে আরূঢ়, মনোহর উজ্জ্বল আভরণে এবং মালিন্যহীন বসনে সজ্জিত দেবগণসহ স্বয়ং সুরেন্দ্র। দেবগণসহ সুরেন্দ্র,সূর্য ও অগ্নিতুল্য কিরণময়, দেদীপ্যমান তাঁর অঙ্গ। রাম দেখলেন, হরিদ্বর্ণ অশ্ববাহিত রথে অবস্থানরত ইন্দ্রকে পূজা করছেন মহান ব্যক্তিত্বগণ। রাম, দূর হতে দেখলেন, যেন বিচিত্রমাল্যে সজ্জিত, চামরযুক্ত নির্মল ছত্রধারণকারী, রথারূঢ়, ইন্দ্র, যেন, পাণ্ডুরবর্ণ মেঘতুল্য চন্দ্রাতপধারণকারী নবীন সূর্যপ্রতিম কিরণময়। তাঁর মস্তকে ব্যজনরত দুই সুন্দরী রমণী। অন্তরীক্ষে অবস্থানরত দেবেন্দ্রর স্তুতিগীতিরত রয়েছেন গন্ধর্ব, দেব, সিদ্ধপুরুষ ও মহর্ষিবৃন্দ। শরভঙ্গমুনির সঙ্গে সম্ভাষণরত, বাসব ইন্দ্র। তাঁর রথের প্রতি, ভাই লক্ষ্মণের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন রাম।
প্রোজ্জ্বল, অপূর্ব শ্রীযুক্ত, অদ্ভুত, গগনমণ্ডলে প্রদীপ্ত সূর্যবৎ রথটি। পূর্বে বহুযজ্ঞকারী দেবরাজের যেমন অশ্বের কথা শুনেছেন, অন্তরীক্ষে অবস্থানরত অশ্বগুলি নিশ্চিত সেই রকমই স্বর্গীয় রূপবান। কুণ্ডলধারী, খড়্গহস্ত, প্রশস্তবক্ষস্থল যাঁদের, পরিঘতুল্য আয়তবাহু বিশিষ্ট, রক্তবর্ণবস্ত্রাবৃত, ব্যাঘ্রতুল্য দুর্ধর্ষ, অগ্নিতুল্য হারে বক্ষ সমুজ্জ্বল, এমন শত শত যুবা, চতুর্দিকে দৃশ্যমান। তাঁদের রূপ দেখে মনে হয় তাঁরা পঞ্চবিংশতিবর্ষীয়। এই প্রিয়দর্শন, পুরুষশ্রেষ্ঠগণ নিশ্চয়ই দেবতা, কারণ দেবতাদের বয়ঃক্রম এমনিই হয়ে থাকে। রাম, লক্ষ্মণকে, তাঁর পর্যবেক্ষণসম্বন্ধে জানালেন। বললেন, যতক্ষণ না রথে অবস্থানরত দ্যুতিমান পুরুষসম্বন্ধে তাঁর নিজের সুস্পষ্ট ধারণা হচ্ছে ততক্ষণ যেন লক্ষ্মণ, বৈদেহী সীতার সঙ্গে মুহূর্ত কাল অপেক্ষা করেন। লক্ষ্মকে নির্দেশ দিলেন রাম, ইহৈব স্থীয়তামিতি এখানেই থাক। শরভঙ্গমুনির আশ্রমের উদ্দেশে রওনা দিলেন তিনি। রামকে অগ্রসর হতে দেখে, শরভঙ্গমুনির সম্মতি নিয়ে সুররাজ, দেবগণকে বললেন, ওই রাম আসছেন, যতক্ষণ রামের সঙ্গে তাঁর কোন কথা হচ্ছে, ততক্ষণ রাম যাতে (ব্রতপালনে) নিষ্ঠা বজায় রাখতে পারেন, তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যের পক্ষে দুষ্কর কর্তব্য সম্পন্ন করতে হবে রামকে, যখন তিনি জয়ী হবেন তখন অচিরেই আমি এনার (আমার দর্শন)উদ্দেশ্য সফল করব। জিতবন্তং কৃতার্থং হি তদাহমচিরাদিনম্। কর্ম্ম হ্যনেন কর্ত্তব্যং মহদন্যৈঃ সুদুষ্করম্।। এই বলে, বজ্রপাণি, অরিদমনকারী ইন্দ্র, তাপস শরভঙ্গমুনিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে, সম্মানিত করলেন। অতঃপর ইন্দ্র, অশ্বচালিত রথে স্বর্গাভিমুখে যাত্রা করলেন। সহস্রাক্ষ ইন্দ্র প্রস্থান করলে,রাঘব রাম, অনুগামীদের সহ শরভঙ্গমুনির কাছে উপস্থিত হলেন। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ তাঁর চরণ স্পর্শ করলেন এবং মুনির অনুমতি নিয়ে উপবেশন করলেন। নিমন্ত্রিত হয়ে,তাঁরা সেখানে আশ্রয় লাভ করলেন। দেবতাদের সেখানে আগমনের কারণসম্বন্ধে জিজ্ঞাসু হলেন রাম। মুনি সমস্ত বৃত্তান্ত রাঘবকে জানালেন।
প্রোজ্জ্বল, অপূর্ব শ্রীযুক্ত, অদ্ভুত, গগনমণ্ডলে প্রদীপ্ত সূর্যবৎ রথটি। পূর্বে বহুযজ্ঞকারী দেবরাজের যেমন অশ্বের কথা শুনেছেন, অন্তরীক্ষে অবস্থানরত অশ্বগুলি নিশ্চিত সেই রকমই স্বর্গীয় রূপবান। কুণ্ডলধারী, খড়্গহস্ত, প্রশস্তবক্ষস্থল যাঁদের, পরিঘতুল্য আয়তবাহু বিশিষ্ট, রক্তবর্ণবস্ত্রাবৃত, ব্যাঘ্রতুল্য দুর্ধর্ষ, অগ্নিতুল্য হারে বক্ষ সমুজ্জ্বল, এমন শত শত যুবা, চতুর্দিকে দৃশ্যমান। তাঁদের রূপ দেখে মনে হয় তাঁরা পঞ্চবিংশতিবর্ষীয়। এই প্রিয়দর্শন, পুরুষশ্রেষ্ঠগণ নিশ্চয়ই দেবতা, কারণ দেবতাদের বয়ঃক্রম এমনিই হয়ে থাকে। রাম, লক্ষ্মণকে, তাঁর পর্যবেক্ষণসম্বন্ধে জানালেন। বললেন, যতক্ষণ না রথে অবস্থানরত দ্যুতিমান পুরুষসম্বন্ধে তাঁর নিজের সুস্পষ্ট ধারণা হচ্ছে ততক্ষণ যেন লক্ষ্মণ, বৈদেহী সীতার সঙ্গে মুহূর্ত কাল অপেক্ষা করেন। লক্ষ্মকে নির্দেশ দিলেন রাম, ইহৈব স্থীয়তামিতি এখানেই থাক। শরভঙ্গমুনির আশ্রমের উদ্দেশে রওনা দিলেন তিনি। রামকে অগ্রসর হতে দেখে, শরভঙ্গমুনির সম্মতি নিয়ে সুররাজ, দেবগণকে বললেন, ওই রাম আসছেন, যতক্ষণ রামের সঙ্গে তাঁর কোন কথা হচ্ছে, ততক্ষণ রাম যাতে (ব্রতপালনে) নিষ্ঠা বজায় রাখতে পারেন, তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যের পক্ষে দুষ্কর কর্তব্য সম্পন্ন করতে হবে রামকে, যখন তিনি জয়ী হবেন তখন অচিরেই আমি এনার (আমার দর্শন)উদ্দেশ্য সফল করব। জিতবন্তং কৃতার্থং হি তদাহমচিরাদিনম্। কর্ম্ম হ্যনেন কর্ত্তব্যং মহদন্যৈঃ সুদুষ্করম্।। এই বলে, বজ্রপাণি, অরিদমনকারী ইন্দ্র, তাপস শরভঙ্গমুনিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে, সম্মানিত করলেন। অতঃপর ইন্দ্র, অশ্বচালিত রথে স্বর্গাভিমুখে যাত্রা করলেন। সহস্রাক্ষ ইন্দ্র প্রস্থান করলে,রাঘব রাম, অনুগামীদের সহ শরভঙ্গমুনির কাছে উপস্থিত হলেন। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ তাঁর চরণ স্পর্শ করলেন এবং মুনির অনুমতি নিয়ে উপবেশন করলেন। নিমন্ত্রিত হয়ে,তাঁরা সেখানে আশ্রয় লাভ করলেন। দেবতাদের সেখানে আগমনের কারণসম্বন্ধে জিজ্ঞাসু হলেন রাম। মুনি সমস্ত বৃত্তান্ত রাঘবকে জানালেন।
শরভঙ্গমুনি কঠোর তপোবলে,অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিদের দ্বারা দুষ্প্রাপ্য ব্রহ্মলোক লাভ করেছিলেন। অধুনা তাঁকে সেই লোকে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক, দেবরাজ ইন্দ্র, এসেছিলেন।কিন্তু পুরুষোত্তম রাম, নিকটেই আছেন জেনে, প্রিয় অতিথিকে না দেখে, মুনি ব্রহ্মলোকে যাননি। শরভঙ্গমুনি পরম প্রীত হয়ে জানালেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ ধার্মিক রাম সমাগত,এইবারে তিনি তাঁর অভীপ্সিত লোকে গমন করবেন। অক্ষয়া নরশার্দ্দূল জিতা লোকা ময়া শুভা। ব্রাহ্ম্যাশ্চ নাকপৃষ্ঠ্যাশ্চ প্রতিগৃহ্ণীষ্ব মামকাঃ।। মুনি অনুরোধ জানালেন, হে নরোত্তম,আমার অর্জিত অক্ষয় স্বর্গলোক ও ব্রহ্মলোক লাভজনিত শুভ পুণ্যফল গ্রহণ করুন। উত্তরে, সর্বশাস্ত্রজ্ঞ, নরবর রাঘব, ঋষি শরভঙ্গকে বললেন, হে মহামুনি, আমি নিজেই এই সকল লোক লাভ করব। অহমেবাহরিষ্যামি সর্ব্বান্ লোকান্ মহামুনে। রাম তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, এই বনে, মুনির উপদিষ্ট একটি আবাস রামের অভিপ্রেত। ইন্দ্রতুল্য শৌর্যশালী রামের এই প্রস্তাব শুনে মহাপ্রাজ্ঞ শরভঙ্গ বললেন, এই অরণ্যে মহাতেজস্বী সুতীক্ষ্ণ নামে ধার্মিক বাস করেন,তিনি রামের কল্যাণ সাধন করবেন। ঋষি রামকে দিক নির্দেশ করলেন, পুষ্পসম্ভার বহন করছে এই মন্দাকিনী নদী, তার বিপরীত দিকে গমন করলেই রাম,সেখানে পৌঁছতে পারবেন। পথনির্দেশের পরে মুনির অনুরোধ, সর্প যেমন, নির্মোক অর্থাৎ জীর্ণ ত্বক ত্যাগ করে তেমন তিনিও এই দেহ ত্যাগ করবেন, শুধু রাম মুহূর্তকাল তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। এষ পন্থা নরব্যাঘ্র মুহূর্ত্তং পশ্য তাত মাম্। যাবজ্জহামি গাত্রাণি জীর্ণত্বচমিবোরগঃ।। ঋষি,অগ্নি সৃষ্টি করে, মন্ত্রপূত ঘৃতাহুতি প্রদান করলেন। অতঃপর মহাতেজা শরভঙ্গমুনি অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। সেই মহাত্মার রোমরাশি, কেশ, জীর্ণ ত্বক, অস্থি, মাংস, রুধির, সমস্ত গ্রাস করলেন অগ্নি। ঋষি শরভঙ্গ, অগ্নিতুল্য হয়ে উঠলেন। অগ্নি থেকে উঠে অচিরেই তিনি অপূর্ব রূপ ধারণ করলেন। তিনি অগ্নির উপাসক ব্রাহ্মণগণের, মহান ঋষিদের এবং দেবতাদের লোক অতিক্রম করে, ব্রহ্মলোকে উপস্থিত হলেন। সেই পুণ্যকর্মা, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, অনুচরসহ পিতামহ ব্রহ্মার দর্শনলাভ করলেন। পিতামহ তাঁকে স্বাগত সম্ভাষণ জানালেন সুস্বাগতমিতি।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৩: যুধিষ্ঠিরের সভায় উপস্থিত মহর্ষি নারদের প্রশ্নগুলি যেন রাজনীতির সার্বিক দিগদর্শন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৪: বিশাল বপু নিয়ে দিনেন্দ্রনাথ ধপাস করে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের উপর

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৩: ডেসডিমোনার রুমাল/২

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৩: শঙ্করের দেশান্তর, আখ্যানের অন্য পথ
স্বর্গলোকে শরভঙ্গের প্রয়াণের পরে, বৈখানস (প্রজাপতি ব্রহ্মার নখজাত), বালখিল্য (প্রজাপতির লোমজাত), সংপ্রক্ষাল (প্রজাপতির চরণামৃত হতে যাঁদের উৎপত্তি), মরীচিপ (চন্দ্র ও সূর্যের কিরণ পান করে প্রাণধারণকারী), অশ্মকুট্ট (অঙ্গে প্রস্তর ধারণ করেন, যেগুলি দিয়ে শস্য পেষণ করা হয়, সেই অপক্ক পিষ্টান্ন ভোজন করেন যাঁরা), বহু পত্রাহার তাপস (পত্রভোজী তাপস), দন্তলূখলী(দন্ত দ্বারা শস্যদানা পেষণ করে, ভোজন করেন যে তাপস), উন্মজ্জক (আকণ্ঠ জলমগ্ন অবস্থায় যাঁরা তপস্যা করেন), গাত্রশয্যা (যাঁরা নিজের শরীর স্কন্ধ বা বক্ষদেশ আশ্রয় করে শয়নকারী), অশয্যা (শয্যাহীন), অনবকাশিকা (অবকাশবিহীন তপস্বীগণ), সলিলাহারা মুনিবৃন্দ (জল যাঁদের একমাত্র আহার্য), বায়ুভক্ষ (বায়ুভোজী), আকাশনিলয়া (শূন্যে অবস্থানকারী), স্থণ্ডিলশায়ী (ভূতলশায়ী), ঊর্দ্ধবাসী (উচ্চ শিখরবাসী), দান্ত (সংযতেন্দ্রিয়), আর্দ্রপটবাস (সর্বদাসিক্তবস্ত্র পরিধান করেন যাঁরা), সজপ (নিয়ত জপরত), তপোনিষ্ঠ (ব্রতনিষ্ঠ), পঞ্চতপান্বিত(পঞ্চ অগ্নির উপাসক), সর্বব্রহ্মশ্রীযুক্ত (বৈদিকজ্ঞানসম্পন্ন ও যোগসমাহিত (যোগীতুল্য দৃঢ়), এমন তাপস ও ঋষিবৃন্দ শরভঙ্গমুনির আশ্রমে রামের কাছে উপস্থিত হলেন।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২১: সুন্দরবনের পাখি: ছোট গুলিন্দা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
পরমধর্মজ্ঞ মুনিগণ সমবেতভাবে মিলিত হয়ে, ধার্মিকদের মধ্যে সর্বোত্তম রামকে বললেন, রাম হলেন ইক্ষ্বাকুলের, এমন কি সমগ্র পৃথিবীখ্যাত মহাবীর। যেমন ইন্দ্র দেবগণের তেমনই এই নরলোকের, প্রধান প্রভু হলেন রাম। রামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ঋষিগণ। পিতৃ-আজ্ঞাপালনকারী রাম, সত্য ও ধর্মের আশ্রয়দাতা। রাম, তাঁর যশ ও বিক্রমের কারণে ত্রিভুবনখ্যাত। রাম স্বয়ং ধর্মজ্ঞ ও ধর্মবৎসল। তাঁরা আজ প্রার্থী। তাঁরা যা বলবেন সেটি রাম ক্ষমা করবেন। যে নৃপতি ষষ্ঠাংশ কর গ্রহণ করেন অথচ পুত্রতুল্য প্রজাদের রক্ষা করেন না, তাঁর ঘোর অধর্ম হয়। যিনি প্রাণপ্রিয় পুত্রতুল্য প্রজাদের সর্বদাই রক্ষাকার্যে যুক্ত থাকেন, তিনি বহুবর্ষব্যাপী চিরন্তন যশ লাভ করেন। ব্রহ্মার যোগ্য স্থানে উন্নীত হয়ে, মহিমান্বিত হন। যিনি ফলমূলভোজী হয়ে পরম ধর্ম অর্জন করেন, ধর্মানুসারে প্রজাপালক রাজা তাঁর লব্ধধর্মের চতুর্থ ভাগ লাভ করেন।তাপসগণ রামকে জানালেন, বানপ্রস্থ অবলম্বন করেছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণরাই প্রধান, তাঁরা অনাথতুল্য হয়ে রাক্ষসদের হাতে ভীষণভাবে নিহত হচ্ছেন।তাঁরা রামকে আহ্বান জানালেন, এহি পশ্য শরীরাণি মুনীনাং ভাবিতাত্মনাং। হতানাং রাক্ষসৈর্ঘোরৈর্বহূনাং বহুধা বনে।। আসুন দেখুন বনমধ্যে ভয়ঙ্কর রাক্ষসদের দ্বারা নিহত বহুদর্শী অসংখ্য মুনিদের শবদেহ।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৬: মত্ত হস্তির দাপাদাপি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’
পম্পা ও মন্দাকিনীর তীরবর্তী এবং চিত্রকূটনিবাসী মুনিগণ, রাক্ষসদের অতীব উৎপীড়নের শিকার। তপস্বীগণের প্রতি ভীমকর্মা রাক্ষসকৃত এমন বিরূপ ভয়ঙ্কর অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শরণাগতের রক্ষক রামের কাছে তাঁরা এসেছেন। নিশাচর রাক্ষসদের কবল থেকে তিনি তাঁদের রক্ষা করুন। এই পৃথিবীতে রাম বিনা তাঁদের কোন গতি নেই। তাপসদের বিনীত অনুরোধ,হে রাজনন্দন, রাক্ষসদের হাত হতে আমাদের রক্ষা করুন। পরিপালয় নঃ সর্ব্বান্ রাক্ষসেভ্যো নৃপাত্মজ।। আনতবিনয়ে রাম জানালেন, এমন অনুরোধ না জানিয়ে, তপস্বীগণের তাঁকে আদেশ করাই কর্তব্য। নৈবমর্হথ মাং বক্তুমাজ্ঞাপ্যোঽহং তপস্বিনাম্। রাম কথা দিলেন, নিজের কার্যোদ্ধারের (পিতৃ-আজ্ঞায় বনবাসবরণ) কারণে তাঁকে অরণ্যে প্রবেশ করতেই হবে। তাই পিতার নির্দেশরক্ষার্থে, মুনিদের প্রতি রাক্ষসদের অত্যাচার তিনি দমন করবেনই। মুনিগণের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে এই বনবাস মহাফলদায়ক হয়ে উঠবে। রাম, যুদ্ধে, তপস্বীগণের শত্রু, রাক্ষসদের বধ করতে উৎসুক হয়েছেন, তপোধন ঋষিগণ, ভ্রাতা-সহ রামের শৌর্য দর্শন করুন। ধর্মে নিরত, শৌর্যশালী, তপস্বীদের সঙ্গে একযোগে আর্যবৃত্তিধারী, রাম, লক্ষ্মণ-সহ এমন আশ্বাস দান করে সুতীক্ষ্ণ মুনির আশ্রমাভিমুখে যাত্রা করলেন।
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে
মুমূর্ষুপ্রায় রাক্ষস বিরাধ, রামচন্দ্রকে মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, সেখান থেকে অর্দ্ধযোজন দূরে শরভঙ্গমুনির আশ্রমে। সেই মুনি, রামের মঙ্গল সাধন করবেন। তং ক্ষিপ্রমভিগচ্ছ ত্বং স তে শ্রেয়োঽভিধাস্যতি। রাক্ষসের এই সদুপদেশের মাহাত্ম্য অনুধাবন করলেন রাম। তার কথার মান্যতা দিয়ে, রাম শরভঙ্গ ঋষির আশ্রমে গমন করলেন। নৃশংস রাক্ষস বিরাধ তার উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজের হত্যাকারী রামের ভাবি আশ্রয়, ধার্মিক মুনি শরভঙ্গের আশ্রমসম্বন্ধে রামকে অবহিত করেছেন। একদা অভিশপ্ত গন্ধর্ব তুম্বুরু জন্ম নিয়েছিলেন অত্যাচারী রাক্ষস বিরাধরূপে। বিরাধ তার মৃত্যুর উপায়টি নিজেই রামকে বলেছিলেন। বিরাধের শাপমুক্তির নিয়ামক হলেন রাম। শস্ত্রের দ্বারা অবধ্য বিরাধের জীবন্ত সমাধি হল একটি গর্তে।তার মৃত্যু নিশ্চিত করলেন রাম। বিরাধের সুপরামর্শদানেরূপ সুকৃতির ফলভোক্তা হলেন রাম। নিজের কৃত অন্যায়কাজের পাপমুক্তির উপায়, বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন। বিরাধের আত্মশুদ্ধির বিচিত্র মাত্রা, রাক্ষসসুলভ নির্মমতার আবরণ ছিঁড়ে, উন্মোচিত করে উদারমনটিকে। বাস্তব জগতে তথাকথিত রাক্ষসবৃত্তিধারী মানুষের অভাব নেই।মানুষ অনেক সময়েই, পরিস্থিতির প্রভাবে রাক্ষস হয়ে ওঠেন, যেমন গন্ধর্ব তুম্বুরু হয়েছিলেন নির্মম রাক্ষস। তবে রাক্ষসের অন্তরালে, রয়ে যায় কিছু মানবিক গুণ, যা দানব,মানব নির্বিশেষে সকলের মধ্যে অন্তর্নিহিত থেকে যায়। যেমন কৃতজ্ঞতা, অনুশোচনা, আত্মশুদ্ধির তাগিদ, প্রভৃতি গুণ তথাকথিত পাপাচারীর পাপবোধ হতে মুক্তির উপায় হয়ে ওঠে। অবশ্য সর্বোপরি থাকতে হবে বিবেকের দহনজ্বালা। সেটি না থাকলে, বোধ হয় কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
রামের অমল মহিমা বহু মুনি ঋষিদের আশীর্বাদধন্য তাঁর জীবন। রামের অরণ্যবাস আরও মধুর ও সার্থক হয়ে উঠেছে, কারণ ধার্মিক, প্রাজ্ঞ ও মননশীল সাধুসঙ্গ তাঁর বনবাস জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। মননশীল ঋষিদের আন্তরিক সস্নেহ প্রীতিডোরে বাঁধা যেন রামের জীবন। তাঁরা রামের জীবনের সমস্ত আসন্ন প্রতিকূলতার ইঙ্গিত দিয়েছেন, দান করেছেন সাদর আশ্রয়, তাঁদের সস্নেহ সঙ্গসুখে ধন্য হয়েছেন রাম। অযোধ্যার রাজনন্দন রামের বনবাস জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা শরভঙ্গমুনির সঙ্গে সাক্ষাৎকার। দেবরাজ ইন্দ্র রামকে দেখা দেননি, দেবেন্দ্রর সাক্ষাতে অনিচ্ছা প্রকাশের কারণটি মহৎ।
রামের পিতৃদত্ত শর্তপালনের নিষ্ঠাপূর্ণ অরণ্যবাস ও তাঁর দুষ্কর শত্রুদমনের কাজটি সম্পন্ন হলে তবেই তিনি রামকে দর্শন দান করবেন — এই ঘোষণা, রামের প্রতি তাঁর অসীম শ্রদ্ধার প্রকাশ। দেবরাজেরও আস্থাভাজন রাম। শুধু রামের দর্শনলাভের আশায়, শরভঙ্গমুনি, বহু কাঙ্খিত, কষ্টার্জিত ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি স্থগিত রাখেন। রামকে আতিথ্যদান করে শরভঙ্গ ঋষি নিজেকে ধন্য মনে করেন। রামকে নিজের অর্জিত অক্ষয় পুণ্যফল ও ব্রহ্মলোক দান করতে ব্যাকুল হয়েছেন শরভঙ্গমুনি। ক্ষত্রিয় রাজকুমারের প্রতি মুগ্ধতার ঘোরে আচ্ছন্ন ঋষি ও মুনিগণ, এতটাই রামের অভাবনীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাব। ধার্মিক রামের সত্যনিষ্ঠতা ও ত্রিভুবনখ্যাত বীর্যবর্তার প্রতি মুনিগণের অপরিসীম আস্থাই কি তার কারণ? কখনও আবার বনবাসজীবনের ক্লেদ হয়তো রামের রাজোচিত কর্তব্যবোধকে গ্রাস করেছে, এই ভেবে,তাঁরা হয়তো রামকে তাঁরা রাজধর্ম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মনে করিয়েছেন উপার্জনের ষষ্ঠাংশ যাঁরা কর হিসেবে দিয়ে থাকেন সেই পুত্রতুল্য প্রজারাতো বটেই, এ ছাড়াও বন্য ফলমূলভোজী অরণ্যবাসী তপস্বী, তাঁরাও ধর্মার্জিত পুণ্যফলের চতুর্থাংশের করদাতা, তাঁরা সকলেই রাজার প্রদত্ত সুরক্ষাবলয়ের আয়ত্তাধীন।
অযোধ্যার রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারীর কাছে এ যেন মুনি ঋষিদের অনুরোধ নয়, স্বঘোষিত দাবি। রাজপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রভুহীন অনাথের মতো বানপ্রস্থী ও মুনিগণ রাক্ষসদের উৎপীড়নের শিকার। তাঁদের আজ জীবনসংশয়।অস্তিত্বের সঙ্কট। কেন? কারণ শরণাগতের আশ্রয়দান রাজার কর্তব্য। রাম রাজপ্রতিনিধি। তাই হয়তো অরণ্যবাসী তাপসদের এই অনুরোধ রাজপ্রশাসনের কাছে।
শুধু পিতৃসত্যরক্ষার্থে নয়, আরও মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের সফলতায় অচিরেই মহিমান্বিত হয়ে উঠবে রামের অরণ্যবাস, সিদ্ধ হবে উৎপীড়িতের হাহাকারমুক্ত বনাঞ্চল — রামের এই আশার বাণী যেন সমস্যাসমাধানের লক্ষ্যে একজন সফল প্রশাসকের গভীর আত্মবিশ্বাস-ঋদ্ধ ঘোষণা।
পিতুস্তু নির্দ্দেশকরঃ প্রবিষ্টোঽহমিদং বনম্। ভবতামর্থসিদ্ধ্যর্থমাগতোঽহং যদৃচ্ছয়া। তস্য মে২য়ং বনে বাসো ভবিষ্যতি মহাফলঃ।। পিতার নির্দেশ কার্যকর করতে বনে প্রবেশ করেছি। যথেচ্ছ আমার এই আগমন, আপনাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির সহায়ক হবে। তাই আমার বনবাস মহাফলদায়ক হয়ে উঠবে। রামের এই উচ্চকিত ঘোষণার মন্দ্র গম্ভীর আশ্বাস, কি তাঁর অবতারত্ব ছাপিয়ে,আধুনিক ভারতীয় প্রশাসকদের মর্মভেদী হয়ে ওঠবে কখনও?—চলবে।
রামের পিতৃদত্ত শর্তপালনের নিষ্ঠাপূর্ণ অরণ্যবাস ও তাঁর দুষ্কর শত্রুদমনের কাজটি সম্পন্ন হলে তবেই তিনি রামকে দর্শন দান করবেন — এই ঘোষণা, রামের প্রতি তাঁর অসীম শ্রদ্ধার প্রকাশ। দেবরাজেরও আস্থাভাজন রাম। শুধু রামের দর্শনলাভের আশায়, শরভঙ্গমুনি, বহু কাঙ্খিত, কষ্টার্জিত ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তি স্থগিত রাখেন। রামকে আতিথ্যদান করে শরভঙ্গ ঋষি নিজেকে ধন্য মনে করেন। রামকে নিজের অর্জিত অক্ষয় পুণ্যফল ও ব্রহ্মলোক দান করতে ব্যাকুল হয়েছেন শরভঙ্গমুনি। ক্ষত্রিয় রাজকুমারের প্রতি মুগ্ধতার ঘোরে আচ্ছন্ন ঋষি ও মুনিগণ, এতটাই রামের অভাবনীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাব। ধার্মিক রামের সত্যনিষ্ঠতা ও ত্রিভুবনখ্যাত বীর্যবর্তার প্রতি মুনিগণের অপরিসীম আস্থাই কি তার কারণ? কখনও আবার বনবাসজীবনের ক্লেদ হয়তো রামের রাজোচিত কর্তব্যবোধকে গ্রাস করেছে, এই ভেবে,তাঁরা হয়তো রামকে তাঁরা রাজধর্ম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মনে করিয়েছেন উপার্জনের ষষ্ঠাংশ যাঁরা কর হিসেবে দিয়ে থাকেন সেই পুত্রতুল্য প্রজারাতো বটেই, এ ছাড়াও বন্য ফলমূলভোজী অরণ্যবাসী তপস্বী, তাঁরাও ধর্মার্জিত পুণ্যফলের চতুর্থাংশের করদাতা, তাঁরা সকলেই রাজার প্রদত্ত সুরক্ষাবলয়ের আয়ত্তাধীন।
অযোধ্যার রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারীর কাছে এ যেন মুনি ঋষিদের অনুরোধ নয়, স্বঘোষিত দাবি। রাজপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রভুহীন অনাথের মতো বানপ্রস্থী ও মুনিগণ রাক্ষসদের উৎপীড়নের শিকার। তাঁদের আজ জীবনসংশয়।অস্তিত্বের সঙ্কট। কেন? কারণ শরণাগতের আশ্রয়দান রাজার কর্তব্য। রাম রাজপ্রতিনিধি। তাই হয়তো অরণ্যবাসী তাপসদের এই অনুরোধ রাজপ্রশাসনের কাছে।
শুধু পিতৃসত্যরক্ষার্থে নয়, আরও মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের সফলতায় অচিরেই মহিমান্বিত হয়ে উঠবে রামের অরণ্যবাস, সিদ্ধ হবে উৎপীড়িতের হাহাকারমুক্ত বনাঞ্চল — রামের এই আশার বাণী যেন সমস্যাসমাধানের লক্ষ্যে একজন সফল প্রশাসকের গভীর আত্মবিশ্বাস-ঋদ্ধ ঘোষণা।
পিতুস্তু নির্দ্দেশকরঃ প্রবিষ্টোঽহমিদং বনম্। ভবতামর্থসিদ্ধ্যর্থমাগতোঽহং যদৃচ্ছয়া। তস্য মে২য়ং বনে বাসো ভবিষ্যতি মহাফলঃ।। পিতার নির্দেশ কার্যকর করতে বনে প্রবেশ করেছি। যথেচ্ছ আমার এই আগমন, আপনাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির সহায়ক হবে। তাই আমার বনবাস মহাফলদায়ক হয়ে উঠবে। রামের এই উচ্চকিত ঘোষণার মন্দ্র গম্ভীর আশ্বাস, কি তাঁর অবতারত্ব ছাপিয়ে,আধুনিক ভারতীয় প্রশাসকদের মর্মভেদী হয়ে ওঠবে কখনও?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















