
তখন প্রায় মধ্যরাত। মেঘাবৃত আকাশ গর্জন করছিল থেমে থেমে। ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমেছে অনেকক্ষণ। জোলো বাতাস বইছে নিজের মতো করে। দক্ষিণ পুবের জানলা টেনে বন্ধ। পায়ের কাছে মেঝে সমান পশ্চিমের জানলার পাল্লাখানা শুধু খোলা। বিছানা থেকে দেখা যাচ্ছিল, গাঢ় অন্ধকার চিরে চিরে রুপোলি অলোর ইচ্ছেখুশি ছুটোছুটি।
ঝড়টা উঠেছিল শেষ বিকেলে। গোধূলির মুখ নিকষ কালো হয়ে থমথম করল কিছুক্ষণ। তারপরেই আছড়ে পড়া কাকে বলে। প্রবল সাইক্লোন। সঙ্গে তুফান বর্ষণ। একঘন্টার মধ্যে সামনের রাস্তায় গোড়ালি ডুবল। সুনীতি ভাগ্যিস মেয়েকে নিয়ে তখনও এ বাড়িতেই। বেরোনোর আগে গুরুদেবকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন। অব্যক্ত মুখরতায় জানাতে গিয়েছিলেন তাঁর একাকিত্বের আশ্চর্য অসুখের কথা। সব থেকেও কি দুঃসহ একটা নিঃসঙ্গতার বোধ। কারও কাছে যা প্রকাশ করবার নয়। লুকোনো লজ্জার মতো তীব্র যন্ত্রণা! কবে থেকে যে এই ব্যাধির সূচনা ঘটল নিজেও জানেন না। নিস্তার পেতে নিজের স্বেদ শীতল ললাট ছুঁইয়েছিলেন ওই অপার্থিব চরণ কমলে। ইতিমধ্যে বাড়ি ফাঁকা হয়েছে। বিশেষ কয়েকজন একান্ত পার্ষদ ছাড়া অধিকাংশ ভক্ত শিষ্যই বেলা তিনটে সাড়ে তিনটের মধ্যে বিদায় নিয়েছেন। সুনীতিকেও ফিরতে হবে অনেকদূর। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে শিয়ালদহ থেকে পাঁচটার ট্রেন ধরবেন। বাড়ির গাড়িতেই স্টেশনে যাবেন। তাই খুব তাড়া ছিল না। অপেক্ষা করছিলেন গুরুকে একলা পাবার। পেলেনও।
ঝড়টা উঠেছিল শেষ বিকেলে। গোধূলির মুখ নিকষ কালো হয়ে থমথম করল কিছুক্ষণ। তারপরেই আছড়ে পড়া কাকে বলে। প্রবল সাইক্লোন। সঙ্গে তুফান বর্ষণ। একঘন্টার মধ্যে সামনের রাস্তায় গোড়ালি ডুবল। সুনীতি ভাগ্যিস মেয়েকে নিয়ে তখনও এ বাড়িতেই। বেরোনোর আগে গুরুদেবকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন। অব্যক্ত মুখরতায় জানাতে গিয়েছিলেন তাঁর একাকিত্বের আশ্চর্য অসুখের কথা। সব থেকেও কি দুঃসহ একটা নিঃসঙ্গতার বোধ। কারও কাছে যা প্রকাশ করবার নয়। লুকোনো লজ্জার মতো তীব্র যন্ত্রণা! কবে থেকে যে এই ব্যাধির সূচনা ঘটল নিজেও জানেন না। নিস্তার পেতে নিজের স্বেদ শীতল ললাট ছুঁইয়েছিলেন ওই অপার্থিব চরণ কমলে। ইতিমধ্যে বাড়ি ফাঁকা হয়েছে। বিশেষ কয়েকজন একান্ত পার্ষদ ছাড়া অধিকাংশ ভক্ত শিষ্যই বেলা তিনটে সাড়ে তিনটের মধ্যে বিদায় নিয়েছেন। সুনীতিকেও ফিরতে হবে অনেকদূর। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে শিয়ালদহ থেকে পাঁচটার ট্রেন ধরবেন। বাড়ির গাড়িতেই স্টেশনে যাবেন। তাই খুব তাড়া ছিল না। অপেক্ষা করছিলেন গুরুকে একলা পাবার। পেলেনও।
ভয়ানক গম্ভীর মেঘটা প্রথম ডাকল ঠিক তখনই। তারপর সশব্দে বাজ পড়ল। একেবারে আচম্বিতে। শ্রবণেন্দ্রিয় অসার করে। গুরুদেবের আশির্বচনের অন্তিম পংক্তি যেন প্রকৃতির রহস্যময় যোগসাজসে অশ্রুত থেকে গেল। বুক কেঁপে উঠেছিল সুনীতির। কেন এমনটা হল, কেন শোনা হল না সম্পূর্ণ করে গুরুর পথনির্দেশ?
শিবু দৌড়ে এসেছিল অবধুতের বিশ্রাম কক্ষে।
পিছন পিছন পুত্রবধূ মাধবী।
মা, মাগো, ভারি দরাজ গলায় ডাকতে পারে শিবব্রত, তাঁর শিবু। বোঝবার উপায় নেই যে ওই ছেলে সুনীতির গর্ভজাত নয়! আর সুনীতি সবচেয়ে আশ্চর্য হন শিবুর বাচনভঙ্গিতে। তাঁদের সঙ্গে তাঁদের মত পূর্ববঙ্গের কথা। কিন্তু কলকাতার মানুষের সাথে ওর ভাষা বিনিময় এক্কেবারে আলাদা। নিমেষে মাথায় ঘোমটা টেনে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সুনীতি।
শিবু বলে, মা, আজ আর তোমার যাওয়া হয় না…।
কী কও শিবু, তমার বাবা ওখানে অসুবিধায় পড়বেন যে…
কিচ্ছু হইব না। খুকু আছে তো, শঙ্কু ও আছে, ওরা সামলাইব, বাইরে তাকাও, দেখ, কি ভীষণ দুর্যোগ ঘনাইছে। ট্রেন চলাচলও বন্ধ হইতে পারে।
মাধবীরও এক কথা, যাওয়া হবে না মা, সুধারে নিয়া থাকুন আজ রাত টুকুন।
স্মিত গুরুদেবের দিকে আতুর দৃষ্টি মেলে খুঁজে পেয়েছিলেন সম্মতি। ডায়মন্ডহারবার ছেড়ে সর্ব কনিষ্ঠা সুধাকে নিয়ে এ বাড়িতে তাই তাঁর আজকের স্বামীহীন রাত্রি যাপন। কুড়ি বৎসরের বিবাহ- জীবনে এই প্রথম। ঘুমানোর সময় মা কে এমন নিজের করে তো পায় না। অনেক ভাগিদার সংসারে। আজকে তাই সুধার সুখের শেষ নেই। সুনীতিকে জাপটে ধরে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।
আর তার পাশে বিনিদ্র সুনীতি। স্মৃতির দল ষড়যন্ত্রকারী। ভারি চতুর। সুযোগসন্ধানী। নির্জন আঁধার পেলেই সদলবলে হুমড়ি খেয়ে হল্লা বাঁধায়। অপ্রস্তুত অসহায় মস্তিষ্কের কোষে কোষে শুরু হয় প্রদাহ। সকলের কি এমনটাই হয়, নাকি সুনীতির জন্যই নির্ধারিত এমন তাড়না! প্রশস্ত নির্ঘুম রাত জুড়ে যথারীতি চলতে থাকে দুরন্ত স্মৃতির অবিশ্রান্ত তাণ্ডব।
শিবু দৌড়ে এসেছিল অবধুতের বিশ্রাম কক্ষে।
পিছন পিছন পুত্রবধূ মাধবী।
মা, মাগো, ভারি দরাজ গলায় ডাকতে পারে শিবব্রত, তাঁর শিবু। বোঝবার উপায় নেই যে ওই ছেলে সুনীতির গর্ভজাত নয়! আর সুনীতি সবচেয়ে আশ্চর্য হন শিবুর বাচনভঙ্গিতে। তাঁদের সঙ্গে তাঁদের মত পূর্ববঙ্গের কথা। কিন্তু কলকাতার মানুষের সাথে ওর ভাষা বিনিময় এক্কেবারে আলাদা। নিমেষে মাথায় ঘোমটা টেনে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সুনীতি।
শিবু বলে, মা, আজ আর তোমার যাওয়া হয় না…।
কী কও শিবু, তমার বাবা ওখানে অসুবিধায় পড়বেন যে…
কিচ্ছু হইব না। খুকু আছে তো, শঙ্কু ও আছে, ওরা সামলাইব, বাইরে তাকাও, দেখ, কি ভীষণ দুর্যোগ ঘনাইছে। ট্রেন চলাচলও বন্ধ হইতে পারে।
মাধবীরও এক কথা, যাওয়া হবে না মা, সুধারে নিয়া থাকুন আজ রাত টুকুন।
স্মিত গুরুদেবের দিকে আতুর দৃষ্টি মেলে খুঁজে পেয়েছিলেন সম্মতি। ডায়মন্ডহারবার ছেড়ে সর্ব কনিষ্ঠা সুধাকে নিয়ে এ বাড়িতে তাই তাঁর আজকের স্বামীহীন রাত্রি যাপন। কুড়ি বৎসরের বিবাহ- জীবনে এই প্রথম। ঘুমানোর সময় মা কে এমন নিজের করে তো পায় না। অনেক ভাগিদার সংসারে। আজকে তাই সুধার সুখের শেষ নেই। সুনীতিকে জাপটে ধরে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।
আর তার পাশে বিনিদ্র সুনীতি। স্মৃতির দল ষড়যন্ত্রকারী। ভারি চতুর। সুযোগসন্ধানী। নির্জন আঁধার পেলেই সদলবলে হুমড়ি খেয়ে হল্লা বাঁধায়। অপ্রস্তুত অসহায় মস্তিষ্কের কোষে কোষে শুরু হয় প্রদাহ। সকলের কি এমনটাই হয়, নাকি সুনীতির জন্যই নির্ধারিত এমন তাড়না! প্রশস্ত নির্ঘুম রাত জুড়ে যথারীতি চলতে থাকে দুরন্ত স্মৃতির অবিশ্রান্ত তাণ্ডব।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৩: শঙ্করের দেশান্তর, আখ্যানের অন্য পথ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৫: সুস্থ থাকলে কেউ কি কবিতা লেখে?

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৩: ডেসডিমোনার রুমাল/২
৫বি, ডি এল রায় স্ট্রিটের বাড়িতে সেদিন কি উৎসবের আলো জ্বলেছিল? যেদিন ইন্দুমতির পুত্রদের এই গৃহটিতে পদার্পণ করেছিলেন পিতা? দীর্ঘ-অদর্শনের পর তাঁদের সেই অপূর্ব সম্মিলন মুহূর্ত । সদলবলে সুনীতিদের কলকাতায় আসবার প্রথম দিন। দু’চোখ ভরে দেখছিলেন সুনীতি। কত কাঙ্খিত সেই আলিঙ্গন আর সেই প্রণতি! আশীর্বাদের উদ্বেল নিঃশ্বাস! সুনীতির সন্তানদের নিয়ে নিয়ত স্বস্তিহীন থাকেন আদিনাথ। সুনীতি বোঝেন। ইন্দুমতীর দুই পুত্র স্বামীর নয়নের মণি। দেবব্রত শিবব্রত। দেবু, শিবু। মার্জিত শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত। দেবুর তো তুলনাই নেই। অর্থনীতি নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা। এখন স্বনামধন্য সাংবাদিক। পুত্রবধূদুটিও স্ত্রী রত্ন। বিশেষ করে প্রথমাটি। বেথুন কলেজের নামকরা ছাত্রী। বিদেশিনীর মতো চালচলন। দর্শন বিভাগে সোনার পদক পাওয়া। অবশ্য দেবু নিঃসন্তান। শিবব্রতর স্ত্রী মাধবী দশ ক্লাস পাস। অল্প বয়সে বিবাহ। অভিজাত পরিবারের মেয়ে। সদ্য সন্তানসম্ভবা। আর এ ধারে এরা আদিনাথের চোখে যেন একদল পরভৃৎ। দজ্জাল দুরন্ত অসভ্য সম্ভ্রমহীন। শংকরের তো কথাই নেই। আস্থা কেবল সুনীতি আর খুকুর ওপরে যেটুকু। আর কেউ না। সুনীতিকে একান্ত মুহূর্তগুলোয় সে সব কথাই বলতেন আদিনাথ। বলতেন, তাঁর একক সত্ত্বার ভেঙে দুই হবার কষ্ট কথন। ক্রমশ দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে নিজের জীবনের পূর্বপথ আর উত্তরপথে। ও পথে তো কত চরিত্র ছিল। এ পথেও এল নতুন অনেকে। সম্পর্ক রচনা করানো উচিত ছিল তাঁরই। পারেননি। দূরত্ব বেড়েছে। আলাপ জমেনি। মধ্যবর্তী সেতুতে তাঁর স্বামী আদিনাথ দাশগুপ্ত নাকি কেবল ভেঙেচুরে গন্ধক চূর্ণের মত মিশে গেছেন সবুজ নীল দুর্গম উপত্যকায়। আদিনাথ মহাজ্ঞানী পুরুষ। অন্তরঙ্গ মুহূর্তে তাঁর বলা সব কথার অর্থ সুনীতির কাছে স্পষ্ট হয় না। অধরা শঙ্খচিল হয়ে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের পাল তোলা আকাশে। অবগুন্ঠনের আড়াল থেকে সুনীতি তাদের ছুঁতে পারেন না। কেবল বোঝেন, দ্বিতীয় পক্ষের এই বিবাহ আদিনাথের পূর্ণ সম্মতিতে হলেও ভিতর থেকে তিনি সুখী নন। সুনীতির কায়মনোবাক্যের নিবেদিত পূজার মধ্যেও নন। সবটুকু উজাড় করা ভালবাসার মধ্যেও স্বামীকে তাঁর পরিপূর্ণ পাওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২১: সুন্দরবনের পাখি: ছোট গুলিন্দা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
কলকাতায় এসে গুরুদেবের বিশ্রাম মঞ্চের পাশের বড় ঘরটায় আদিনাথের শোবার ব্যবস্থা হয়েছিল। অপালা আর মাধবী শ্বশুরমশাইকে খুব যত্ন করে প্রকান্ড দোতলা বাড়ির সবচেয়ে আলোবাতাস খেলা ঘরখানা ছেড়ে দিয়েছিল। ছেড়েছিল আসলে অপালা। দেবুর স্ত্রী। এ সংসারে তারই প্রথম অধিকার। দেবুর নামেই বাড়ি। আদিনাথ সেভাবেই উইল করেছিলেন। সুনীতিকেও ওরা প্রণাম করেছিল। সংকোচে মাথা নত হয়েছিল সুনীতির। বিশেষ করে দেবুর বউ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতেন সুনীতি কি শিক্ষিতা কি অপরূপ মুখখানা! হয়তো তত নিখুঁত নয় কিন্তু মোমের মত রং, ঘাড় পর্যন্ত থোপা থোপা চুল, মাখন ত্বক…! মিষ্টি কন্ঠস্বর, মোলায়েম অনুচ্চ। ধীর পায়ে হাঁটাচলা। বয়স কত হবে, কম ও হবে না। সুনীতির তখন পঁয়ত্রিশ, আর অপালা অতগুলো পাশ দিয়ে তারপর দেবুর সঙ্গে ভালোবাসা করে বিবাহ। বছর ঊনত্রিশ তো হবেই। অপালার প্রতি অকৃত্রিম সম্ভ্রম গোড়াতেই গভীর এবং সশ্রদ্ধ দূরত্ব সৃষ্টি করল তার সঙ্গে সুনীতির। তুলনায় মাধবীকে বেশি কাছের জন মনে হয়। কাছের জন বলা যায় কি? নাকি বলা ভালো চেনা মানুষ মনে হয়েছিল। হ্যাঁ চেনা পৃথিবীর মানুষ মাধবী। ওর আচার আচরণ, ব্যবহার বিধি, ওর স্বার্থপরতা ক্রোধ আবার সব ভুলে সকলের মধ্যে মিশে যাওয়া.. এগুলো অনেক কাছের, অনেক স্বাভাবিক ছিল সুনীতির কাছে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৬: মত্ত হস্তির দাপাদাপি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৪: রামের অমল মহিমা, অরণ্যবাসের সাধুসঙ্গ
কলকাতায় আসবার পর থেকেই তাঁর রান্নাঘরের দায়িত্ব। নম্র সংকুচিত ব্যবহারের জন্যই সেই দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে আগ বাড়িয়ে স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন। যাতে তাঁদের আগমনকে নতুন সংসারে ভার বলে মনে না হয়। যেমন নির্দেশ আসত পালন করতেন। বাজারের দায়িত্ব ছিল শিবুর। পছন্দের হেরফের লেগেই থাকত। শঙ্কু আর রামকে নিয়ে যত মুশকিল। শঙ্কুর রান্না পছন্দ হচ্ছে না আর রামের পেটে সইছে না। বড় অসুস্থ ছেলে রাম। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র। সুধার ওপরের সন্তান। লিভার খারাপ। হৃদযন্ত্র দুর্বল। মধ্যে মধ্যে জন্ডিসে পড়ে। নিশ্বাসেও কষ্ট হয়। পথ্য পড়ছিল না ঠিকমত। থানকুনি পলতা কুলেখাড়া আসতই না একরকম। পুঁটি পারশে ইলিশের দিকে শিবুর ঝোঁক। সবই তেলা মাছ। রাম বমি করে। শঙ্কু ছোট আর কাঁটাওয়ালা মাছ খেতে পারে না তাই খেতে বসে ঝামেলা করে। দেশের বাড়িতে ছিল নিজেদের সবজির অরণ্য। পাতা পুতি কচি বেগুন লাউ চাল কুমড়ো, পেঁপে বাড়ির বাগানে অফুরন্ত। যেমন ইচ্ছে তুলে হালকা ঝোল করে নাও। ছিল বাঁধানো দিঘি পুকুর। জ্যান্ত আর জিওল মাছের কোনও অভাব হতো না। সেখানে সর্বময়ী রান্না ঘর পরিষ্কার কর্ত্রী ছিলেন সুনীতি। হেঁসেল সামলাত অনন্তর বউ আর বাগদী পাড়ার হিরণ। আর তিনি বুঝে রান্না টুকু করতেন। কলকাতার আবাসে প্রতিদিন রান্নাঘরে ঢুকে বুক ঢিপ ঢিপ করত সুনীতির। তকতকে গোছানো রান্নাঘর। পরিষ্কার উনুন। ঝকঝকে বাসনপত্র। রান্নাঘরে দু’খানা দেয়াল আলমারি। আর একটা কাঁচের পাল্লা বসানো মিটসেফ। সেখানে রান্না করে রাখবার ব্যবস্থা। আর দুটো আলমারি ভর্তি বাসন। একটায় কাঁচ, চিনামাটি আর একটা পিতলের । খুব সাবধানে রান্না ঘরের কাজ সারতেন সুনীতি।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে
এভাবেই পা টিপে টিপে চলছিল দিন। রোজই ব্রাহ্ম মুহূর্তে ঘুম ভেঙে যাওয়া ওঁর অভ্যাস। আকাশের কৃষ্ণকলি বুকে ঝাঁক বাঁধা তারারা তখনও থাকত জেগে। তারপর সুনীতি স্নান সেরে শুদ্ধাসনে সেরে নিতেন আহ্নিক। বড় বারান্দায় যখন বের হতেন হাসিমাখা শুকতারার নিবিড় দৃষ্টিটুকু ছাড়া চরাচরে তখনও কোনও প্রাণের হদিশ নেই। দশদিক শূন্য। স্তব্ধ। শান্ত। বড় মধুর কাটত মুহূর্তটুকু। পৃথিবীর যত অন্তর্জলী সন্তাপ নিজের বুকে ধারণ করে ওই আকাশ যেন মায়ের মত আপন। সুনীতির ব্যস্ত ক্লান্ত বিষন্ন রোজনামচার একমাত্র স্বজন। এ পাওনা তাঁর প্রকৃতির কাছ থেকে। সুনীতি নিজের এই অনুভবের কথা একবার বলেছিলেন গুরুদেবকে। গুরুদেব শুনে আশ্চর্য সংবাদ দিয়েছিলেন ওঁকে। বলেছিলেন, তুই তো নিজেই প্রকৃতি! প্রকৃতি তরে কিছু দ্যায় নাই। তুই জুড়ে আছস পরমের সঙ্গে। সংসারের জৈবিক বাধা কাটাইয়া ওই ক্ষণটুকু তর তাঁর প্রতি আত্মনিবেদনের প্রহর। অভিসারের সময়। লজ্জায় মাথা তুলতে পারেনা সুনীতি এসব ভাবলে। কেন যে বলতে গিয়েছিল গুরুদেবকে! গুরুদেবের অতুল স্নেহদৃষ্টি তাঁর প্রতি। এমন সৌভাগ্য ক’জনের হয়! সে তো একজন নিতান্ত তুচ্ছ মানুষ। প্রকৃতি পরমের সম্পর্ক সে বোঝেটা কি? বরং সংসারের ক্ষুদ্র জীব হয়ে পরিবারের জন্য দায়িত্ব পালনেই ওঁর শান্তি। সেই শান্তিটুকু নিজ ভূম ছাড়বার পর পাচ্ছেন কোথায় ! স্বামী সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেবার কর্তব্য তাঁর । ছেলেমেয়েতে কোনওদিন কোনও ভেদ করার কথা মনে আসে না। পূর্বপক্ষ উত্তরপক্ষেও না। কক্ষনো না। সুনীতি শুধুই মা। সংসারে কেবল মা হয়ে থাকতে চান। কিন্তু তারই মধ্যে কোথা থেকে অগোচরে নিজের মধ্যে বাসা বাঁধলো হাহাকারের এই উপশমহীন ব্যাধি।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















