
সম্প্রতি হাতে এল পান্নালাল রায়ের ‘না বলা অনেক কথা’ গ্রন্থটি। সাবলীল লেখার মাধ্যমে লেখক গ্রন্থটিতে তাঁর জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন। কিন্তু মূলত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হলেও গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে গত প্রায় ছয় দশকের সময়কাল। সুদীর্ঘকাল ধরে পান্নাবাবু উত্তরপূর্বাঞ্চল ভিত্তিক ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সামাজিক নানা বিষয়ে নিরন্তর লিখে চলেছেন। এই অঞ্চলের পত্র পত্রিকায় যেমন নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশ পাচ্ছে, তেমনই প্রায় প্রতি বছরই প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর একাধিক গ্রন্থ। সহজ সরল গদ্যে নানা জটিল বিষয়ে পান্নালাল রায়ের উপস্থাপনা বরাবরই পাঠকদের আকৃষ্ট করে থাকে। ব্যতিক্রম নয় আলোচ্য ‘না বলা অনেক কথা’ গ্রন্হটিও। একবার পাঠ শুরু করলে আড়াই শতাধিক পৃষ্ঠার বইটি পাঠককে শেষ করতেই হবে।
গ্রন্থটি ভালো লাগবে এই কারণে যে, তিনি আত্মকথন গ্রন্থনার প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন শৈশব-কৈশোর-যৌবন ও প্রৌঢ় জীবনের অনুভব ঋদ্ধ নানা কথা শুনিয়েছেন, তেমনই তার পাশাপাশি প্রলম্বিত কালসীমা, সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতও তুলে ধরেছেন। আলো ফেলেছেন সেই সময়কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপরও। গ্রন্থটির শুরুতেই লেখকের নিবেদনে পান্নালাল রায় লিখেছেন, ২০২০ সালের কোভিডকালের গৃহবন্দি জীবনে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখতে শুরু করেছিলেন ‘না বলা অনেক কথা’।
আরও পড়ুন:

বইয়ের দেশে : দেশভাগ, সিলেট গণভোট এবং করিমগঞ্জ

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৮: সুজাতজাতক—তবু অনন্ত জাগে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৩: ক্যান ইউ হ্যান্ডেল ইট?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৮: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বানর
শৈশব-কৈশোর-কর্মজীবনের পর আসতে থাকল অতীত দিনের নানা চিত্র, এলো রাজনীতিও। লেখক বলেছেন, ”…নিজের কথা বলতে বলতে সময়কালকে ধরার চেষ্টা করলাম। প্রায় ছয় দশকের এক দীর্ঘ সময়কাল। যোগাযোগে টরেটক্কার যুগ থেকে ইন্টারনেট, মুদ্রণে লেটারহেড প্রেস থেকে কালার অফসেট! এলো আসাম-আগরতলা সড়কপথে ভ্রমণ। সঙ্গে রেলপথের কথাও চলে এলো স্বাভাবিকভাবেই। আবার রাজনীতিও চলে এলো! ত্রিপুরায় প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বামফ্রন্ট, মাঝে আবার কংগ্রেস জোট,তারপর একনাগাড়ে আড়াই দশক বাম শাসন। বর্তমানে চলছে বিজেপি জোট। এ ভাবেই যৎসামান্য এসেছে দেশেরও রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ।” এই দীর্ঘ সময়ের প্রতিচ্ছবি সবটা না হলেও গ্রন্হটিতে পাওয়া গেল বেশ কিছুটা।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
ছয় দশকের কালদর্পণে প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক পট পরিবর্তনের ধারাভাষ্য অনেকটাই পাওয়া গেল আত্মকথনের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোয়। গ্রন্থটি তাই নিছক আত্মজীবনীমূলক বর্ণনা হয়ে উঠেনি। এটি যেন হয়ে উঠেছে সময়ের এক দলিল। নানা অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যাপিত জীবনের পাশাপাশি তা হয়ে উঠেছে সাহিত্য-ইতিহাস চেতনার এক যুগলবন্দিও!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২০: গোরা-সুনীতি: সম্পর্কের অন্য সুর

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৩ : শহরের ইতিকথা
গ্রন্থটিতে ১১৮টি অনুচ্ছেদের শিরোনামেই বোঝা যায় ‘না বলা অনেক কথা’র ব্যাপ্তি। টরেটক্কার যুগে, একদিন দৈনিক সংবাদে, প্রাইমারি স্কুলে, চিন-ভারত যুদ্ধ, সেদিনের আগরতলা, পাক-ভারত যুদ্ধে ট্রেঞ্চ খনন, সেদিনের ফুটবল, একাত্তরের যুদ্ধ, কংগ্রেসে অন্তর্কোন্দল, কর্মচারী ধর্মঘট, ইন্দিরার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ, চাকরির প্রথম দিনটি, মাদার টেরেসার সঙ্গে, মৃণাল সেনের সঙ্গে, সাংবাদিকদের নিয়ে মিজোরামে, বিমল সিংহের হত্যাকাণ্ড, রাঙ্খলের জেনেভা ভাষণ, শেখ হাসিনার রাজ্য সফর ইত্যাদি সূচির পর এসেছে কোভিডকালের উপলব্ধি জীবন যেন পদ্মপাতায় জল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
সব মিলিয়ে আত্মকথন ও সমসাময়িক ঘটনাবলির সমন্বয়ে পান্নালাল রায় এক মালা রচনা করেছেন, যার প্রতিটি ফুলের কোনওটিতে রয়েছে আনন্দময়তার সৌরভ, কোনওটিতে যেন আবার বিষন্নতার দীর্ঘশ্বাস। এটিকে আবার আত্মকথন কেন্দ্রিক এক ইতিহাস গ্রন্থও বলা যেতে পারে। নানা তথ্য বহুল সুখপাঠ্য এই গ্রন্থটি পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে এমন আশা করা যায়। গ্রন্হটির দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদ করেছেন কামনা দেব। প্রচ্ছদে ঐতিহাসিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে।
গ্রন্থ : না বলা অনেক কথা
লেখক : পান্নালাল রায়
ঘরানা পাবলিকেশন
মেলার মাঠ,আগরতলা
মূল্য ৬৭০ টাকা
গ্রন্থ : না বলা অনেক কথা
লেখক : পান্নালাল রায়
ঘরানা পাবলিকেশন
মেলার মাঠ,আগরতলা
মূল্য ৬৭০ টাকা


















